somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অন্ধকারের একশ বছর : আনিসুল হক

২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১১:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তখন কত বয়স আমার? সতেরো। কলেজের ফার্স্ট ইয়ার। কিশোরী আমি একঢাল চুল নিয়ে দুই বেণী ঝুলিয়ে কলেজে যাই। বন্ধুদের সাথে শেয়ারের বেবীট্যাক্সিতে যাবার পথে ফান্ডামেন্টালিস্ট আর ফ্যানাটিকদের নিয়ে গরম গরম কথা বলি। বিএনপির শাসন আর লীগের হরতালে কুপোকাত প্রাণ। তীব্র ঘৃণা নিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে আমি বারুদের মতো জ্বলি। তসলিমা নাসরিনের বিপদে মনে মনে ব্যথা পাই। কচি মনের নরম জমিন। দেশ নিয়ে ভাবি। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি কিছু করতে পারবে সেই স্বপ্ন তখনো দেখি। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাইনি। পড়াশোনা তেমন করে করা হয় না।টেক্সটের বাইরে যে কোনকিছু পড়তে আমার তীব্র আগ্রহ।

সেই সতেরোর পঁচানব্বই সাল। বইমেলা থেকে আনিসুল হকের ”অন্ধকারের একশ বছর” কিনে পড়ি আর শিউরে উঠি। বইয়ের প্রথম পাতায় লিখা ”দরিয়ার পাশে আওরাতের আসার নিয়ম নেই।” প্রতি পাতায় এক ভয়ংকর সময়ের হাতছানি। কক্সবাজারের লাবণী সৈকতের নাম লোবান। সপ্তর্ষিমন্ডল হয়ে যায় সাত আউলিয়া। দেশের চিকিতসাশাস্ত্রের অবস্থা খুবই খারাপ। ইনকিলাবের সময় বহু মেডিক্যাল কলেজের বিশাল ক্ষতি হয়ে গেছে। জেনানা আওরাতদের ঘর থেকে বেরুনো হারাম। কঠোরভাবে নিষেধ। কোরআন শরীফ হাদিস শরীফে কি আছে, আল্লাহ জানেন। এদেশটা কি আসলেই ইসলামী বিধান অনুযায়ী চলছে, না কি চলছে মওদুদী বিধান অনুসারে? এ দেশে নবী রসূলের ক্রিয়া কর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে কিন্তু মওদুদীবাদ নিয়ে নয়। যে কোনো সময় বদরিয়া বাহিনী যে কোনো কাউকে দাঁড় করিয়ে বলতে পারে, বলো হযরত আবু আলা মওদুদী ছাহেবের দস্তুরী তাজাবিজ গ্রন্থের ৬ পৃষ্ঠায় কি আছে? না পারলে কান ধরে ওঠ বোস।

অদ্ভূত আঁধার এক পৃথিবীতে নেমেছে আজ। বইএর অন্যতম চরিত্র নাসিমা মনে করতে পারেন তার শৈশবে এনএনপির সাথে গাঁটছড়া বেঁধে মওদুদিয়ারা ঠিকই তাদের দলের জেনানাদের বোরখা পরিয়ে পার্লামেন্টে পাঠিয়েছে।

জিজিয়া কর ধার্য করা হয় অমুসলিমদরে উপর। কিন্তু এখন দেশে অমুসলিম কেউ আছে বলে মনে হয় না। হয় মারা গেছে অথবা জান নিয়ে পালিয়ে বেঁচেছে। যেসব মুসলিম জামাতিয়া মওদুদিয়ার সদস্য নয় তাদেরও দিতে হবে জিজিয়া বা নিরাপত্তামূলক সামরিক কর। সিয়াসী কাশমকাশ গ্রন্থে মওদুদী ছাহেব বলেছেন, ”ইসলামের দৃষ্টিতে তারাই কেবলমাত্র মুসলিম সম্প্রদায় যারা ’গায়ের ইলাহী’ সরকার মিটিয়ে দিয়ে ইলাহী সরকার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের গড়া আইন কানুনের বদলে খোদাই আইন কানুন দ্বারা দেশ শাসনের জন্য সংগ্রাম করে। যে দল বা জামায়াত এরূপ করে না বরং গায়ের ইলাহী শাসন ব্যবস্থায় মুসলমান নামক একটি সম্প্রদায়ের পার্থিব কল্যাণ সাধনে সংগ্রাম করে তারা ইসলাসপন্থী নয় এবং তাদের মুসলিম সম্প্রদায় বলাও বৈধ নয়।

সবটাই জেহাদ। সত্য মিথ্যা বলতে কিছু নেই। কেতাবে আছে, তিনটি কারণে মিথ্যা বলা জায়েজ। এক. দাম্পত্য সম্পর্ক রক্ষা করা, দুই. নিজের জীবন রক্ষা করা এবং তিন. যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে বিভ্রান্ত করা। সেই কেতাবী কথায় ভর করে বদরিয়া বাহিনীর প্রধান আতিউর রহমান মিজানী ছাহেব এনএনপির বেগম ওয়ালিদাকে রোজার দিনে শরবতে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন।

ফতোয়ার তো মাথামুন্ড খুঁজে পাই না। সুবিধামতো হাদিস শরীফ থেকে আওড়ানো হচ্ছে। নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। মওদুদী ছাহেবের বাণী, কোরআন করিম হেদায়াতের জন্যে যথেষ্ট কিন্তু নাজাত বা মুক্তির জন্য নয়? এই মারাত্মক কথা বলেছেন মওদুদী ”তাফহিমাত” গ্রন্থের ৩১২ পৃষ্ঠায়।

আতিউর রহমান মিজানী ছাহেবকে পাকিস্তান ভাঙ্গার গন্ডগোলের সময় এক মেজর জেনারেল খুব পেয়ার করতো। সেই তাঁকে বেশ কদিন মদ্য পান করিয়েছে। ছেলেবেলায় মদের নেশার ঘোরে এক ফর্সা ছেলেকে জড়িয়েও ধরেছিলেন।

আজ থেকে তিন যুগ আগেও দেশে অনৈসলামিক কান্ড কারখানা চলতো দেদার। এই অন্ধকার যুগে নূর জ্বালালেন একজন মহান আলেম। তার নাম হযরত স্যালোয়ার হোসেন দাউদী।

বইয়ের শেষে আমরা দেখি কওমীলীগার , এনএনপি কর্মী এমন কী দরত্যাগী জামাতিয়ারা ঐক্যবদ্ধ হয়। ধর্মের নামে রাজনীতিকে মোকাবিলা করবার অভিপ্রায়ে। নারী পুরুষের সম্মিলিত বাহিনীর অগ্রভাগে থাকে নারীরা।

বইএর অন্যতম চরিত্র শফি আকবর মুক্ত হয়ে ভাবেন মুক্তির আস্বাদ অন্যরকম। প্রিয়জনের কাছে যাবার অনুভূতিটাও তাতপর্যপূর্ণ। আর আছে দীর্ঘদিন জামাতিয়া শিবিরে বন্দী থাকবার এবং অত্যাচারিত হবার অভিজ্ঞতা। একসময় বিজয়ের সূর্য ওঠে।

এভাবেই বইটি এগিয়ে গেছে। আমরা যখন স্কুলে পড়ি তখন আনিসুল হকের গদ্যকার্টুন দারুণ এক জিনিস। রিয়েল স্যাটায়ার বলতে যা বোঝায়। আফসোস একটাই এত বছর আগে আনিসুল হকরা যা টের পেয়েছেন তার বিরুদ্ধে কিছুই করেননি। আতিউর রহমান মিজানীরা আমাদের ভবিষ্যত। স্যালোয়ার দাউদীরা আমাদের ইসলামী চিন্তাবিদ, মোহাম্মদ বিড়াল নিয়ে দেশে আগুন দেবার ব্যবস্থা করছে। বদরিয়া বাহিনীর মতোই আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক বলে দাবীদার অলিভার টুইস্টরা অষ্টপ্রহর বিরুদ্ধবাদীদের কতলে ব্যস্ত। তত্ত্ববোধীনি তালুকদাররা কোট স্যুট পরে দিব্যি জিকির করে বেড়াচ্ছে মওদুদীর ভাষায়।

৯৫ পেরিয়ে এখন ২০০৭। একযুগের ব্যবধানে দেশের যে চেহারা তার সাথে এই বইকে মিলিয়ে নিতে পারেন নতুন করে পাঠক মাত্রই। এমন কী ভবিষ্যত কর্তব্য স্থির করার চিন্তা মাথায় এলে অবাক হব না।
৩৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাসূলের (সা.) অনুসারি হবেন শুধুমাত্র সাহাবা (রা.), অন্যরা এবং ওলামা ওলামার অনুসারি হবেন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৪০




সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ২৮ নং আয়াতের অনুবাদ-
২৮। এভাবে রং বেরং- এর মানুষ, জন্তু ও আন’আম রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে (ওলামা) আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।নিশ্চয়্ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল।

সূরা:... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×