somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: 'অনুরাগে অভিমানে' - দৈনিক আমার দেশ

২১ শে নভেম্বর, ২০১১ বিকাল ৪:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আনন্দে ছোট্ট শিশুর মতো লাফাতে ইচ্ছে করে মেয়েটির। কিন্তু সে তো আর এখন ছোট্ট মেয়েটি নেই। তাই নাচের ইচ্ছেটা মনে গোপন রেখে চোখ-মুখের উজ্জ্বল হাসিতেই ধরে রাখে আনন্দটুকু। মঞ্চ থেকে নিচে নেমে আসে সিঁড়ি বেয়ে। দর্শক সারির মাঝ দিয়ে যাওয়ার সময় এদিক-ওদিক থেকে সিনিয়র-জুনিয়র-ব্যাচমেটদের হাততালি-শিস আর ছুঁড়ে দেয়া মন্তব্য তার আনন্দের সঙ্গে মিশিয়ে দেয় লজ্জার আভাও। দর্শকসারির মাঝামাঝি ওর কয়েক সহপাঠীকে বসে থাকতে দেখে মেয়েটি এগিয়ে যায়। জিজ্ঞেস করে ছেলেটির কথা। ওরা জানায়, কিছুক্ষণ আগে ওদের সঙ্গেই বসে ছিল ছেলেটি। এই মাত্র উঠে গেল। কোথায় গেছে, তারা জানে না। কিন্তু ‘ফ্যাশন-শো’র অংশটুকু ছেলেটি দেখেছে বলে ওরা জানায়।
কলেজের মিলনায়তনে রোটার্যাক্ট ক্লাব আয়োজন করেছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরাই এখানে কলা-কুশলী, তারাই দর্শক-শ্রোতা। ‘ফ্যাশন-শো’ মানে এখানে নামকরা কোনো ডিজাইনারের পোশাক প্রদর্শনী নয়। সঙ্গীতের তালে-তালে ছেলে-মেয়েতে জুটি বেঁধে ক্যাট-ওয়াকের মতো কিছু একটা করার চেষ্টা। এক এক জুটির এক এক ধরনের পোশাক। ‘কোরিওগ্রাফার’ও কলেজের ছাত্র-ছাত্রী। এটাই তাদের কাছে ‘ফ্যাশন-শো’।
মঞ্চের দিকে ঘুরে তাকিয়ে মেয়েটি দেখে, জুনিয়র কাশ্মীরী এক ছাত্রী গান গাইছে এখন। আবছা আলোয় যতটুকু সম্ভব, মিলনায়তনের ভেতরটায় চোখ বুলায় মেয়েটি। ছেলেটিকে চোখে পড়ে না কোথাও। সহপাঠীদের সঙ্গে বসার অনুরোধ স্মিত হাসিতে একপাশে ঠেলে মেয়েটি বেরিয়ে আসে বাইরে।
ছেলেটিকে ফোন করে। কয়েক রিংয়ের পর ফোন ধরে ছেলেটি।
মেয়েটি জিজ্ঞেস করে—‘কোথায় তুমি?’
‘এই তো চত্বরে।’—নিরাবেগ কণ্ঠ ছেলেটির।
‘চত্বরে কেন?’
‘এমনি।’

মিলনায়তনের মূল গেটের সামনে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে লেডিস হোস্টেলের ঠিক বাইরেই কলেজ চত্বরের মাঝে বসে থাকার জায়গাটা। কিন্তু এখন রাত বলে গেট থেকে বোঝা যাচ্ছে না ছেলেটা ঠিক কোথায়। মেয়েটা দ্রুত পায়ে হেঁটে আসে চত্বরে। ছেলেটিকে এক কোণায় চুপ করে বসে থাকতে দেখে।
ছেলেটির পাশে গিয়ে বসে মেয়েটি। বলে—‘প্রোগ্রাম দেখবা না?’
ছেলেটি কোনো জবাব দেয় না। মেয়েটি জানে, ছেলেটির মন খারাপ। জানে মন খারাপের কারণটাও। কিন্তু কারণটা মেনে নিতে পারে না মেয়েটি। কী এমন খারাপ কাজটা করেছে সে? কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ফ্যাশন-শো আর নাচ করে আসছে। কলেজের প্রতিটি অনুষ্ঠানেই তার খোঁজ পড়ে। বরাবরের মতো এবারও অনুষ্ঠানের আয়োজক সিনিয়র ভাইয়া-আপুরা ধরেছে। মেয়েটির নিজেরও উত্সাহ ছিল। কিন্তু ছেলেটির তাতে সায় ছিল না। ছেলেটি অবশ্য এ নিয়ে খুব বেশি জোরাজুরি বা বিতণ্ডা করেনি। একবারই বলেছে, এটা তার পছন্দ না। এ কারণে মেয়েটি এবারের অনুষ্ঠানে কিছু করবে না বলেই ভেবেছিল। কিন্তু সহপাঠী আর সিনিয়রদের কাছে কারণটা বলতে বাধছিল তার। নিজেকে এবং ছেলেটিকেও তাতে সবার সামনে ছোট করা হবে বলে মনে হয়েছিল। মেয়েটি যখন অন্তত ফ্যাশন-শোটা করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার ছেলেটির সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছে, গম্ভীর ভঙ্গিমায় ছেলেটি শুধু বলেছে—‘তোমার ইচ্ছে।’ ফ্যাশন-শোর জন্য ছেলেটিকেই নিজের জোড়া হিসেবে নিতে চেয়েছিল সে। কিন্তু ছেলেটি রাজি হয়নি। পরে সহপাঠী আরেক ছেলে ওর ক্যাটওয়াক-জুটি হয়।
এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই ছেলেটির মুখ ভার ভার। মেয়েটির কোনো রিহার্সালও দেখতে আসেনি সে। বুঝতে পারলেও মেয়েটি এ নিয়ে কোনো কথা বলেনি আর ছেলেটির সঙ্গে। অনুষ্ঠান দেখার পর ছেলেটির রাগ পড়ে যাবে বলে ধারণা ছিল ওর। কেননা, ছেলেটি যখন শুধুই মেয়েটির সহপাঠী, বন্ধু বা রিডিং-পার্টনার ছিল, যুগল সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি তখনও—ছেলেটি ওর নাচ আর ফ্যাশন-শোতে হাঁটার ভঙ্গিমার ভক্ত ছিল, সময়ে-অসময়ে এ নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠত সে।
কিন্তু আজ ছেলেটি এ নিয়ে কোনো কথা বলে না। মেয়েটি নিজেই যেচে পড়ে জানতে চায়—‘দেখছো?’
‘হু’—সংক্ষিপ্ত জবাব ছেলেটির।
‘কেমন হইছে?’
‘ভালো’—শুষ্ক, নিরাসক্ত কণ্ঠ।
‘লোকজন কেমন তালি দিচ্ছিল দেখছো? আমাদেরটাই সবচেয়ে ভালো হইছে।’
ছেলেটি কোনো জবাব দেয় না। চোখ-মুখের কাঠিন্য বাড়ে তার। মেয়েটির আনন্দ উবে যায়।
তবু সে চেষ্টা করে ছেলেটিকে স্বাভাবিক করতে। ছেলেটির হাতের আঙুলের ফাঁকে নিজের আঙুলগুলো রেখে চেপে ধরে সে। কিন্তু ছেলেটি কোনো সাড়া দেয় না। তাকিয়ে থাকে
অন্যদিকে। মেয়েটির দু’চোখ জলে ভরে যায়। সে মৃদু স্বরে বলে—‘এর আগে তুমি আমার নাচ আর ফ্যাশন-শোর কত প্রশংসা করতা। আর আজকে? কী এমন খারাপ কাজটা করছি আমি? ওই ছেলের হাতও তো ধরি নাই।’
ছেলেটির কোনো জবাব নেই।
মেয়েটির চোখ দিয়ে জল গড়ায়। ভেজা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে—‘খাইছো রাতে?’
‘না।’—ছেলেটি বোঝে, কিন্তু তাকিয়ে দেখে না মেয়েটির দিকে।
‘খাবা না?’
‘কোথায়?’
‘কোথায় মানে?’
‘কোথায় মানে, এত রাতে কোথায় খাব?’—বিরক্তি ঝরে ছেলেটির কণ্ঠে।
রাত কেবল ন’টা বাজে। এখনও তারা বেরোলে পুরনো ঢাকার নীরব বা কাঁটাবনের অষ্টব্যঞ্জন বা হাতিরপুলের শর্মায় খেয়ে আসতে পারে। এমন সময়ে কত রাতেই তো খেয়েছে ওরা।
মেয়েটি একটু কঠিন গলায় বলে, ‘বলো যে, তোমার আমার সঙ্গে থাকতে অসহ্য লাগতেছে।’
‘আমি তো তা বলি নাই।’
‘বলতে আর বাকি কি রাখছো?’
ছেলেটি কোনো জবাব দেয় না।
‘আমি কি চলে যাব?’—মেয়েটি জানতে চায়।
‘তোমার থাকতে ইচ্ছে না করলে আমি তো আর জোর করে থাকতে বলতে পারি না।’
কথার কী ছিরি! মেয়েটির বুকের ভেতর চাপ চাপ কষ্টের তীব্রতা বাড়ে।
‘তুমি এমন করতেছো কেন? আমি সরি বলতেছি। জীবনে আর কখনও কোনো শো করবো না।’
ছেলেটি তবু জবাব দেয় না।
মেয়েটি উঠে দাঁড়ায়।
‘তুমি যাচ্ছ?’ ছেলেটির প্রশ্ন শুনে মেয়েটি ভাবে, হয়তো এখন ছেলেটি মত বদলাবে। বলে, ‘হ্যাঁ।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। হোস্টেলে খেয়ে নিও।’— বলে ছেলেটি উঠে দাঁড়িয়ে সোজা হাঁটা দেয় তার হোস্টেলের দিকে। মেয়েটি পেছন থেকে তাকিয়ে থাকে ছেলেটির দিকে। কিন্তু ছেলেটি ফিরে তাকায় না। দৃষ্টির সীমা থেকে চলে যাওয়ার পরও পথের দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকে মেয়েটি। আশা করে, হয়তো কিছুক্ষণ পরেই ফিরে আসবে ছেলেটি।
কিন্তু আসে না সে। অনুষ্ঠান শেষ হয়। হৈ-হুল্লোড় করতে করতে একে একে ছেলে-মেয়েরা বেরিয়ে আসে মিলনায়তন থেকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর পায়ে মেয়েটি ঢুকে পড়ে ওর হোস্টেলের ভেতর।
রুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় মেয়েটি। গালে-চোখে মাখানো প্রসাধনীর প্রলেপ, খোঁপার ফুল, হাত-ভরা চুড়ি, কানের ঝুমকা—তেমনি থেকে যায়। শাড়িটাও জড়িয়ে থাকে গায়ে। রাজ্যের আলস্য যেন ভর করে শরীরে। বিছানা-লাগোয়া জানালাটা খুলে সে অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাইরের দিকে। ছাত্রী-হোস্টেল আর কলেজ ভবনের মাঝের চত্বরটা তখন উচ্ছ্বাসের কোলাহলে জমজমাট। অনুষ্ঠান শেষে অডিটরিয়াম থেকে বেরিয়ে সবাই আড্ডা জমিয়েছে সেখানে। জুটিরা আলাদা—একটু দূরে দূরে, আধো আলোছায়ায়, আবার অনেকে দল বেঁধে কোরাসে গলা ফাটাচ্ছে। জীবনের ওই কাকলিতে তারও অংশ নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছেলেটির অন্যায় ক্রোধ দু’জনের আনন্দটাই এখন মাটি করেছে। অন্যায়-ই তো! মঞ্চে উঠে সুরের তালে কয়েক কদম পা ফেলায় কী এমন অপরাধ করেছে মেয়েটি! ফের বিপ্রতীপ ভাবনাও ঢোকে তার মনে। ক্রোধ? নাকি অনুরাগের অভিমান এটা? ভালোবাসার যুক্তিহীন দাবি? তবুও... আজ এমনটা না করলেই কি চলত না ছেলেটির? একেক বার মেয়েটির মনে হয় ছেলেটিকে ডেকে আনে আবার, চত্বরের ওই প্রাণের মেলায় যোগ দেয় দু’জনে। অলস দৃষ্টি ফেলে সে মুঠোফোনটার দিকে। আবার পরক্ষণেই আহত অভিমান ভেতর থেকে বাধা দেয়। যে অতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, তার সামনে কাঙালপনার কি-ই বা দরকার? মুঠোফোন বন্ধ করে দেয় মেয়েটি।
কত পরিকল্পনাই না ছিল মনে মনে! অনুষ্ঠান শেষে দু’জন রাতের খাওয়াটা সারবে পরিচিত রেস্টুরেন্টগুলোর কোনো একটায়—হয়তো নীরব, শর্মা হাউস বা অষ্টব্যঞ্জনে। তারপর ফিরে এসে কলেজের ছাদে বসবে পাশাপাশি, হাতে হাত রেখে। একটু-আধটু দুষ্টুমি হয়তো করতে চাইবে ছেলেটি। মেয়েটি চোখের কোণে হাসি ঝুলিয়ে, কৃত্রিম রাগের ভান করে তাকে কিছুটা প্রশ্রয় দেবে, কিন্তু খুব বেশি নয়। মাঝরাত পর্যন্ত তারা বসে থাকবে ‘ছোট ছাদে’—মূল ভবনের ছাদের প্রায় লাগোয়া ভবনের বর্ধিতাংশের যে ছোট্ট জায়গাটাকে ‘টং’ বলে অনেকেই। ছাদের ওই অংশ থেকেই কেবল আকাশের দিকে তাকালে আশপাশের উঁচু উঁচু বিল্ডিংগুলো চোখের সামনে তেমন একটা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। ছেলেটির পাশে বসে রাতের নক্ষত্রভরা ওই আকাশ দেখার ইচ্ছে ছিল আজ মেয়েটির।
এখন এই রুমের ভেতর থেকে জানালার পাঁচ শিকের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে একটুখানি আকাশ দেখতে পায় মেয়েটি। স্থির জোনাকিপোকার মতো ইতি-উতি ছড়ানো নক্ষত্রগুলো কেমন যেন ম্লান মনে হয়। এক পাশে চাঁদটাও মনমরা হয়ে পড়ে আছে। তখনই খেয়াল হয়, ময়লা-কালো মেঘগুলো ইতস্তত ছুটে বেড়াচ্ছে আকাশজুড়ে। বৈশাখের এই সময়টায় বিনা-নোটিশে হঠাত্ হঠাত্ই আকাশ রং পাল্টায়। আজ সারাদিন ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘগুলো সারসের পালকের মতো সাদাই ছিল। কিন্তু এই রাতে সেগুলো মলিন এখন। ছোট ছোট মেঘগুলো দুর্বিনীত স্পর্ধায় চাঁদকে আড়াল করে দিচ্ছে মাঝে সাঝে। তারপর ছুটে গিয়ে বড় কোনো মেঘের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। আকারে আরও বিশাল হচ্ছে মেঘগুলো, আকাশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে নক্ষত্রের অধিকার। আকাশের এই পরাজয়ে বাতাসও যেন মুখ লুকিয়েছে কোথাও।
দেখতে দেখতে মেঘের দল গিলে ফেলে পুরো চাঁদটাকেই। পৃথিবীটাকে ডুবিয়ে দিতে চায় গাঢ় অন্ধকারে। কিন্তু এই নাগরিক আয়োজনে কৃত্রিম বিদ্যুতের আলো সেই অন্ধকারকে এখানে ততটা গাঢ় হতে দেয় না। সেই হতাশায়ই যেন বুনো ষাঁড়ের মতো গর্জন করে ওঠে মেঘগুলো। ক্ষোভ মেটাতে হঠাত্ই যেন রাশি রাশি জলকণা ছুঁড়ে দেয়। সেই সঙ্গে হিমালয়ের হিমবাহ ছুঁয়ে ছুটে আসে জলো হাওয়া।
চত্বরের কলরব তাতে আরও বেড়ে যায়। প্রায় সবাই বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ছোটে যার যার নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে। মেয়েরা ঢুকে পড়ে মেয়েদের হোস্টেলে, ছেলেরা তাদের হোস্টেলের দিকে ছোটে। কেউ অবশ্য ওই বৃষ্টির জল গায়ে মেখে আনন্দ নিতে নিতে ছুটে বেড়ায় চত্বরময়। একসময় হাওয়ার বেগ বাড়ে। ছাত্রী হোস্টেলের দেয়ালঘেঁষে উঁচুতে মাথা তুলে দাঁড়ানো কৃষ্ণচূড়া আর নারকেল গাছগুলোর ঝুঁটি ধরে নাড়া দিয়ে যেন শাসিয়ে যায় ঝড়ো হাওয়া। হাওয়ার শাসানির কাছে তাদের মাথা নোয়াতে দেখে বাকি ছেলেমেয়েরাও ফিরে চলে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে।
খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল মেয়েটিকে। গায়ে কাঁপন ধরাচ্ছিল হিম-বাতাসও। কিন্তু মেয়েটি উঠে গিয়ে জানালাটা বন্ধ করে না। হিম-বাতাসের ছোঁয়ায় তার মনের ভেতর জমাট বাঁধা অভিমান গলতে থাকে। ওই গলতে থাকা অভিমানে তার চোখের পাতার নিচের দু’দীঘির জলও উপচে পড়ে। নিজেকে আরও অসহায়, একাকী লাগে তার, তবু অনুভূতির জানালাটা বন্ধ করে না সে।
মানুষের তৈরি কৃত্রিম আলো একসময় হার মানে প্রকৃতির রুদ্রমূর্তির কাছে। কলেজ ভবনের নিচে বা পার্শ্ববর্তী হাসপাতাল ভবনের সামনে টিমটিম করে জ্বলা বাতিগুলো নিভে যায় হঠাত্। গিরিখাতের অতল থেকে একরাশ অন্ধকার কে যেন ছুঁড়ে মারে মেয়েটির জানালার পাশে। বনলতা সেনের চুলের মতো আঁধার হয়ে যায় চারদিক। শুধু নারকেল আর কৃষ্ণচূড়ার আবছা বিশৃঙ্খল অবয়ব টের পায় মেয়েটি।
অনেকক্ষণ কেটে যায় এভাবেই। হাত উঠিয়ে চোখের জল মোছার চেষ্টাও করে না মেয়েটি। অবশ্য বৃষ্টি তার শরীর ছুঁলেও চোখের পাতা ছোঁয় না, তার ‘এত সাধের কান্নার দাগ’ও তাই ধুয়ে যায় না। বারবারই তার ছেলেটির কথা মনে পড়ে, বেলা-অবেলায় বলা ভালোবাসার টুকরো কথাগুলো ফিরে ফিরে এসে কান ছুঁয়ে যায় যেন, একটা-দুটো পুরনো দৃশ্য ভেসে ওঠে মনের পর্দায়। দীঘিতে শুধু জল বেড়েই চলে।
কাছে কোথাও বাজ পড়ার প্রচণ্ড শব্দ হয়। কেঁপে ওঠে পুরো পৃথিবী। মেয়েটিকেও কাঁপিয়ে দিয়ে যেন বাস্তবে ফিরিয়ে আনে। কয়েক সেকেন্ড পরই ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মতো উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। একটা ঝলক মাত্র। পরমুহূর্তেই নিভে যায় মেঘ ফুঁড়ে নেমে আসা সাদা আলো। কিন্তু ওই এক মুহূর্তেই চত্বরে ডা. মিলনের কবরের পাশে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটা চোখে পড়ে মেয়েটির। চমকে ওঠে সে। মাঝে মাঝে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ের জন্য ঝলসানো বিদ্যুতে অবয়বটা হয়তো অস্পষ্টভাবে আগেও চোখে পড়েছে তার, কিন্তু সেই অবয়বটা এতক্ষণ ভেতরটা জুড়ে ছিল এত প্রচণ্ডভাবে যে, বাইরের দিকটায় মনোযোগই ছিল না মেয়েটির।
মৃত পড়ে থাকা মুঠোফোনটা হাতে নিয়ে তাতে জীবনের স্পর্শ দেয় মেয়েটি। ফোন করে ছেলেটিকে। ভেজাস্বরে প্রশ্ন করে— ‘কী?’
ছেলেটির আওয়াজ স্পষ্ট শোনানোর জন্যই যেন বৃষ্টি আর মেঘ তাদের আওয়াজ কমিয়ে দেয়। তবুও বোঝা যায় ছেলেটি কথা বলছে ম্লান, নিচু স্বরে—‘কিছু না’।
‘কখন এসেছো?’
‘এই তো।’
মেয়েটি বোঝে, ছেলেটি সত্যি কথা বলছে না। বোঝে, সে এসেছে আরও অনেক আগে, হয়তো বা মেঘ থেকে বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়ারও আগে। এতক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে ভিজেছে প্রকৃতি আর অপরাধবোধের বৃষ্টিতে।
‘রুমে যাও।’—নরম গলায় বলে মেয়েটি।
‘হু’—বলে ছেলেটি, কিন্তু সে যে নিশ্চল মূর্তির মতো ঠায় সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, ফোনের এ প্রান্ত থেকেও তা বোঝে মেয়েটি।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। কেউ কথা বলে না।
‘আচ্ছা যাও না এখন, সকালে কথা বলবো।’ মেয়েটি অবশেষে নীরবতা ভাঙে।
‘স্যরি।’ ভাঙা, বৃষ্টিভেজা স্বর ছেলেটির।
আবার দীঘি উপচায়। এবার দীঘিতে আর অভিমানের ঢেউ নেই, আনন্দের স্রোত খলবলিয়ে ওঠে। গাঢ় স্বরে মেয়েটি বলে, ‘আচ্ছা ঠিক আছে বাবা, তোমাকে আর ভিজতে হবে না। যাও। কালকে কিন্তু পুষিয়ে দিতে হবে, মনে রেখ।’
‘অবশ্যই, সুদে-আসলে। আমি আসলেই দুঃখিত সোনা। করজোড়ে মাপ চাই।’ অপরাধবোধের সঙ্গে স্বস্তি আর আনন্দের মিশেল ছেলেটির কণ্ঠে।
বৃষ্টির ধারা ক্ষীণ হয়ে আসে। মেঘের নিচে চাপা পড়া নক্ষত্রগুলোও উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করে। অন্ধকারের তেজ কমে আসায় ছেলেটিকে আবছামত দেখতে পায় এখন মেয়েটি। কিন্তু ওই দূর থেকে ছেলেটি জানালার শিকের ওপারে থাকা মেয়েটিকে দেখতে পায় না, শুধু অনুভব করে সেখানে তার উপস্থিতি। তবু ওই জানালা লক্ষ্য করে মেয়েটির উদ্দেশে হাত নাড়িয়ে ছেলেটি রওনা দেয় হোস্টেলের দিকে।
ছেলেটি দৃষ্টিসীমার বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত চোখের পলকও ফেলে না মেয়েটি।
.....................................।
দৈনিক আমার দেশ- এর ১৮-১১-২০১১ তারিখের সাহিত্য সাময়িকী পাতায় প্রকাশিত গল্প।
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×