অ্যামব্রুস বিয়ার্স
টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য দশজন বিখ্যাত নিখোঁজ মানুষের মধ্যে অ্যামব্রুস বিয়ার্স একজন । অনলাইনে শব্দের অর্থ খুঁজতে গিয়ে অনেকেকই হয়ত ১৯১৩ সালের দিকে চিরতরে নিখোঁজ হওয়া এই বিখ্যাত সাংবাদিকের দেয়া শব্দের রম্য সংজ্ঞায়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে, মূলত তার ১৯১১ সালে প্রকাশিত The Devil's Dictionary তে ব্যবহৃত অসংখ্য Satiric সংজ্ঞাই এখন শত শত ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তীব্র ব্যাঙ্গাত্মক উপস্থাপনার কারনে তার এই অভিধানের ডেফিনেশনগুলো যথেষ্ট জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহৃত, কার্ড, ম্যাগাজিন ,ফানি সাইটগুলো এমনকি টিশার্টের বুকেও এসব সংজ্ঞা উঠে আসে অহরহ।
যেমন, এ অভিধানে architect শব্দের অর্থ হল one who drafts a plan of your house, and plans a draft of your money
এই সংজ্ঞা দেখা যায় ডিকশনারীর সাইট থেকে শুরু করে স্থাপত্য নিয়ে তৈরি করা সাইটেও কোটেশন হিসেবে দেখতে পাওয়া যায়।
আমি প্রথম যখন এই ডেভিল'স ডিকশনারীর খোঁজ পাই এবং গোগ্রাসে এসব শব্দ পান করছিলাম,তখন একবার হঠাৎ মনে হল বইটা অনুবাদ করা শুরু করলে কেমন হয়? কিন্তু বুঝলাম খুব একটা সুবিধে হবে না, কারন এই ধরনের কাজে ভাষান্তর করলে তা মজার হওয়া দূরে থাক, রীতিমত বিরক্তিকর হয়ে দাঁড়াবে সে সন্দেহ হল, অন্তত আমার মত কুঅনুবাদকের পক্ষ থেকে এর বেশি সম্ভবপর হয়ে উঠবে না।
বাংলাভাষায় এ ধরনের কোন অভিধান আছে কিনা সেটা জানার চেষ্টা করলাম, কিন্তু বইয়ের দোকানগুলিতে খোঁজাখুঁজি করেও এমন কিছু পেলাম না । পরে আর কী, খাতা কলম নিয়ে বসে গেলাম, নিজেই দেখি চেষ্টা করে। কয়েকদিন লাগিয়ে কিছু শব্দ লিখলাম। বন্ধুদের দেখাতেই তারাও বিমর্ষ মুখে উৎসাহ দিল ( অন্তত আমার কাছে তা উৎসাহই মনে হল
পরে জানতে পারলাম এ ধরনের অভিধান নানা ভাষায় আরো আছে, তার মধ্যে অনেক বিখ্যাত একটি হল Dictionary of Received Ideas বা Dictionary of Accepted Ideas, মূল বই ফরাসী ভাষার, লেখক বিখ্যাত ঔপন্যাসিক Gustave Flaubert
গুস্তাফ ফ্লোবেয়ার
প্রথমে আমার অভিধানের নাম ছিল অনুসন্ধিৎসুর অভিধান, এই নামেই রসআলোতে কয়েকটি পর্ব ছাপা হয়েছে, পরে দেখলাম এতসব জ্ঞানীগুনি মানুষ যে কাজ করেছেন সেই ধরনের কাজে আমার মত গোমূর্খ হাত দিয়েছে, সেটা নিতান্তই বোকামী নয়ত দু:সাহস, তাছাড়া অ্যামব্রুস বা গুস্তাফের লেখায় যেরকম গাম্ভীর্য ছিল তা আমারটায় নেই,রীতিমত খেলো কথায় ভরপুর,তাই সিন্ধান্ত নিলাম অভিধানের নামটা চেঞ্জ করে দিই, তাতে যদি কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত হয়, নাম রাখলাম ''অর্বাচীনের অভিধান'' সোজা বাংলায় অপরিপক্ব বুদ্ধিসম্পন্ন লোকের অভিধান
যাইহোক, অভিধানটা ব্লগে শেয়ার করলাম, আজকের রস+আলোতে অভিধানের ''খ'' বর্ণের শব্দগুলোর পর্বটি ছিল। সাথে আগের পর্বের ''ক'' এর শব্দগুলো্ও দিলাম। পরে কোন একসময় স্বরবর্ণগুলোও শেয়ার করার ইচ্ছা রইল।
ক
কান-
যা অনুপস্থিত থাকলে চোখে সমস্যা হলে আমাদের কনট্যাক্ট লেন্স পড়তে হত।
কোপানল-
কোপ দিয়ে যে অনল বা অগ্নি তৈরি হয়, যেমন - দেয়াশলাই ব্যবহার করে রান্নার জন্য আমরা কোপানল তৈরি করি।
কোন্দল-
দলাদলির মাধ্যমে সৃষ্ট ঝামেলা। ঝামেলার দায়ভার একদল অপর দলের উপর দিয়ে থাকে।তাই স্বভাবতই প্রশ্ন থেকে যায় ঝামেলার জন্য দায়ী ‘কোন দল?’এ প্রশ্নের সমাধান হয় না বলে এ ঝামেলার এইরকম নামকরন ।
কাক -
সর্বজনীন ভ্রাতুষ্পুত্র
কৈফিয়ত-
টাকা পয়সার হিসাবের জবাবদিহিতা থেকে উৎপত্তি হয়েছে । (যদিও এখন সব ধরনের জবাবদিহিতায় ব্যবহৃত হয়) স্কুল কলেজের নানা ফি এর কথা বলে টাকা মারিং করণ প্রতিরোধে অভিভাবক মহোদয় যখন জিজ্ঞাসু হন ‘কৈ কৈ এত ফি লাগসে?’- সেখান থেকেই বাক্যের কৈ ও ফি যোগে অত্যাধুনিক ব্যাকরণ মতে এত থেকে য়ত হয়ে (কৈ+ফি+এত/য়ত) শব্দের উৎপত্তি।
কেদারা-
ইংরেজী চেয়ারের কঠিন-ব্যাঁকা (সহজ সরলের বিপরীত শব্দ) বাংলা প্রতিশব্দ। কে ও দাঁড়া দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘কে দাঁড়া ’ শব্দদ্বয়ে আদেশমূলক ও অবিনীত ভাব আছে এবং বসবার জিনিসে দাঁড়ানোর নির্দেশ আছে- এইসব নানা কথা চিন্তা করে বাঙালি মাত্রই এই প্রতিশব্দ ব্যবহার না করে চেয়ারই ব্যবহার করে।
কেঁচো-
সাপুড়েরা সাপ ধরবার জন্য প্রায়ই যাদের খুঁড়তে বের হয়
কেউটে- সর্প বিশেষ যাদের কামড়ে কেউ বেঁচে থাকে না বা টেকে না। ‘কেউ টেকে না’ এই বৈশিষ্টের জন্য প্রথমে এ সর্পের নাম ছিল ‘কেউটেকেনা সাপ’। কিন্তু সরকার বণ্যপ্রাণী কেনা ও বেচা নিষেধ করায় কেউটেকেনা নামের ‘কেনা’ অংশ বাদ দিয়ে শুধু কেউটে নামই স্থির হয়।
কৃপণ- যে পণ (প্রতিজ্ঞা) করে কাউকে কখনো পণ (যৌতুক) দেবে না। দেশে কৃপণ বাড়ানোর জন্য গনসচেতনতা দরকার।
কোষাগার-
কোষ বা সেলদের আগার, যেমন প্রাণীদেহ।
ক্লোন- ক্লোন..ক্লোন..ক্লোন..ক্লোন.. ( ধুর, শব্দেরও হয় জানতাম না তো !)
কুশীলব-
যে অভিনয়শিল্পী বিটিভির বাংলা নাটকের প্রায় প্রত্যেকটিতে অভিনয় করেছেন, সমস্যা হল এই মহান শিল্পী খুবই আত্মপ্রচারবিমুখ, তাই প্রায় কেউই তাকে চেনে না ।
কুয়াশা -
মন্দ আশা। বাক্যগঠন- সমীরের হাবভাব ভালো মনে হচ্ছে না,ওর মনে কোন কুয়াশা জমে নি তো !
কলঙ্ক-
অঙ্ক করার কল বা মেশিন, যেমন ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার ইত্যাদি
কপিকল-
কপি করার কল। যেমন-ফটোকপি মেশিন, স্ক্যানার ইত্যাদি
কোণঠাসা-
অস্বস্তিকর জ্যামিতিক পরিস্থিতি যেখানে সুক্ষ কোন , সমকোন, স্থুল কোন ইত্যাকার নানা ধরনের কোন দিয়ে তৈরি গাণিতিক সমস্যা থাকে।
বাক্য গঠন- আজকের ম্যাথ প্রশ্ন এত কঠিন ছিল না, একেবারে কোনঠাসা হয়ে পড়েছি।
কর্মফল -
ক্লান্তি, অবসন্নতা ইত্যাদি। যে কোন কর্ম সাধনের পর পরই এসব পাওয়া যায়।
কারবারি-
গাড়ি(কার) ও বাড়ি হয় যার মাধ্যমে। চোরাকারবারি করে বলেই তো ওর আজ গাড়িবাড়ি হয়েছে।
কলরব-
কলের রব ,যেমন কল দিয়ে পানি পড়ার শব্দ। বাথরুমের কলটা কেউ বন্ধ করে দাও,খুব কলরব হচ্ছে।
প্রকাশিত: রস+আলো ২৮ সেপ্টেম্বর
( ক এর আরেকটা পর্ব ছিল, এই মুহুর্তে সেটা খুঁজে পাচ্ছি না। )
খ
খাদ্য
- ( খাদ+য) অর্থাৎ যাতে খাদ আছে। বিশুদ্ধ বা ভেজালবিহীন খাদ্যের অনুসন্ধান তাই কেবল বৃথাই নয়, যা বিশুদ্ধ তা বাংলাভাষা অনুযায়ী খাদ্যই না।
খামখেয়াল
-ডাকবিভাগের খামের মত যাদের খেয়াল। এ শব্দের মাধ্যমে আমাদের প্রাচীন ভাষাবিদরা কতটা ভবিষ্যতদ্রষ্টা ছিলেন তা আমরা টের পাই, বঙ্গদেশে ডাকবিভাগ চালুর পর থেকে প্রেরিত খাম খুব কমই সঠিক জায়গায় সঠিক সময়ে পৌঁছেছে। চিঠির খামের এ ভবিষ্যত আচরণ অনুমান করেই উদ্ভট ও খাপছাড়া আচরণ বোঝাতে এ শব্দটি প্রচলন করা হয়।
খোলস
-(খোলা+লস) অর্থাৎ যা খোলা হলেই লস্ হয় । বাক্যগঠন- ভাল মানুষের খোলস পড়ে আর কতদিন , যেদিন খুলে পড়বে তখন বুঝবি ঠ্যালা!
খতিয়ান
- ব্যবসার বা যেকোন কিছুর হিসাব বই হিসেবে বর্তমানে ব্যবহৃত। শব্দটির উৎপত্তির সময় বাঙালিদের ব্যবসায় খুব মন্দা যাচ্ছিল,ব্যবসায়ীরা তাই প্রতিদিনকার ব্যবসায়ের হিসাব চাওয়ার বদলে কর্মচারীদের কাছে শুধু কত ক্ষতি হল সেটা আনতে আদেশ করত। এই ক্ষতির হিসাব আনতে আনতে একসময় সেই হিসাব বইয়েরই নাম হয়ে গেল ক্ষতিআন (খতিয়ান)
খালাসি
- খাল আর sea মিলে হয় ( সন্ধিযোগে) খালাsea। অর্থাৎ খাল থেকে শুরু করে সাগর বা sea পর্যন্ত সব জলযানে যাদের দেখা যায় তারাই খালাসি।
খতম
- যার শুরু আছে, তার শেষ আছে। এটা মাথায় রেখে প্রাচীন ভাষাবিদরা জগতের সবকিছুকে দুই ভাগে ভাগ করে ব্যঞ্জনবর্ণের ক্রমানুসারে নামকরণ করে,যথাক্রমে শুরু বা ক তম পর্যায় এবং শেষ বা খ তম পর্যায়। কালের বিবর্তনে কতম শব্দটি লাপাত্তা হয়ে গেলেও খতম আজও কোন কিছুর শেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়।
খামাখা
-জ্ঞানী মানুষদের মতে খাওয়া দাওয়ার পেছনে সময় দেয়াটা সময়ের একদম বাজে খর্চা।শোনা যায়, ভাষাবিদরাও খুব জ্ঞানী , তাই তারা বাঙালি হয়েও ভাত খাওয়া এবং সেটাকে নানা তরি-তরকারির সাথে মাখানোকেও সময়ের বিরাট অপচয় ভাবত। তাই অনর্থক বা বাজে কিছু বোঝাতে তখন থেকেই তারা খাওয়া ও মাখানোকে বা খামাখা-কে প্রচলন করেন।
খাবলা
-কাউকে খেতে বললে সে একগ্রাসে কতটুকু গ্রহন করতে পারে সেটা জানা দরকার হতে পারে। সেটা মাপার জন্য এ শব্দের উদ্ভাবকরা কাউকে খেতে নির্দেশ দিয়ে তার পরিমান হিসেব করে রাখে। খেতে নির্দেশ দেয়া বা খা বলা মাত্রই এ পরিমান নির্ধারিত হয় বলে এ পরিমানের নাম হয় খাবলা। যেমন- এক খাবলা দই।
খামার
- যে ব্যবসার উপর ভাষাবিদদের অভিশাপ আছে( খা মার), যুগে যুগে তাই এ ব্যবসায় বাঙালিরা ধরা খেয়ে আসছে। যেমন-অ্যানথ্র্যাক্স এর কারনে গরুর খামার,সোয়াইন ফ্লু হেতু মুরগির খামার।
খয়রাত- পূর্বে ভিক্ষুকরা শুধুমাত্র দিনে ভিক্ষা করতো আর রাতে সে ভিক্ষার টাকাপয়সা নানা কাজে খরচ করে উড়িয়ে দিত। প্রাপ্ত ভিক্ষা রাতেই ক্ষয় হয়ে যেত বলে ভিক্ষা অর্থে একসময় খয়রাত প্রচলিত হয়।
প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০১০ রস+আলো
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই অক্টোবর, ২০১০ রাত ৩:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



