somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

'অন্যায়' - ছুটির দিনে, প্রথম আলো

০৭ ই নভেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৪:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হঠাৎ করেই বিশ্রী গন্ধটা নাকে লাগে, ঝট করে যেন মগজের ভেতরটা পর্যন্ত নাড়িয়ে দেয়। এই গন্ধটা সহ্যই করতে পারি না কখনো। মাথা দপ দপ করতে থাকে, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। উঠে দাঁড়িয়ে দেখি সামনের দুই সীট আগে বসা এক ভদ্রলোক (!) সিগারেট ধরিয়েছেন। গলার আওয়াজটা একটু উঁচু করেই বলি, ‘এই যে ভাই সিগারেট ধরালেন যে?’
‘তো?’ নির্বিকার ভঙ্গিতে উল্টো প্রশ্ন করেন ভদ্রলোক।
‘ট্রেনে সিগারেট ধরানো নিষেধ, এইটা আপনি জানেন না?’
লোকটি মুচকি হাসে, জবাব দেয় না, সিগারেট ধরা হাতটা কেবল কিছুটা জানালার দিকে এগিয়ে রাখে।
মেজাজ চড়ে যায়। - ‘দেখেন না কি লেখা আছে?’ বলে ‘প্রকাশ্যে ধূমপান আইনত দন্ডনীয়’ লেখাটা তাকে দেখিয়ে দিই- ‘আপনারা দেখি আইনও মানতে চান না। এখন পুুলিশ ডেকে আনি, জরিমানা করে দেবে আপনারে?’
লোকটি এবার বিরক্তি প্রকাশ করে - ‘কি শুরু করলেন ভাই? এই দেশে কে কয়টা আইন মানে? আপনি নিজেই কয়টা মানেন? ট্রেনের কারোই কোনো সমস্যা হইতেছে না, খালি আপনেই চিল্লাফাল্লা করতেছেন। অসুবিধা হইলে আমি সিগারেট শেষ করা পর্যন্ত আপনি একটু ঘুইরা আসেন।’
চরম ক্রোধে আমি বাক্য হারিয়ে ফেলি। সাহায্যের আশায় আশপাশে তাকাই। বেশীরভাগ যাত্রীই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। দুই একজন আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন, কারো মুখে মুচকি হাসি, কিন্তু এই বচসায় অংশগ্রহণের তেমন ইচ্ছে কারো নেই।
অনির্দিষ্টভাবে বলি- ‘দেখছেন, কি রকম ব্যবহার করতেছেন উনি। অপরাধ করবে, আবার বললেও দোষ!’
প্রতিক্রিয়া দেখালেন তিন সীট আগের আরেক ভদ্রলোক। আমার দিকে তাচ্ছিল্যের একটা চাহনি দিয়ে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলেন। একটা সিগারেট ধরিয়ে কামরার ভিতরেই ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে শান্ত গলায় বললেন - ‘বসেন ভাই বসেন। অযথা কথা খরচ কইরা কি লাভ?’
আমি চুপচাপ বসে পড়লাম। ....

নাকটা কুঁচকে উঠলো বিশ্রী কড়া ধরণের গন্ধে। সামনের সীটে বসা লুঙ্গি-শার্ট পরা যাত্রীটির হাতে সিগারেট। নাহ- সিগারেট না বোধহয়, যে কড়া গন্ধ- এটাকেই বোধহয় বিড়ি বলে। মেজাজ খারাপ হলো - ‘কি ভাই, বাসের মধ্যে সিগারেট ধরাইছেন কেন?’ লোকটি কোন জবাব দেয় না।
‘সিগারেট ফেলেন।’ আদেশের সুরে বলি।
লোকটি এবার তেড়ে উঠে-‘টাকা দিয়া টিকিট কিনি নাই? আপনের কথামতোন চলুম।’
‘আরে, তাই বলে বাসে বিড়ি ধরাবেন? অন্য যাত্রীদের সমস্যা হইতেছে না?’
‘কার সমস্যা হইতেছে?’
‘আমার সমস্যা হচ্ছে।’
‘বাস আপনের বাপের? অসুবিধা হইলে নিজে বাস কিনা একা বইসা যান।’
এই লোকের সাথে কথায় পারা আমার পক্ষে সম্ভব না। সাহায্যের জন্য সামনের দিকে তাকাই। কিন্তু সাহায্য করবে কে? যার দিকে তাকাই, সেই ড্রাইভারের এক হাত স্টিয়ারিং-এ, অপর হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। পাশে তাকিয়ে দেখি, বাসের দরজা ঘেঁষে দাঁড়ানো হেলপারের ঠোঁটেও ধূম্র-শলাকা।.....

চারদিকে রোগীর ভীড়। তার মাঝ দিয়েও গন্ধটা ঠিকই জানান দেয় তার অস্তিত্ব। সামনে থেকে রোগীদের সরে যেতে বলি। দু-তিন জন সরে গিয়ে যেটুকু জায়গা করে দেয়, সেটুকু ফাঁক দিয়েই দেখি, দরজার ঠিক বাইরেই সিগারেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে এক লোক।
‘এই, হাসপাতালের ভিতরে সিগারেট খায় কে?’ বলে চেঁচিয়ে উঠি।
চেঁচানোতে লোকটি ঘাড় ঘুরিয়ে এদিকে তাকায়। যখন বুঝতে পারে, তাকে উদ্দেশ্য করেই বলেছি, দরজা থেকে কিছুটা সরে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সিগারেট ফেলে না হাত থেকে। মেজাজ খিঁচড়ে যায়। চেয়ার থেকে উঠে বাইরে আসি - ‘কি ব্যাপার, এইখানে সিগারেট খাইতেছেন কেন?’
গাট্টাগোট্টা ধরণের লোকটা এবার উল্টো জিজ্ঞেস করে - ‘নতুন আইছেন? বাড়ি কই?’
এবার আমার রাগে প্রায় দিশেহারা হওয়ার অবস্থা। কথা আটকে যায়। - ‘হাসপাতাল থেকে বেরোন।’ নির্দেশের সুরে বলি।
‘যামু না, আপনে আমারে বাইর করার কে?’ নির্বিকার ভঙ্গিতে সিগারেটে টান দিয়েই যায় লোকটা।
এরই মধ্যে হৈ-চৈ শুনে পাশেই হাসপাতালের দু-তিনজন স্টাফ ওখানে আসে। দুজন ঐ লোকটিকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে যায়। আমাকে বলে - ‘স্যার আপনে যান, আমরা দেখতেছি।’ লোকটিকে কি যেন বিড় বিড় করে বলে ওরা। লোকটি হাত থেকে সিগারেট ফেলে না। বরং উচ্চস্বরে অফিস স্টাফদের বলে - ‘তোমাগো নতুন ডাক্তাররে কইও লোক চিনা যেন কথা কয়। নাইলে কিন্তু চাকরি করবার পারবো না।’
লজ্জায়, অপমানে নত মুখে আবার এসে চেয়ারে বসি। দ্রুত মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে হয় রোগীর প্রতি। অনেক রোগীর ভীড় যে!

(ঘর-মন-জানালা, ছুটির দিনে, প্রথম আলো- ৭ নভেম্বর প্রকাশিত)

সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই নভেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৪:১৫
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×