-- "তোমার কি মনে পড়ে কোনো এক কোলকাতার কবি লিখেছিল বৃষ্টি নিয়ে ... লিখেছিল যে বৃষ্টি এলে তার মনে হয় সেতুবন্ধ হচ্ছে তার সাথে তার প্রেমাস্পদের।"
-- "এমন ফটকা রোমান্টিকতা তুমি নাও কীভাবে?"
-- "ভালভাবে নিই না। বিশ্বাস করো। স্রেফ মনে পড়ল তাই বললাম।"
বলেই ছেলেটি হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ে। ‘ফটকা রোমান্টিকতা! বেশ তো!’ ছেলেটি আওড়াতে থাকে কেবল। আর ওর হাসিতে কিছুতেই যোগ না দিয়ে পারে না সঙ্গীটি।
-- "সেতুবন্ধ নিয়ে এত গুরুগম্ভীর কিছু বলার দরকার পড়ে না। বৃষ্টিতে এমনিতেই নানারকম সেতুবন্ধ হয়। হবারই কথা। খাবার পানির সাথে গুয়ের পানিরও সেতুবন্ধ হয়।"
-- "এটা কেমন কথা?" আশ্চর্য হয় প্রথমজন।
-- "শুনতে খারাপ লাগছে তোমার? কিন্তু কেন? হয় না বলতে চাও? তোমার আমার হয় না। কিন্তু অনেকেরই তো হয়।"
এই কথায় ভাবান্তর হয় প্রথমজনের। ফলে সে থাই এলুমিনিয়ামের কাঠামে লাগানো খয়েরি কাচের দিকে চেয়ে থাকে। বৃষ্টিরা সেখানে লেপ্টে লেপ্টে যাচ্ছে। কাচের গায়ে লেগে থাকা ধুলোরা ধুয়ে যাচ্ছে। আর একেকটা জলের ধারা ফিতাকৃমির মতো আকার নিয়ে নানারকম খেলা করে চলেছে। বাইরের পৃথিবীটা তখন দূরকায়া, ঝাপসা। ওধারের বাড়ির ব্যালকনিতে একটা দলছুট কাক আশ্রয় নিয়েছে। ওর চোখে সঙ্গীহীন ত্রস্ততা। এই আবছায়া খয়েরি কাচ ভেদ করেও তা বোঝা যায়। বাম পাশের উঁচু বাড়িটার ওপর তলায় ক্যাঁচক্যাঁচ করে জানালা খোলার আওয়াজ হয়। টয়লেটের জানালার মতো ছোট ছোট জানালা। কিছুণ আগেই ওগুলো বন্ধ করা হয়েছিল। এখন এই বৃষ্টির মধ্যেও আরেকটু বাতাসের লোভে আধখোলা করে দিতে চাইছে কোনো এক গার্মেন্টস শ্রমিক। জানালার পাল্লায় হাতটা দেখা যায়। হাতের মালিক মুখটাকে দেখা যায় না। ওর নাগাল পাবার চেষ্টা বলে দেয় জানালাগুলো ওর মাথার ওপরে। গার্মেন্টস কারখানায় এরকম জানালা থাকে। হয়তো বৃষ্টি দেখতে গিয়ে কাজে ভাটা পড়বে এই দুশ্চিন্তা থেকে জানালাগুলো খাটো করে দেয়া। সামনের ত্রস্ত কাক ঘাড় কাৎ করে জানালার ক্যাঁচক্যাঁচ দেখে কিংবা শোনে। তেমন ভীতিকর কিছু না দেখে আবার বৃষ্টি থামবার প্রার্থনায় মগ্ন হয়। সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ছেলেটার চোখে একবার চোখাচোখি হয়। কাকটি চোখ নামিয়ে নেয় বিব্রত অসচরাচর একাকীত্বে। ছেলেটির দিব্যি মনে হলো এই কাচ ডিঙিয়েও চোখাচোখি হয়েছে।
কাকটির সঙ্গে চোখাচোখি শেষ হলে ছেলেটি পাশে থাকা সঙ্গীর দিকে ফেরে। আর ফিরেই বুঝতে পারে এতণ সে তাকেই দেখছিল। তার মুখে কী ছায়া পড়েছে সে নিজে তা জানেনি। কিন্তু সেই ছায়ার প্রত্যুত্তরে এমন আর্ত, আর্দ্র চোখ আর অবয়ব সঙ্গীটির যে, সে নিজের মুখের ছায়ামণ্ডলী টের পেয়ে যায়। সেও সেবেলা চোখ নামিয়ে নেয়। পলাতক প্রসন্নতার বিব্রতিতে। বাইরে কিন্তু বৃষ্টি তখন পাগলা চালে ছুটছে। আর জানালার কাচে ফিতাকৃমির মতো অবয়বগুলো আরো ঘন আরো নিরন্তর ফুটছে। সামনের ব্যালকনিতে কাকটাকে এখন যেকোন পাখি মনে হয়। ওর অস্তিত্ব এখন নেহায়েত ছেলেটির জ্ঞানের ওপর ভরসারত। নইলে কাচ আর বৃষ্টি ডিঙিয়ে ওকে আর চেনা যায় না। ছেলেটি সঙ্গীর দিক থেকে কাচেই ফেরে তবু। আর শার্সিটা একপাশে সরিয়ে দেয় খানিক।
বৃষ্টিরা ছাঁটে ছাঁটে ঘরে ঢোকে। আর ছেলেটি কাকের সঙ্গে আরেকবার চোখাচোখি করতে চায়, এবারে নিবিড়। কোনো শব্দ হয়নি যদিও, কাকটি তবু শার্সিখোলা দেখল একপল। এবং আবার অধোবদন, ও টের পেয়েছে একটা চোখাচোখির আবেদন আছে এপারের জানালা থেকে। পাশের গার্মেন্টসটাতে খাটো খাটো জানালার আধখোলা পাল্লা থেকে নড়বড় করে দুলতে থাকা পাখাগুলো ঘুরতে দেখা যায়। আর কাকটা সেটা নিয়ে ভ্রূক্ষেপও করে না। আর ছেলেটি এভাবে দুটিমাত্র দৃশ্য থেকে ক্রমাগত আরো আরো প্রচ্ছায়াদের মুখের ভাঁজে মাখতে থাকে। মাখতেই থাকে। আর কাকটা বিব্রতভাবে আরো আরো মাথানিচু করে।
ছেলেটির দিকে চেয়েই থাকে সঙ্গীটি। ছেলেটি টের পায়। যেভাবে টের পাচ্ছে কাকটা। কিংবা, হয়তো, যেভাবে টের পেয়েছিল মাথা-না-দেখানো গার্মেন্টস-হাতখানা। ছেলেটির মুখে প্রচ্ছায়ারা আরো ঘনীভূত হলে, নিছক বাৎসল্যে, সঙ্গীটি তার কাঁধে আলতো খুউব আলতো একগোছা হাত রাখে। আর ছেলেটি জানালার শার্সি থেকে, অকস্মাৎ, ডুকরে কেঁদে ওঠে। সঙ্গীটি দুই হাতে মুখ ফেরানোর চেষ্টা করে ওর। শার্সিটা খোলা ছিল বলে কিছুতেই বোঝা যায় না প্রচ্ছায়ার অধিকন্তু ওর মুখে জলগুলো কীসের। বৃষ্টিরও হতে পারে। কিংবা কান্নার। কিংবা দুয়েরই। কিন্তু এখন তো সে ডুকরে কাঁদছে।
সঙ্গীর নিমন্ত্রণে সে সমর্পিত ভারে মুখ ফেরায়। সঙ্গীকে গাঢ়, শক্ত, ব্যাকুল আলিঙ্গন করে। তারপর তার কাঁধে নিজের মাথার ভার গুঁজে দিয়ে সে কাঁদতে থাকে। দুজনে এরপর নিতান্ত নিরুপায়, অথচ আকাক্সিত, স্পর্শে ভরিয়ে দিতে থাকে দুজনকে। আর ঠিক তখনি কাকটা একবার আলগোছে খোলা শার্সিটার দিকে চায়। এবেলা চোখ নামিয়ে সে আবার বৃষ্টি থামবার প্রার্থনায় মনোযোগ দেয়।
(২৮শে জুন, ২০০৪/শ্যামলী)
প্রকাশ: সম্ভবতঃ অপ্রকাশিত। কিন্তু কামরুজ্জামান সম্পাদিত কথা'র কোনো সংখ্যা এটি প্রকাশিত হয়ে থাকতে পারে। মনে নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



