আমাদের মেডিক্যাল কলেজে একজন শিক্ষক ছিলেন যার দুই শব্দের নামের ইংরেজী প্রথম অক্ষরগুলো হচ্ছে - ‘এল. ই.’। ‘এল.ই.’ নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন। এল. ই.-তে কি হয় এখন আর মনে নেই। কিন্তু প্রথম যখন নামটা শুনলাম, ভাবলাম নামটা হচ্ছে - এলি - কোন নারীর নাম। পরে যখন ক্লাস নিতে এলেন, দেখলাম- ওমা - তিনি একজন সৌম্যকান্তি পুরুষ! তার ক্লাস নেয়ার একটা অন্যরকম স্টাইল ছিল। স্টকে ছিল প্রচুর কৌতুক - ‘মেডিক্যাল জোকস’-এর অফুরন্ত ভান্ডার। সেই ভান্ডার থেকে কয়েকটি ঝেড়ে তার পর তিনি পড়াতে শুরু করতেন। আঁতেল-টাইপের দু-একজন ছাত্রছাত্রী হয়তো মেডিক্যাল জ্ঞানের যুক্তিবিদ্যা প্রয়োগে জোকসের ভেতর ফাঁক বের করার চেষ্টা করতো। কিন্তু পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান আর যুক্তির নিরিখে মাপতে গেলে তো জোকস আর জোকস থাকে না। তাই সেসব না ভেবে বাকী প্রায় সবাই আমরা আনন্দের রসটুকুই আস্বাদন করতাম সেই সব জোকস থেকে। পড়ার ফাঁকে ফাঁকেও চলতো জোকস। আমাদের ব্যাচের কেউই সেগুলো স্যারের আগে অন্য কারো মুখ থেকে শুনিনি। স্যার এগুলো কোত্থেকে পান জিজ্ঞেস করলে মিটি মিটি হাসতেন- কিছু বলতেন না। রহস্য! রহস্য!!
পড়াশোনা-সম্পর্কিত কোন প্রশ্নের উত্তর না পারলে সরাসরি- ‘পারি না’ বলে দেয়া কারো কারো স্বভাব। আবার অনেকের কাছেই শিক্ষকের মুখের উপর এই ধরণের ‘নেতিবাচক’ উত্তর দেয়াটা যেন বিষম লজ্জার! আমাদের ক্লাসেও সে রকম ‘ইতিবাচক’ মানসিকতার ছাত্রছাত্রীর অভাব ছিল না। সঠিক উত্তরের আশপাশের কোন গলির ঠিকানাও হয়তো জানা নেই, তবুও কিছু একটা বলতে তাদের হবেই। অবশ্যই সেই ‘কিছু একটা’ একদমই আন্দাজে। অতিস্বাভাবিকভাবেই তা হতো ভুল কোন উত্তর, এবং নিশ্চিতভাবেই ক্লাসের অন্যদের জন্য তা হয়ে উঠতো অত্যন্ত আমোদজনক একটা ব্যাপার। ‘স্লিপ অব টাঙ্গু’-র কারণেও বলতে চাওয়া বা না-চাওয়া শব্দের কাছাকাছি আরেকটা শব্দ বের হয়ে আসতো অনেকের মুখ থেকে, যার অর্থ দাঁড়াতো সম্পূর্ণ অন্যরকম, হাস্যকর কিছু একটা। একদিন ঐ এল.ই স্যারের ক্লাসেও হলো এমনটা।
স্যার এক শিশুর বুকের এক্স-রে প্লেট দেখিয়ে এক ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, এক্স-রেতে কি দেখা যাচ্ছে? নিউমোনিয়া-আক্রান্ত ঐ শিশুর এক্স-রেতে যা দেখা যাচ্ছিল চিকিৎসা-বিজ্ঞানের পরিভাষায় তাকে বলা হয় - কনসোলিডেশন (Consolidation)। তবে আমাদের সেই সহপাঠির মুখ দিয়ে উচ্চারিত হলো সম্পূর্ণ ভিন্নার্থক একটি শব্দ- কন্সটিপেশন (Constipation)। যার অর্থ ‘কোষ্ঠকাঠিন্য’। হয়ত ‘যা-হোক-একটা’ উত্তর দেয়ার তাগিদে নয়, সঠিক উত্তর জানা থাকা সত্ত্বেও স্লিপ অব টাংয়েই এরকমটা হলো, কিন্তু হাসির হররা বয়ে গেল ক্লাসে। হাসির দমক থিতিয়ে এলে স্যার বললেন, ‘খোকা, না পারলে বোলো পারি না, তবু এমন উল্টোপাল্টা শব্দ বোলো না। শেষে গল্পের ঐ ভদ্রলোকের মতো অবস্থা হবে।’
শকুনে গন্ধ পেল গরুর মৃত্যুর - আমরা গন্ধ পেলাম আরেকটি মেডিক্যাাল জোকসের- ‘কোন গল্প স্যার?’
‘শোন তবে’- স্যার শুরু করলেন -
এক হিন্দু ভদ্রলোক। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্র-সম্পর্কিত কোন পেশার সাথে লতায়-পাতায়ও যুক্ত নন। তবে কিছু কিছু মেডিক্যাল টার্ম বা শব্দ জানেন; সেই শব্দের প্রকৃত অর্থ জানেন- তা নিশ্চয় করে বলতে পারি না। ডাক্তারের কাছে গেলে বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত কোন আলোচনায় নিজের বিদ্যেটুকু জাহিরের চেষ্টাটা তিনি করতেন পুরোমাত্রায়। তো এই ভদ্রলোক একদিন এক ডাক্তারের শরণাপন্ন হলেন। চিকিৎসক একজন সার্জন, অস্ত্রোপচারে তার বিশেষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। আমাদের আলোচ্য ভদ্রলোক চিকিৎসককে বললেন, ‘Doctor, I want to do castration’ অর্থাৎ কিনা তিনি ‘ক্যাসট্রেশন’ করাতে চান। ইংলিশ টু বেঙ্গলী ডিকশনারী অনুযায়ী Castrate শব্দের অর্থ খোজা বা খাসি করা, পুরুষত্বহীন করা, সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা হরণ করা।
ডাক্তার হতবাক। ৩০-৩২ বছরের যুবক ভদ্রলোক। এ বয়সেই কেন ক্যাসট্রেশন? জিজ্ঞেস করলেন- ‘আপনার ওয়াইফের এ ব্যাপারে সম্মতি আছে? তার সাথে কথা বলেছেন?’
‘না।’
‘তার অনুমতি ছাড়া তো আমি এ অপারেশন করতে পারব না। আপনি তার সাথে আগে কথা বলেন।’
পরদিন আবার এলেন ভদ্রলোক। না- তার স্ত্রীর কোন আপত্তি নেই। সুতরাং....
রোগীর ইচ্ছানুযায়ী ডাক্তার ‘হরণকার্য’ সম্পন্ন করলেন। পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে চেতনা ফিরে পেয়ে ভদ্রলোক আশেপাশে তাকালেন। পাশের বেডেই দেখলেন আরেক রোগীকে। ভদ্রলোকের যে স্থান জুড়ে ব্যান্ডেজ বাধা ঐ রোগীরও সে স্থানে ব্যান্ডেজ। ঐ রোগীকেও ‘সমগোত্রীয়’ ভেবে উৎফুল্ল হলেন ভদ্রলোক। জিজ্ঞেস করলেন- ‘ভাই আপনার কি অপারেশন হয়েছে?’
এ ধরণের ব্যক্তিগত একটা প্রশ্নে স্পষ্টতই বিরক্ত হলেন ঐ রোগী। ভদ্রলোকের দিকে একবার তাকিয়ে নিরাসক্ত গলায় বললেন- Circumcision (সারকামসিশন)। ইংলিশ টু বেঙ্গলী ডিকশনারী অনুযায়ী যার অর্থ লিঙ্গাগ্রের ত্বকচ্ছেদ করা, সুন্নৎ করা। সোজা বাংলায় মুসলমানী করানো, খতনা করানো।
অপারেশনের নামটা শুনেই শোয়া অবস্থা থেকে লাফ দিয়ে উঠে বসলেন আমাদের আলোচ্য ভদ্রলোক। উত্তেজিত গলায় চিৎকার দিয়ে উঠলেন- ‘ইয়েস, ইয়েস। দ্যাট ওয়াজ দ্যা ওয়ার্ড, দ্যাট ওয়াজ দ্যা ওয়ার্ড।’ (Yes, yes. That was the word, that was the word.)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




