somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাঁচজনে, একা একা

০৪ ঠা জুলাই, ২০০৮ রাত ১:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রথম যখন পরিবারের সদস্যরা জানলো আমরা এরকম একটা পরিকল্পনা করেছি তখন প্রথমেই শিরোনামের কথাটাই শুনেছি - তোমরা পাঁচজন অথবা তোরা পাঁচজন কিভাবে একা একা এতদূর তাও এতদিনের জন্যে যাবে/যাবি? কতদূর যাচ্ছি? হিমালয় অথবা আন্দামান কিংবা এন্টার্কটিকা অথবা মহাশূন্যে! না। চট্টগ্রাম হয়ে রাঙ্গামাটি যাব। এতদিন মানে কতদিন? পঁচিশে মার্চ রাত বারোটার বাস, ছাব্বিশ, সাতাশ, আটাশ থাকব, উনত্রিশে সকাল সাতটার বাসে চড়ে বসব আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে।
মনে খটকা লাগছে - পাঁচজন কিভাবে একা একা হয়? হয় হয়। পাঁচজনের জেন্ডার যদি হয় 'নারী' তাহলে পাঁচজনে একা একাই হয়। যারা বিবাহিত তাদের বরেরা বিরসবদনে, বউদের অনেক কাঠখড়ের স্টক পুড়ে শেষ হবার পর সম্মত হয়েছে। অবিবাহিতরা বাসায় বলেছে বিবাহিতদের বর যাবে সাথে, এভাবে ট্যুর ম্যানেজ করা হলো। আমি, তুলি, পল্লবী সেই স্কুলের বান্ধবী। কাকলী, তুলির ভার্সিটির বন্ধু। শাবানা আমার ভার্সিটির বন্ধু। কিমাশ্চর্যম হচ্ছে কাকলী তুলিকে ছাড়া আর কাউকে চিনে না। শাবানা আমাকে ছাড়া আর কাউকে আগে দেখেনি। আমাদের কোন সমস্যা হলো না যাত্রার শুরু থেকেই। গ্রীন লাইনের বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে বসে আছি রাত এগারোটা থেকে। যার কাছে টিকেট বাসের সেই শাবানা তো আর আসে না। আমরা আমাদের ইভেন কোচ নাম্বারটাও জানি না। শাবানা এগারোটা চল্লিশ বাজে তবু আসে না। শাবানা পৌঁছানোর পর শুনলাম আমাদের বাসটা চলে গেছে। আমাদের বরেরা অনেক কষ্টে তাদের আনন্দের হাসি চেপে রেখেছে। রাজারবাগ স্ট্যান্ড থেকে গ্রীনলাইন কর্তৃপক্ষ ই আমাদের আরামবাগ স্ট্যান্ডে পাঠালো, ঐখানে আমাদের বাসটা তারা দাঁড় করিয়েছে। যাক প্রথম ধাক্বা শেষ হলো এভাবে। বসলাম বাসে। ভোরে সাড়ে পাঁচটায় চট্টগ্রাম নামলাম। আগে থেকে ঠিক করা মাইক্রো আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। আমরা শাবানা জিন্দাবাদ বলে মাইক্রোতে চড়ে বসলাম। গন্তব্য খুলশি গেস্টহাউজ। গেস্টহাউজের মানুষদের টেনে হিঁচড়ে উঠালাম। কোটিখানেক মশার ভেতর রিসেপশনে বসে আমরা জানতে পারলাম বেলা বারোটার আগে আমরা রুম পাব না। গেস্টহাউজের লোকেরাই আবার আমাদের নিয়ে গেল পরের আরেক রাস্তায় তাদেরই আরেকটা গেস্টহাউজে। যাক্, ফ্রেশ হবার তো জায়গা পাওয়া গেল! সবাই টুকটাক খেয়ে, দশটায় নাস্তা করব জানিয়ে ঘুমানোর জন্য ঝাঁপ দিলাম। ঘুম থেকে উঠে জানলাম আমি ছাড়া আর সবাই তুমুল আড্ডা পিটিয়েছে। নাস্তা করে আমরা গেলাম চিটাগং আড়ং এ। সেখানে আমার এক ছোট ভাই শায়ের আমাদের সাথে যোগ দিলো। মাইক্রোতে করে ফয়েজ লেক। ফয়েজ লেকে বোট রাইডিং করে আমরা তো যারপরনাই আনন্দিত। এত সবুজ চারিদিকে আর পানি। আহা এখানে যদি থাকা যেত। আমি বললাম ফয়েজ লেকের কোন সৌন্দর্যই এখন আর এই জবরজং কাঠামোর ভেতর নেই। কি একটা বানিয়েছে, থিম পার্ক না ঘোড়ার ডিম। আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল। আমরা সব কিভাবে নষ্ট করে ফেলি। তারপর ওয়ার সিমিট্রি। লাঞ্চ। এরপর ভাটিয়ারি। মেরিন ড্রাইভ। সবাই পতেঙ্গা পতেঙ্গা করে মাথা খেয়ে ফেলছে। পতেঙ্গা গিয়ে আমরা দাঁড়ানোর জায়গাও পাই না, এমনই অবস্থা। গরমে জিভ বেরিয়ে যাবার অবস্থা। তবু আমাদের বিরামহীন হাসি ঠাট্টা চলছে। হয়তো ছাব্বিশে মার্চ সরকারী ছুটি তাই এই অবস্থা, এত ভীড়।
পতেঙ্গা থেকে ফেরার পথে শায়েরকে নামিয়ে দিয়ে জিইসির মোড়ে, কিছু ফল কিনতে আমরা গাড়ি থামালাম। বান্ধবীরা চিৎকার করছে তরমুজ খাবে বলে। কেনা হলো তরমুজ। সন্ধ্যায় গেস্টহাউজে ফিরলাম। সারাদিনের ক্লান্তি সবাইকে মোটামুটি কাবু করে ফেলেছে। গোসল করতে ঢুকলো যে যার সিরিয়ালে। তরমুজ কেটে রুমের ফ্রিজে রাখা হলো। ডিনার করে খাওয়া হবে এই আশায়। রাতে হোটেল জামান এ ডিনার করলাম। রুমে ফিরে একটু আড্ডা দিয়ে ঘুমাতে গেলাম। তরমুজ কিন্তু খাওয়া হলো না। আমাদের সকালে সাতটায় রাঙ্গামাটির বাস। সেভাবে মাইক্রোর ড্রাইভার রানাকে বলে আমরা সব গুছিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
ভোরে রওনা দিলাম। শুনলাম আমদেরটাই শেষ বাস যেটাকে সাতাশ তারিখে রাঙ্গামটি যেতে দেয়া হচ্ছে। কারণ সেদিন প্রধান উপদেষ্টা রাঙ্গামাটি যাচ্ছেন। আমার বান্ধবীরা আমাকে সেই কাটা তরমুজ গেষ্টহাউজে ফেলে আসতে দিলো না। প্রথমে তরমুজের দুই ফালি একসাথে করে বাঁধা হলো, তারপর সেটাকে একটা ব্যাগে ভরা হলো। এই ভারী জিনিস ওরা বয়ে নিয়ে গেল পালা করে। আমি যতই বলি রাঙ্গামটিতে প্রচুর তরমুজ আছে ওরা সেসব শুনতে রাজি না। নিবেই নিবে। রাঙ্গামাটি পৌঁছে চলে গেলাম ঘাটে। আমাদের মালপত্র পর্যটনের কাছেই বেসরকারী কিছু কটেজে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই কটেজগুলো বেসরকারী একটা প্রতিষ্ঠান পর্যটনের কাছ থেকে লিজ নিয়েছে। ঘাটে গিয়ে চড়ে বসলাম বড় নৌকায়, এগুলোকে সম্ভবত বজরা বলে। নৌকায় করে আমরা গেলাম শুবলং। শুকনা শুবলং। এখানেও ইট কাঠ পাথরের দৌরাত্ম্য। সেই বন্য শুবলং আর নেই। রোদে মাথা ঘুরাচ্ছে। শুবলং থেকে ফেরার পথে ঝুলন্ত সেতু দেখে আমরা চলে এলাম একটা রেস্টুরেন্টে। লাঞ্চ সেরে পর্যটনের কটেজে। দারুণ কটেজ, পাশেই ঝুলন্ত সেতু দেখা যায়, পানি দেখেই আমরা খুশি। রুমে ঢুকতে বুঝলাম এত আনিন্দত হবার কিছু নেই। রুমে এসি নেই। গরমে গায়ের চামড়া খুলে হাতে নেবার অবস্থা। এরমধ্যে পঁচা তরমুজের গন্ধে রুম মাতোয়ারা। ব্যাপক আজেবাজে কথা বলে বান্ধবীদের তরমুজকে ওয়েস্ট বাস্কেটে বিসর্জন দিলাম। দুই রুমের দুই বাথরুমে ঢুকে একজন আরেকজনকে ডাকছি। কারণ মাথায় শ্যাম্পু দেবার পর জানা গেল পানি নেই। এতেও আনন্দ। সবকিছুতেই আনন্দ। সন্ধ্যায় ডিসির বাংলো। পানির উপরে জেটির মতো তৈরী করা, সে কি বাতাস। গান শুনলাম স্থানীয় শিল্পীদের। খাওয়া দাওয়া করে কটেজে ফিরে মাত্র রাত দু'টা পর্যন্ত গপ্পো করলাম। আমাদের আনন্দের কোন সীমা পরিসীমা নেই। কারণ এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই। ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাসায় রিপোর্টিং এর ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না।
আটাশ তারিখের সকালটা কবুতরের ডানার মতো সাদা রূপ নিয়ে আমাদের দরোজায় ধাক্বা দিলো। নাস্তা করে রাজবন বৌদ্ধবিহার দেখলাম। সবাই যথেচ্ছ কেনাকাটা করলো। সন্ধ্যা নামতেই সবার মন খারাপ। আজ শেষ দিন। রাত তিনটা পর্যন্ত আমরা সুখ দুঃখের কথা বললাম।
উনত্রিশের ভোরে ঢাকার বাসে চড়ে বসলাম।
পাঁচজনের একা একা ভ্রমণ কোন বাধা বিপত্তি ছাড়াই শেষ হয়ে গেল নির্মল আনন্দের ঝলমলে কিছু স্মৃতি রেখে।
১৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×