আমি দাঁড়িয়ে আছি একটা চৌরাস্তার মাঝখানে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। ভাবছি কোন দিকে যাবো- পূর্ব নাকি পশ্চিমে, উত্তরে নাকি দক্ষিণে ? রাতের বেলা। চাঁদ উঠেছে। আজকে বোধয় পূর্ণিমা। সবশেষে ঠিক করলাম পূর্ব দিকেই হাঁটা শুরু করবো। কারণ, চাঁদটা পূর্ব দিকে উঠেছে। চাঁদ দেখতে দেখতে হাঁটবো। মনে মনে একটা কবিতা বানানোর চেষ্টা করছি-
মাথার উপর কালচে আকাশের ছাদ,
পূর্বে অপূর্ব চাঁদ ।
কবিতা কি হলো ? কি জানি ! আজ-কালকার কবিতাগুলো কেমন যেন এলোমেলো। কবিতাকে ঠিক কবিতা বলে মনে হয় না। ছন্দহীন, গন্ধহীন এবং সবশেষে অর্থহীন । আচ্ছা, ছন্দহীন কথাটা ঠিক আছে, শেষের অর্থহীন কথাটাও ঠিক আছে, গিট্টুটা লাগছে মাঝখানে- মানে, গন্ধহীন বললাম কেন ? কবিতার আবার গন্ধ-টন্ধ থাকে নাকি ? কবিতার গন্ধ আছে কি নেই- এটা নিয়ে এখন আর ভাবতে ইচ্ছে করছে না। কারণ, আমি এখন কিছু একটার উৎকট গন্ধ পাচ্ছি। উৎকট গন্ধ ছড়ানোর উৎসটা খুঁজছি, আশপাশে তাকাচ্ছি কিন্তু গন্ধের উৎসটা চোখে পড়ছে না। ভাবলাম গন্ধটা অনুসরণ করে গেলে কেমন হয় ? গন্ধই দেখিয়ে দেবে তার উৎস। না, গন্ধ বেশিক্ষণ অনুসরণ করতে হলো না। সামনেই ডাস্টবিন। কয়েকটা কুকুর সেখানে যেন কী করছে। জনমানবশূন্য রাস্তা, আমি একা একা হাঁটছি। গন্ধটা এখন আর নাকে লাগছে না। ডাস্টবিন ছেড়ে অনেক দূর চলে এসেছি বোধয়। পকেটের মোবাইলটা বেজে উঠলো। অচেনা নম্বর, ফোনটা রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে সুরেলা কন্ঠে কে যেন হ্যালো বললো। কন্ঠ শুনে প্রথমে চমকে উঠেছিলাম। হুট করে মেয়ে মানুষের কন্ঠ শুনলেই কেন যেন আমি চমকে উঠি। আমার বোধয় এ ব্যাপারে চমকানোর রোগ আছে।
হ্যালো, কে বলছেন ?- আমি জিজ্ঞেস করলাম।
নাম জানাটা কি খুব দরকার ?
না, খুব দরকার না। নাম না জানা লোকের সাথে কথা বলতে আমার বরং ভালোই লাগে। একটা মানুষের সাথে কথা বলছি এবং সে মানুষটা আমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত, সব কথা বলা শেষে মানুষটা অপরিচিত থেকে গেলে আমার আরো বেশি ভালো লাগে। খুশিতে তিনটা লাফ দিতে ইচ্ছা করে।
অ্যাই, ফাইজলামি করবা না।
আচ্ছা, করবো না।
আমি ফারিয়া। চিনতে পারো নি ?
আমি নিজেকেই এখনো চিনি নি। মোবাইলে কন্ঠস্বর শুনেই তোমাকে চিনে ফেলবো ? এটা কীভাবে সম্ভব ?
দেখ, আমার সাথে ফিলোসফি কপচাবে না। ফিলোসফি আমার কাছে বাজে লাগে, একদম বাজে।
ঠিক আছে, আমি ফিলোসফি কপচাবো না। আচ্ছা, কপচানো কথার অর্থ কী ?
ওপাশে ফারিয়া নিশ্চুপ। মনে হয় রেগে যাচ্ছে। মানুষকে রাগাতে আমার ভালো লাগে। মেয়ে মানুষদের রাগাতে আমার একটু বেশি ভালো লাগে। আর এই ফারিয়া নামের মেয়েটিকে রাগাতে আমার আরো বেশি ভালো লাগে।
ও, কপচানো কথার অর্থ তুমি জানো না, সেটা তুমি আগে বলবে তো। আমি জিজ্ঞেস করতাম না।- আমি বললাম।
কি করছো তুমি ?- একটু রাগত স্বরে ফারিয়া জিজ্ঞেস করলো।
নাইট ওয়াক।
মানে ?
মানুষ মর্নিং ওয়াক করে। আমি নাইট ওয়াক করি। মাঝেমাঝে অবশ্য নুন ওয়াকেও বের হই।
আবার ফাইজলামি ?
ফাইজলামি কই করলাম ? আমি তো রাস্তা দিয়েই হাঁটছি। রাতের বেলা। তাই বলালাম নাইট ওয়াক।
ফারিয়া রাগ হয়ে ফোন রেখে দিল। আমার মিশন সাকসেসফুল হলো। প্রায় প্রতিদিনই এই মেয়েটা আমাকে ফোন দিবে এবং রাগ হয়ে একসময় ফোন রেখে দিবে। ফিলোসফি নাকি তার ভালো লাগে না, কিন্তু আমার ধারণা সে ফিলোসফি টাইপের কথা শোনার জন্যই আমাকে ফোন দেয়। প্রিয় পাঠক, একটা কবিতার লাইন মনে পড়ছে। কবিতাটা মনে হয় আমার নিজের। এর ছন্দ, গন্ধ, অর্থ সবই আছে বলে আমার ধারণা।
পৃথিবীটা বোঝা বড় দায়
কে জানে, কখন কে কী চায়!
নিজের ভিতরে এখন একটা রবীন্দ্র রবীন্দ্র অনুভূতি কাজ করছে। রবীন্দ্র নাথের অনুভূতি নিজের ভিতরে কাজ করলে তখন আমি তাকে রবীন্দ্র অনুভূতি বলি। রবীন্দ্র+অনুভূতি = রবীন্দ্রানুভূতি। বুঝলাম বাংলা ব্যাকরণেও আমার দক্ষতা বেশ ভালো। রাস্তা দিয়ে না হেঁটে বাংলা ব্যাকরণ বই লিখলেও একটা কাজ হতো। তাই তো বলি, আম্মা কেন আমাকে অকর্মার ঢেঁকি বলে ডাকে। কর্মহীন ঢেঁকিকে বলে অকর্মা ঢেঁকি, আর কর্মহীন মানুষের ঢেঁকিকে বলা হয়- অকর্মার ঢেঁকি । এই যেমন কোনো কাজ নেই দেখে এই অখাদ্য-কুখাদ্য টাইপের লেখাটা লিখে ফেললাম। প্রিয় পাঠক, সময় নষ্ট করে আমার এই উদ্ভট টাইপের লেখাটা পড়ার কোনো প্রয়োজন ছিল কি ?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



