মূল লেখা: Jamaal al-Din M. Zarabozo-র]
..............পূর্বে প্রকাশিত লেখার ধারাবাহিকতায়:
কুর’আনকে কেবলি শিফা হিসাবে অথবা শারীরিক অসুখ সারাতে ব্যবহার করা
আল-কুর’আনে এমন কতিপয় আয়াত রয়েছে, যেগুলোকে একথার প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করা হয় যে, শারীরিক অসুস্থতার প্রতিষেধক হিসাবে কুর’আনকে ব্যবহার করা যায়। ঐ সব আয়াতের একটি হচ্ছে :
“আমরা ধাপে ধাপে কুর’আনের অংশ নাযিল করেছি যা বিশ্বাসীদের জন্য আরোগ্য ও রহমত। জুলুমকারীদের জন্য তা কেবলমাত্র তির পর তি।” (সূরা ইসরা, ১৭:৮২)
“.... বল : যারা বিশ্বাস করে এটা তাদের জন্য এক পথ নির্দেশক এবং শিফা।....” (সূরা ফুস্সিলাত, ৪১:৪৪)
এসব আয়াতে শারীরিক রোগের আরোগ্যের কথা বলা হয়েছে, নাকি আধ্যাত্মিক রোগমুক্তির কথা বলা হয়েছে তা নিয়ে কিছু আলোচনার অবকাশ রয়েছে।
যাহোক, কুর’আন যে শারীরিক ও আত্মিক দুই ধরনের রোগের বেলায়ই শিফা, তা নিম্নলিখিত হাদীস থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
আবু সাঈদ আল খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলের (সা.) কিছু সাহাবী এমন এক আরব গোত্রের সদস্য ছিলেন, যারা তাঁদের প্রতি অতিথিপরায়ণ হতে নারাজ ছিলেন। তাঁরা যখন সেই গোত্রের মাঝে অবস্থান করছিলেন, তখন সেই গোত্রের প্রধানকে সাপে কামড়েছিল (অথবা বৃশ্চিক দংশন করেছিল) এবং তারা সাহাবীদের জিজ্ঞাসা করলো, “তোমাদের সাথে কি কোন ওষুধ আছে? অথবা তোমাদের সাথে এমন কেউ আছে যে ঝাড়-ফুঁক করতে পারে?” তাঁরা উত্তর দিলেন, “তোমরা আমাদের প্রতি অতিথিপরায়ণ হতে নারাজ ছিলে, তাই তোমরা অর্থপ্রদান না করলে আমরা তার চিকিৎসা করবো না।” তারা একপাল ভেড়া দিতে সম্মত হলো। একজন সাহাবী সূরা ফাতিহা পড়তে শুরু করলেন এবং তাঁর লালা জড়ো করে তিনি ঐ ব্যক্তির ক্ষতস্থানে লাগালেন। ঐ গোত্রপ্রধান ভাল হয়ে উঠলো এবং তার লোকেরা সাহাবীদের ভেড়ার পাল দিতে চাইলে তাঁরা বলেন, “আমরা নবীকে (সা.) জিজ্ঞেস না করে এটা গ্রহণ করবো না (আমাদের জন্য এটা বৈধ কিনা সেটা না জেনে)।” তাঁরা যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করতে গেলেন, তখন তিনি মৃদু হেসে বললেন, “তোমরা কি করে জানলে যে সূরা ফাতিহা দিয়ে ঝাড় ফুঁক করা যায়? ওটা (ভেড়ার পাল) নাও এবং আমার জন্য এক অংশ বরাদ্দ করো।” (বুখারী)।
কিন্তু এটা স্পষ্ট যে, একমাত্র এই কারণেই যদি কেউ কুর’আনকে ব্যবহার করে বা এর কাছে যায়, তাহলে সে কুর’আনের বৃহত্তর কার্যকারিতা থেকে বঞ্চিত হলো। সেক্ষেত্রে সে শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসার মত একটি কারণে কুর’আনকে ব্যবহার করবে - যা করা এমনিতে বৈধ - কিন্তু সে তার মঙ্গলের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক অসুস্থতার চিকিৎসার কাজে কুর’আনকে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হলো। আল্লাহ্ বলেছেন :
“হে মানবকুল! তোমাদের কাছে তোমাদের প্রভুর কাছ থেকে এক সতর্কবাণী ও তোমাদের অন্তরের অসুস্থতার নিরাময় এসেছে, আর যারা বিশ্বাস করে তাদের জন্য এটা হচ্ছে এক পথনির্দেশনা ও রহমত।” (সূরা ইউনুস, ১০:৫৭)
উপরের এই আয়াতের উপর মতামত দিতে গিয়ে ইবনে বাদীস লেখেন :
“সূরা ইউনুসের এই আয়াতে কুর’আনকে অন্তরের চিকিৎসা বলে নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে - অন্তর হচ্ছে সেই স্থান, যেখানে বিশ্বাস সংরক্ষিত হয়। কেননা সেটাই হচ্ছে কুর’আনের প্রধান লক্ষ্য এবং সেটাই হচ্ছে অন্যান্য দিকগুলোর ভিত্তি। এটা এজন্য যে, যদি খারাপ বিশ্বাস ও সন্দেহগুলোকে অন্তর থেকে দূর করা যায় এবং সত্যে বিশ্বাস স্থাপন করা হয় ও নিশ্চয়তা ধরে রাখা হয়, তখন আত্মা পরিশুদ্ধ হয়ে যায় - ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং সামাজিক পর্যায়ে মানুষের ব্যবহার শুদ্ধ হয়ে যায় এবং তারা তখন পূর্ণতার দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে যায়। (উপরে উদ্ধৃত) সূরা আল-ইসরা ও সূরা ফুসসিলাতের আয়াতসমূহে যেমন ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, কুর’আন দুষ্ট চরিত্রের জন্যও এক চিকিৎসা - তার সাথে এর (উপরোক্ত বক্তব্যের) কোন বিরোধ নেই। কেননা, চরিত্রের উৎস হচ্ছে বিশ্বাস - আর তাই, চরিত্র হচ্ছে বিশ্বাসের স্বাভাবিক পরিণতি। উপরন্তু, মানুষের আত্মা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় না, যতক্ষণ না (বিশ্বাস ও চরিত্র) উভয়ে সুস্থ না হয়। এ ব্যাপারটারও আবার এই বাস্তবতার সাথে কোন বিরোধ নেই যে, কোন কোন ক্ষেত্রে কুর’আন শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসার কাজেও লাগতে পারে। যেমন সাধারণভাবে চিকিৎসা বা নিরাময়ের কথা বলা হলে, তার আওতায় এ দিকটাও এসে যাবে..... কিন্তু, কুর’আনে শিফা বলতে যা বোঝানো হয় তার মূল উদ্দেশ্য সেটা নয়।”
এরপর ইবনে বাদীস ব্যাখ্যা করে যান যে, অসুস্থতা হয় শারীরিক - নতুবা আধ্যাত্মিক। আধ্যাত্মিক রোগ হচ্ছে সেগুলো, যেগুলো মনের বা আত্মার রোগ। মনের সাথে সম্পর্কযুক্ত রোগগুলোর মাঝে রয়েছে ঔদাসীন্য, ভুল ধারণা, সভ্যতার ও পূর্বপুরুষের অন্ধ অনুকরণ, মিথ্যা বিশ্বাস এবং সত্য সম্পর্কে সন্দেহ। আত্মার সাথে সম্পর্কযুক্ত রোগগুলোর মাঝে রয়েছে চারিত্রিক দুর্বলতা, লালসা এবং অসদিচ্ছা।
উভয় ধরনের আধ্যাত্মিক রোগের নিরাময় পবিত্র কুর’আনে রয়েছে। প্রথম প্রকারের রোগের ব্যাপারে কুর’আন মানবকুলকে চিন্তা করতে, ভেবে দেখতে, বুঝতে এবং নিজেদের ও প্রতিবেশের সৃষ্টিসমূহের তদন্ত করে দেখতে আহ্বান জানায়। কুর’আন মানবকুলকে শিক্ষা দেয়, কি করে এই সৃষ্টির বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে হবে এবং কি করে চিন্তা করতে হবে। পূর্বপুরুষরা ভ্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও যারা তাদের পূর্বপুরুষের শিক্ষাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে, কুর’আন তাদের দোষারোপ করে। এরপরে কুর’আন এই বিশ্বের বাস্তবতার ব্যাপারে বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রশ্নাতীত যুক্তি উপস্থাপন করে। যারা এ ধরনের অসুস্থতা থেকে নিরাময় লাভ করতে চান, তাদের জন্য ফলাফল দাঁড়াবে সন্দেহ অথবা সংশয়মুক্ত সত্যের উপর এক দৃঢ় বিশ্বাস। দ্বিতীয় ধরনের আধ্যাত্মিক রোগের উপরে বলতে গেলে (অর্থাৎ আত্মার রোগের ব্যাপারে বলতে গেলে) বলতে হয় যে, কুর’আন একজন মানুষকে এই ধরনের রোগের দুষ্ট পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়। একই সময়ে তা কাউকে সঠিক আচরণ ও চরিত্রের বিরাট সুফল ও গুরুত্ব বর্ণনা করে সেগুলোর দিকে পরিচালিত করে।
এভাবেই উভয় শ্রেণীর আধ্যাত্মিক রোগের নিরাময় ঘটে। যদিও দুটো রোগেরই নিরাময় ঘটে বিশ্বাস সঠিক করার মধ্য দিয়ে - আর সঠিক বিশ্বাসই অন্যান্য সৎকর্মের ভিত্তি। সত্যি বলতে কি ঐ ধরনের রোগের (আধ্যাত্মিক রোগ) সত্যিকার নিরাময় কেবলমাত্র পবিত্র কুর’আনেই পাওয়া যাবে। কেউ যদি অন্য কোন উৎসের কাছে এসবের নিরাময় খোঁজ করে, তবে তার রোগ কেবল বৃদ্ধিই পাবে। আজকের পৃথিবীতে ঠিক তেমনটিই ঘটছে, যখন মানুষ মানুষের তৈরি তত্ত্ব ও নীতিমালার কাছে নিজেদের সমস্যার সমাধান ও রোগের নিরাময়ের জন্য ছুটে যায় - অথচ, কেবলমাত্র তার সৃষ্টিকর্তাই এক সত্যিকার ও পরিপূর্ণ সমাধান দিতে সক্ষম। তাই যে কোন বিশ্বাসীর উচিত, ইসলাম সম্বন্ধে যে কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে সকল “ইজম” বা মতবাদ ত্যাগ করে, ইখলাস বা বিশ্বস্ততার সাথে কেবল মাত্র আল্লাহর কালাম ও রাসূলের (সহীহ্) হাদীসের শরণাপন্ন হওয়া।
(চলবে......... ইনশা'আল্লাহ্!)
[এই পর্বের ঠিক আগের লেখাগুলো রয়েছে এখানে:
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link ]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



