আমরা সতর্ক এবং সাবধান,
বর্তমান সময়ে জীবনের প্রয়োজনে অনেকেই সতর্ক এবং সাবধান হতে চেষ্টা করেন। কোন প্যাকেটজাত খাবার কিনতে গেলে আমরা তার উৎপাদন তারিখ ও মেয়াদউত্তীর্ণ তারিখ পরখ করেন এবং আরও সতর্ক যারা তারা সেই প্যাকেটজাত খাবারটি কোন কোন উপাদান দিয়ে তৈরী, তাতে ক্ষতিকারক রং মিশ্রিত আছে কিনা, বা এমন কোন উপাদান আছে কিনা যা শরীরের জন্যে ক্ষতিকর তাও পরখ করে দেখেন। মাছ কিনতে গেলে, মাছটি তাজা কিনা তা ফুলকা উঠিয়ে পর্যন্ত অনেকে পরীক্ষা করে দেখেন, অনেক দেখে শুনে মাছ ক্রয় করেন কারণ ফর্মালিন নামক একটা উপাদান মাছের সাথে ফ্রি পাওয়া যায়! শাক-সবজি কিনতে যেয়ে সেটি তাজা কিনা তাও পরখ করে দেখেন। এরপর ধরুন, কোন ইলেকট্রনিক্স কিছু কিনতে গেলে সেটা পরখ করে দেখেন কোন দেশের তৈরী, গ্যারন্টি বা ওয়ারেন্টি আছে কিনা, অনেকগুলো কম্পানি যাচাই বাচাই করে তারপর ইলেকট্রনিক্স পন্যটি ক্রয় করেন। কাপড় কিনতে যেয়ে সেই কাপড়টি সুতি নাকি সিল্ক, ইন্ডিয়ান নাকি দেশী নাকি বিদেশী, জামাটি কোথাও ছেড়া আছে কিনা বা কোন ক্ষুত আছে কিনা তাও যতেœর সাথে পরখ করে দেখা হয়। কোথাও বসতে যেয়ে আমরা পরখ করি সেই জায়গাটি পরিস্কার কিনা, কোন ময়লা লেগে আছে কিনা প্রভৃতি। টিভিতে কোন সিরিয়ালটি বেশী আকর্ষনীয় তথা কুফরের কথায় ভরপুর, কোন অনুষ্ঠানটি বেশী জমজমাট তথা কুফরের কার্যকলাপে সয়লাব সেটাও অনেকে অনেক সময় পরখ করেন রিমোট কন্ট্রোল চেপে। কোন সিনেমাটি বেশী ‘নাফরমানী মূলক আনন্দ’ দিবে তাও অনেকে আগে থেকে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। কোন ফ্ল্যাট কিনতে যেয়ে কোন রিয়াল এস্টেট কম্পানিটি বেশী সুবিধা দিচ্ছে, কাদের ডিজাইন বেশী আধুনিক ইত্যাদি অনেকেই পরখ করে দেখেন। কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়লে কিংবা কোন সাবজেক্টে পড়লে ‘বাজারদর’ বেশী পাওয়া যাবে তা প্রায় সবাই আগে থেকেই দেখেশুনে তারপর অগ্রসর হন। মোটকথা পার্থিব প্রয়োজনের সকল ক্ষেত্রেই আমরা সতর্ক এবং সাবধান। কিন্তু একটি বিষয়ে অধিকাংশ মানুষ চরম প্রকারের বোকা সেজে যান বা বিশেষ অজ্ঞতার পরিচয় দেন যা তার পার্থিব সতর্কতার সাথে তুলনা করলে অবাক হতে হয়। একই মানুষ পার্থিব প্রয়োজনে কত সতর্ক-সাবধান অথচ এই বিষয়টিতে চরম বোকা, অজ্ঞতা আর মুর্খতার পরিচয় দেন। বিষয়টি কোনটি?
কিন্তু...
বিষয়টি হচ্ছে ‘ইসলাম’! জ্বী সত্যি কথাই বলছি। বর্তমান সময়ে মুসলমানরা কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশী অজ্ঞ এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে ‘ইসলাম’। ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ অনেক মুসলমানেরই আছে তবে এই জানতে যেয়ে পার্থিব ক্ষেত্রে তারা যতটা সতর্ক-সাবধান এই ক্ষেত্রে তারা ততটাই বোকা সেজে যান। ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্যে বিভিন্ন বাতিল বইয়ের সারনাপন্ন হন। যেমনঃ মকসুদুল মোমেনীন, নেওয়ামুল কোরআন, তাজকেরাতুল আউলিয়া, ওয়াজে নিসওয়ান বা মহিলাদের ওয়াজ, বেহেশতী জেওর, বিভিন্ন পীর-কবর মাজার পূজারীদের বই, মাত্র দশটাকার বই, ফাজায়েল আমল, পাঞ্জেগানা বই, স্বপ্নের ব্যাখার বই বা খোয়াবনামা, বার চাঁন্দের ফযীলত, সূফী তরীকার বই, ইরানী কালচারাল সেন্টারের ফ্রি বই, স্টিকার, তাবীজ-কবজের বই, বিভিন্ন বিদআতী সাপ্তাহিক-মাসিক ম্যাগাজিন ইত্যাদি থেকে ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্যে অধিকাংশ মানুষের আগ্রহ। এই সব বই থেকে জানার সময় একটুও সতর্ক সাবধান হওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না। পরখ করে দেখেন না কোরআন এবং সহীহ হাদীসে কি রয়েছে। পরখ করে দেখেন না এই বইগুলোতে যা আছে তা কি কোনআন এবং সহীহ হাদীসে রয়েছে? সেই দলীল কি তারা উল্লেখ করে আর উল্লেখ করে থাকলেও সেই দলীলগুলো পরখ করে দেখা হয় না। পরখ করে দেখা হয় না যে ইবাদতের পদ্ধতী বা আমলের পদ্ধতী তারা বর্ণনা করছে তা রাসূল ﷺ এর সুন্নাতে রয়েছে কিনা। কুরআন, বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ পড়ে দেখার সময় হয় না। বোকা সেজে যান, আরে আমরা কি এগুলো বুঝব! ফাসিক, মিথ্যুক, ঘুষখোর, মদখোর, সুদখোর, বিদআতী, শিরকে-কুফরে লিপ্ত ব্যক্তি ইসলাম সম্পর্কে কথা বললে তা মাথায় ঢুকে যায়। শয়তান কি চালটাই না চেলেছে! পাপ কাজ করলে মানুষ বুঝতে পারে আর সহীহভাবে তওবা করলে আল্লাহ তাআলা তা ক্ষমা করে দেন, কিন্ত শয়তান এমন ঘোলই খাইয়ে দিয়েছে যে এতগুলো মানুষ শিরকে, কুফরে, বিদআতে লিপ্ত অথচ এই সম্পর্কে তাদের কোন বোধদয় নেই কারণ তারা এগুলোকে সওয়াবের কাজ মনে করেই করে থাকে! পার্থিব প্রয়োজনে যতটা সতর্ক-সাবধান অথচ নিজের দ্বীন রক্ষার জন্যে ততটাই অসতর্ক-অসাবধান। আর যারা বিভিন্ন নামধারী দলে নাকে ক্ষত দেন তাদের বিষয়টাতো আরো মারাতœক। আরে আমার পীরকি ভুল বলতে পারে, আরে এতবড় জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন তিনি কি ভুল করেছেন নাকি, আরে আমার দলকি ভুল নাকি, আরে এতগুলো মানুষ মানছে ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ পার্থিব প্রয়োজনে এই মানুষগুলো কতই না সতর্ক-সাবধান। ফর্মালিন যুক্ত মাছ হাজার হাজার মানুষ খেলেও অনেকেই খাবেন না কারণ এটা শরীরের জন্যে ক্ষতিকর। অথচ সহীহ বিষয় কোরআন-সুন্নাহ থেকে পাওয়া গেলেও তা মানবেন না কারণ অধিকাংশ মানুষ যে তা মানছে না! কি বিপরীতমুখী আচরণ। নিজের দ্বীন রক্ষা করাটাকে ‘সময় পেলে ভেবে দেখব’ টাইপে আবদ্ধ করে ফেলেছে! কিন্তু সেই সময় আর হয়ে উঠে না, বৃদ্ধ বয়সে যেয়ে যাও একটু ইবাদত করার চিন্তা মাথায় আসে তাও করা হয় ভুল পন্থায়, নিজে যা এতদিন ভুল জেনে এসেছেন সেই পন্থায়। কুরআন-হাদীস অনুযায়ী ইবাদত করার কথা বললে বলে উঠে, ‘আরে আমাদের বাপ-দাদাদের তো দেখিনি এভাবে করতে’! অবস্থাদৃষ্ট এমন দাড়ায় যে, ‘বুড়ো বয়সে আলেম’ সেজে যান, মসজিদে যেয়ে খবরদারি করেন যদিও ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান উপরে উল্লেখিত বইগুলো পড়ে! অথচ সাহাবীরা (রা) সবসময় আগে নিজের দ্বীনকে হিফাজত করতেন, সবসময় খেয়াল রাখতেন রাসূল ﷺ এর সুন্নাহ মোতাবেক ইবাদতটি হলো কিনা। শিরক, কুফর থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতেন। বিদআতীদের দেখলে সাহাবীরা তিরস্কার করতেন। তারা ইবাদত করে আল্লাহর নিকট কান্নাকাটি করতেন সেই ইবাদতটি কবুল হওয়ার জন্যে। মুনাফেকী থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতেন, আল্লাহর নিকট সাহায্য কামনা করতেন। কিন্তু আজ মুসলমানরা যে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক ও সাবধান হওয়া উচিত ছিল সেই বিষয়ে সবচেয়ে বেশী উদাসীন।
মুসলমানদের অধপতনের কারণ হিসেবে অনেকে অনেক রকম কারণ বলে থাকেন। অমুক ক্ষেত্রে মুসলমানরা পিছিয়ে, তমুক ক্ষেত্রে মুসলমানরা কিছুই জানে না আর এই মাপকাঠিগুলো নির্ধারণ করা হয় ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, ইসরাইল প্রভৃতি দেশের আলোকে। এগুলোর কোন কিছু মুসলমানদের অধপতনের কারণ নয়! কারণ, একটাই কোরআন এবং সহীহ সুন্নাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া। ইখলাসের সাথে ইবাদত এবং রাসূল ﷺ এর অনুসরণ না করা। তাই মুসলমান ভাই বোনদের আহবান করব, কোরআন এবং বুখারী ও মুসলিম অধ্যায়ন করুন। আল্লাহর নিকট সাহায্য চান, আপনার যদি আগ্রহ থাকে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই আপনাকে সঠিক হিদায়াতের পথে পরিচালিত করবেন, আপনাকে আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্যশীল ও অনুগ্রহ প্রাপ্ত বান্দাহদের দলে শামিল করে নিবেন। আপনার জীবনটি সুন্দর হয়ে উঠবে, আল্লাহর রহমতে আপনার পরিবার শান্তিরে ভরে যাবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের হিফাজত করুন এবং দ্বীন ইসলামকে জানার জন্যে আমাদের হিদায়াত দান করুন। আমীন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

