আমেরিকার পাবলিক লাইব্রেরিগুলো থেকে যে বইটি সবচেয়ে বেশি চুরি হয়, তার নাম 'গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস'। সারা বিশ্বে কপিরাইট যেকোনো বইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত বইটিই হলো গিনেস বুক। অদ্ভুত এই সংকলন বছরে বিক্রি হয় ৩০ লাখ কপি। তথ্যভিত্তিক এই সংকলনে থাকে মানুষ ও প্রাণীর গড়া নানা রকম রেকর্ড। বেশির ভাগই বিচিত্র। ২৮টি ভাষায় লিখিত এবং ভিডিও ফরম্যাটে গিনেস বুক প্রকাশিত হয় ব্রিটেন থেকে।
বন্ধুদের সঙ্গে শিকার পার্টিতে গেছেন স্যার হিউ বিভার। আয়ারল্যান্ডের একটি কাউন্টিতে বসেছে তাঁদের এই পার্টি। নানা রকম আলোচনা হলো বন্ধুমহলে। তবে কথা বলতে বলতেই একসময় স্যার হিউ বন্ধুদের সঙ্গে তর্কযুদ্ধে নেমে গেলেন। যুদ্ধের বিষয় ইউরোপের সেরা গেম বার্ড কোনটি_গোল্ডেন প্লোভার, নাকি গ্রস। কারো মতামতই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না ইংল্যান্ডের মদ বানানোর প্রতিষ্ঠান আর্থার গিনেস, সন অ্যান্ড কম্পানির স্বত্বাধিকারী বিভার। কোনো সমাধানে আসতে না পারায় অবশেষে বই-পুস্তকের খোঁজে নামলেন তিনি। তবে কোনো বইতেই তথ্যটি পেলেন না। ১৯৫১ সালের ৪ মে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনাই হিউ বিভারের মাথায় আইডিয়াটির জন্ম দিল_'এমন একটি বই প্রকাশ করলে কেমন হয়, যেখানে সংকলিত হবে শুধুই নানা বিষয়ের রেকর্ড।'
হাঁটি হাঁটি পা পা
১০৭ ফ্লিট স্ট্রিট। লন্ডনের এ অফিস থেকেই ১৯৫৫ সালের ২৭ আগস্ট প্রকাশিত হয় গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের প্রথম সংখ্যা। পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ১৯৮। টানা ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত যৌথভাবে এটি সম্পাদনা করেন যমজ ভাই রস ও নোরিশ ম্যাকওয়েরটার। প্রকাশের দিনই বইটি কেনার জন্য হামলে পড়ে উৎসাহী পাঠকরা। ত্রমবর্ধমান চাহিদায় ১৯৭৫ সালে গিনেস বুক প্রকাশিত হয় আমেরিকা থেকে। বিক্রির হারও অবিশ্বাস্য_৭০ হাজার কপি! ওই বছর বড়দিন উপলক্ষে কেনাকাটার সঙ্গে এ বইটিও উপহার ও কালেকশনের জন্য ছিল সাধারণ মানুষের প্রথম পছন্দ। এই অসামান্য সাফল্যে মুগ্ধ হয়ে প্রকাশক হিউ বিভার মন্তব্য করেন, 'অর্থ উপার্জনের জন্য প্রকাশিত হয় না গিনেস বুক, বরং এর প্রধান লক্ষ্য রেকর্ডকে সারা বিশ্বের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া।' এই দারুণ জনপ্রিয়তার কারণে সংকলনটি ঘিরে শুরু হয় মাতামাতি। তৈরি হয় অনেকগুলো টিভি অনুষ্ঠানও।
এখন যেমন
শুরুর মালিকানা বদলে গেছে কয়েকবার। স্যার হিউ বিভারের হাত থেকে গিনেসের মালিকানা ছুটে গেছে সেই কবেই। এখন গিনেস বুকের মালিকানা জিম পেটিসন গ্রুপের হাতে। রিপ্লে এন্টারটেইনমেন্ট গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড নামে গ্রুপের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গিনেসের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তারাই এখান থেকে প্রকাশ করছে নানা রকম রেকর্ড। একদল উদ্যমী কর্মী কাজ করছেন প্রতিষ্ঠানটিতে, যাঁদের দায়িত্ব কোথাও কোনো রেকর্ডের খোঁজ পেলে সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে সেখানে হাজির হওয়া এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বিশ্বরেকর্ড হিসেবে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া। দারুণ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করেন তাঁরা। তাই কোনো রেকর্ড নিয়েই বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে না গিনেস কর্তৃপক্ষ।
নাম লেখাতে চান যদি
বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে গিনেস বুকে নাম লেখাতে পারেন আপনিও। কোনো প্রতিযোগী যদি আগের কোনো রেকর্ড ভেঙে ফেলেন কিংবা নতুন কোনো রেকর্ড গড়েন, তাহলে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন গিনেস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। অথবা চিঠি লিখতে পারেন এই ঠিকানায় : গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস লিমিটেড, থার্ড ফ্লোর, ১৮৪-১৯২ ডায়মন্ড স্ট্রিট, লন্ডন। চিঠির সঙ্গে অবশ্যই
জমা দিতে হবে নিজের গড়া রেকর্ড সম্পর্কে ফটোগ্রাফ ও ভিডিও। পাশাপাশি উল্লেখ করতে হবে প্রয়োজনীয় তথ্যাবলিও। এত বিপুলসংখ্যক আবেদনপত্র ঘেঁটে আগ্রহী ব্যক্তির কাছে সিদ্ধান্ত জানাতে গিনেস কর্তৃপক্ষ সময় নেয় চার থেকে ছয় সপ্তাহ। তবে কর্তৃপক্ষ কখনোই নিজ উদ্যোগে কোনো প্রতিযোগীকে বেছে নেয় না। আবেদন করা রেকর্ডগুলো থেকেই তারা বেছে নেয় প্রতিযোগী বা বিষয়বস্তু।
করতে মানা
জীবনকে আশঙ্কার মুখে ঠেলে দেয় এমন (যেমন_তলোয়ারবাজি, ব্যস্ত রাস্তায় দ্রুতগতিতে সাইকেল চালানো ইত্যাদি) ভয়ংকর রেকর্ড গড়তে উৎসাহ দেয় না কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া যেসব বিষয়ের রেকর্ড করতে গিয়ে বিতর্ক হতে পারে, সেগুলোও (যেমন_চুলের জটা) গ্রহণ করে না গিনেস বুক। এ ছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা আসতে পারে এমন রেকর্ডও নেওয়া হয় না। যদিও ২০০৮ সাল থেকে বিয়ার পান বিষয়ে বিধিনিষেধ ওঠানো হয়। তা ছাড়া বড় কোনো খাবার খাওয়ার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গেলে সম্পূর্ণ খাবার খেতে হবে_এমন শর্ত জুড়ে দেয় গিনেস, যাতে খাবার নষ্ট না হয়।
রেকর্ডপাগল তিন লাখ
প্রতিবছরের মতো এবারও ১৭ নভেম্বর পালন করা হয় গিনেস রেকর্ড ডে। বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত এই উৎসবে অংশ নিয়েছেন প্রায় তিন লাখ মানুষ। ধর্মীয় উৎসব ছাড়া কোনো বিশেষ উৎসবে অংশ নেওয়ার হিসাবে এটাও ছিল বিশ্বরেকর্ড। এবারও আগ্রহী ব্যক্তিরা রেকর্ড গড়ার নেশায় ছিলেন মাতোয়ারা। ফলে যেসব রেকর্ডের জন্ম হয়েছে এবার, সেগুলোর অন্যতম হলো_
* লন্ডনের ক্যানারি ওয়ার্ফে একটি বিশাল উজ্জ্বল গোলাপি রঙের অন্তর্বাস একসঙ্গে পরেছিলেন ৫৭ জন মানুষ। তাঁরা গড়েছেন একটি অন্তর্বাস একসঙ্গে সবচেয়ে বেশি মানুষের পরার রেকর্ড। এখানেই আয়োজন করা হয় ক্ষুদ্রতম কার এবং দ্রুততম স্কুটারের মধ্যে রেসের।
* একসঙ্গে এক হাজার ৫৪১ জন গণনাচে অংশ নিয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছেন নেদারল্যান্ডসে।
* আমেরিকার ফ্লোরিডায় সবচেয়ে বেশি বয়সী যোগ ব্যায়ামের শিক্ষক হয়েছেন ৯১ বছর বয়সী বার্নিস মেরি বেটস।
* ৩৩৪ জনের অংশগ্রহণে ইংল্যান্ডের অ্যাশেজে আয়াজন করা হয়েছিল দুধের সর দিয়ে পরিবেশন করা বিশ্বের সবচেয়ে বড় চা চক্রের।
সূত্র

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



