somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটদের সামহোয়্যার ইনের জন্য ভালোবাসা

১৫ ই এপ্রিল, ২০০৯ রাত ৮:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সামহোয়্যার ইন ব্লগে ছোটদের জন্য লেখার গ্রুপ খোলা হয়েছে।ভালো লাগল। সাথে সাথে আমাদের দেশের শিশুসাহিত্য নিয়ে মনের পুরনো ক্ষোভটা ফের মনে পড়ে গেল।


আমার মতে আমাদের বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যকে কোন প্রকারের চেষ্টাতেও সমৃদ্ধ শব্দটার ধার কাছ দিয়েও নেয়া যায় না। শিশুতোষ কোন লেখা বলতে আমাদের কবি সাহিত্যিকরা গোড়া থেকেই ছড়াটাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে বসে আছেন। ছোটদের জন্য গল্প টল্পের মান মোটেও সন্তোষজনক নয়।
আমাদের দেশের জনপ্রিয় লেখক যারা আছেন, প্রতি বইমেলায় অসীম সংখ্যক বই প্রসব করে যারা আমাদের কৃতার্থ করছেন, তারা এত এত উঁচুদরের প্রেমের উপন্যাসের পাশাপাশি মনের ভুলে কখনো আবার বাচ্চাদের জন্যও দু একটা বই বের করে ফেলেন। অবশ্য সেসব বই হজম করার মত সুগঠিত পাকস্থলী না থাকায় আমাদের শিশুকিশোররা এ সুখাদ্য থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হয়।
তাই আমাদের দেশের শিশুকিশোররা গল্প টল্প পড়ার জন্য সহজ ও নির্ঝঞ্ঝাট পথ বেছে নেয়- প্রথমে তিন গোয়েন্দা, পরে মাসুদ রানা, ফাঁকে ফাঁকে সস্তা উপন্যাস। ফলস্বরূপ একটা দেশে শিশুমনের যে শিশুসাহিত্য তার একটাই গন্তব্য তৈরি হয়-তা মুখ থুবড়ে পড়ে।

আবদুল্লাহ আল মুতীর বিজ্ঞান সিরিজ,জাফর ইকবাল ,হূমায়ুন আহমেদের প্রথম দিকের বাচ্চাদের জন্য লেখা কিছু বই তাও এ মঙ্গার মধ্যে সামান্য স্বস্তি।( আমি শুধু সেসব লেখকের লেখার কথাই বলছি যা এখনো ছোটরা পড়ে )

তবে যদি ধরা হয় বাঙলা ভাষার শিশুসাহিত্য তাহলে বলা চলে তা যথেষ্ট সমৃদ্ধ। আর কিছু না যদি ধরি একজন শিবরাম চক্রবর্তীর কথা, তিনি একাই শিশু কিশোরদের জন্য যা লিখেছেন আর যে রকম উচুঁ মানের লেখা লিখেছেন , তাতে আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি শুধুমাত্র শিবরামের লেখা বিবেচনায় এনেই বাংলা শিশুসাহিত্যকে (বর্তমানে কিশোরসাহিত্য বলা উচিত হয় তো ) যেকোন ভাষার শিশুসাহিত্যের উপর টেক্কা দেয়া যায়। আর মজার ব্যাপার হল তার লেখার যে বাংলা মৌলিকত্ব এটা এতটাই প্রকট যে এগল্পগুলো শুধুই বাঙলাভাষার, তার অন্যভাষায় অনুবাদ অসম্ভব। (যদিও পরে বুঝতে পেরেছি শিবরাম বিদেশী গল্প থেকে কখনো কাহিনী ধার করেছেন, যেমন মার্ক টোয়েনের কিছু গল্পের সাথে তার কিছু মিল আছে,তবে শিবরামের সেসব গল্পের স্টোরি টেলিংয়ের কাছে মার্ক টোয়েন নস্যি।)
উপেন্দ্রকিশোর -সুকুমার -সত্যজিৎ রায়, বাঙলা শিশুসাহিত্যের তিন উজ্জ্বল নত্র, যারা শিশুদের জগৎটাকে ভরিয়ে দিয়েছেন কিছুটা অনুবাদ আর পুরোটাই নিজেদের লাগামহীন কল্পনার রেশ ছড়িয়ে।
কলকাতার লেখকদের মধ্যে আরো আছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র,নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায়,সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় এরাও শিশুকিশোরদের জন্য আজীবন ভালো ভালো লেখা লিখেছেণ। হাল আমলের শীর্ষেন্দুর লেখা ছোটদের গল্পগুলোও চমৎকার।

তারপরও আফসোস থেকে যায় যখন বিদেশী ভাষার শিশুসাহিত্যের সম্ভার দেখি। ইংরেজি ভাষায় সে জগৎ বড় হবে সেটা স্বাভাবিক, কিন্তু তার বৈচিত্র্য দেখলে মন ভরে উঠে, সেই আগেকার লুইস ক্যারল থেকে আজকের রাওলিং পর্যন্ত রত্নে ভরপুর। লিয়রের ননসেন্সের জগৎ,গ্রিম ভাই (জার্মান মূল) আর হ্যানস ক্রিশ্চিয়ানের রূপকথা, নার্নিয়ার মত সিরিজ, টম সয়্যারের মত ক্ল্যাসিকগুলো আর কত মজার মজার সব রাইমে ভরপুর এ জগৎ।
যখন প্রগতি প্রকাশন থেকে রাশিয়ান বই বাংলা হয়ে আমাদের দেশে আসত তখন আমরা উপলব্ধি করি রাশিয়ান শিশুসাহিত্য কতটা বিশ্বমানের। ইউরি ইয়াকভলেভের 'রূপের ডালি খেলা' এর মত ভালো বই আর পড়েছি বলে মনে পড়ে না। আর্কাদি গাইদারের ইসকুল ,তিমুরের দলবল আর নাম মনে না রাখা কত বই, বৃষ্টি আর নক্ষত্র, পাভেল বাঝোভের মালাকাইটের ঝাপি আর অসাধারণ সব রূপকথা আমাদের শৈশবকে একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল যেসব বই, সেসবের কথা ভাবলে মনে হয় বাংলা শিশুসাহিত্যকে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
অথচ বাংলাভাষার যে অপরিমেয় শক্তি তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের দেশের শিশুকিশোরদের বাংলাবইয়ের জগৎ খুব ছোট হয়ে আসছে,আজকে ভালো মানের কোন শিশুতোষ পত্রিকা নেই,যেমনটা ছিল সন্দেশ।
আসলে ব্যাপার হল আমাদের দেশে শিশুতোষ লেখা যতটা গুরুত্ব পাবার কথা ছিল তার শতভাগের একভাগও কখনো দেয়া হয়নি। দক্ষিনারঞ্জন মিত্রের পর আর কেউ রূপকথার ধার সেরকম ভাবে মারায় নি(বন্দে আলি মিয়া,মনসুর উদ্দিন সহ কয়েকজন কিছু করেছিলেন), অথচ যার ভীষন দরকার ছিল। ভালো শিশুতোষ উপন্যাসের সংখ্যা খুবই কম ।( লেবু মামার সপ্তকান্ড টাইপ গল্পকেও ভালোর খাতায় ধরে। )পাঠ্যপুস্তকগুলোতে আদর্শগত ভাব বজায় রাখার জন্য একই ধরনের বৈচিত্রহীনতা দিয়ে ভরে রাখা হয়েছে।
তাছাড়া আরেকটা ব্যাপার খুব লক্ষনীয় , আমাদের দেশে যারা ছোটদের জন্য লিখেছেন তাদের লেখা গুলো খুব বেশি উপদেশমূলক, যা ভালো শিশুসাহিত্যের প্রধান অন্তরায় । উপেন্দ্রকিশোরের লেখাতেও এ বৈশিষ্ট্য ছিল,সুকুমার রায়ের গল্পগুলোতে তার সামান্য অবশিষ্ট ছিল, আর সত্যজিৎ এ ব্যাপারে সবচেয়ে সফল ছিলেন।তার গল্পগুরো পুরোপুরি উপদেশমুক্ত। একই পরিবারে যে চেন্জ তৈরি হয়েছে লেখনিতে তার থেকে আমাদের দেশের শিশুতোষ গল্পের লেখকরা কোন অনুপ্রেরণা পাননি।

অথচ আমার সবসময় মনে হয় একটা দেশের অন্তত শিশুসাহিত্যের বেসটা খুব শক্তিশালী হওয়া জরুরী। মনে পড়ে ছোটবেলার পড়া প্রতিটা গল্প,ছড়া মনে কতটা দাগ কাটত,সেসময়ের ভালো কোন গল্প,ছড়া রূপকথার স্মৃতি আজীবন মধুর হয়ে থাকে।
এক একটা ভালো বই এক একটা জগৎ,আর এই জগৎ তৈরির প্রক্রিয়া শৈশবে শুরু না হলে মানুষ তার কল্পনার জগৎ আর কোনদিনই হয়তো তৈরি করতে পারে না। আমি জানি না এখনকার তিন গোয়েন্দা টাইপ লস অ্যাঞ্জেলিয় জগৎ নিয়েই শুধু যারা তাদের মনোজগৎ তৈরি করছে, দেশজ সাহিত্যের প্রতি তাদের আকৃষ্টতা কতটুকু বজায় থাকে।
আর একটা কথা বলে নেয়া দরকার, শিশুসাহিত্যকে কেউ যদি শুধু শিশুদের সাহিত্য ভেবে নেয় তাহলে খুব অন্যায় হবে। আসলে শিশুসাহিত্য শিশুমনের সাহিত্য। সে মন শিশুতে স্বভাবতই থাকে, আর প্রত্যেক সুপাঠক তাকে লালন করে পুরো জীবন। তাই ভালো শিশুতোষ গল্প চেনার একটা মজার উপায় হচ্ছে -ধরুন কোন লেখা ছোটবেলা পড়ে আপনার ভালো লেগেছিল,বড় হয়েও যদি সে গল্প আপনার একইরকম ভালো লাগে তাহলেই সেটা প্রকৃত শিশুতোষ গল্প।শিব্রাম, সত্যজিতের গল্প যারা ছোটবেলা পড়েছেন তারা বিষয়টা সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন।
তাই আসুন যারা কিছু লিখতে চাচ্ছি,গল্প উপন্যাস বা অন্যকিছু তারা শিশুকিশোরদের জন্যও কিছু লিখতে চেষ্টা করি এবং এ ব্যাপারে সামান্য হলেও আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই। সময়ের সাথে সাথে ভাষার একটা দেয়াল তৈরি হয় ছোটদের জন্য লেখার সময় সেটা খুব মাথায় রাখতে হয়,তাই যারা লিখবেন চেষ্টা করুন এ যুগীয় লেখা লিখবার,যাই লিখুন না কেন চেষ্টা করুন ভাষায় সা¤প্রতিক বৈশিষ্ট ফুটিয়ে তুলতে। ভালো শিশুতোষ বিদেশী গল্পের অনুবাদ করতে পারেন,কিন্তু বিদেশী গল্পের দয়া করে দেশীকরণ করার চেষ্টা করবেন না।
নিসন্দেহে শিশুতোষ ভালো কিছু লেখা অত্যন্ত কঠিন,তাতে চমৎকার ভাষা সৌষ্ঠবের পাশাপাশি সুগঠিত প্লট থাকতে হয়,তবু আসুন আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করি ,বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যকে আমরা আরেকটু গুরুত্ব দিই।
ছোটদের সা.ইনে ছোটদের লেখার গ্রুপে যোগ দিই, অন্তত প্রকাশ করি আমাদের দেশের শিশুসাহিত্য নিয়ে আমরা ভাবছি।

সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০০৯ রাত ৮:০০
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×