শুরুতেই একটা কাহিনীতে সকলকে শরিক করি। ১৯৯৯ বা ২০০০ সাল। ১৯৯৮ সালের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের নাগরিক স্মৃতি তখনও প্রকট। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সভাপ্রধান তখন সম্ভবত জনাব সারা যাকের। তিনি কোনো একটা বিশেষ দিনে অন্যান্য অনুষ্ঠানের পাশাপাশি নারী থিয়েটার কর্মীদের পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা এবং হয়রানির অভিজ্ঞতাকে জনদরবারে হাজির করার সিদ্ধান্ত নেন। সন্ধ্যাবেলা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এই বিষয়ে একটা খোলা আলোচনা আয়োজন করেন। হয়তো আমাদের ১৯৯৮ সম্পৃক্তির কারণেই, কাউকে কাউকে সেখানে তিনি হাজির থাকতে আগাম তাগাদা দেন। আমরা কয়েকজন সেখানে গেছিলাম। অবাক হইনি যে, একজনের পর একজন নতুন প্রজন্মের নারী থিয়েটার কর্মীরা সেখানে বক্তব্য রাখছিলেন থিয়েটার করতে এসে তাদের যে আসলে এসব 'বাজে' কোনো অভিজ্ঞতাই হয় না সেটা বোঝানোর জন্য। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না যে উদ্যোক্তারা 'থিয়েটার' অঙ্গণে "পবিত্র" সম্পর্ক আছে এই প্রচারণা চালানোর জন্যই অনুষ্ঠানটার আয়োজন করেছিলেন কিনা। কিন্তু আমরা কয়েকজন যারপরনাই ক্ষুণ্ন হয়েছিলাম। এবং আমাদের ওটাকে বড়জোর নৈশব্দের অনুশীলন মনে হচ্ছিল। আমাদের এক আলোকচিত্রী বন্ধু, সৈয়দা ফারহানা, মঞ্চে উঠে এই অভাবনীয় পরিবেশের কাহিনীকে অবিশ্বাস করার ঘোষণা দেবার আগ পর্যন্ত এই নাটক চলতেই থাকল। "আমাদের থিয়েটারের পরিবেশ কী ভালো কী ভালো!" জাতীয় প্রপাগাণ্ডা এরপর আর ঠিক জমে ওঠেনি। তবে নারীদের অভিজ্ঞতা নিয়েও কার্যকরী কোনো আলাপ হয়নি।
জাহাঙ্গীরনগরে হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড বা যৌন নিপীড়ন অধিক ঘটে -- এই থিসিসটা নিয়ে ইতোমধ্যেই দু'চারজন ব্লগার স্পষ্ট করেছেন। জা.বি.র শিক্ষার্থীরা নিশ্চুপ থাকার সংস্কৃতি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটাই বড়জোর অপরাপর কর্মক্ষেত্র থেকে জা.বি.র স্বাতন্ত্র্য। এটাকে একদম সাধারণ বোধবুদ্ধি দিয়েই বোঝা সম্ভব।
ব্লগে মাঝেমধ্যেই যেরকম রংতামাশাধর্মী যোগাযোগ হয় সেই তুলনায় এই বিশেষ বিষয়টাকে ব্লগাররা যে অনেক সিরিয়াসলি নিয়েছেন সেটা জা.বি.র একজন বাসিন্দা হিসেবে আরামদায়ক।
অভিযুক্ত, এবং সদ্য অভিযোগ থেকে প্রশাসনিক উপায়ে খালাসপ্রাপ্ত, ছানোয়ার হোসেন-এর খালাসপ্রাপ্তি অনেকগুলো উপাদানের উপর নির্ভর করেছে। তিনি নিজে একজন একনাগাড় দলবাজ। যদ্দুর শোনা যায়, মাস্টারির এই কাজটাতে যোগদানের সময় যেখানে বাজিগিরি করেছেন সেই দলের সঙ্গ দরকার মতো বাদ দিয়ে আবার অন্য দলের বাজিগর হয়েছেন। মাস্টার হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন (আছেন) সেটা স্বতন্ত্র জিজ্ঞাসা এবং আমি তার ছাত্র না বিধায় না বলাই অধিক যুক্তিসঙ্গত। এখানে দলের বিষয়টা একটু খোলাসা করা ভাল। এই সুযোগে অনেকেই এনজিও-সিভিল-বিশ্বব্যাঙ্কের সুরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি উঠিয়ে দেবার দাবি করেছেন। ক্যাম্পাসে দলবাজি, জাতীয় রাজনৈতিক দলের ফপরদালালি আর দাবিনামা পেশের অধিকারচর্চা সবগুলো একটার থেকে একটা স্বতন্ত্র জিনিস। লক্ষ্য করবেন এখানে অন্তত তিন ধরনের মালের কথা বলা হলো। এবং তালিকাটা আরও দীর্ঘ বানানো সম্ভব। যখন 'রাজনীতি বন্ধ কর' ধরনের কথা ওঠে তখন আতঙ্ক জাগে পাছে না আপনারা পেশাগত অধিকারচর্চাটাই বরবাদ করে বসেন। কারণ, ক্যাম্পাসে লীগ, দল, জাপা, জামাত-এর ফপরদালাল থাকবে না এমন আব্দার ৪টাকার মাস্টার না হয় ধরা যাক মানতে শুরু করল, হাজার গুণ্ডার পার্টি মানবে তো?! ক্যাম্পাসে দালালবৃদ্ধির জাতীয় চর্চাটা বন্ধ করা লাগবে না? এ তো গেল একটা দিক। একটা ৪হাত মাদুরে পর্যন্ত কে আগে বসেছে তা নিয়ে আল-ঠেলাঠেলি চলে। আর একটা আস্ত ক্যাম্পাসে দলবাজি চলবে না? কিন্তু পেটি-স্বার্থময়তার এই দলবাজির পাল্টা কী রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সৃষ্টি করা যায় সেই উপায়ও তো ভাবা দরকার। এগুলো বলছি একটা বাতিকগ্রস্ত "রাজনীতি চাই না" আওয়াজ যে উপকারী নাও হতে পারে সেটা স্পষ্ট করার জন্য।
কিন্তু কথা হচ্ছিল জনাব ছানোয়ার হোসেন-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ জা.বি. কর্তৃপক্ষ খালাস করে দেয়ার প্রেক্ষাপট নিয়ে। আরও যদ্দুর বোঝা যায়, দলবাজির দক্ষতা ছাড়াও খালাসপ্রাপ্ত শিক্ষক নিজ এলাকায় এবং ক্যাম্পাসে যথাক্রমে আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল-এর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহযোগিতা পেয়েছেন। এই বাহিনীর কাজ ছিল এককথায় বললে আন্দোলনরতদের চেতনা/সাহস ধ্বংস, টেলিফোন মাধ্যমে কিংবা সাক্ষাত ভীতিপ্রদর্শন এবং মূল এজেন্ডাগুলোকে পাতলা করে দেয়ার বাজারী গল্প চালু করা। এগুলো ক্যাম্পাস-রাজনীতির পুরানো চালিয়াতি। কিন্ত একত্রে বাঘে-মহিষে কাজ করার তো আর আকছার উদাহরণ থাকে না। খালাসপ্রাপ্তের কৃতিত্বই মানতে হবে এটাকে। (এই কাজ এখনো কেন্দ্রে করা সম্ভব হয় নাই।)
এটা কাকতালই হবে যে জা.বি.র উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং ছানোয়ার হোসেন-এর তদন্ত সময়ের বিচারে এক কালে হয়েছে। কিন্তু এটা কাকতালীয় নয় যে আগের উপাচার্য এবং তার লোকজন এটাকে যথাসম্ভব প্রলম্বিত করেছেন। বর্তমান উপাচার্য এমনিতে নামেই উপাচার্য। দলবাজি করে করে নিজের লোকজন বানিয়ে ফেলার অনেক সুযোগ তিনি তার ক্যারিয়ারে তেমন এস্তেমাল করেন নাই। ফলে তার বাহিনী বলতে খুব ঢোড়াসাপ কিসিমের অল্প এবং কনফিউজড প্রকৃতির একদল মানব। এই লুরমা দশাটা ছানোয়ারকে সাহায্য করেছে মানতে হবে। আমার বক্তব্য কিন্তু এই নয় যে, উপাচার্য ছানোয়ারকে শাস্তি দেবার চেষ্টা করেছেন; বরং এই প্রসঙ্গে তার নড়াচড়া (অন্যান্য প্রসঙ্গেও) অগ্রজের পাদুকাবহন মাত্র। আমার বক্তব্য হচ্ছে পাইকপেয়াদাহীন উপাচার্য একাধারে পাইক ও পেয়াদা ছানোয়ার-এর প্যারেন্ট দল নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। তিনি দীর্ঘসূত্রিতা করেছেন একদম বড়ভাইয়ের কায়দায়। এখানে এটা ভাবার একটা ক্ষীণ সুযোগ আছে যে আগের উপাচার্য মেয়াদবৃদ্ধির সুযোগ পেলেই বরং চক্ষুলজ্জাজনিত একটা মামুলি শাস্তি ছানোয়ার লাভ করে থাকতে পারতেন। এখানে আমার আলোচনায় চক্ষুলজ্জা বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। যারা জানেন না তাদের জানানোটা আমার কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে যে জনাব ছানোয়ার হোসেন দলবাজির গতিপ্রবাহে, সর্বশেষে, "মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি" নামধারী এবং আওয়ামী ঘোষণাবাহী শিক্ষককুলের একাংশপন্থী যে একাংশ শিক্ষক সমিতির সভাপতির নেওটা; এবং এই সভাপতি সাবেক উপাচার্যের মিত্র (মানে নেওটা আরকি)। ফলে নিজ পুত্রকে বিচারে এক থাপ্পড় লাগানোর মতো চক্ষুধোলাই একটা শাস্তি হলেও হতে পারত। বর্তমান উপাচার্য সেটাকে এড়ানোর জন্য মোচড়াবেন এটাই স্বাভাবিক ছিল।
কিন্তু এখানে তদন্ত কমিটিসমূহ একটুও কম ভূমিকা রাখেন নাই। তারা সমূহ, কারণ তিনটা ভিন্ন ভিন্ন কমিটি হয়েছে, এবং সমূহ বিপদের কারণ হয়েছে। ইচ্ছায় হোক বা অলখে এই কমিটিগুলো দীর্ঘসূত্রিতার সবচেয়ে বড় মালমশলা সরবরাহ করেছেন। এবং সেটা তিনটা কমিটি হওয়া থেকেই বোঝা সম্ভব। এদের রিপোর্ট যেহেতু একটা দাবি এখন, এবং যেহেতু তা এখনো পাওয়া যায়নি, আপাতত এই বিষয়টা আমি সংক্ষিপ্ত রাখি।
হিসেবে থাকুক বা নাই থাকুক ইউজিসি (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) এক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতায় অবদান রেখেছে। এটা কালিক দীর্ঘসূত্রিতা না ঘটালেও মানসিক ঢিলেমির দারুণ একটা অবকাশ করে দিয়েছিল এমন একটা সময়ে যখন কর্তৃপক্ষের কিছু না কিছু উসিলা দরকার পড়ছিলই। সেই সময়ে অখণ্ড নীতিমালার একটা ঘোষণা, তা যতই ভাল হোক, জা.বি. কর্তৃপক্ষকে একটা অজুহাত সরবরাহ করেছে। "আমরা আর কী! এখন তো ইউজিসিই নীতিমালা করবে।" এরকম আরকী।
কিন্তু কারণগুলোকে পর্যালোচনা করলে এই কারণটাকেও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে যে গত এক দশকে ক্যাম্পাস সংস্কৃতির যে কর্পোরেটায়ন হয়েছে তাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনমুখিতা। একটা গড়পড়তা আন্দোলনবিমুখতা এখনকার ক্যাম্পাসের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এর একটা ফলাফল হচ্ছে আন্দোলনে ব্যাপক এবং প্রগাঢ় অংশগ্রহণ ১০ বছর আগের তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে কম। সম্ভবত বাংলাদেশের স্বদেশী এবং বিদেশী শাসকেরা এর থেকে বেশি খুশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আর হতেই পারেন না।
রমজানের ছুটির প্রাক্কালে পরিশেষে কর্তৃপক্ষ ছানোয়ার হোসেন-কে বেকসুর ঘোষণা করলেন।
শুরুতে একটা কাহিনী আপনাদের দরবারে হাজির করেছিলাম। জা.বি.তে নাট্যকলা বিভাগে (বিচ্ছিন্নভাবে অন্যান্য বিভাগ সমেত) যৌন নিপীড়ণ ও হয়রানির অভিযোগ নিয়ে কানাঘুষা চলে কম করে হলেও দু' দশক। ২০ বছর। কিন্তু নিশ্চুপ থাকার, ও রাখার সংস্কৃতি ভীষণ শক্তিশালী। অনেকেই ভণিতা করতে পারেন যে তারা জানেন না কিছু, কিন্তু অনেকেই ভণিতা করেন না এবং তাদের জানাশোনাটা ব্যক্ত করেন। কিন্তু সেটা তারা প্রকাশ্যে করেন না। সমস্যাটা কেবল জা.বি.র নয়। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগেরও নয়। পাবলিক ও প্রাইভেট বিভিন্ন সেক্টরে। মিডিয়া ও প্রেস-এ। থিয়েটার ও সঙ্গীত দলসমূহে। কিন্তু একটা চক্রব্যুহ ভেঙ্গে কথা বলবেন কে?! ভুক্তভোগী, নাকি সাক্ষী, নাকি সহকর্মী? খোদহয়রানকারী নিশ্চয় করবেন না।
কর্তৃপক্ষ একটা প্যারানয়ার মধ্যে ছিল। এখনো আছে। ছানোয়ার হোসেন খালাস পেয়েছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কেবল তাকে রক্ষা করে নাই। তারা রক্ষা করেছে একটা শিথিল এবং মিথোজীবী ব্যবস্থাকে। তারা রক্ষা করেছে খোদ নিজেদেরকেই। ছানোয়োর হোসেন যদি "দোষী" "সাব্যস্ত" হতেন এবং নামমাত্র একটা শাস্তিও তাকে দিতে হতো তাহলে কর্তৃপক্ষের মোকাবিলা করতে হতো আরও কঠোর এবং ব্যবস্থার জন্য স্পর্শকাতর একটা দাবি। নীতিমালা। ছানোয়ার হোসেন খালাসপ্রাপ্ত হয়ে খোদ জা.বি. কর্তৃপক্ষকে খালাস করে দিল আশু একটা চাপের মুখ থেকে।
কর্তৃপক্ষ একটা প্যারানয়ার মধ্যে ছিল। এখনো আছে। এটাই সম্ভবত এই মুহূর্তে মনোযোগ দেবার জায়গা। এটাই সম্ভবত এই আন্দোলনের কাজ করবার জায়গা।
.......
মোহাম্মদপুর।। ২০শে সেপ্টেম্বর ২০০৮।। রাত ১:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

