লন্ডনে হাজার হাজার বাংলাদেশী ছাত্র খোলা আকাশের নিচে
তাইছির মাহমুদ লন্ডন
’মাসে ২৫০ পাউন্ড ভাড়া দিয়ে একটি বাসার সিটিং রুমের ফ্লোরে ঘুমাই। খেয়ে না খেয়ে কোনো মতে দিন কাটাই। দেশ থেকে যে সামান্য টাকা নিয়ে এসেছিলাম তা দিয়ে ভাড়া দিচ্ছি। ১৫ দিন হয় লন্ডন এসেছি। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জব সেন্টারগুলোতে ধরনা দিচ্ছি। কিন্তু কোনো কাজ পাচ্ছি না। হাতের টাকা শেষ হয়ে গেলে রাস্তায় না খেয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’
কথাগুলো ঢাকা সিটি কলেজের সাবেক ছাত্রী শামীমা আলম সুমিলার। এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেনের প্রিন্সলেট স্ট্রিটের শাহনান জব অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট সেন্টারে।
ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা সুমিলা জানান, সাড়ে সাত লাখ টাকা খরচ করে লন্ডন এসেছেন। ঢাকার মতিঝিল এলাকার নাহার মার্কেটে (চতুর্থ তলা) ইউকে ভিসা রিফিউজড-সেন্টার তার ভিসা প্রসেসিং করেছে। পূর্ব লন্ডনের ওয়েস্টাহামে বাঙালি মালিকানাধীন ব্রিট কলেজে ভর্তি হয়েছেন। নামেমাত্র একটি কলেজ। ছোট ছোট কয়েকটি রুম। সেখানে কিছু ডেস্ক-বেঞ্চ ছাড়া আর কিছুই নেই। অথচ কলেজের অফার লেটার ও ভিসা প্রসেসিং সেন্টারে কত না আকাশকুসুম সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল হোস্টেল আছে। এয়ারপোর্ট থেকে গিয়েই হোস্টেলে উঠতে পারব। কিন্তু হিথ্রো এয়ারপোর্টে পা রাখতেই বাস্তবতা বুঝতে শুরু করলাম। যত দিন যাচ্ছে ততই বুঝতে পারছি বাস্তবতা কাকে বলে। লেখাপড়া আর কলেজ বলতে এখানে কিছুই নেই। ভিসা প্রসেসিং সেন্টার থেকে বলা হয়েছিল লন্ডনে থাকা-খাওয়া ও অর্থের কোনো অভাব হবে না। সেখানে পৌঁছতে পারলেই কাজ পাবো। কাজের কোনো অভাব নেই। ঘন্টাপ্রতি সাত পাউন্ড করে ওয়েজেস পাবো। কিন্তু এখন দেখছি বাংলাদেশ থেকে এখানে কাজ পাওয়া আরো কঠিন। আমি যদি সাড়ে সাত লাখ টাকা খরচ করে না আসতাম তাহলে আজই দেশে ফিরে যেতাম। এখন ফিরে গিয়ে বাবা-মার সামনে কিভাবে মুখ দেখাব। জানি না কপালে কী আছে?
শাহনান জব সেন্টারে মঙ্গলবার দুপুরে যখন সুমিলার সাথে কথা হচ্ছিল তখন তীর্থের কাকের মতো সারিবদ্ধভাবে সেখানে বসা ছিলেন অসংখ্য ছাত্র, যারা টিআর-৪-এর আওতায় স্টুডেন্ট ভিসা পদ্ধতি চালুর পর লন্ডন এসেছেন। সবারই দৃষ্টি জব সেন্টারের ম্যানেজার ও তার টেলিফোনটির দিকে। কাজের জন্য লোক চেয়ে কি কোনো ফোন কল আসে। হঠাৎ হয়তো বা কাজ চেয়ে কেউ একজন ফোন করল, তখনই সবাই আনন্দিত হয়ে ওঠেন বোধহয় একটি কাজ পাওয়া গেল। কিন্তু দেখা গেল কোনো কজের জন্য নয়, কাজ প্রার্থীর ফোন কল। এভাবেই সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রতিটি জব সেন্টারে ছাত্রদের উপচে পড়া ভিড়।
জব সেন্টারের ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমার অফিস যতক্ষণ খোলা থাকে ততক্ষণই ছাত্ররা বসে থাকে। তাদের সাথে সারাদিন কথা বলে আমি হয়রান। এক হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রীর একটি তালিকা দেখিয়ে তিনি বলেন, আমার কাছে সবাই নাম-ঠিকানা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিন বারবার এসে খোঁজ নিচ্ছেন, অনবরত ফোন করছেন। কিন্তু কাজ পাবো কোথায়? ব্রিটেনে যেখানে বিশ্বমন্দার কারণে প্রতি মিনিটে সাতজন লোক চাকরি হারাচ্ছেন, সেখানে জব আসবে কোথা থেকে? আবুল কালাম আজাদ বলেন, দিনে গড়ে একটি কাজও দিতে পারি না।
তিনি বলেন, এ অবস্খা শুধু তার জব সেন্টারেই নয়, পূর্ব লন্ডনে বাঙালি মালিকানাধীন যে ১০-১৫টি জব সেন্টার আছে সবগুলোরই একই চিত্র।
শাহনান জব সেন্টারে কথা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ধীমান শাহের সাথে। ভর্তি হয়েছেন ব্রিকলেনের ক্লিফটন হোটেলের ওপরে অবস্খিত এসডিএস কলেজে। ভিসা প্রসেসিং বাবদ তাকে গুনতে হয়েছে সাড়ে সাত লাখ টাকা। লন্ডন এসে যখন কলেজে গেলেন দেখেন এসব তো কোনো কলেজ না। বাংলাদেশের প্রাইমারি স্কুলও তো এর চেয়ে অনেক বড়। একটি রেস্টুরেন্টের ওপরে দু’টি রুমে কিছু ডেস্ক-বেঞ্চ বসিয়ে নামমাত্র একটি কলেজ। আসার সময় ধীমান দেশ থেকে সামান্য টাকা এনেছিলেন। ওগুলো দিয়ে আপাতত থাকা-খাওয়া ও পকেট খরচ চালাচ্ছেন। একটি ছাত্র মেসে আছেন। প্রতি সপ্তাহে থাকা-খাওয়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিফোন, ইন্টারনেট বিল বাবদ পরিশোধ করতে হয় ৬০-৭০ পাউন্ড, যা বাংলাদেশী টাকা সপ্তাহে প্রায় সাত হাজার টাকা। প্রতি সপ্তাহে সাত হাজার খরচ হলে দেশ থেকে আনা অর্থ শেষ হয়ে যাবে ক’দিনেই। তখন কী করবেন? কাজ পাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না তিনি।
কথা হয় লন্ডন রিডিং কলেজের ছাত্র আরিফ আহমদের সাথে। জানালেন তারা দু-তিনজনের থাকার কোনো জায়গা নেই। রাত ১০টা পর্যন্ত পার্কে থাকেন। কিন্তু এর পর আর থাকা যায় না। কারণ পার্কের গেট বìধ করে দেয়া হয়। তখন কোনো মসজিদে আশ্রয় খুঁজতে হয়। গত রাতে একটি মসজিদের বারান্দায় চার-পাঁচ ছাত্র এক সাথে ঘুমিয়েছিল। সকালে ওঠে দেখেন রাতে তার মানিব্যাগ ও জরুরি কাগজপত্র চুরি হয়ে গেছে। পকেটে একটি টাকাও নেই। সকালে এক গ্লাস পানি খেয়ে জব সেন্টারে এসেছেন। বিকেল পর্যন্ত কিছু খাননি।
মুন্সীগঞ্জ থেকে এসেছেন সুমি। ছেলেরা এক রুমে গাদাগাদি করে থাকতে পারলেও তাকে থাকতে হয় সিঙ্গেল রুমে। এতে তাকে পয়সা দিতে হয় বেশি। সাড়ে তিন মাস হলো অথচ এখনো কোনো কাজ পাননি।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন বাংলাদেশ থেকে যেসব ফ্লাইট লন্ডন আসছে তার প্রতিটির ৯০ ভাগ যাত্রীই হচ্ছেন বাংলাদেশী ছাত্র।
ভিসা প্রসেসিংয়ের নামে বাংলাদেশে একটি দালাল চক্র মোটা অঙ্কের অর্থ কামিয়ে নিচ্ছে। যেখানে মাত্র সাড়ে তিন হাজার পাউন্ড টিউশন ফি দিয়ে কলেজে ভর্তি হওয়া যাচ্ছে, সেখানে ভিসা প্রসেসিংয়ের নামে ছাত্রদের কাছ থেকে ৭ থেকে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
তথ্যসুত্রঃ এখানে ক্লিক করুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


