somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রাকবাজেট ভাবনা

৩০ শে মে, ২০০৮ রাত ১২:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শেরশাহের আমলে টাকায় আটমণ চাল পাওয়া যেত। যাই হোক সেসব তো এখন ঠিক ইতিহাস না অনেকটা রূপকথারই অংশ। এখন টাকায় একটা লজেন্সও পাওয়া যায় না। আগে টাকায় একটা বলাকা ব্লেড পাওয়া যেত, এখন আত্মহত্যা করবেন হয়তো হাতের রগ কেটে সেটার জন্যও মিনিমাম দশটাকা দামের ব্লেড কিনতে হবে, তা না হলে প্রয়োজনীয় ধারের অভাবে নিুমানের ব্লেড দিয়ে শুধু চামড়া কেটে একটা বিশ্রী হাস্যকর অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।
আমাদের বাড়ির কর্তাদের মুখে প্রায়ই শুনতে হয় “একটু বুঝেশুনে খরচ করো, রোজগার তো কর না, তাই জানো না কি অবস্থা!” সংসারের হাঁড়ি ঠেলা নারীটি কি আসলেই জানে না খরচের বহর দিন কে দিন কিভাবে বেড়ে যাচ্ছে অথচ আয় বাড়ছে না একটাকাও!

মালেকা চারটা বাসায় ছুটা কাজ করে। গড়ে হাজার দু’এক মালেকার মাসের আয়। মালেকার স্বামী রিকশা চালায়। তারও এমন হাজার দু হাজার টাকা আয় থাকে মাসে। কিছুদিন আগেও মালেকারা ঘর ভাড়া ৮০০টাকা দিয়ে মোটামুটি চলতে পারতো। গত বছরের কথা সেটা। কিন্তু এই বছর আর মালেকাদের এই আয়ে তিনবেলার খাবার জুটছে না। মালেকা আয় বাড়াতে গার্মেন্টস এ কাজ নেয়। সকাল আটটা থেকে রাত আটটা। বাচ্চাকে কার কাছে রেখে যাবে এই দীর্ঘসময়? সেই সমস্যার সমাধান করতে গ্রাম থেকে মাকে নিয়ে আসে। বাসায় আরেকজন সদস্য বাড়ে। আয় তো বাড়ে না। বাড়ে বস্তির ভাড়া। একলাফে ঘর ভাড়া হয়ে যায় এক হাজার টাকা। আগে ১৫দিনে একবার মাছ বা মাংসের চেহারা দেখা যেত। এখন শুধু ভাতে ভাত খাওয়া কষ্টকর। বাসা বাড়িতে কাজ করার একটা সুবিধা ছিল। দেখা যেত দুপুরে যে বাসায় কাজ করতো তারা দুপুরের খাওয়াটা দিত। কোন বাসা থেকে বাচ্চার জন্য বাসি রুটি নিয়ে যেতে পারতো। বিকালের মধ্যে বাসায় যেতে পারতো। একটু বিশ্রাম নিতে পারতো। লাভ ক্ষতির হিসাবে দেখা গেল গার্মেন্টস এ কাজ করার চাইতে বাসায় কাজ করা লাভজনক। মালেকা আবার ছুটা বুয়ার তকমা এঁটে নেমে পড়ে। মালেকা বলেই ফেলে, শেখের বেটি থাকতে চাল খাইছি ১৮ টাকা কেজিতে। এখন চালের যে কেজি, আটার যে দাম তাতে কুলায় না। তরকারিতে তেল দেওয়া ছাইড়াই দিছি কইতে গেলে। বাচ্চারে স্কুল থেইকা ছাড়ায়ে আনুম ভাবতাছি। নিউজপ্রিন্টের খাতাও কিনা দিতে পারি না। মোদ্দা কথা মালেকার সীমিত বাজেটে এই বাজারে দারুণভাবে টান পড়েছে।

মালেকা যেসব বাসায় কাজ করে সেসব বাসার বিবিসায়েবরা এখন আর সেভাবে বাসি রুটিও দিতে পারে না। দুপুরে খাওয়াতে চায় না। মালেকার এক বিবিসায়েব তাহেরার হাজব্যান্ড একটা বায়িং হাউজে ভদ্রস্থ বেতনে চাকুরী করেন। বাসা ভাড়া ছিল আট হাজার। সেটা ২০০৭ থেকে ২০০৮ এ এসে দাঁড়িয়েছে দশ হাজারে। তাহেরা তাই বাঁধা কাজের লোক ছাড়িয়ে দিয়েছেন। বাসার কাজ কষ্ট হলেও নিজেই করতে চেষ্টা করেন। মালেকা বাসা ঝাড়–, ঘর মোছা আর কাপড় ধুয়ে যায়। বাকী কাজ তাহেরা নিজেই করেন এতবছর পর। সয়াবিনের লিটার একশ দশ টাকা, মুরগির দাম বার্ড ফ্লুর পরে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। ডিমের ডজন সত্তর টাকা। তাহেরারা মধ্যবিত্ত। হাজব্যান্ডের বেতন একটাকাও গতবছরের তুলনায় বাড়েনি। খরচের ডালপালা একটাও কমেনি। তাহেরা তাই ধাক্বা সামলাতে নিজের আরাম আয়েশের জিনিসগুলোতে ছাড় দেন। সারাদেশ যখন মোবাইলে কথা বলছে তাহেরা নিজের মোবাইলটাতে দেড়মাসেও কার্ড ভরেন না যেহেতু ইনকামিং আছে ব্যালেন্স না থাকলেও। ডিশের লাইন ছেড়ে দিয়েছেন। আগে মাসে একবার অন্তত বাইরে খেতেন এখন বাইরে খাওয়ার কথা পারতপক্ষে বলেন না। বাসে তাহেরা চড়তে পারতেন না।্ অভ্যাস করে নিয়েছেন এখন। কারণ সিএনজি বেবিট্যাক্সি বা কালো অথবা নীল ক্যাবের ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তাহেরার কথা খুব পরিষ্কার। আমাদের যে সামাজিক অবস্থান তাতে আমার হাজব্যান্ডকে ঠিকই ধোয়া ইস্ত্রি করা শার্ট পরে টাই লাগিয়ে অফিসে যেতে হবে। বাচ্চাকে ইংলিশ মিডিয়ামেও পড়াতে হবে। আমাদের ভেতরের টাকাপয়সার খবর তো কাউকে জানাতে পারব না, পারব না হাত পাততে তাই এভাবে খরচ কমিয়ে, প্রতিবেলায় তিনটার জায়গায় দুটা তরকারী খেয়ে, যেখানে রিকশায় যাওয়ার দরকার সেখানে হেটে নিজেদের ঠাঁটবাট বজায় রাখছি। কতদিন পারব জানি না, চেষ্টা করছি। আমাদের কথা কাকে বলব? কে জানবে হঠাৎ করে মধ্যবিত্ত থেকে নিমনবিত্তের সারিতে নেমে যাবার ব্যথা!

ফিরোজা ছেলের বাসায় থাকেন। তার নেশা হলো পান খাওয়া। ছেলে বলে না কিন্তু ছেলের টানাটানির অবস্থা বুঝতে তো আর আইনস্টাইন হওয়া লাগে না। তাই ফিরোজা খুব কষ্ট করে ২৫ বছরের নেশা ছেড়ে দেন, একটা খরচ তো ছেলের কমবে! মনের ভুলে হয়তো মুখ চলে পান চিবোনোর ভঙ্গী করে তখন হাসেন ব্যথার হাসি। ভাবেন তাদের দিনগুলো যেমনই থাক খাওয়ার কষ্ট করেননি কখনো। কিন্তু স্বল্প আয়ের ছেলে এককথায় গলদঘর্ম বাসার খরচ চালাতে। ছেলের বউ যেমনই হোক একটা চাকুরী খুঁজছে যাতে বাসায় সামান্য হলেও টাকা দিতে পারে।

মালেকা, তাহেরা, ফিরোজা সবাই আমাদের বিশ্বায়নের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন। ধনী দেশগুলোতে খাদ্যশস্য পুড়িয়ে জৈব জ্বালানী তৈরী করা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট চলার পেছনে এটাও অন্যতম কারণ। পেট্রোলের দাম এখন যা আছে লিটার প্রতি আটষট্টি টাকা তা হয়ে যাবে ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরের বাজেটের পর একশ টাকা। গত পনেরো বছরে বাংলাদেশে দারিদ্রতা কমেছে ১.৫% হারে। গত দেড়বছরে দারিদ্রতা বেড়েছে বাংলাদেশে ১০% হারে। কোন নির্বাচিত সরকার যদি ক্ষমতায় আসেও দেশকে আগের অবস্থায় অর্থাৎ দারিদ্রতার হার আগের অবস্থায় কমিয়ে আনতে সেই সরকারের কমপক্ষে পনেরো বছর লাগবে।

ফিরোজা প্রতিদিন ফ্ল্যাট গজিয়ে ওঠা ঢাকা শহর দেখেন আর ভাবেন এ দেশের মানুষ কি এরপর ফ্ল্যাটের ছাদে ধান চাষ করবে? এক হাত জমিও কেউ খালি রাখছে না। কোথায় হবে ফসল, কোথা থেকে আসবে এত মানুষের খাবার? বিদেশ থেকে নিম্মমানের বীজ আমদানী করে দেশের খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে ব্যাহত। ফিরোজার এই শেষ বয়সে এসে মনে হয় একটা মাইক নিয়ে সারা দেশে ঘুরে বেড়াবেন আর মানুষকে বলবেন বাপধনরা আর বিল্ডিং বানাইস না, ধানের জমি ভরাট করে আর দোকানপাট বানাইস না। কয়দিন পরে নিঃশ্বাসের বাতাসও কিনতে হবে। ফিরোজা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

আমাদের ও বর্ষীয়ান ফিরোজার মতো বলতে ইচেছ করে আবার বাজেট আসছে সেই বাজেটে আমাদের জীবন যাত্রার মান যাতে না কমে তার জন্যে একটা ব্যবস্থা নেয়া হোক। আমাদের রান্নাঘরে বসে যেন বাচ্চাকে প্রয়োজনীয় খাবারটা দিতে না পারার জন্যে দীর্ঘশ্বাস গোপন করতে না হয় তার জন্যে একটা দিক নির্দেশনা থাকুক।
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×