somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

''বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা''

২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১ সকাল ৭:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সম্প্রতি বের হয়েছে জেলবন্দী সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের দুটি বই। এর একটি বইয়ের ভূমিকা আমাকে লিখতে হয়েছে। ‘চান্স এডিটর’ মাহমুদুর রহমানের প্রথম বইটির ভূমিকা লেখার চান্স পেয়ে আমি প্রথমে ‘চান্স’ শব্দটির ইচ্ছাকৃত অপপ্রয়োগ বিষয়ে কিছু বলে নিতে চাই। নতুবা ভবিষ্যতে কোনো আদালতে কোনো বিচারক তাকে ‘চান্স রাইটার’ বা ‘চান্স লেখক’ রূপে অ্যাখ্যায়িত করতে পারেন।

২০১০ সালে একটি আদালতে বিচারাধীন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক প্রশ্ন করেছিলেন সাংবাদিকতায় তার কোনো ডিগ্রি অথবা ডিপ্লোমা আছে কি না অথবা তিনি কখনো সাব-এডিটর পদে কাজ করেছিলেন কি না। জার্নালিজমে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা এবং পত্রিকা সম্পাদনায় কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই জেনে বিচারপতি (তখন) এ বি এম খায়রুল হক মন্তব্য করেন, ‘ও, তাহলে আপনি চান্স এডিটর।’

এই ভূমিকাটি লেখার সময়ে মাহমুদুর রহমান আছেন রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে গাজীপুরে একটি জেলে বন্দী। আর যে মামলার ফলে তিনি জেলদণ্ড খাটছেন, তার বিচারক এ বি এম খায়রুল হক এখন প্রধান বিচারপতির পদ অলংকৃত করেছেন। কিন্তু বর্তমান প্রধান বিচারপতি স্বয়ং ‘চান্স’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছেন। পরবর্তী কেয়ারটেকার গভর্নমেন্টের ‘চান্স চিফ এডভাইজর’ তিনি হবেন কি না এ নিয়ে বিতর্কের সূচনা হয়েছে। দেশের শীর্ষ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক গত বছরে বলেছেন, ‘... তিনি (প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক) কেন প্রধান উপদেষ্টা হবেন? তার পরে তো বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোহাম্মদ মোমিনুর রহমান রয়েছেন। তিনি অবসরে যাবেন ডিসেম্বরে। বিচারপতি নাঈম প্রধান বিচারপতি হলে তো তিনিই প্রধান উপদেষ্টা হবেন। তাহলে কি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন বিচারপতি নাঈমকে প্রধান বিচারপতি করা হবে না। অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য শুনলে তো তাই মনে হয়।’

এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ওয়ান-ইলেভেনের উদ্যোক্তা কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল সেনা অফিসার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা রূপে নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। কিন্তু ড. ইউনূস সেনা অফিসারদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চাননি। পরিবর্তে তার পরিচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও চাকরিজীবী ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে ওই পদে নিযুক্তির উপদেশ দেন। তখন প্রকৃত অর্থেই ড. ফখরুদ্দীন আহমদ হন বাংলাদেশের প্রথম ‘চান্স প্রধান উপদেষ্টা।’

বাংলাদেশে ‘চান্স মোহাম্মদ’ বিশেষণটির সঙ্গে যারা পরিচিত তারা বোঝেন বিচারপতি খায়রুল হক কোন দৃষ্টিকোণ থেকে এই মন্তব্য করেছেন। ‘চান্স মোহাম্মদ’ বিশেষণটি সেই ব্যক্তি সম্পর্কে প্রয়োগ করা হয় যিনি সর্বদাই নিজ স্বার্থসিদ্ধির তালে থাকেন এবং সুযোগ বা চান্স পেলেই লক্ষ্য পূরণে সচেষ্ট হন অর্থাৎ সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি। তাই ‘চান্স মোহাম্মদ’ বিশেষণটি প্রশংসাসূচক নয়, বরং কটূ, শ্লেষাত্মক এবং কিছুটা অবমাননাকর।
কিন্তু মাননীয় বিচারপতি নিশ্চয়ই আদালতের উচু আসনে বসে একজন সম্পাদককে অবমাননা করতে চাননি। তা ছাড়া শুনেছি, বিচারপতি খায়রুল হক পড়াশোনা করতে ভালোবাসেন ও জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী। সুতরাং এখন আমি যেসব তথ্য উপস্খাপন করবো, আমার দৃঢ়বিশ্বাস, সে সবই প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক জানেন। তবুও আপামর পাঠককে মনে করিয়ে দেয়ার জন্য বলছি, এই বাংলাদেশে একটি প্রবাদ চালু আছে, হায়াত, মওত ও রিজিক হচ্ছে বিধাতার হাতে।

রিজিক অথবা রুজির জন্য মানুষ তার জীবনে এক বা একাধিক পেশা বেছে নিতে পারে। একজন প্রতিভাবান ও যোগ্য ব্যক্তি যুগপৎ একাধিক পেশায়ও সফল হতে পারেন। যেমন মাহমুদুর রহমান হয়েছিলেন কেমিকাল ইঞ্জিনিয়ার। তারপর জাপানে সিরামিকস টেকনলজি স্টাডি করে তিনি হন যথাক্রমে মুন্নু সিরামিকস ও শাইনপুকুর সিরামিকসের অন্যতম পরিচালক। তারপর এই পেশা ছেড়ে তিনি হন গত বিএনপি জোট সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা। সেই সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পর তিনি ফিরে যান আটিজান নামে নিজের সিরামিকস শিল্পে এবং আত্মপ্রকাশ করেন দৈনিক নয়া দিগন্তের কলামিস্ট রূপে। অল্প সময়ের মধ্যেই মাহমুদুর রহমান ব্যাপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন তার শক্তিশালী লেখালেখির মাধ্যমে।

যে গুটিকয়েক লেখক তখন ওয়ান-ইলেভেনে সংশ্লিষ্ট উচ্চাভিলাষী সেনা অফিসারদের যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা করেছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন মাহমুদুর রহমান। সেই অর্থে বলা চলে, একটি কুচক্রী, অবৈধ ও ব্যর্থ সেনা সরকারের বিদায় এবং দেশে গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনে মাহমুদুর রহমানের বিশাল অবদান ছিল। দেশের এই গভীর সঙ্কটের সময়ে বিচারপতিদের কি ভূমিকা ছিল সে প্রশ্ন আমি তুলছি না। কিন্তু এটা বলা যায়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্খা ফিরে আসার ফলে বর্তমান বিচার বিভাগের অনেকেই লাভবান হয়েছেন।

৬ অক্টোবর ২০০৮-এ মাহমুদুর রহমান দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেন এবং আর্থিক ঝড়-ঝাপটায় পড়ে যাওয়া পত্রিকাটির হাল ধরেন। পাশাপাশি তিনি নিয়মিতভাবে তার লেখালেখিও চালিয়ে যান। কেমিকাল ইঞ্জিনিয়ার, সিরামিকস এক্সপার্ট মাহমুদুর রহমান দেশব্যাপী পরিচিতি পান সম্পাদক ও লেখক রূপে বা বিচারপতি খায়রুল হকের ভাষায় ‘চান্স এডিটর’ রূপে।

এখন বিবেচনা করা যাক বিশ্বের কয়েকজন খ্যাতনামা ব্যক্তির কথা যারা লেখক রূপে খ্যাতি অর্জনের আগে অন্য পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক তাদের লেখা পড়েছেন। তবুও আমি সাধারণ পাঠকের জন্য নিচে মাত্র দশজনের নাম দিলাম।

ফিওডর ডস্টয়ভস্কি মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ার
মার্ক টোয়েন পৃন্টার
উইলিয়াম ফকনার ব্যাংকার
টিএস এলিয়ট ব্যাংক অফিসার
এইচজি ওয়েলস ড্রেপার্স অ্যাসিসটান্ট
টম শার্প ফটোগ্রাফার
ট্রুম্যান কাপোট অফিসবয়
শন ও কেইসি রেলওয়ে লেবারার
ইউকিও মিশিমা এয়ারপোর্ট লেবারার
ডিক ফন্সান্সিস ঘোড়ার জকি

তাদের লেখা পড়লে বোঝা যায়, জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা একজন লেখককে কিভাবে সমৃদ্ধ করে তোলে। উপরোক্ত ব্যক্তিদের কেউই চান্স লেখক ছিলেন না। যদি চান্স লেখক হতেন তাহলে তাদের লেখা কালজয়ী হতো না। তার পরিণতি হতো স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মতো যিনি ক্ষমতায় থেকে লেখক পরিচিতির চেষ্টা করেছিলেন। যেমনটা এখন করছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরশাদ-হাসিনা চান্স রাইটার।
মাহমুদুর রহমান চান্স এডিটর নন, চান্স রাইটারও নন। আশা করি, এই সত্যটা বুঝবেন সেই সব ব্যক্তি যারা এখন চান্স চিফ এডভাইজর হওয়ার তালে আছেন।

বইটির সংকলনে মাহমুদুর রহমানের মোট চল্লিশটি লেখা স্খান পেয়েছে। এসব লেখা দৈনিক আমার দেশ-এ প্রকাশিত হয়েছিল ডিসেম্বর ২০০৮ থেকে ৩০ মে ২০১০ পর্যন্ত। তিনি ৪ জানুয়ারি ২০০৯-তেই আশংকা করেছিলেন, ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ ফ্যাসিবাদের দিকে ঝুকে পড়বে। ৬ জানুয়ারি ২০০৯-এ আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ঠিক সেদিকেই গিয়েছে। মাহমুদুর রহমানের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছে।
১৪ জুন ২০০৯-এ তিনি আওয়ামী সরকারের বাজেটের সত্য-মিথ্যার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। তার সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ দুটি লেখা হচ্ছে, ‘স্বাধীনতা বেচে স্বাধীনতার ঋণ শোধ’ এবং ‘আওয়ামী লীগের ঋণ বাংলাদেশ শোধ করবে কেন?’ এই দুটি লেখাতে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে জোরালো আবেদন রেখেছেন। বস্তুত, ফেলানি যুগে যখন একটি অসম চুক্তির আওতায় ট্রানজিটসহ ইনডিয়ার বিভিন্ন দাবি মেনে নিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে, তখন মাহমুদুর রহমানের লেখার অভাব দেশপ্রেমিক বাংলাদেশিরা প্রচণ্ডভাবে অনুভব করছেন।

৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০-এ ‘সততায় পারবেন না প্রধানমন্ত্রী’ শীর্ষক রচনায় মাহমুদুর রহমান যে ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন সেটাও সত্য। ওয়ান-ইলেভেনের সেনা সরকার যখন বাংলাদেশের দুই প্রধানমন্ত্রী, বহু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, ব্যবসায়ী, আইনজীবী ও সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা দুর্নীতির মামলা শুরু করেছিল তখন তারা মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনতে পারেনি। সুতরাং নির্দ্বিধায় বলা যায়, সততার চ্যালেঞ্জে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেরে গিয়েছেন। বস্তুত, তাকে বন্দী রাখার মূল কারণ এটাই।

২ জুন ২০১০-এ মাহমুদুর রহমানকে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা অফিস থেকে পুলিশ অভিযানের পর গ্রেফতার করা হয়। তার পত্রিকায় ২১ এপৃল ২০১০-এ ‘চেম্বার মানেই সরকার পক্ষে স্টে’ শিরোনামে প্রকাশিত রিপোর্টের জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১৯ আগস্ট ২০১০-এ তাকে জেলদণ্ড দেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ এ মামলায় নিজেই বিচারিক আদালত হিসেবে কাজ করায় দণ্ডিত সম্পাদক ও রিপোর্টার অলিউল্লাহ নোমান কোথাও কোনো আপিল করার সুযোগ পাননি। এর মাত্র কয়েকদিন পরে ৩ সেপ্টেম্বর ২০১০-এ বিচারপতি খায়রুল হক হন প্রধান বিচারপতি। ১৯২০-এর আইন মোতাবেক মাহমুদুর রহমানের সর্বোচ্চ দণ্ড হতে পারতো, ছয় মাস জেলদণ্ড এবং ২,০০০ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরো এক মাস জেলদণ্ড। কিন্তু মাহমুদুর রহমানকে বিজ্ঞ বিচারক দেন ছয় মাস জেলদণ্ড এবং ১০০,০০০ অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরো এক মাস জেলদণ্ড। কেন এই অতিরিক্ত অর্থদণ্ড? এর উত্তর পাওয়া যায়নি। মাহমুদুর রহমানের রায়ের সার্টিফায়েড কপি এখনো পাওয়া যায়নি। কেন? তারও সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

মাহমুদুর রহমান জানিয়েছেন তিনি কোনো অর্থদণ্ড দেবেন না। অর্থদণ্ড দিলে এই রায়কে মেনে নেয়া হবে। তাই, পরিবর্তে তিনি আরো এক মাস জেল খাটবেন। অর্থাৎ, মোট সাত মাস তিনি জেলে থাকবেন।
তাহলে মাহমুদুর রহমান কবে মুক্তি পাবেন? এই প্রশ্নেরও কোনো উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। তার প্রথম বন্দী হবার দিন থেকে সাত মাস পূর্তি হয়েছে ২ জানুয়ারি ২০১১-তে। কিন্তু তিনি মুক্তি পাননি। যদি দণ্ডিত হবার দিন থেকে ধরা হয়, তাহলে সাত মাস পূর্তি হবে ১৯ মার্চ ২০১১-তে। কিন্তু তিনি কি সেই দিন মুক্তি পাবেন? এর উত্তর কোন বিজ্ঞ বিচারপতি দেবেন?

১৯ মার্চ ২০১১-তেও যদি তিনি মুক্তি না পান অথবা অন্য আরেকটি মামলা দিয়ে তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য জেলবন্দী রাখার হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়। তাহলে আমি আশা করবো, সেদিন একটি জনতার আদালত গঠন করে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিচার করা হবে।
অসাধারণ সততা এবং অকাট্য যুক্তিনির্ভর লেখনী শক্তির ফলে মাহমুদুর রহমান দেশব্যাপী শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। তার এই অর্জন বাই চান্স নয়। একটি কুচক্রী সরকার তাকে বিচারের আবরণে বন্দী করে রেখেছে। কিন্তু তিনি হয়েছেন পাঠক নন্দিত।
তার প্রতি ধন্যবাদ জানানো এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শ্রেষ্ঠ পন্থা হলো এই বইটি পড়া এবং অন্য সবাইকে পড়তে বলা।

০২.
বাংলাদেশই বোধহয় পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে বিচারের বাণী নিভৃতে কাদে এমন একটি বাক্য প্রচলিত আছে। এই দেশে, বিশেষত আলুতত্ত্বের প্রবর্তক পটেটো জেনারেল মইন ইউ আহমেদের ওয়ান-ইলেভেন ক্যু-র পরে ২০০৭ থেকে বিচারের নামে অবিচারের মাত্রা আরো অনেক বেড়ে গিয়েছে।
নির্বিচারে গণহুলিয়া জারি এবং সূক্ষ্ম গণনা করে সমালোচক ও বিরোধীদের দমন করার জন্য গ্রেফতার, মাসের পর মাস মানুষকে বিনা বিচারে জেলে আটক রাখা এখন বর্তমান সরকারের স্টাইলে পরিণত হয়েছে। সত্যিই বিচারের বাণী এখন নিভৃতে কাদছে। আর অবিচারের স্রষ্টারা এখন প্রকাশ্যে হাসছে।

তাদের কেউ কেউ পদোন্নতির পর প্রয়াত নেতার ছবি অফিস রুমে টাঙিয়ে শাসকের প্রতি গভীরতম আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। তাদের আশা, তারা শাসকের আরো অনুগ্রহ পাবেন। কিন্তু সেটা না-ও হতে পারে। কারণ তারা যদি মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন না করতে পারেন তাহলে সেই অশ্রদ্ধা রূপান্তরিত হতে পারে ক্ষোভে-বিক্ষোভে।
মাহমুদুর রহমানের বিচারের সময়ে তাকে চান্স এডিটর রূপে আখ্যায়িত করেছিলেন বিচারপতি।
কি দু:খজনক উক্তি!
মাহমুদুর রহমান চান্স এডিটর নন। তার মতো সুশিক্ষিত, বিবেকবান ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তির সাংবাদিকতায় আগমন যে কোনো সময়েই কাম্য।

এক. আপনারা জানেন, গত দশ বছরে বাংলাদেশে মিডিয়ার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। আট পৃষ্ঠার দৈনিক পত্রিকা হয়ে গিয়েছে আটচল্লিশ পৃষ্ঠা। প্লাস নিয়মিত ক্রোড়পত্র বা সাপ্লিমেন্ট দেয়া হচ্ছে। একটি সরকারি রেডিও স্টেশনের বিপরীতে দশটি বেসরকারি রেডিও স্টেশনের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। একটি সরকারি টিভি স্টেশনের বিপরীতে বাইশটি বেসরকারি টিভি স্টেশনের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। এছাড়া এসেছে অনলাইন সংবাদ পরিবেশন ব্যবস্খা।

মিডিয়াতে বেড়েছে সাংবাদিকদের ডিমান্ড বা চাহিদা। তাদের বেতন হয়েছে বেশি এবং কিছুটা নিয়মিত। এই ডিমান্ডের বিপরীতে শিক্ষিত ও যোগ্যতা সম্পন্ন সাংবাদিকদের সাপ্লাই বা সরবরাহ বাড়েনি। এ জন্য সময় লাগবে। বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞান অর্জন করে সাংবাদিকতায় আসতে হবে।
ইতিমধ্যে মাহমুদুর রহমানের মতো সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের সাংবাদিকতায় যোগদানকে অভিনন্দিত করতে হবে।

দুই. শুধু সুশিক্ষিত হলেই চলবে না, তাকে বিবেকবানও হতে হবে। কিন্তু কিছু সাংবাদিক তাদের বিবেককে দেন বন্ধক। সেটা হতে পারে ওয়ান-ইলেভেনের স্বঘোষিত জন্মদাতা একটি বাংলা দৈনিক পত্রিকা ও একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা সম্পাদক যুগল যারা গণতন্ত্রের আশায় তাদের বিবেককে বন্ধক দিয়েছিলেন পটেটো জেনারেল মইন ও তার সেনাতন্ত্রের কাছে। সেটা হতে পারে অন্যান্য কিছু সম্পাদক ও সাংবাদিক যারা টাকা এবং মিথ্যা মর্যাদার লোভে ধনী বণিক গোষ্ঠিকে বিবেক দিয়েছেন বন্ধক। মাহমুদুর রহমান তার বিবেককে মুক্ত রেখেছেন।

তিন. শুধু সুশিক্ষিত ও বিবেকবান হলেই চলবে না, সম্পাদক-সাংবাদিককে প্রকৃত দেশপ্রেমিকও হতে হবে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে মিডিয়ায় যারা কাজ করছেন তাদের মধ্যে এই গুণটির প্রয়োজন এখন সবচাইতে বেশি। আপনারা জানেন, সম্প্রতি প্রকাশিত আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ১৫ জানুয়ারি ২০১১-তে যে টেলিফোন আলাপ হয়েছিল তাতে মিসেস ক্লিনটন ফাস করে দেন যে, ডিসেম্বর ২০০৮-এর সাধারণ নির্বাচনের ফল নতুন দিল্লিতে আগেই ঠিক করা ছিল। তাই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ মনে করছে, বর্তমান সরকার ইনডিয়ার সেই ঋণ পরিশোধে ব্যস্ত হয়ে শুধু ট্রানজিট দিতেই নয়, এমনকি চলতি ওয়ার্ল্ড কাপ কৃকেটের উদ্বোধনী ম্যাচে টসে জেতার পরে একটি ব্যাটিং উইকেটে ইনডিয়াকেই প্রথম ব্যাট করার সুযোগ দিতে নির্দেশ দিয়েছিল। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, কৃকেট ম্যাচের ওই সিদ্ধান্তটি ছিল রাজনীতি বহির্ভূত তবুও সাধারণ মানুষের পারসেপশন বা ধারণা হয়েছে, সেটা ছিল ইনডিয়া তোষণ নীতির অন্তর্গত।

এই যখন দেশের অবস্খা, তখন সম্পাদক-সাংবাদিকদের মাথা ঠাণ্ডা রেখে অবশ্যই দেশপ্রেমিক রূপে কাজ করতে হবে। ফেলানি যুগে কাটাতারের বেড়ায় নিহত হয়ে ঝুলে থাকার ঝুকি সত্ত্বেও যে ভিত্তিতে ১৯৪৭-এ আমরা দেশের যে সীমান্ত পেয়েছি সেটা রক্ষা করতেই হবে।
আপনারা জানেন, হিলারি ক্লিনটন তার ওই টেলিসংলাপে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে মনে করিয়ে দেন, বিচার বিভাগের ওপর তার সরকার প্রভাব বিস্তার করেছে এবং সরকারের ইঙ্গিতে বিচার বিভাগ কাজ করছে। ক্লিনটনের এই অভিযোগ কতোটা সত্য বা মিথ্যা সেটা সরকার ও বিচার বিভাগ বিবেচনা করবেন।

তবে মাহমুদুর রহমানকে যখন অতিরিক্ত দণ্ড দেয়া হয় এবং তার রায়ের সার্টিফায়েড কপি না দেয়া হয় তখন সাধারণ মানুষ মনে করতেই পারে হিলারি ক্লিনটনের অভিযোগ সত্য। অর্থাৎ বিচারের বাণী নিভৃতে কাদছে।
তাই শুধু সম্পাদক ও সাংবাদিকরাই নন, বিচার বিভাগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হতে হবে সুশিক্ষিত, বিবেকবান ও দেশপ্রেমিক।
কিন্তু তারা যদি মাহমুদুর রহমানকে চান্স এডিটর আখ্যা দিয়ে নিজেরাই পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চান্স চিফ এডভাইজর হওয়ার তালে থাকেন তাহলে কি হবে?

আপনারা তো ভালো করেই জানেন, বাংলাদেশের প্রথম চান্স চিফ এডভাইজর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ এখন আমেরিকায় নিভৃতচারী হয়েছেন। বাই চান্স ক্ষমতায় এসে তিনি রবি ঠাকুরের কবিতা থেকে সদর্পে আউড়েছিলেন :
চিত্ত যেথা ভয় শূন্য
উচ্চ যেথা শির...

সেই ড. ফখরুদ্দীন আহমদ নত শিরে বিদেশে চলে গিয়েছেন।
বাংলাদেশে যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দ্বিতীয় চান্স চিফ এডভাইজর হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছেন তারা এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে পারেন।

এই ভূখণ্ডে ১৯৪৭-এর পর, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি সরকার বিরোধী মতাবলম্বী ব্যক্তি, জেলে আছেন। তাদের মধ্যে আছেন মাহমুদুর রহমান ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ব্যক্তি বিহীন আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালতের বিচারাধীন অনেক রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী। তাদের মধ্যে আছেন বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর উদ্দেশে আটক সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রাইভেট সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম ডিউক।

এছাড়া সিরাজগঞ্জ, রূপগঞ্জ, আড়িয়ল বিল প্রভৃতি স্খানে গণহুলিয়া জারির ফলে হাজার হাজার পুরুষ তাদের পরিবার ও বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।
এখন তাহলে কোন ধরনের শাসন চলছে?
কোন ধরনের বিচার চলছে?
এর পরিণাম কি?

আমি এর উত্তরে দুজন লেখক ও একটি উপন্যাসের কথা বলতে পারি।
১৯৭৯-এ চেক লেখক ভাকলাভ হাভেল-কে সাড়ে চার বছর জেলদণ্ড দিয়েছিল স্বৈরাচারী কমিউনিস্ট সরকার। পরবর্তীকালে মুক্ত হয়ে তিনি হয়েছিলেন চেক রাষ্ট্রপতি।

প্রথম মহাযুদ্ধ চলার সময়ে যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন মনীষী বারট্রান্ড রাসেল। তাকে জেলদণ্ড দিয়েছিল বৃটিশ সরকার এবং তিনি জেলে থেকে তার বিখ্যাত বই অ্যান ইনট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিকাল ফিলসফি বইটি লেখেন। পরবর্তী সময়ে বারট্রান্ড রাসেল নোবেল পুরস্কার পান।
এই দুটি ঘটনার পাশাপাশি বিবেচনা করুন ১৮৪৪-এ ফরাশি ঔপন্যাসিক আলেকজান্ডার ডুমা-র লেখা বই দি কাউন্ট অফ মন্টি কৃস্টো।
এই উপন্যাসের তরুণ নায়ক এডমন্ড দান্তে মিথ্যা অভিযোগে ১৪ বছরের জেলদণ্ড পেয়েছিলেন।

জেলে তিনি আরেক বন্দীর কাছে গুপ্তধনের সন্ধান পান। দান্তে মুক্ত হয়ে সেই গুপ্তধনের ফলে বিরাট ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হন। যে বিচারক ও ব্যক্তিদের কারণে দান্তেকে জেল খাটতে হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিশোধ নিতে পেরেছিলেন তেইশ বছর পরে।
আমি জানি, মাহমুদুর রহমান প্রতিশোধ পরায়ণ নন। আমি দেখছি, তার দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। আমি জানি, তিনি জেলে থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।

এই পড়াশোনার সুফলে মাহমুদুর রহমান মুক্তির পর যদি তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগকারীদের আদালতে তিনি নিতে পারেন এবং বিচারে যদি তাদের শাস্তি হয় তাহলে বিচারের বাণী নিভৃতে কাদে বাক্যটিকে নির্বাসনে পাঠানোর সূচনা তখন হতে পারে।
আমি দি কাউন্ট অফ মন্টি কৃস্টোর ফেরার দিনটির অপেক্ষায় আছি।

বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা গানটি আবার শোনার সুন্দর দিনটির অপেক্ষায় আছি।
শফিক রেহমান : রাইটার (কোনো বিচারেই চান্স রাইটার নই। আমি লেখালেখি করছি ১৯৪৯ থেকে)
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ২৫/০২/১১]

Click This Link
৮টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×