'সাপ্তাহিক' - এর পাঠক ঈদ সংখ্যা 'প্রথম প্রথম' - এ ছাপা হওয়া 'পরমাণু গল্প'-এর ইউনিকোড কনভার্সন।
১৯ মে, ১৯৯৯। আজ আমরা মহাউত্তেজিত। আজ মৃতদেহের গায়ে ছুরি বিধাবো আমরা। এ কদিন শুধু লেকচার হয়েছে। দুই পায়ের চামড়া, মাংস, হাড় এগুলো নিয়ে লেকচার। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় দুই পায়ের একত্রে একটা বিটখিটে নাম আছে - ইনফিরিয়র এক্সট্রিমিটি। আজকে মৃতদেহের পায়ের চামড়া কেটে আমরা ভেতরটা দেখব। নার্ভ, আর্টারী, মাসল আলাদা আলাদা করে দেখব।
এতদিন লাশ রাখা ছিল ডিসেকশন ক্লাস রুমেরই এক পাশে, বড় চৌকানা একটা বাক্সে। আজ ক্লাসে এসে দেখি লাশ ঐ বাক্স থেকে তুলে রাখা হয়েছে পাশে ডিসেকশন টেবিলে। আমরা দূর থেকে দেখি। কাছে যাই না কেউ। মেয়েদের কয়েকজনের চোখ-মুখ শুকনো, যেন পাঁচশ লোকের সামনে জীবনে প্রথমবারের মতো বক্তৃতা করতে মঞ্চে তুলে দেয়া হয়েছে তাদের। ছেলেরা অবশ্য মুখে স্বাভাবিক ভাব ধরে রাখার চেষ্টা করে। মফস্বল থেকে আসা কেউ কেউ রাতের বেলা একা কবরস্থানে গিয়ে কি রকম সাহসের পরিচয় দিয়েছিল বা তার আত্মীয়ের মৃতদেহের কাছে কতটা অবলীলায় দাঁড়িয়ে ছিল, সে গল্প করে। মেয়েদের মুখ আরো আমসি মেরে যায়। তবে সবার চেহারায় নতুন ধরণের অভিজ্ঞতার উত্তেজনা খেলা করে স্পষ্টই।
স্যার এসে প্রথমে ব্রিফ করেন কি করতে হবে। তারপর আমাদের নিয়ে চলেন ডিসেকশন টেবিলের দিকে। টেবিলের কাছে আসতেই ঝাঁঝালো একটা গন্ধ ঝট করে নাকে এসে বাড়ি মারে। ঐ বিকট গন্ধের ধাক্কায় যেন দুই পা পিছিয়ে যাই আমি। অনেকে নাকে হাত চাপা দেয়। স্যার তাদের দিকে কড়া চোখে তাকান। স্যারের দিকে তাকিয়ে তারা নাক থেকে হাত সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু একটা মেয়ে দৌড়ে বেরিয়ে যায় ক্লাস থেকে। দূর থেকে আমরা দেখি, সে বারান্দায় গিয়ে বমি করছে। স্যার হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়েন। একটা মেয়ে এগিয়ে যায় বমি করা মেয়েটিকে সাহায্য করতে। আমি মুখ ঘুরিয়ে শ্বাস নিয়ে আবার লাশের দিকে ঘুরে শ্বাস বন্ধ করে রাখার চেষ্টা করি। বেশীক্ষণ পারি না। মুখের ঘাম মোছার ছলে নাকে মাঝে মাঝে হাতচাপা দেই।
স্যার শুরু করেন প্রথমে। মৃতদেহের উরুর চামড়ায় টান দেন ছুরি দিয়ে। একটা মেয়ে চিৎকার করে ওঠে। না, সে ডিসেকশন দেখে ভয়ে চিৎকার করেনি। তার সামনে দাঁড়ানো মেয়েটা ঢলে পড়ে গেছে ওর গায়ের উপর। ছুরির কাজ দেখে অজ্ঞান হয়ে গেছে সে। 'এ টুকুতেই এ অবস্থা হলে এরা ডাক্তারি করবে কেমনে?' - স্যার বিরক্তি প্রকাশ করে ওকে সরিয়ে নিয়ে যেতে বলেন। দুটো মেয়ে অজ্ঞান মেয়েটাকে ধরাধরি করে দূরে সরিয়ে নিয়ে মুখে পানির ছিটা দেয়। আমরা আবার মনোযোগ দেই স্যারের কাজে।
স্যার কিছুটা কাজ এগিয়ে, মানে চামড়া কেটে ছুরি এগিয়ে দেন ছাত্রছাত্রীদের হাতে। কারা ডিসেকশন করতে আগ্রহী? রাকিব, জয়, আসিফ, সায়েম, সেলিম, সারাহ আর শান্তা হাত তোলে। তারা আগ্রহী। মনে হলো, অন্যরা হাঁফ ছেড়ে যেন বাঁচলাম। কিন্তু না। হাঁফ ছাড়া আর হলো কই? সবাইকে লাশের গায়ে ছুরি ছোঁয়াতে হবে অর্থাৎ একটু হলেও কাটাকাটি করতে হবে - স্যারের নির্দেশ। আর যারা আগ্রহী, তারা মাংসপেশী আলাদা করার কঠিন ও সময়সাপেক্ষ কাজটা করবে। এবং সেটা শুধু আজকের জন্যই। প্রথমদিন বলে কিছুটা মাফ। কিন্তু পরদিন থেকে সবাইকেই বাই রোটেশন ভালোভাবে ডিসেকশন করতে হবে।
উত্তেজনা ততক্ষণে মিইয়ে গেছে। আমরা বেশীরভাগই নিতান্ত অনাগ্রহী। সবাই একটু আধটু ছুরি চালিয়ে চলে আসছে। গন্ধের জন্য আমার লাশের সামনে যেতে ইচ্ছে করছে না। ভেবেছিলাম, স্যার হয়তো লক্ষ্য করবেন না। ভীড়ের মধ্যে পার পেয়ে যাব। কিন্তু আমি বাদে নিম-আগ্রহী ছেলেদের সিরিয়াল শেষ হওয়ার পর যখন মেয়েরা শুরু করবে, তখনই স্যার আমাকে নির্দেশ করে বললেন, 'এই ছেলে তুমি যাও না কেন? যাও।'
আমি দূর থেকে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে লাশের দিকে এগোই। টুটুলের কাছ থেকে ছুরি নিয়ে লাশের একদম কাছে পৌঁছার আগ মুহূর্তে সোহেলের গায়ে ধাক্কা খাই। সরতে গিয়ে সোহেলের কনুই এসে লাগে পেটে। ভুস করে সঞ্চিত বাতাস বের হয়ে যায় ফুসফুস থেকে। আবার শ্বাস নিতেই তীব্র গন্ধ নাক দিয়ে ঢুকে যেন মাথার ভেতরটা ঝাঁকিয়ে দেয়। মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। চোখে পানি চলে আসে। নাড়ি-ভুড়ি উল্টে বেরিয়ে আসতে চায়। আর থাকতে পারি না। ছুরিটা টেবিলে ফেলেই ঘুরে দৌড় দেই বারান্দার দিকে। পেট চেপে বসে পড়ে হড় হড় করে বমি করে দেই। সহপাঠীদের হাসির আওয়াজ দূর থেকেও কানে আসে।
..........................
ছাপা হওয়া আরও কয়েকটি 'পরমাণু গল্পের' লিংক-
সেই তিন শব্দ - মৌচাকে ঢিল
বীভৎস - মৌচাকে ঢিল
চেনা চেনা লাগে - রস+আলো
স্মৃতি রয়ে যায় - সাপ্তাহিক ২০০০
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জানুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৫:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


