যাওয়ার সময় আমাকে বলেওনি অসীম। রাতে রুমে ফিরে দেখি চিরকুট - আমি কলকাতা যাচ্ছি, সপ্তাহখানেক পরে ফিরবো।
কিছুদিন থেকেই অসীম বলছিল রিমির সাথে দেখা করতে যাবে। পুরোপুরিই ভেঙ্গে পড়েছিল ও। রিমির সাথে দেখা করার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল। তা-বলে এমনটা হুট করে চলে যাবে ভাবিনি। আগের দিনও কোন আভাস পাইনি। সকালে আমি যখন রিডিং রুমে যাই, তখনো সে বিছানায় শুয়ে, ৫ টা ঘুমের ওষুধ একবারে খেয়েও ঘুম হয়নি সারারাত। সারাদিন-রাত প্রায় শুয়ে বসেই কাটছিল ক'দিন ধরে ওর। দেখে দেখে আমিও প্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলাম। আশায় ছিলাম, হয়তো সময় লাগবে, কিন্তু ধীরে ধীরে এক সময় স্বাভাবিক হয়ে উঠবে ও।
কিন্তু এর মাঝেই হুট করে এই কলকাতা চলে যাওয়া!
ভোর রাতের দিকে মোবাইলের রিং-টোনে জেগে উঠি। অসীম। বেনাপোল থেকে ফোন করেছে। জিজ্ঞেস করলাম -‘কবে আসবি?’
‘দেখি।’
‘পরীক্ষা দিবি না?’
‘জানি না। রিমির সাথে দেখা হওয়ার পর ঠিক করবো।’
পরীক্ষার মাত্র তিন সপ্তাহ আগে এ ধরণের পাগলামীর কোন মানে আছে! বললাম-‘তাড়াতাড়ি চলে আসিস।’
রিমি। অসীমের ভাবীর ছোট বোন। কুষ্টিয়ার ছেলে অসীম রায়ের বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়েছিল দেশেই। পরে ওর ভাবীর পরিবার কলকাতায় স্থায়ী হয়, ভাই-ও চলে যায় ওখানে। কলকাতার এক ছেলের সাথে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় রিমির; অসীম, মানে আমরা তখন দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছি মাত্র। রিমি বয়সে আমাদের চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট। ভাইয়ের বিয়ের পর অসীমের সাথে রিমির পরিচয়, যোগাযোগ আত্মীয়তার সূত্রেই, আত্মীয়তার খাতিরেই - এর বেশী কিছু ছিল না। আমাদের প্রথম পেশাগত পরীক্ষার পর অসীম যখন কলকাতা যায়, রিমির সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে তখন।
স্বামীর শারীরিক-মানসিক অত্যাচারে অতিষ্ঠ রিমি তখন বোনের বাসায় এসে উঠেছিল। রিমির কষ্ট স্পর্শ করেছিল অসীমকে। দুজনের মাঝে গড়ে উঠেছিল অন্যরকম এক রসায়ন।
অসীম আমার কাছে কিছুই লুকাতো না। মেডিক্যালে ভর্তির পর গণরুমে একসাথে থাকার সময় ওর সাথে পরিচয়। গণরুমে আমরা ১২ টা ছেলে থাকতাম একসাথে। কেমন করে যেন ওর সাথেই ঘনিষ্ঠতাটা বেশী হয়ে যায়। ভর্তির বছর খানেক পর যখন নিচতলার গণরুম ছেড়ে দোতলা-তেতলার 'ভদ্রস্থ' রুমে ওঠার 'ছাড়পত্র' পাওয়া যায়, আমি আর অসীম একই রুমে উঠি। সেই মেইন বিল্ডিং থেকে ব্লক ভবন হয়ে ইন্টার্ণী হোস্টেল - আমরা রুমমেট ছিলাম সব সময়। আমাদের বন্ধুত্বটাও ছিল গাঢ়।
রিমির সাথে ওর সম্পর্কের ব্যাপারে কোন পক্ষের অভিভাবকেরই সায় ছিল না। প্রথম স্বামীর সাথে শেষ পর্যন্ত রিমির ডিভোর্স হয়ে যায়, কিন্তু অসীমের সাথে বিয়ে দিতে রাজী ছিল না কোন পরিবার-ই। এরই মাঝে বাবা-মার সাথে ঝগড়া, ভাইয়ের সাথে কথা বলা বন্ধ, লুকিয়ে কলকাতা গিয়ে রিমির সাথে দেখা করা- সবই শুনি অসীমের মুখ থেকে। রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে ওর। একবারে পাশ করতে পারে না- কয়েকবার করে দিতে হয় আইটেম, অ্যাসেসমেন্ট, ওয়ার্ড ফাইনাল পরীক্ষাগুলো। কোনমতে পার পেয়ে যায় ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায়। শুরু হয় আমাদের ইন্টার্ণশীপ। ওরা সিদ্ধান্ত নেয় পালিয়ে বিয়ে করার।
খুব খাটতে থাকে অসীম। রিমিকে বিয়ে করলে দুই পরিবার থেকেই যে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে চূড়ান্তভাবে - এটা জানতো সে। ভবিষ্যতের ছক এঁকে নেয় তাই আগে থেকেই। যেভাবেই হোক টাকা জমাতে হবে তাকে। অমানুষিক পরিশ্রম শুরু করে অসীম। ইন্টার্ণীর পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লিনিকে কাজ করে। বন্ধের দিনে টাঙ্গাইলের এক গ্রামে চেম্বার প্র্যাকটিস। নাওয়া-খাওয়া-ঘুম শিকেয় ওঠে। কয়েক মাসে ওজন কমে যায়, গালে ভাঙ্গন ধরে - সেদিকে যেন কোন ভ্রূক্ষেপই নেই তার। রিমিকে নিয়ে সুখের ভবিষ্যতের আশায় বর্তমানের সকল কষ্ট হাসিমুখে মেনে নেয় সে। রিমির সাথে যোগাযোগ থাকে চিঠিতে, কখনো ফোনে।
আমাদের ইন্টার্নশিপ শেষে ওদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় হঠাৎ করে। একদম হঠাৎ করেই। মাসখানেক ধরে কোন চিঠির জবাব আসে না। রিমি-অসীম কারোরই মোবাইল ফোন ছিল না, লুকিয়ে চুরিয়ে মাঝে-মধ্যে আমার মোবাইলেই ফোন দিত রিমি- সেই ফোনও আসে না আর।
এরপর খবর আসে, রিমির বিয়ে হয়ে গেছে। নিজের ইচ্ছায় রিমি বিয়ে করেছে না জোর করে দেয়া হয়েছে তা জানার কোন উপায় ছিল না অসীমের। অসীমের বাবা-মা বলেছে, নিজের ইচ্ছায়ই বিয়ে করেছে রিমি; অসীম যেন আর ওর জীবনে ঝামেলা সৃষ্টি না করে। খুব ভাল জায়গায় বিয়ে হয়েছে ওর, অসীমের বাড়াবাড়ি ওর জীবনটাকে আবার অনিশ্চিত করে দিতে পারে।
বিশ্বাস করতে পারেনি অসীম। এলোমেলো হয়ে যায় ওর জীবন। ক্লিনিকের চাকরি চলে যায়, চেম্বারও করে না আর। সারাদিন ঝিম মেরে পড়ে থাকে রুমে। মাঝে মধ্যে আবার হাওয়া হয়ে যায়- কয়েক ঘন্টা বা এক রাতের জন্য - কোথায় যায়, কি করে আমাকেও বলে না। এফসিপিএস ফার্স্ট পার্ট পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছে, কিন্তু পড়ায় মন নেই।
এক রাতে রুমে ফিরে দেখি, চিৎ হয়ে মরার মতো বিছানায় পড়ে রয়েছে অসীম, বিদঘুটে গন্ধে ভারী সারা ঘরের বাতাস। বুঝতে পারি, গাঁজা ধরেছে সে। প্রচুর বকাবকি করি, বোঝাই, অনুরোধ করি- কোন কাজ হয় না- নিয়মিত চলতে থাকে গাঁজা সেবন। তবে, ওদিনের পর থেকে রুমে আর টানে না সে। ছাদে অথবা মাদকাসক্ত অন্য কারো রুমে গিয়ে টেনে আসে। সারারাত ঘুমায় না। রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখি, বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছে ও, চোখ ছাদের দিকে, দৃষ্টিতে নিঃসীম শূন্যতা। একর পর এক পুড়িয়ে চলেছে সিগারেট।
আমি বোঝাতে ব্যর্থ হই, ব্যর্থ হয় অন্য বন্ধুরাও। সিদ্ধান্ত নেই, এখন ওর বাবা-মা-ভাইকে ব্যাপারটা জানাবো। এখনই কোন ব্যবস্থা না নিলে পুরোপুরিই ধ্বংসের দিকে চলে যাবে অসীম।
কিন্তু এর-ই মাঝে হুট করে ও চলে গেল কলকাতা। বেনাপোল থেকে সে-ই যে ফোন দিয়েছিল, এর পর আর কোন যোগাযোগ করে নি আমার সাথে।
সাতদিন পর ফোন আসে। আমার মোবাইলে। অপরিচিত নম্বর। বোঝা যায় দেশের বাইরের কল।
উহু, অসীম ফোন করেনি। কিন্তু ঐ ফোন কলেই পাওয়া যায় অসীমের খবর।
ফোন করেছেন অতুল রায়, অসীমের ভাই। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারি না যখন তিনি জানান, অসীম মারা গেছে। যাওয়ার দুইদিন পরই নিখোঁজ হয় অসীম। দু'দিন পর খোঁজ পাওয়া যায় সে আছে স্থানীয় হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে। অচেতন। চিকিৎসকরা বলেছেন, ডিপ কোমা। হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়-দারোয়ানদের কাছ থেকে জানা যায়, রাস্তায় পড়ে ছিল ওর দেহ রক্তাক্ত হয়ে। সম্ভবত বাস বা গাড়ির ধাক্কায়। পথচারীরা এনে ভর্তি করেছে সেখানে। দুদিন আইসিইউতে ছিল অজ্ঞাত হিসেবেই। আরও একদিন পর চিকিৎসকরা চূড়ান্ত দুঃসংবাদটাই ঘোষণা করেন। অসীমের ব্যাগে পাওয়া ছোট ডায়েরীটায় আমার ফোন নম্বর লেখা ছিল। অতুলদা আমার নম্বরটা পেয়েছেন ওখান থেকেই।
মারা গেছে অসীম? একই সাথে, একই ছাদের নিচে, একই ঘরে যার সাথে কেটেছে ছয়টি বছর- সে আজ নেই। চিরতরে চলে গেছে না-ফেরার দেশে। বুকের ভেতরটায় কেমন যেন গুমোট বাতাস। হাহাকার। ব্যাচের অন্যদের খবরটা জানাতে গিয়ে চোখ ভিজে যায়, কন্ঠ কেঁপে ওঠে। কিভাবে মারা গেল ও? বলি- রোড অ্যাকসিডেন্ট। কিন্তু সে কথা নিজেরই যেন বিশ্বাস হতে চায় না। রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ি চাপা পড়েছিল? এতটাই অন্যমনস্ক ছিল ও সে সময়? নেশায় চুর ছিল কি?
রিমির সাথে কি দেখা করতে পেরেছিল? রিমির কথায় তীব্র অভিমান হয়েছিল কি? রিমির সাথে দেখা করতে না পেরে অথবা রিমির প্রত্যাখ্যানে জীবনের প্রতি চূড়ান্ত বিরাগে নিজেই ঝাঁপ দিয়েছে গাড়ির নিচে? অনেক প্রশ্ন জাগে মনে। সঠিক উত্তর জানা নেই। এসব কথা জিজ্ঞাসাও করতে পারিনি অতুল দাকে।
সময় নাকি ধীরে সব ক্ষতে প্রলেপ বুলিয়ে দেয়। কত ধীরে? অসীমের মৃত্যুর ক্ষত যেন ধীরে ধীরে আরো দগদগে হতে থাকে। প্রাত্যহিকতায় অভ্যস্ত হতে পারি না, মেনে নিতে পারি না অসীমের অনুপস্থিতিটাও। রুমে ঢুকলেই খুব করে মনে করে। ওর রেখে যাওয়া সব কিছু- জামাকাপড়, বই, টেবিলঘড়ি, আলমারিটা- ওর কথা মনে করিয়ে দেয় বার বার। মাঝে মাঝে কেমন যেন দম বন্ধ ভাব জাগে।
আমাদের এই ইন্টার্ণী হোস্টেলটার সুবিধা হচ্ছে, ইন্টার্ণশীপ শেষ হওয়ার পরও প্রায় বছরখানেক আমরা এখানে থাকতে পারি। কিন্তু অসীমের স্মৃতি আমাকে এতটাই তাড়া করে ফিরতে থাকে, যে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় হোস্টেল ছেড়ে দেয়ার। অসীমের বাবা-মাকে কুষ্টিয়ার আর অতুলদার কলকাতার ঠিকানায় দুটো চিঠি লিখি ওর জিনিসগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্য।
চিঠি পাওয়ার পর ফোন করেন অতুলদা। অসীমের কোন কিছু হয়তো নিতে আসবেন না তারা কেউ-ই। অসীমের বাবা-মা আর ছোট বোনটাও এরই মধ্যে কলকাতা চলে গেছেন। বিক্রি করে দিয়েছেন বাংলাদেশে থাকা সম্পত্তি। তারা কলকাতায়ই স্থায়ী হবেন। এই মুহূর্তে তাদের কারো বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা নেই। আর তাছাড়া অসীমের স্মৃতির ব্যাপারেও তারা তেমন উৎসাহী নন। আমি সেগুলো নিজের কাছে রাখতেও পারি, আবার ফেলেও দিতে পারি।
কিছুটা ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করেই ফেলি রিমির কথা।
'রিমি ভালো আছে'- বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন অতুল দা। তারপর জানান, রিমির শ্বশুরবাড়ির গলির সামনের বড় রাস্তায়ই পাওয়া গিয়েছিল অসীমের রক্তাক্ত দেহটা। ওর মুখমন্ডলে কিছু আঘাতের চিহ্ন ছিল যা ঠিক গাড়ির ধাক্কার সাথে মেলে না। রিমি মুখ খোলেনি। ওর সাথে অসীমের দেখা হয়েছিল কি না তা-ও বলেনি কাউকে। কিন্তু ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন কৌশলে জানিয়ে দিয়েছে, ব্যাপারটা নিয়ে যেন বাড়াবাড়ি করা না হয়।
বাড়াবাড়ি করেনি অসীমের পরিবার। কারণ তারা বাংলাদেশের পাট চুকিয়ে ফেললেও কলকাতায় স্থায়ী হতে পারেনি তখনও। অসীমের ব্যাপারটা নিয়ে নাড়াচাড়া করলে বাড়ির সবার শ্রীঘরে যাওয়ার অথবা উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই ওর মৃত্যুটা সন্দেহজনক জেনেও তারা আইনের আশ্রয় নেয়নি।
অতুলদা বললেন - 'হয়তো ওকে মেরে রাস্তায় গাড়ির সামনে ফেলে দিয়েছে ওরা। অসীম আমাদের সাথে অনেকদিন আগে থেকেই সম্পর্ক ত্যাগ করেছিল। তারপরও সে তো আমার ভাই। ওর জন্য আমারো ফিলিংস আছে। কিন্তু এ ব্যাপারটা নিয়ে জল ঘোলা করে আল্টিমেটলি কোন লাভ হবে না। বিচার তো হবেই না। উল্টো আমাদের সবার জীবনটাই অনিশ্চিত হয়ে যাবে। তাই, আমরা সবাই মিলে ডিসিশন নিয়েছি, ব্যাপারটা আমরা ভুলে যাব।'
কিন্তু চাইলেই কি সব ভুলে যাওয়া যায়? আমি কি অসীমকে ভুলতে পেরেছি এতদিনেও? অসীমের সব জিনিসপত্র নিয়ে এসেছি আমার নতুন বাসায়। ওর স্মৃতি এখন আর দুঃস্বপ্ন হয়ে তাড়িয়ে বেড়ায় না। বরং অদ্ভূত এক মমত্ত্ববোধে সেই স্মৃতিকে লালন করে এসেছি আমি নয়টি বছর ধরে। সামনের মাসে কলকাতায় একটা সেমিনারে যাওয়ার সুযোগ এসেছে। ভাবছি এ সুযোগে অতুলদার সঙ্গে দেখা করে আসবো। দেখা করে আসবো রিমির সাথেও। ওকে কিছু প্রশ্ন করার ছিল আমার। জানি না, আমার প্রশ্নের উত্তর দেবে কি না সে। অথবা জানি না, দেখা করতে রাজী হবে কি না। আদৌ কি দেখা পাবো? আগের ঠিকানায় কি ওরা আছে এখনো?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




