ব্যবসার জন্যও চাই পরিকল্পনা
ব্যবসার জন্য পরিকল্পনাটা খুব বেশি জরুরি। পরিকল্পনা না করে হুট করে ব্যবসায় নামলে তাতে ঝুঁকির আশঙ্কাই বেশি থাকে। তাই ব্যবসায় নামতে চাইলে সবার আগে চাই পরিকল্পনা। নতুন ব্যবসায়ী তো বটেই, যারা আগে থেকেই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, সাফল্য পেতে তাদেরও দরকার পরিকল্পনা করে করে এগোনো। আর ব্যবসার পরিধি বাড়াতে বা নিজের ব্যবসা দাঁড় করাতে ঋণ পেতে চাইলে ঋণদাতারা কিন্তু দেখবে আপনার ব্যবসার সম্ভাবনাকে। আপনার ব্যবসার সম্ভাবনাকে আপনি কিন্তু এই পরিকল্পনার মাধ্যমেই তুলে ধরতে পারেন।
কেন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা
অনেকেই ব্যবসায় ক্ষুদ্র উদ্যোগ নিয়ে থাকেন, ব্যবসা পরিচালনার জন্য অনেক সময় তাঁদের প্রয়োজন হয় ঋণের। ব্যবসা যে লাভজনক হবে বা উদ্যোগ যে সাফল্যের মুখ দেখবে, তা সম্ভাব্য ঋণদাতাদের বুঝিয়ে বলার সবচেয়ে সহজ ও সেরা উপায় হচ্ছে এই বিজনেস প্ল্যান বা ব্যবসায় পরিকল্পনা। শুধু তা-ই নয়, এই পরিকল্পনা ব্যবসা পরিচালনার সময় দিক-নির্দেশকের ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি প্রকৌশলী মো· নিজাম উদ্দিন জিতু বলেন, ‘ব্যবসার ক্ষেত্রে পরিকল্পনা খুবই জরুরি। সম্ভাবনা সত্ত্বেও পরিকল্পনার অভাবে অনেকেই পিছিয়ে পড়ছে। যাঁরা ব্যবসা শুরু করতে চাচ্ছেন বা পুরোনো ব্যবসায়ী-সবার জন্যই এই পরিকল্পনা দরকার।’
কী থাকবে পরিকল্পনায়
একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ওপরই নির্ভর করে ব্যবসার সফলতা। তাই পরিকল্পনাটি কীভাবে ভালো করা যায়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। একটি পরিকল্পনার বেশ কয়েকটি অংশ থাকে। সেগুলো হচ্ছে-
১· সূচিপত্র
একটি পরিকল্পনায় সবার আগে থাকবে সূচিপত্র। এটি একঝলক দেখেই পাঠক বুঝতে পারবেন, এর ভেতর কী কী আছে।
২· সংক্ষিপ্তসার
পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে এই সংক্ষিপ্তসার। এ গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে, এখানে অল্প পরিসরে মূল পরিকল্পনার একটি সারকথা তুলে ধরতে হয়, যা পড়েই পাঠক মূলত পরিকল্পনাটির মূল্যায়ন করবে।
৩· ব্যবসার সুযোগ সম্ভাবনা
আপনার ব্যবসার কতটুকু সম্ভাবনা রয়েছে ও সুযোগকে আপনি কীভাবে কাজে লাগাতে চান, তা থাকবে পরিকল্পনার এই অংশে। ব্যবসার অতীত অভিজ্ঞতা ও বাজার-জ্ঞানের আলোকে কীভাবে ভবিষ্যতে নিজের বা নিজেদের ব্যবসাকে দাঁড় করাতে চান এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যবসা দাঁড় করাতে কী ভাবছেন, তা থাকবে পরিকল্পনার এই অংশে।
৪· প্রতিষ্ঠানের কাঠামো
এ অংশে আপনার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাঠামো লিখতে হবে। কী কাঠামোর দ্বারা প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হবে বা হচ্ছে, তা থাকবে এতে। এই অংশে ব্যবসার ধরন অর্থাৎ ব্যবসাটা কি একার না অংশীদারের ভিত্তিতে, তাও লিখতে হবে।
৫· লক্ষ্য ও কৌশল
আপনার ব্যবসাকে ভবিষ্যতে আপনি কীভাবে পরিচালনা করতে চান, কী লক্ষ্যে আপনার প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হবে, কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য আছে কি না, কীভাবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাবেন অর্থাৎ আপনার ব্যবসায়িক কৌশল কী হবে-সবই থাকবে এই অংশে।
৬· ব্যবস্থাপনা দল
ব্যবস্থাপনা দল বা ম্যানেজমেন্ট টিম-ই বলে দেবে আপনার ব্যবসা সাফল্যের মুখ দেখবে, নাকি ক্ষতির মুখে পড়বে। এ জন্য ব্যবসার জন্য দক্ষ ব্যবস্থাপনা দল খুব জরুরি। এই অংশে প্রতিষ্ঠানের প্রধান থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন পদ পর্যন্ত সবার শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, ব্যবসার অভিজ্ঞতা, উল্লেখযোগ্য সাফল্য-এসব বিষয়ে লেখা থাকবে।
৭· বিপণন পরিকল্পনা
এই অংশে থাকবে কীভাবে আপনি আপনার উৎপাদিত পণ্য বা সেবা গ্রাহকদের মাঝে পৌঁছে দিতে চান। ক্রেতার কাছে কীভাবে পণ্য পৌঁছাবে অর্থাৎ সরাসরি, পরিবেশক, নাকি পুনর্বিক্রেতার মাধ্যমে, তা এই অংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্রেতার চাহিদা, তা কীভাবে পূরণ করা হবে, কীভাবে পণ্য তাঁদের মধ্যে জনপ্রিয় করা যায়, পণ্যের দামের বিষয়ে ক্রেতারা কতটুকু সচেতন-এসব বিষয়ও থাকবে বিপণন পরিকল্পনায়।
৮· পরিচালন পরিকল্পনা
এই অংশও ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হবে, তা থাকবে এই পরিচালন পরিকল্পনায় (অপারেটিং প্ল্যান)। আপনি কী পরিমাণ পণ্য বাজারজাত করবেন, কতটুকু পর্যন্ত মজুত থাকবে, খুচরা বিক্রেতা বা সরবরাহকারীদের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক বজায় থাকবে। মোট কথা ব্যবসা কীভাবে সামাল দেবেন, তার বিস্তারিত থাকবে এই অংশে।
৯· আর্থিক পরিকল্পনা
আর্থিক পরিকল্পনা ব্যবসায়িক পরিকল্পনার তেমন গুরুত্বপূর্ণ অংশ না হলেও আপনার ব্যবসার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কী পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করবেন, ব্যবসার লাভের অংশ কতটুকু তুলে নেবেন এবং তা থেকে কতটুকু বিনিয়োগ করবেন, তা থাকবে আর্থিক পরিকল্পনা অংশে।
পরিকল্পনা লেখার সময় মাথায় রাখতে হবে
ব্যবসায়িক পরিকল্পনা লেখার সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে। পরিকল্পনা এমনভাবে লিখতে হবে, যেন তা পড়ে পাঠকের বিরক্তি না চলে আসে। ইংরেজি যেহেতু আন্তর্জাতিক ভাষা, তাই লেখার ভাষা হিসেবে ইংরেজিকেই বেছে নেওয়া ভালো। পরিকল্পনার ভাষা যথাসম্ভব সহজ-সরল ও প্রমিত হতে হবে। অল্প কথায় মূল ও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে। পরিকল্পনার লেখাকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে নিতে হবে। যেমন, প্রয়োজনে শিরোনাম, উপশিরোনাম ব্যবহার করা যেতে পারে এবং গ্রাফ, বার ডায়াগ্রাম ইত্যাদিও সংযোজন করা যেতে পারে।
**************************
আরাফাত শাহরিয়ার
প্রথম আলো, ৩১ মে ২০০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



