মানুষ আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠজীব। আশরাফুল মাখলুকাত। প্রাণী জগতের মধ্যে সর্বগুণে গুণান্বিত মানুষ। কাজেই মানুষকে অবশ্যই তার জীবনের আসল উদ্দেশ্য জেনে নেয়া অপরিহার্য। যদি সে
অন্য সব বিষয়ে মহা পণ্ডিতও হয়ে যায়, আর তার আগমনের আসল উদ্দেশ্য জেনে না নেয় বা হেলায় ভূলে বসে, তাহলে লক্ষ্যচ্যুত তার এ জীবন অবশ্যই সফল হবে না।
মানব জীবনের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সঙ্গত কারণেই তিনটি বিষয় সামনে এসে যায়। যথাক্রমে মানুষ কি? মানব জীবন বলতে কি বোঝায়? মানব জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্যইবা কি?
মানুষ কি বা তার স্থান কোথায়?
মানবকুল আজ ভূগর্ভ থেকে শুরু করে সৌরজগত সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করে নিত্য-নতুন বস্তু আবিস্কার করে চলেছে। আবিস্কার করে চলেছে অচেনা-অজানা অনেক কিছুই। তবে অসংখ্য-অগণিত বিষয়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যদিও সে কল্যাণ জনক হাজারো বিষয় জানতে পেরেছে, চিনতে পেরেছে, আবিস্কার করতে পেরেছে, কিন্তু একটি কথা তিক্ত হলেও সত্য যে, নিজেকে নিয়ে গবেষণা করে স্বীয় সত্তাকে আজো চিনতে পারেনি, জানতে পারেনি যে, মানব সত্তা কি? কেন তার আগমন?
মোটকথা, সব বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করলেও সে নিজেকে জানেনি, চিনেনি। অবস্থা এমন যে, মনে করুন কোটিপতি বাবার একমাত্র সন্তান হত্যা মামলার আসামী হয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হল। এখন মাত্র হাইকোর্টে আপীল করার সময়টুকু বাকী রয়েছে, তাও মাত্র এক সপ্তাহ। তাকে হাইকোর্টে আপীল করার জন্য শহরে প্রেরণ করা হয়েছে। কিন্তু সে তার শহরে আসার আসল উদ্দেশ্য ভূলে গিয়ে শহরের সৌন্দর্য ও নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গোটা শহর ঘুরে বেড়াচ্ছে, বিভিন্ন স্থাপনা দেখে দেখে চমৎকৃত হচ্ছে, বিভিন্ন লোকের সাথে মত বিনিময় করছে।এভাবেই তার সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেল, আপীল করা হল না। বাড়ী ফিরে বলল: শহরের বিভিন্ন দৃশ্য দেখে আর বিভিন্ন লোকের সাথে মত বিনিময় করে সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, আপীল করা সম্ভব হয়নি।
উপরের লোকটির যে অবস্থা বর্তমান মানবজাতির অবস্থাও ঠিক তাই। মানবজাতি যে উদ্দেশ্যে এ ধরায় আগমন করেছে, তার সে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য উপেক্ষা করে, বিস্মৃত হয়ে দুনিয়ার চাকচিক্যে নিমগ্ন হয়েছে, বিভোর হয়েছে ভূগর্ভ ও সৌরজগতকে জানার গবেষণায়। এসব কিছুই সে জানতে পারছে, অথচ তার আসল উদ্দেশ্য জানতে আর সময় পাচ্ছেনা।এটা অবশ্যই আক্ষেপের বিষয়। তবে হ্যাঁ, মানবজীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সাধনের সাথে সাথে দুনিয়ার জীবনকেও জানতে সক্ষম হলে তো সোনায় সোহাগা, এতে কারো দ্বীমত থাকার কথা নয়।
আজকের দুনিয়ার প্রধান সমস্যাই হচ্ছে, মানবকুল ভূগর্ভ থেকে শুরু করে সৌরজগত ও তদমধ্যস্থিত উদ্ভিদ জগত, প্রাণীজগত ও জড় জগত নিয়ে চিন্তা-গবেষণায় মত্ত হয়েছে, অথচ নিজেকে নিজে ভূলে গেছে। সত্য বলতে কি, যদি কেউ মানব জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সাধনে মগ্ন হয়, তখন তাকে দুনিয়ার মানুষ ঠাট্রা বিদ্রূপে জর্জরিত করে। এমন কি শক্তি প্রয়োগ করে তার বিরূদ্ধাচরণ করতেও কুন্ঠাবোধ করে না।
আজকের মানুষ অন্য আরো একটি মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পরেছে। আর তা হল: সত্যকে ক্ষমতা ও শক্তির পাল্লায় ওজন করতে শুরু করেছে। যে সত্যের সাথে শক্তি নেই তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে। আর যে মিথ্যার সাথে শক্তি প্রচুর, তাকে সত্যরূপে সাব্যস্থ করছে। অর্থাৎ ক্ষমতা ও শক্তিকেই হক্ব-বাতিলের, সত্য-মিথ্যার মানদণ্ড ধার্য করেছে, যেমনটি পূর্ববর্তী কাফের-বেঈমান নমরূদ, ফেরাউন, হামানেরা আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসুলগণের সাথে করেছিল। তবে ওদের বেলায় যা হবার তা-ই হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন: বলুন (হে নবী) সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।(সূরা বনি ইসরাইল : ৮১)
স্মর্তব্য যে, ক্ষমতা ও শক্তিকে হক্বের এবং অক্ষমতা ও শক্তিহীনকে বাতিলের মানদণ্ড নির্ধারণ করা মস্তবড় ভূল। কেননা, হক্ব হক্বই হয়ে থাকে যদিও তা অক্ষম ও শক্তিহীনের কন্ঠে উচ্চারিত হোক না কেন? আর বাতিল বাতিলই হয়ে থাকে যদিও তা ক্ষমতাবান ও শক্তিশালীর কন্ঠে উচ্চারিত হোক না কেন? মণি-মুক্তা, হিরা-কাঞ্চন নিঃস্ব-দরিদ্র লোকের হাতে থাকলেও যেমন সেটা অতি মূল্যবান, তার মূল্য কোন অবস্থাতেই হ্রাস পায় না, তেমনি হক্ব-বাতিলের ক্ষেত্রেও।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

