somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অভিশাপ - অগাস্ট, 'আলো ও ছায়া'

০৯ ই অক্টোবর, ২০১০ সকাল ১১:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ওয়ার্ডের বারান্দায় গাদাগাদি অবস্থা রোগীদের। বারান্দার এক পাশে দুটি বিছানা। দুই বিছিনায় চার রোগী। বাকীরা সব মেঝেতে। শুয়ে আছে চাদর বিছিয়ে। রোগীগুলোকে ভালমতো পরীক্ষা করারও উপায় নেই। কোনমতে হাঁটু গেড়ে বসে পালস- ব্লাড প্রেসার দেখা যায়। স্টেথোস্কোপ দিয়ে হৃৎপিন্ড-ফুসফুস পরীক্ষা করতে গিয়ে বাইরের আওয়াজের যন্ত্রণায় স্টেথোর ভেতরের আওয়াজও ঠিকমতো শোনা যায় না। স্যালাইন ঝুলানোর স্ট্যান্ড নেই। জানালার সাথে অথবা বারান্দার গ্রীলের সাথে দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে স্যালাইনের বোতল। অনেক রোগীর সাথে দুই তিনজন করে আত্মীয়স্বজন। কারো কারো আবার সাথে কেউ নেই। রাস্তা থেকে অজ্ঞান অবস্থায় পুলিশ হয়তো উদ্ধার করে রেখে গেছে। অজ্ঞান পার্টির কাজ। নেশাজাতীয় কিছু মেশানো খাবার খাইয়ে অচেতন করে টাকা-পয়সা লুটে নিয়েছে। তবে এসব রোগীর মৃত্যুও আশংকা নেই। সকালের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে। শুধু স্যালাইন দিয়ে মেঝের এক কোণে ফেলে রাখা হয়েছে। ঠিকানা জানা নেই বলে এদের বাড়িতেও খোঁজ দেয়া যায় না।

এই রাত দশটাতেই বারান্দার মেঝে প্রায় ভর্তি। ওয়ার্ডের ভেতরের বিছানা তো বটেই, মেঝে পর্যন্ত পুরো ভর্তি হয়ে গেছে অনেক আগেই।
সারারাতে আর তিন-চারটা রোগীর বেশী বারান্দার ফোরেও জায়গা দেয়া যাবে না- দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বারান্দার দিকে তাকিয়ে ভাবে চয়ন। ঢাকা মেডিক্যাল থেকে এমবিবিএস পাস করার পর চয়ন মাস দুয়েক হয় ইন্টার্ণী চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেছে মেডিসিন বিভাগের এই ওয়ার্ডে। রাতের ডিউটিতে দুজন ওরা। সঙ্গে তিন বছরের সিনিয়র চিকিৎসক পারভেজ, ঢাকা মেডিক্যাল থেকেই পাস করেছে। পারভেজ ইন্টার্ণী ডাক্তার না, মেডিসিনের উচ্চতর প্রশিণার্থী। পোস্ট-গ্রাজুয়েশনের ট্রেনিং-এর অংশ হিসেবে ওয়ার্ডে কাজ করতে হয় পারভেজের মতো ডাক্তারদেও, ওদেরকে বলে অনারারী মেডিক্যাল অফিসার। রোগী দেখার কাজ-ডিউটি অন্যান্য সরকারী ডাক্তারদের মতোই, কিন্তু পার্থক্য হলো - পারভেজরা বেতন পায় না।

পারভেজ নতুন আসা একটা রোগী দেখছিল। সম্ভবত ভর্তি লাগবে না, দেখেই ব্যবস্থাপত্র দিয়ে ছেড়ে দেবে। চয়ন বারান্দার মাঝামাঝি শুয়ে থাকা দশ বছরের ছেলেটার দিকে তাকায়। দুঃখ বোধ করে ছেলেটার জন্য। চোখের সামনে মৃত্যুও দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে ছেলেটি, অথচ করার তেমন কিছু নেই। দরিদ্র কৃষকের ছেলে। মানিকগঞ্জে বাড়ি। বাবা-মার সাথে অভিমান করে ধানের পোকা মারার ওষুধ খেয়ে ফেলেছে এক বোতল। বিকেলে ভর্তি হয়েছে ঢাকা মেডিক্যালে। সঙ্গে বাবা-মা আর এক চাচাতো ভাই। আনতে অনেকটা দেরী করে ফেলেছে তারা। ওষুধপত্র কেনার সামর্থ্যও বাবার নেই। হাসপাতালের সাপ্লাই থাকা ওষুধ আর ডাক্তারদের পুওর ফান্ডের ওষুধ-স্যালাইন দেয়া হয়েছে কিছু, কিন্তু ছেলেটা সকাল পর্যন্ত টিকবে কিনা সন্দেহ আছে।

এটা রোগীর বাবা-মাও জানে। তারা ছেলের পাশে বসে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলে যাচ্ছে। রোগী অচেতন। চয়ন ব্লাড প্রেসার (রক্তচাপ) মাপার যন্ত্রটা হাতে নিয়ে রোগীদের ভীড়ের মধ্যে দিয়ে গিয়ে কোনমতে পায়ের আঙুলের উপর ভর দিয়ে ছেলেটার পাশে বসে। ডান হাতটা বের করে প্রেসার মাপে। প্রেসার কম। রোগীর ফাইলে দেখে, পারভেজ আগে মেপে যা পেয়েছিল এখন প্রেসার তার চেয়েও কম। ধীরে ধীরে কমছে। সে উঠে আসে। বাবা-মা অব্যক্ত প্রশ্ন নিয়ে তাকায় তার দিকে। চয়ন শুধু বলে ‘ভাল না’। আর বেশী কিছু বলতে পারে না। খুবই মায়াময় চেহারা ছেলেটার।

আবেগটাকে খুব একটা প্রশ্রয় দেয় না চয়ন। প্রথম দিকে খুব খারাপ লাগতো। এখন নিয়মিত মৃত্যু দেখতে দেখতে সয়ে গেছে। আগের মতো খারাপ আর লাগে না। কিন্তু ধীরে ধীরে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কেউ, কিন্তু কিছুই করার নেই- এরকম অবস্থায় তার খুব অসহায় লাগে।
পারভেজ ডাক দেয় ভেতর থেকে। চয়ন ভেতরে এলে বলে- ‘দেখতো ভাইয়া ঐ স্ট্রোকের পেসেন্টটার নাকি কি হয়েছে?’
ওয়ার্ডের মেঝেতে ঠাঁই হয়েছে ৬০ বছরের এক বৃদ্ধটির। প্রথমবার স্ট্রোক হয়েছে। বাম হাত-পা অবশ হয়ে গেছে। বৃদ্ধের ছেলে বলে, ‘বাবাকে পানি খাওয়ানের চেষ্টা করতাছি, খাইতেছে না। চুপ মাইরা আছে কেমুন জানি।’

চয়ন গিয়ে দেখে, বৃদ্ধ চোখ মেলে চেয়ে আছে - অসহায় দৃষ্টি। একটু নেতিয়ে পড়া ভাব চোখে-মুখে। বাম হাতে স্যালাইন লাগানো, নাকে নল লাগানো- নল দিয়ে পানি বা দুধ খাওয়ানোর জন্য। এর হাতেও কোন রকমে যন্ত্রটা বেঁধে ব্লাড প্রেশার মাপে। কম, কিন্তু ফাইলে দেখা যাচ্ছে, আগেও এরকমই ছিল। সে বৃদ্ধের ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘নাকে নল তো লাগানোই আছে, দুই ঘন্টা পর পর নল দিয়ে যেভাবে খাওয়াতে বলা হইছে, সেভাবে খাওয়ান। মুখে খাওয়ানোর দরকার নাই তো এখন। না খাইতে চাইলে অসুবিধা নাই। আর শোয়ানো অবস্থায় কিছু খাওয়ায়েন না। একটু তুইলা বসাইয়া খাওয়াবেন।’ বেশীর ভাগ স্ট্রোকের রোগীর েেত্র এই এক সমস্যা। মুখে খাওয়ানোর জন্য আত্মীয়স্বজনরা অস্থির হয়ে পড়ে। যতই না করা হোক, একটু পর পর মুখে আপেল-কমলা-আঙ্গুর তুলে দিতেই হবে। অথচ এই রকম শোয়া অবস্থায় জোর করে খাওয়ালে যে রোগীর খারাপ হতে পারে, সেটা এদের যেন বোঝানোই যায় না। এইতো সেদিন, চয়নের মনে পড়ে, স্ট্রোকের এক রোগী শুধু শুইয়ে মুখ দিয়ে খাওয়ানোর জন্য গলা দিয়ে খাওয়া ফুসফুসে চলে যাওয়ায় দম আটকে মারা গেছে, অথচ ঐ রোগীর মারা যাওয়ার আর কোন কারণই ছিল না।

ওয়ার্ডের ভেতর ডাক্তারদের বসার জায়গায় ফিরে আসার সময় বারান্দায় চিৎকার-কান্নার শব্দ শোনে চয়ন। পারভেজ আগেই গেছে ওখানে। চয়ন গিয়ে দেখতে পায়, ততণে পোকা মারার ওষুধ খাওয়া ঐ ছেলেটা মারা গেছে। ছেলেটির মা মৃতদেহের বুকে আছড়ে পড়ে বিলাপ করে কাঁদছে- বাবা নির্বাক চেয়ে আছে, তারও চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। পারভেজ পরীক্ষা করেছে, তবুও চয়নকে আরেকবার পরীক্ষা করতে বলে ভেতরে যায়। ছেলেটার নাকের কাছে হাত নিয়ে, চোখে টর্চের আলো ফেলে, স্টেথো বুকে লাগিয়ে, পায়ের পাতায় চাবি দিয়ে আঁচড় কেটে চয়নও নিশ্চিত হয়, প্রাণের কোন চিহ্ন নেই আর। সে ছেলেটার বাবাকে দু-একটা সান্ত্বনার কথা বলে। ফাইলটা নিয়ে আসে। সিস্টারকে দিতে হবে ফাইল ঠিক-ঠাক করার জন্য। এরপর মৃত্যুর সার্টিফিকেট লিখতে হবে। এই লাশ আবার মর্গে পাঠাতে হবে। আত্মহত্যার ঘটনা বলে আজ চাইলেও লাশ বাড়িতে নিতে পারবে না ওরা। কাল এসে পুলিশ সুরতহাল করবে, ময়নাতদন্ত হবে কি হবে না সিদ্ধান্ত হবে। ময়নাতদন্ত হলে কাল দুপুরের পর হয়তো ছেলেটির লাশ নিয়ে যেতে পারবে তারা।
খারাপ লাগাটা ঝেড়ে ফেলে চয়ন ওয়ার্ডের ভেতর এসে বসে। আরেক রোগীর আত্মীয় এসে বলে তার রোগীর খারাপ লাগছে, একটু যেন সে দেখে যায়। পঞ্চান্ন বছর বয়স্ক রোগীটির লিভারের রোগ। প্রায় ভাল হয়ে এসেছে। দু-একদিনের মধ্যে ছেড়ে দেয়া যাবে। সাথে হাই ব্লাড প্রেসার আছে। চয়ন প্রেসারটা মেপে দেখে- একটু বেশীই। জিজ্ঞেস করে জানতে পারে, প্রেসারের ওষুধ সাপ্লাই নেই বলে ওষুধ দেওয়া হয়নি। রোগীর লোকও কিনে আনেনি। ওষুধের নাম লিখে তুণি বাইরের ফার্মেসী থেকে কিনে এনে খাইয়ে দিতে বলে চয়ন।

টেবিলে ফিরে এসে দেখে, পারভেজ ভাই ততণে আরেক রোগীর ডেথ ডিকেয়ার করেছেন। ঐ স্ট্রোক করা বৃদ্ধ। একটু চমকে যায় চয়ন। মুখে কিছু খাইয়েছে নাকি! বৃদ্ধের ছেলে জানায়, আর মুখে খাওয়ানোর চেষ্টা করেনি তারা। তাহলে? পারভেজ বলে, হয়তো আবার স্ট্রোক হয়েছে এর মধ্যে। ব্রেনের এমন জায়গায় রক্তক্ষরণ হয়েছে যে রোগী বেশীক্ষণ টেকেনি। ব্রেন স্টেমে রক্তপাত হলে এরকমটা হতে পারে।

আচমকা অস্বস্তিটা এসে ভর করে চয়নের ভেতর। স্ট্রোকের রোগীর চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও আবার যে কোন সময় স্ট্রোক হতে পারে, এতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। আর, পোকা মারার ওষুধ খাওয়া রোগীটার মৃত্যু তো অবধারিতই ছিল। হয়তো কাল সকাল পর্যন্ত টিকতো, একটু আগেভাগেই মারা গেছে। মনের অপর অংশটি চয়নকে বলে, কিন্তু দুটো মৃত্যুই হয়েছে তার ব্লাড প্রেসার মাপার পর। এবং মাপার অল্পণের মধ্যেই ঘটেছে। তবে কি..??


মনে পড়ে যায় দুপুরের ঘটনাটা। কাল রাতে ডিউটি করেছে চয়ন। আজ তাদের ওয়ার্ডে রোগী ভর্তির ডেট। মেডিসিন বিভাগে ৫ টা ওয়ার্ড। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি হয়। আজ তাদের ওয়ার্ডে অ্যাডমিশন। তাই, রাতের ডিউটির পরও সকালে চয়ন চলে যায়নি। তার উপর আটটি বেড দেখার ভার। অর্থাৎ ঐ আটটি বিছানার রোগীর ফলো-আপ তার করতে হয়। সে ফলো-আপ দিয়েছে। স্যারের সাথে রাউন্ড দিয়েছে, সকালের দিকে আসা অনেক নতুন রোগীও দেখেছে। দুপুর একটার দিকে হঠাৎ বড় স্যার মানে ওয়ার্ডের ইন-চার্জ প্রফেসর তাকে ডেকে বলেছেন, আজ রাতেও তাকে ডিউটি করতে হবে। যে মেডিক্যাল অফিসারের ডিউটি করার কথা তার নাকি কি অসুবিধা।
শুনেই মেজাজ খিঁচড়ে গেছে চয়নের। এমনিতেই এ সপ্তাহেই তাকে টানা দুটি নাইট ডিউটি করতে হয়েছে। আজ আবার একই অবস্থা। ঐ মেডিক্যাল অফিসার এমনিতেই ফাঁকিবাজ। তিনি কোন নাইটই করতে চান না। ইন্টার্ণী বা অনারারী মেডিক্যাল অফিসারদের উপর চাপিয়ে দেন। প্রভাবশালী চিকিৎসক সংগঠনের মাঝারি গোছের নেতা বলে স্যাররাও তাকে কিছুটা তোয়াজ করেন। সাধারণত এইসব ডিউটির ব্যাপার অ্যাসিসটেন্ট রেজিস্ট্রারই ম্যানেজ করেন। কিন্তু পর পর দুই নাইট বলে বড় স্যারকে দিয়েই বলালেন, যাতে চয়ন ‘না’ বলতে না পরে। চয়ন সেটা বুঝতে পারে। কিন্তু কি আর করা!- স্যারের মুখের উপর তো আর ‘না’ করা যায় না।

প্রফেসরের রুম থেকে মুখ কালো করে বের হয়ে সে ওয়ার্ডের ভেতর ডাক্তারদের বসার জায়গায় এসে বসে। অ্যাসিসটেন্ট রেজিষ্ট্রারের উপর মেজাজ খারাপ হয়। আর লোক পায় না? তাকেই কেন এতো খাটানো হয়! ওয়ার্ডে ইন্টার্ণীদের মধ্যেই সে-ই সবচেয়ে বেশী কাজ করে, তার পরও তার উপরই যত সব বাড়তি কাজগুলো চাপে। যারা ফাঁকি দেয়, তারা সবটাতেই পার পেয়ে যায়।

অ্যাসিসটেন্ট রেজিষ্ট্রারকে দু কথা শুনিয়ে দেবে কি না ভাবে। শুনিয়েই বা কি লাভ। শেষ পর্যন্ত তাকেই তো ডিউটিটা করতে হবে। এইসব সাত-পাঁচ ভাবছিল আর বিরক্তির মাত্রা ক্রমেই বাড়ছিল চয়নের। এ সময় এক বৃদ্ধা মহিলা এসে বলে - ‘বাবা, আমার পিসারটা এট্টু মাইপা দিবা। কেমুন যেন দুর্বল দুর্বল লাগতেছে?’

বিরক্তি আরও বেড়ে যায় চয়নের। এটা পুরুষ রোগীদের ওয়ার্ড। নিশ্চয়ই কোন রোগীর সাথে এসেছে বৃদ্ধা।

‘আপনি কি রোগী? ভর্তি এইখানে? আপনার প্রেসার মাপার জন্য তো আমি এইখানে বসে নাই। রোগীদের প্রেসার মাইপাই কুল পাইনা! যান , বিরক্ত কইরেন না এখন।’ খুবই কড়া স্বরে কথাগুলো বলে চয়ন। এতটা কড়া স্বরে সাধারণত সে রোগীর বা রোগীর আত্মীয়স্বজনের সাথে কথা বলে না। কিন্তু তার মেজাজ এখন চরমে। কারো উপর ঝাড়তে না পেরে বৃদ্ধার উপরই মেজাজ ঝাড়ে সে।

বৃদ্ধা একটু থতমত খেয়ে যায় যেন এই ব্যবহারে। কিন্তু চলে যায় না। বরং বলে, ‘আমি কি এমুন অপরাধ করলাম বাবা, একটু তো পিসারই মাপতে চাইছিলাম। তুমি তো বইয়াই আছ। ’

এবার আরও রেগে যায় চয়ন - ‘আমি বইসা আছি মানে? আমি বইসা
থাকলে আপনের কি? বইসা থাকলেই লোকজন ডাইকা আইনা প্রেসার মাপা শুরু করবো নাকি? আপনার প্রেসার মাপা আমার কাজ না, মাপতে চাইলো আউটডোরে টিকিট কিনা মাপান গিয়া। এখন চোখের সামনে থেকে দূর হন।’ কথাগুলো বলার পর নিজের উপর মনে মনে বিরক্তি হয় চয়ন। এইসব কি বলছে সে! কিন্তু চেহারায় কাঠিন্য ধরে রাখে।

বৃদ্ধা তা-ও যায় না, সে-ও যেন একটু রেগে যায়, ‘বাবা তুমি আমার নাতির বয়সী। ডাকতর অইছো বইলা এমুন করলা? আল্লায় সইবো না.....’ গজর গজর করতে থাকে বৃদ্ধা। চয়ন বৃদ্ধার কথা না শুনে অন্য দিকে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করে। হঠাৎ কানে ঢোকে বৃদ্ধা বলছে, ‘তুমি যার পিসার মাপবা, হে-ই মরবো, আমি কইয়া গেলাম, আল্লায় যেন আর কারু পিসার মাপবার লায়েক না রাহে তুমারে, তুমার বাপ-মায়েরও না.....’

মেজাজ আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না চয়ন। চেয়ার ছেড়ে লাফ দিয়ে দাঁড়ায়। দেখে মনে হয় ,এখনি যেন মেরে বসবে বুড়িকে। নিকুচি করি বুড়ির অভিশাপের! ওয়ার্ড বয়কে ডাক দেয়- ‘এই, এই বুড়িকে এণ ওয়ার্ড থেকে বের কর। এ যেন আমার চোখের সামনে না আসে।’
অবশ্য ওয়ার্ড বয়ের কিছু করা লাগে না। নিজ থেকেই বুড়ি সরে যায়। যাওয়ার সময় অদ্ভূত এক তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে চয়নের দিকে। সেই দৃষ্টির দিকে বেশীণ তাকিয়ে থাকতে পারে না চয়ন।

রাতে ডিউটি করবে বলে তখনই ব্যাগ নিয়ে হোস্টেলে চলে আসে সে। গোসল করে, খেয়ে দেয়ে লম্বা একটা ঘুম দেয়। ঘুম থেকে উঠে আর দুপুরের ঘটনাটা মনে থাকে না। ফাঁকিবাজ মেডিক্যাল অফিসারকে মনে মনে শাপান্ত করতে করতে ওয়ার্ডে আসে।


দুই দুইটি মৃত্যুর পর দুপুরের ঘটনাটা আবার মনে পড়ে যায় চয়নের। বুড়ির অভিশাপ কি ফলে যাচ্ছে? তার প্রেসার মাপার সাথে কি মৃত্যুগুলোর কোন যোগসূত্র আছে? পরণেই আবার নিজের উপর হাসি পায়; একটু বিরক্তও হয় চয়ন - এসব সে কি ভাবছে? ঢাকা মেডিক্যাল থেকে পাস করা একজন ডাক্তার এই রকম কুসংস্কারে বিশ্বাস করছে শুনলে যে কেউ হাসবে। মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চায় চিন্তাটা। দুটি মৃত্যুরই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রেসার মাপার ব্যাপারটা কাকতালীয় হতে পারে। আবার এ-ও মনে হয়, রাতে ডিউটিতে আসার পর মাত্র তিনটি রোগীরই কেবল ব্লাড প্রেসার মেপেছে সে। দুজনই মারা গেল! লিভারের রোগীটার দিকে তাকায়। নাহ- রোগীটা তো ভালই আছে দেখা যাচ্ছে। সঙ্গের লোকটা হয়ত ওষুধ কিনতে গেছে।

ছোট ছেলেটার ডেথ সার্টিফিকেট লেখে সে। পারভেজ লিখছিল বৃদ্ধের ডেথ সার্টিফিকেট। এ সময় আরেকটা নতুন রোগী আসে। পারভেজ লিখছিল বলে চয়নই দেখে রোগীটা। তেমন সিরিয়াস কিছু না। পাতলা পায়খানা হয়েছে কয়েকবার। ঢাকা মেডিক্যালের কাছেই চানখারপুলে বাসা বলে নিয়ে এসেছে। পারভেজও রোগের ইতিহাস শোনে। বলে , ‘প্রেসারটা মেপে দেখ; ভাল থাকলে ভর্তির দরকার নেই। ট্রিটমেন্ট লিখে ছেড়ে দাও।’

প্রেসার মেশিনটা হাতে নিয়ে কিছুটা থমকে যায় চয়ন। নিজে মাপবে না পারভেজকে বলবে চিন্তা করে। শেষমেষ চিন্তাটা ঝেঁটিয়ে দূরে সরিয়ে প্রেসার মেপেই ফেলে চয়ন। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু কম, তবে সেটা তেমন গুরুতর কিছু না। ভর্তির দরকার নেই। ব্যবস্থাপত্র লিখে ছেড়ে দেয় সে। স্বাভাবিক ডায়রিয়ার রোগী তো আর হুট করে মরে যাবে না। ঐ রোগীদুটোর সেরকম রোগ ছিল বলেই মারা গেছে। কিছুটা হাঁপ ছাড়ে চয়ন - ঐ দুটি মৃত্যুর সাথে তার প্রেসার মাপার কোন সম্পর্ক নেই বলে নিজেকে আশ্বস্ত করে।

ক্লান্ত লাগে তার। ওয়ার্ডের লাগোয়া ডাক্তারদের জন্য আলাদা একটা রুম আছে। পারভেজ ভাইকে ওয়ার্ডে বসতে বলে সে রুমে যায় একটখানি রেস্ট নিতে। ফিল্টার থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে খায়। পনের মিনিট গড়িয়ে নেয় বিছানায়। তারপর উঠে বসে। ভাবে, রোগীর চাপ না থাকলে পারভেজ ভাইকে বলে ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়ে নেবে কিনা। ভোরের দিকে পারভেজ ভাইকে ঘুমাতে বলে সে জেগে থাকবে। একটার পর থেকে রোগীর চাপ এমনিতেই কমে যায়। তখন দুজন একসঙ্গে জেগে থাকার দরকার হয় না আর। আর তেমন জরুরী হলে তো তাকে জাগাবেই।
ওয়ার্ডে এসে আরেকটা ধাক্কা খায় চয়ন। মারা গেছে লিভারের রোগীটা। কি ব্যাপার? পারভেজ ভাই জানান, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কি কারণে, হয়তো আচমকা হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। আনপ্রেডিকটেবল।

হঠাৎ আতংক ভর করে চয়নের মনে। কি হচ্ছে এ সব? আসলেই কি বুড়ির অভিশাপ? পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে যেতে থাকে তার। এর মানে কি জীবনে সে কখনো আর কোন রোগীর প্রেসার মাপতে পারবে না? তাহলে ডাক্তারী করবে কি করে সে! উদভ্রান্ত দৃষ্টিতে পুরো ওয়ার্ডে চোখ বুলায় সে বুড়িটার খোঁজে। কিন্তু বুড়িটাকে দেখা যায় না কোথাও। কোন রোগীর আত্মীয় ছিল সে, জানা হয়নি। বুড়ির রোগীটা কি আছে? কিভাবে বুড়িটাকে পাবে সে এখন? দুপুরের ওয়ার্ড বয়টাকে খোঁজ করে। জানতে পারে, তার আজ আর ডিউটি নেই। প্রচন্ড অসহায় বোধ করে চয়ন। পারভেজ ভাইকে কি বলবে? পারভেজ ভাই বিশ্বাস করবেন? উনি তো হেসেই উড়িয়ে দেবেন। উনি কেন- যে কেউই হেসে উড়িয়ে দেবে? কিন্তু তিনটি ঘটনাই কি কাকতালীয়? মাথার ভেতরটা জট পাকিয়ে যেতে থাকে চয়নের। ওয়ার্ডের ভেতরে দম বন্ধ বন্ধ লাগে তার। পারভেজকে বলে বাইরে বেরিয়ে আসে। এতো রাতে শুধু জরুরী বিভাগের বাইরের দোকানই খোলা থাকে। ওখানে গিয়ে চা খাবে সে। তারপর খোলা বাতাসে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করবে পুরো ব্যাপারটা।
গাইনী ওয়ার্ডের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বন্ধু রাফির সাথে দেখা হয়। ওর ডিউটি গাইনী ওয়ার্ডে। রাফিও তখন বের হচ্ছিল চা খাওয়ার জন্য। ওয়ার্ডের সামনে লোকজনের ভীড় আর কান্নাকাটি দেখে চয়ন রাফিকে জিজ্ঞেস করে - ‘কি ব্যাপার রে?’

‘ডেলিভারীর সময় ব্লিডিং হয়ে একটা মেয়ে মারা গেছে। রক্ত দেয়ার দরকার ছিল, কিন্তু ওরা যোগাড় করতে পারেনি।’ রাফি জানায়।
মৃত্যুর খবরটা যেন স্বস্তি দেয় চয়নকে। এইতো একটা মেয়ে মারা গেছে, যার প্রেসার চয়ন মাপেনি। সে না মাপলেও যার মারা যাওয়ার কথা সে মারা যাবে। তেমনি সে প্রেসার মাপলেও যার নিয়তিতে মৃত্যু লেখা সে তো মরবেই। এতে নিজেকে অপারাধী ভাবার কিছু নেই। নিজেকে প্রবোধ দিয়ে যেন কিছুটা স্বস্তি খোঁজে চয়ন।

জরুরী বিভাগের সামনেও প্রচন্ড ভীড়। এমনিতেই ওখানে ভীড় থাকে সবসময়ই। কিন্তু এই মাঝরাতে এত ভীড় তেমন একটা হয় না। কি ব্যাপার? এক কর্মচারী জানায়, রোড-অ্যাকসিডেন্টের কেস। কেউ একজন রাস্তা পার হতে গিয়ে ট্রাকচাপা পড়ে মারা গেছে। তার আত্মীয়স্বজনের ভীড়। শুনে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে পাশ কাটিয়ে বের হয়ে যেতে চায় দুজন। এ সময় হঠাৎ মৃতদেহের উপর চোখ পড়ে চয়নের। প্রচন্ডভাবে চমকে ওঠে সে। মাথাটা যেন ফাঁকা হয়ে যায়। কিছুণ আগে এই লোকটিই এসেছিল মেডিসিন ওয়ার্ডে। ডায়রিয়ার সমস্যা নিয়ে। এই লোকটিরই প্রেসার মেপেছিল চয়ন কিছুণ আগে। রাফির হাত খামচে ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। রাফি টান দেয় ওকে- কি হলো, আয়।

নড়ার শক্তিও যেন হারিয়ে ফেলেছে চয়ন। নিশ্চল পাথরের মূর্তির মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সে। মৃতদেহের পাশের ভীড়ে যেন দেখতে পায় বৃদ্ধা মহিলাটিকে। চয়নের দিকেই যেন নিষ্পলক চেয়ে আছে বৃদ্ধা। দৃষ্টিতে সেই একই রকম তাচ্ছিল্যের হাসি।

...............................
'আলো ও ছায়া' - অগাস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই অক্টোবর, ২০১০ সকাল ১১:২০
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আমি ক্রিকেটার বলে বেঁচে গেলাম” — নাঈম হাসানের কান্না এবং সাধারণ মানুষের প্রশ্ন

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ১৩ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:১৯

একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার মাঝরাতে বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফিরছিলেন। জাতীয় দলের জার্সি পরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন, অসংখ্য মানুষ তাকে চেনে। অথচ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে নিজের পরিচয় প্রমাণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্রাজিলের ম্যাচগুলো কবে কখন কোথায় এবং কার সঙ্গে?

লিখেছেন শিমুল মামুন, ১৩ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:১৪


একনজরে ব্রাজিলের গ্রুপ পর্বের ফিক্সচার (Brazils Group Stage Fixtures at a Glance)
প্রথম ম্যাচ (প্রতিপক্ষ মরক্কো): ১৪ জুন ২০২৬। বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১

কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাগরিকের অপমান ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সংকট: ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ঘটনা

লিখেছেন নতুন নকিব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪০

নাগরিকের অপমান ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সংকট: ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ঘটনা

ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ছবিটি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ক্রিকেটার নাঈম হাসানের সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×