
ফ্ল্যাশব্যাকঃ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে একটি স্থানীয় দৈনিকের প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করতাম। তখন সাংবাদিকতার প্রতি ভালোই আগ্রহ ছিল। তবে কেন জানি সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ ধরে রাখতে পারলামনা। তবে পুরনো অভ্যাস মত অফিস শেষে প্রায় সময় বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে যায়। তাই সাংবাদিকতা ছাড়লেও এটার সাথে ভালোই যোগাযোগ আছে। আজকে এই মহান পেশাকে ক্তিপয় সাংবাদিক এবং পত্রিকা মারফত কলংকিত করা নিয়ে একটা লেখা লিখবো ভাবছি।
আপনাদের মনে আছে কিনা জানিনা এই সরকারের আমলে একবার চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি সদ্য প্রয়াত প্রফেসর ড. আবু ইউসুফ আলম লাঞ্ছিত হন এবং তার গাড়ি স্যারের গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। সে ঘটনার সময় আমি সেখানে ছিলাম পেশাগত কারনে। সেদিন একমাত্র প্রথম আলো ছাড়া আর সব জাতীয় স্থানীয় পত্রিকা প্রায় একই খবর ছাপে। “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের হামলায় ২৫ কক্ষ তছনছ, উপাচার্যের গাড়ি ভাঙচুর” শীর্ষক প্রথম আলোর ১৬ মে রিপোর্টে বলা হয়, “রাতে উপাচার্য পরিস্থিতি শান্ত করতে শাহ আমানত হলে গেলে সেখানে শিবিরের কর্মীরা উপাচার্যের গাড়ি ভাঙচুর করে এবং তাকে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা চালায়।" এছাড়াও ১৭ মে “ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের ন্যক্কারজনক হামলা” শিরোনামে সম্পাদকীয়তে প্রথম আলো লিখেছে, “তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররা উপাচার্যের গাড়ি ভেঙে দিয়েছে, তাঁকে সশরীরে লাঞ্ছিত করারও চেষ্টা করেছে। শিবিরকর্মীদের এ তৎপরতা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও নিন্দনীয়।“
আর আপনারা অন্যান্য সব পত্রিকার ২০০৯ সালের মে মাসের ১৬ তারিখের পত্রিকা দেখলে দেখবেন ইত্তেফাক, সমকাল, যুগান্তর, আমার দেশ, ইনকিলাব, আমাদের সময়, মানব জমিন, নয়া দিগন্ত, যায়যায় দিন সহ প্রায় সব পত্রিকার মতে, উপাচার্যকে লাঞ্চিত করন, তার গাড়ি ভাঙচুর ও আমার দেশের প্রতিনিধি রাশেদ খানকে লাঞ্ছিত করে ছাত্রলীগ। যা আমি নিজেও দেখেছি। যাক এই ঘটনা এখন অতীত।
২০১১ সালঃ
কিন্তু আজকে আবারো প্রথম আলো সহ বিভিন্ন পত্রিকা একই কান্ড ঘটিয়েছে। আজ প্রথম আলোর দু দুটি খবর সারাদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে তাদের ভয়াবহ "হলুদ" সাংবাদিকতা দেখে। আমি যেহেতু চট্টগ্রামে থাকি সেহেতু সেখানের ব্যাপার আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। প্রথম আলোর আজকে দুটি মোটা দাগের হলুদ সাংবাদিকতার একটি হচ্ছে গতকালের আলোচিত ঘটনা বিএনপি দলীয় চিপ হুইপ কে পুলিশের আক্রমন নিয়ে। ছবিতে স্পস্ট দেখা যাচ্চে ফারুক হাতের মোবাইল ছুড়ে মারার ভঙ্গি করছে কিন্তু প্রথম আলো নিচে লেখেচে তিনি নাকি ডিল ছুড়ছে। এটা নিয়ে অনেক লেখা আজকে ব্লগে এসেছে দেখলাম। তাই এটা নিয়ে আমি বেশী কিছু না লেখে বরং দৃতীয় ঘটনায় চলে যায়।
লাল মার্কের ভিতর কি দেখছেন?ঢিল নাকি মোবাইল?
কিভাবে সংবাদপত্র অফিসে "হলুদ" উৎপাদনঃ
প্রতিদিনকার অভ্যাসমত বিকেলে একটি সদ্য প্রকাশিত পত্রিকা অফিসে আড্ডা দিতে গেলাম। তখন আমার আমার পুর্ব পরিচিত এক বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলছিলাম। এসময় পাশে বসা আরেক সিনিয়র সাংবাদিক একটা রিপোর্ট করছিলেন সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তিন সন্ত্রাসীকে একে-৪৭ রাইফেলসহ পাঁচটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা নিয়ে। উদ্ধার হওয়া একে-৪৭ রাইফেলের ২৭ রাউন্ড গুলির মধ্যে অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির গুলিও রয়েছে। তবে মজার ব্যাপার হল যিনি রিপোর্টটি করছেন তিনি সেই সংবাদ কাভার করতে পুলিশ কমিশনার এর কার্যালয়ে যাননি। মনের মাধুরী মিশিয়ে তিনি লিখছিলেন যা পুরও ঘটনার বিপরীত। আর উনি সংবাদ সম্মেলন কাভার পাঠিয়েছিলেন এক জুনিয়র সাংবাদিক কে। সে সেখান থেকে এসে যে কাগজটি ঐ প্রতিবেদককে দিয়েছেন সেটা ভুলবশত কিনা কে জানে টেবিলে পড়া ছিল। আমি হাতে নিয়ে দেখলাম সেখানে যা লিখা ছিল তা সুন্দর করে সাজিয়ে লিখলে হবে, সাংবাদিকদের কাছে আটক তিন সন্ত্রাসী দাবী করেন, আমরা শিবির নই, শিবিরকে আমরা ঘৃণা করি, আমরা যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। এসব অস্ত্র ফেনীর নব নির্বাচিত পৌর মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা নিজাম হাজারী অস্ত্রগুলো তাদের কাছে রাখতে দিয়েছিল। তারা পুলিশকে এও বলেছে, ফেনী আওয়ামী লীগের এক সময়ের গডফাদার জয়নাল হাজারীর সন্ত্রাসীদের ঘায়েল করতে নিজাম হাজারী অস্ত্রগুলো ব্যবহার করতো। এবং সত্য হল তারা যা বলেছে সেটাই। হোন্ডা নিয়ে আখাউড়ার ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় ফেনসিডিল খেতে গিয়েই তারা পুলিশের কাছে ধরা পড়ে।
মুল ঘটনাঃ
আমি একজন প্রফেশনাল ক্রাইম রিপোর্টার থেকে ঘটনার বিস্তারিত যেনেই লেখাটি লিখতে বসেছিলাম। তিনি জানিয়েছেন এরা সাবেক শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ এর নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজি করতো যার কারনে এদেরকে শিবির ক্যাডার বলে আজকে বিভিন্ন পত্রিকায় নিউজ করে দেয়া হয়েছে। এরা মুলত চাঁদাবাজির পাশাপাশি এলাকায় মাদক ব্যবসাও চালাতো। তারা রাজনৈতিক ভাবে নিজেদের যুব্লিগ বলে এলকায় পরিচিত। আর এদের পিছনে রয়েছেন চট্টগ্রামের প্রভাবশালী উঠতি এক আওয়ামীলীগ নেতা। যার কারনে এ বছর ১৬ মার্চ বায়েজিদ এলাকায় নির্মাণাধীন একটি বাড়ির মালিকের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করতে গিয়ে সরোয়ার ও ম্যাক্সনের তিন সহযোগী আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হওয়া স্বত্বেও জামিন পেয়ে যান। আর এই জামিন করিয়ে নেন ঐ প্রভাবশালী নেতা। এই নেতার এবং তার অনুসারীরা গতকালও এদের জামিন করাতে কোর্ট এলাকায় তৎপরতা দেখায়। আদালতে এদের হাজির করা হলে তাদের সহযোগী প্রায় ৫০ যুবক আদালত এলাকায় এদের জামিনসহ নানা বিষয়ে তৎপর থাকে।
কেন এই গ্রেফতারঃ আজকে আমি অনুসন্ধান করে আরো জানতে পারি মূলত জুট আলম, তৌফিক এবং আলমগীর নামের যুবলীগের একটি গ্রুপের সাথে গ্রেফতারকৃদের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। বিরোধের মুল কারন হল জায়গা জমি দখল এবং মাদক ব্যবসা। আর ঐ গ্রুপটিকেও নিয়ন্ত্রন করেন আরেক প্রভাবশালী আওয়ামীলীগ নেতা। কিন্তু গ্রেফতারকৃত দের দাপটে তারা এলাকায় চাঁদাবাজি এবং অন্যান্য ব্যবসায় টিকতে পারছিলনা। আর তাই পথের কাটা দূর করতে এই গ্রুপের একটা অংশকে কাজে লাগিয়ে এদেরকে দরিয়ে দেয় জুট আলম, তৌফিক এবং আলমগীর গ্রুপ। আর সাজ্জাদ হল ওরা যেখান থেকে গ্রেফতার হয়েছিল সে এলাকার সাবেক সম্রাট যে কিনা আজ থেকে প্রায় ছয় বছর আগে দুবাই পারি জমিয়েছে।
আর এভাবেই আমাদের পত্রিকাগুলো যুবলীগকে বানিয়ে দেয় শিবির, মোবাইল ছুড়ে মারার ছবির নিচে ক্যাপশন দেয় ডিল ছুঁড়ে মারার, ভিসির গাড়িতে ছাত্রলীগ আগুন দেয়াকে চালিয়ে দেয় শিবিরের নামে, এক সম্পাদক আরেক সম্পাদককে জঙ্গি আর বোমাবাজ বানাতে গিয়ে হলুদ সাংবাদিকতার দায় মাথা নিয়ে চাকুরি ছাড়েন!!!
লেখার শেষে একসময়ে আমার আইডল মতই ভাইয়ের একটা কথা মনে পড়ছে। যতদুর মনে পড়ে, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ভোরের কাগজ থেকে পদত্যাগ করেন ১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি সময়। পদত্যাগের কারন হিসেবে তখন তিনি বিবিসি কে বলেছিলেন,পত্রিকাটি যেহেতু সরকারী দলের একজন গুরুত্বপূর্ন মন্ত্রীর (ভোরের কাগজের মালিক সাবের হোসেন চৌধুরী ৯৬ আলীগ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী ছিলেন) সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত, তাই নিরপেক্ষ ভাবে পত্রিকা চালানো সম্ভব নয় বলে তিনি পদত্যাগ করছেন। এরপর প্রথম আলো প্রকাশের আগে বিজ্ঞাপন হিসেবে তাদের পত্রিকা প্রকাশনা টিমের পক্ষ থেকে কার্টুনিষ্ট শিশির ভট্টাচার্যের একটি কার্টুন প্রকাশ করা হত বিভিন্ন দৈনিকে। এতে দেখা যায়, একজন পাঠক কোন ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে দুইটি পত্রিকা পাশাপাশি রেখে প্রকৃত সত্য উদ্ধারে গলদঘর্ম। এই পেরেশানী থেকে পাঠককে উদ্ধারের স্বার্থেই নাকি মতি-মাহফুজ জুটি প্রকাশ করেছেন নিরপেক্ষ দৈনিক প্রথম আলো। দূর্ভাগ্য বশত শিশিরের সেই কার্টুনের মতো এখনও আমাদের প্রকৃত সত্যের জন্য দেখতে হয় অনেক পত্রিকা আর তার মধ্যেই বেরিয়ে আসে প্রথম আলোর নিরপেক্ষতার নামে হলুদ সাংবাদিকতার আসল রূপ। আর হয়তো এসব নোংরামিগুলো খুব কাছ থেকে দেখেই কিনা এই জগতে আমার পথচলা বেশীদিন স্থায়ী হয়নি।
যা কিছু কালো , তার সাথেই প্রথম আলো!!!!
কোনভাবেই মৌলবাদী সংগঠন শিবিরকে ডিপেন্ড করে লেখাটি পোস্ট করা হয়নি
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুলাই, ২০১১ রাত ১০:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


