এখন সময় আগুন জ্বালার : প্রতিশোধের
আকাশের বিভিন্ন রং সময় পেলেই পর্যবেক্ষণ করি। সেই কোন ছোটবেলায় শুনেছিলাম প্রতিদিন আকাশ না দেখলে মানুষের মন বড় হয় না। সেই বিশ্বাসে এখনো পৃথিবী নামক গ্রহের অত্যাশ্চর্য এক ছাদ আকাশকে দেখে যাই পরম ভালোবাসায়। সেদিন ও দেখেছিলাম কোন সন্দেহ নেই। মাত্র চাকুরীতে জয়েন করেছি। চাকুরী স্থায়ী হবার জন্য আমাদের প্রতিষ্ঠানে দেড়মাসের একটা বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ পাশ দিয়ে আসতে হয়। সেদিন ছিল সেই কোর্সের উদ্বোধন বেলা দুইটায়। উদ্বোধন শেষে ক্লাশের শুরু, সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। ক্লাশ শেষে বের হয়ে দেখলাম রাস্তায় কোন যানবাহন নেই। রিকশাওয়ালা এক ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম এ অবস্থার কারণ কি। যা শুনলাম তাতে আমরা কয়েকজন রাস্তায় ঠান্ডা মেরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। কি শুনলাম?? জানলাম আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা হয়েছে। শত শত মানুষ আহত এবং নিহত। জননেত্রী শেখ হাসিনা বেঁচে আছেন কি না বলা যাচ্ছে না। আমার অবস্থা - ক্রোধ আশংকা এবং আতঙ্কের সংমিশ্রণ দেখে আমার এক সহপাঠী দ্রুত আমাকে তার হোন্ডার পেছনে তুলে নেয়। একঘন্টার পথ বাইশ মিনিটে টান দিয়ে আমাকে বাসায় পৌঁছে দেয়। এমনই ছিল আমার ২১শে আগস্ট ২০০৪ এর অভিজ্ঞতা।
গ্রেনেড কি বস্তু তা আমাদের মতো মানুষদের জানার কথা নয়। আমরা জানলাম, দেখলাম আইভি রহমানের অসহায় মৃত্যু। মৃত আইভি রহমানকে নিয়ে করা নাটক। বৃষ্টির মতো বিভিন্ন বিল্ডিং এর উপর থেকে গ্রেনেড মারা হয়েছিলো বক্তৃতা করার মঞ্চকে লক্ষ্য করে। মোটামুটি নয়টা গ্রেনেড ছোঁড়া হয়। ততকালীন শাসক দল বিএনপি ক্ষমতায় থাকার কল্যাণে তাদের দলীয় মিডিয়া এনটিভি সেই ভিডিও ফুটেজ সবচাইতে স্পষ্টভাবে দেখাতে সক্ষম হয়। কারণ তারা ক্যামেরা নিয়ে সবচাইতে কাছে অবস্থান করার সুযোগ পায়। যদিও পরবর্তীতে সেই আলামত অত্যন্ত পারদর্শীতার সাথে গায়েব করে দেয়া হয়। বিভিন্ন কুকর্মের আলামত নষ্টের অভিপ্রায়ে এনটিভি ভবনে আগুন দেবার নাটকও মঞ্চস্থ হয়।
আগস্ট মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে যা উঠে আসে তাতে কারও বুঝতে অসুবিধা হয় না কি কারণে আওয়ামী লীগের সমাবেশে এই সুপরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আরোহণের পর থেকেই বিএনপি জামায়াত জোট নৃশংসতার এক হোলি খেলায় মেতে উঠে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংখ্যালঘু নির্যাতন লাভ করে ভিন্নমাত্রা। সূচিত হয় ”পূর্ণিমা” ধর্ষণের মতো কলঙ্কজনক অধ্যায়ের। বিরোধীদলীয় নেতা কর্মীদের এথনিক ক্লিনজিং এর কায়দায় মাটির সাথে মিশিয়ে দেবার মিশন হাতে নেয় জোট সরকার। রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় লেবাসে সন্ত্রাসকে একধরনের ভীতিকর শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করা হয় অতি অল্প সময়ে। এসবের বিরুদ্ধে একমাত্র সোচ্চার তখন আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে খুন করে এই পরিবারের নাম নিশানা মুছে ফেলার যে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিলো তাকেই পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে রচনা করা হয় ২১শে আগস্ট ২০০৪ এর। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য যে বিল পাশ হয়েছিলো তা ২০০১ এ ক্ষমতায় আরোহণের পর পরই বিএনপি জামায়াত জোট প্রত্যাহার করে নেয়। ২০০২ থেকে ২০০৪ এর জুলাই পর্যন্ত শেখ হাসিনার উপর মোট চারবার প্রকৃতপক্ষে আক্রমণ হয়। ২০০২ এর ৪ঠা মার্চ নওগাঁয়, সাতক্ষীরাতে ২০০৩ এর ২৯শে আগস্ট, ২৬শে ফেব্রুয়ারী ২০০৪ এর বরিশালে ফেরিঘাটে এবং ২রা ফেব্রুয়ারী গৌরনদীতে। প্রতিটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে শেখ হাসিনার নিরাপত্তা জোরদার করার ব্যাপারে আবেদন করা হয়। কিন্তু নিরাপত্তা জোরদার তো দূরে থাকুক এসএসএফের প্রহরা যেমন তুলে নেয়া হয় তেমনি সংসদে দাঁড়িয়ে বেগম খালেদা জিয়া শেখ হাসিনা তাঁর জীবনের নিরাপত্তা বিষয়ে যে আশংকা প্রকাশ করেন তা নিয়ে রীতিমতো ঠাট্টা করেন। এমন কী ৫ই জুলাই ২০০৪ এ যখন শেখ হাসিনা ইস্তাম্বুলে সফররত তখনও তাঁকে টেলিফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়।
উপরোক্ত সব ঘটনার যোগফল ২১শে আগস্ট ২০০৪। প্রকাশ্য দিবালোকে নয়টি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দৃস্কৃতকারীরা পুলিশ, ইন্টেলিজেন্স এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাঝ দিয়ে নিরাপদে এবং অক্ষত অবস্থায় পালিয়ে যায়। এমন কী ঘটনার একমাস পরেও না কোন সন্দেহভাজন কে গ্রেফতার করা হয়, না সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয় কোন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা। বরং এমন কথাও বলা হয় যে যেহেতেু শেখ হাসিনা বেঁচে গেছেন সেহেতু আওয়ামী লীগ নিজেই এই হামলা করেছে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য। কারণ ৩০শে এপ্রিল ২০০৪ এর শোডাউনের ব্যর্থতা আওয়ামী লীগকে না কি একধরনের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের সম্মুখীন করে।
দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। আসে এফবিআই। যারা আলামত সংগ্রহ না ধ্বংস করতে এসেছিলো তা আজো গবেষণার বিষয়। হয় জজ মিয়া নাটক। করা হয় এক সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি। সেই কমিটির রিপোর্ট কোন হিমাগারে তা কেবল খোদাই বলতে পারবেন।
প্রকৃতপক্ষে প্রয়াত মেয়র হানিফসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাকর্মীরা মানববর্ম তৈরী করে শেখ হাসিনাকে বাঁচান। এই নিবেদিত প্রাণ নেতাকর্মীরা নিজেদের শরীরে পেতে নেন গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের শত শত আঘাত। শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী মারা যান। শেখ হাসিনা এক কানে আজো কম শোনেন, তাঁর এক চোখও ক্ষতিগ্রস্ত। সেই স্প্লিন্টারের পরবর্তী প্রতিক্রিয়াতেই মেয়র হানিফ বরণ করেন অকাল মৃত্যু।
নুতন করে ২১শে আগস্ট ২০০৪ এর গ্রেনেড হামলার বিচারকার্য শুরু হয়েছে। আমাদের গগলস মেজরের ছেলের সুকীর্তি বের হয়ে আসছে একে একে। সেগুলো বলে দিচ্ছে বিএনপিরই এক প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু। পিন্টুর দেয়া জবানবন্দী অনুযায়ী ততকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের তত্ত্বাবধানে পুরো অপারেশনটা চালানো হয়, অপারেশনের নীল নকশা করে তারেক জিয়া - যে ২০০১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ছায়া সরকার চালায় হাওয়া ভবনে বসে। পিন্টু, হাওয়া ভবেনর আশীর্বাদপুষ্ট এ লোকের ভাই তাজুল ইসলাম যে কি না হরকাতুল জিহাদের সক্রিয় সদস্য সে গ্রেনেড সরবরাহ করে - ডিটেনশনে থাকা অবস্থায় পিন্টু এসব তথ্য প্রদান করেন। হরকাতুল জিহাদের গ্রেফতারকৃত সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী গ্রেনেড হামলার চূড়ান্ত নকশা প্রণয়ন হয় ২১শে আগস্টের ২দিন আগে পিন্টুর ঢাকাস্থ বাসভবনে বসে।
শেষ কথা
সরকারের সদিচ্ছা থাকলে কোন কাজ সম্ভব না এটা আমরা সাধারণ জনগণ বিশ্বাস করি না। দায়িত্ব প্রাপ্তির সাত মাস ইতিমধ্যে চলে গেছে। আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করছি ২০০১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত চলমান রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের যারা নাটের গুরু - সেই তারেক জিয়া, মওদুদ, সাকা চৌধুরী, নিজামী, মুজাহিদ সহ অপরাপর লোকজন বহাল তবিয়তে বিরাজমান। তারেক জিয়ার জন্য দেশের যে ক্ষতি হয়েছে তার প্রতিকার চেয়ে একটি সাধারণ মামলাও হতে দেখলাম না। রাজনীতিতে কি কোন নীতি নেই? আওয়ামী লীগ কি শুধু রাজনৈতিক বাণিজ্যের জন্যই বিভিন্ন বিচারের ইস্যুগুলোকে ব্যবহার করবে, না কি আন্তরিকতার সাথে ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা, কিবরিয়া হত্যা, ১৭ই আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার বিচার করবে?
একজন হানিফ কি দলের ইতিহাসে উপেক্ষিত ই থেকে যাবেন?
একজন আহসানউল্লাহ মাস্টারের ছেলে কি শুধু এমপি হতে পারলেই পিতৃহত্যার প্রতিশোধের কথা ভুলে যাবেন?
আমাদের দুর্ভাগ্য দায়িত্বে এলেই আওয়ামী লীগ কেমন যেন প্রো বিএনপির মতো আচরণ শুরু করে, চেষ্টা করে নিরপেক্ষতার নষ্ট ভূমিকা পালন করতে।
আইভি রহমান সহ ২২ জন নেতাকর্মী, যারা সবার আগে মানুষ তাদের জন্য আমরা সব সময়ই শোক করব। তাদের স্মরণ করব শ্রদ্ধাবনত চিত্তে।
কিন্তু আমরা এও আশা করব সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এধরনের ঘটনার মূলোৎপাটন করা হবে। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ ভারতীয় উপমহাদেশেরই একটি সদস্য রাষ্ট্র এবং এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস কেবল ই রক্তপাতের। সেই ধারাবাহিকতার অবসান তখনই হবে যখন আন্তরিকতার সাথে এই ঘৃণ্য ও বর্বরোচিত কাজের ফলাফল দোষীরা ভোগ করবে। এখন সময় চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত তুলে নেবার। এখানে ক্ষমা বা ঔদার্য প্রদর্শন দুর্বলতারই নামান্তর। এখন সময় আগুনের, প্রতিশোধের - চোখের জলের নয়।
সূত্র : আওয়ামী লীগের দলীয় ওয়েবসাইট, উইকিপিডিয়া, দি হিন্দু পত্রিকাসহ ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইট

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


