মো. আলী আশরাফ খান
অন্যান্য প্রাণীকে যেমন নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ করতে হয়, মৌমাছির বেলায় তার কোনো প্রয়োজন নেই। মৌমাছি নিজেরাই নিজেদের খাদ্য সংগ্রহ করে থাকে। এদের খাদ্য ফুলের পরাগ রেণু এবং পুষ্পরস, যা তারা নিজেরা বিভিন্ন গাছ থেকে সংগ্রহ করে। মৌমাছি পুষ্পরস থেকে মধু উত্পাদন করে তা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে রাখে। তাছাড়া নিজ দেহের অভ্যন্তরে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি করে মোম, যার দ্বারা চাক বা কুঠরি বানায়। এ কুঠরিগুলোতে মৌমাছির ডিম, শুককীট, মুককীট ইত্যাদি থাকে এবং সঞ্চিত মধু ও পরাগরেণু সংরক্ষণ করা হয়। প্রকৃতিতে যখন ফুলের সমারোহ কম থাকে কিংবা ঝড়-বৃষ্টি ও শীতের আধিক্য পরিলক্ষিত হয়, সে সময় কলোনিতে খাদ্যাভাব দেখা দিলে কৃত্রিম খাদ্য সরবরাহের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ সময় চিনি এবং পানি ১ঃ১ অনুপাতে মিশ্রিত করে মৌমাছিকে খাওয়াতে হয়। মৌচাকে মধু জমা করার পর তা মোম দ্বারা ঢেকে ফেলে। যখন চাকের অধিকাংশ কোষ মধুতে পূর্ণ হয় সে সময় মধু নিষ্কাশন যন্ত্রের সাহায্যে সাবধানে তা বের করে আনতে হয়।
পরিচর্যা : সাফল্যের সঙ্গে মৌমাছি পালন করতে হলে নির্ধারিত সময় পর পর মৌ-কলোনির সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে লক্ষ্য রাখা, পর্যবেক্ষণ, সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং তার সমাধানের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। ঋতুভেদে এ পরিচর্যা ৭-১০ দিন পর পর করতে হয়। মৌমাছি পালনের ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক শ্রম দেয়ার প্রয়োজন নেই। সপ্তাহে একবার একটি মৌ-কলোনির জন্য মাত্র ৮-১০ মিনিট সময় ব্যয় করাই যথেষ্ট। এ জন্য অন্য পেশার পাশাপাশি তা করা সম্ভব।
উপযুক্ত পরিবেশ : মৌ-বাক্স রাখার জন্য নির্বাচিত স্থানটি ছায়াযুক্ত, শুকনা ও আশপাশে মৌমাছির খাদ্য সরবরাহের উপযোগী গাছ-গাছড়া দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়া আবশ্যক। প্রয়োজনে কিছু কিছু ঋতুভিত্তিক গাছ জরুরি ভিত্তিতে লাগানো যেতে পারে। নির্বাচিত স্থানের আশপাশে যেন বিকট শব্দ সৃষ্টিকারী এবং ধোঁয়া উত্পাদনকারী কোনো কিছু না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
মৌমাছির শত্রু ও রোগ : মৌমাছির প্রধান শত্রু মথ পোকা। এছাড়া পিঁপড়া, তেলাপোকা, বোলতা, টিকটিকি, ইঁদুর, পাখি, ফড়িং, শিয়াল, কুনোব্যাঙ ইত্যাদির হাত থেকে মৌমাছিকে রক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। উপরন্তু জীবজগতের অন্যান্য প্রাণীর মতো মৌমাছিও নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হতে পারে এবং এর ফলে মৌমাছির মৃত্যু হতে পারে। শুককীট এবং মুককীট অবস্থায় মৌমাছি বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস এবং কীটাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে। এছাড়া পূর্ণাঙ্গ মৌমাছি একারাইন, আমাশয়, ফাউলব্রুড, অবশতা ও ফাঙ্গাস প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এসব রোগের নিরাময়কল্পে নির্ধারিত ওষুধ ব্যবহার করতে হয়।
মৌমাছি পালন প্রকল্প স্থাপনের জন্য আলাদাভাবে কোনো জায়গার প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আনাচে-কানাচে, ঘরের বারান্দায়, ছাদে কিংবা বাগানেও মৌ-বাক্স রাখা যায়। অ্যাপিস সেরানা প্রজাতির ৫টি মৌ-কলোনি সম্বলিত মৌ-খামার স্থাপনের জন্য মোট বিনিয়োগ হবে ১৫-১৬ হাজার টাকা। প্রতিবছর গড়ে প্রতি বাক্স থেকে ১০ কেজি মধু পাওয়া যাবে, যার বাজারমূল্য ২৫০ টাকা হিসেবে ২৫০০ টাকা। এ হিসেবে ৫টি বাক্স থেকে উত্পাদিত মধুর মূল্য দাঁড়াবে ৫–১০ কেজি – ২৫০ টাকা (প্রতি কেজি)= ১২,৫০০ টাকা। এই আয় ১০-১৫ বছর অব্যাহত থাকবে অর্থাত্ প্রথমে মাত্র একবার ১৫-১৬ হাজার টাকা ব্যয় করে প্রকল্প স্থাপন করলে মৌ-বাক্স এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি ১০-১৫ বছর ব্যবহার করা যাবে। আর কোনো বিনিয়োগ বা খরচ নেই বললেই চলে।
অন্যদিকে অ্যাপিস মেলিফেরা প্রজাতির ৫টি মৌ-কলোনি সম্বলিত মৌ-খামার স্থাপনের জন্য মোট ব্যয় হবে ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা। এক্ষেত্রেও ১০-১৫ বছর পর্যন্ত মৌ-বাক্স ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা যাবে। আর কোনো অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে না। মেলিফেরা প্রজাতির প্রতিটি মৌ-বাক্স থেকে বছরে ৫০ কেজি পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করা সম্ভব, যার বাজারমূল্য ৫০ কেজি –২৫০ টাকা (প্রতিকেজি) – ৫টি বাক্স= ৬২,৫০০ টাকা। প্রকল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে মাত্র ২৫-২৭ হাজার টাকা এককালীন বিনিয়োগ করে প্রতিবছর ৬০ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে আয় করা সম্ভব। মৌ-বাক্সের সংখ্যা প্রতিবছর বৃদ্ধির মাধ্যমে এ আয় অনেকগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। স্বল্প পরিশ্রমে এ ধরনের প্রকল্প স্থাপনের মাধ্যমে একদিকে যেমন আর্থিক দিক থেকে লাভবান হওয়া যায়, তেমনি পরাগায়ন প্রক্রিয়ায় সহায়তা দানের মাধ্যমে দেশের ফল ও ফসলের উত্পাদনে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা দান করা যায়।
মৌমাছি পালন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে বিসিকের যে কোনো কার্যালয়ে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এছাড়া টেলিফোন করতে পারেন : ০১১৯৯৪২৫৫২৩, ০১৭১০৪০৭০৭৪ অথবা ০১৯১১৪০৫৩৬৬ নম্বরে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, গ্রন্থাকার ও প্রধান নিরীক্ষা কর্মকর্তা, বিসিক, ঢাকা।
ই-মেইল : [email protected]
Click This Link
আলোচিত ব্লগ
কবিতাঃ সুবহানার বীরত্ব

সুবহানা খুব ছোট্ট হলেও, দারুণ মিষ্টি দেখতে,
চটপটে, বেজায় সাহসী , কেউ পারে না রুখতে।
স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন দুপুরবেলা
অনাথ দুটি শিশু বসে করছিল কি এক খেলা।... ...বাকিটুকু পড়ুন
গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...
গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...
একসময় ভারতীয় কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ কিংবা বাংলাদেশের কিছু ক্ষমতাসীন নেতা এমন ভাষায় কথা বলতেন, যেন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; বরং কোনো ছোট ভাই, আদরের বোন বা... ...বাকিটুকু পড়ুন
অন্তর্দিগন্ত

যে নদী সাগরকে ছোঁয়নি, সে-ই গায় সবচেয়ে নির্মল সঙ্গীত।
যে বৃক্ষের শাখা ফলের ভারে নত হয়নি, সে-ই আকাশকে বেশি বোঝে, বাতাসকে বেশি শোনে।
পৃথিবীর প্রাচীনতম ভ্রমগুলোর একটি এই,
মানুষ ভেবেছে প্রাপ্তিই পরিত্রাণ।
তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন
Laptop Stand কেন দরকার?
Laptop Stand কেন দরকার? | Digital Fast IT থেকে স্মার্ট সমাধান

দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ ব্যবহার করলে অনেকেরই একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়—ল্যাপটপের নিচের অংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।