somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঢাকা শহরে বাস , বাসযাত্রা এবং বাসযাত্রীর দু'দশক ব্যাপী বিবর্তন :একজন প্রত্যক্ষদর্শীর (অ)রম্য জবানী

১৯ শে মে, ২০০৮ বিকাল ৪:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

৯০ এর দশকের শুরু থেকে ঢাকার রাস্তায় প্রথম প্রজন্মের বাস "মুড়ির টিন" এর চূড়ান্ত বিদায়ঘন্টা বাজতে শুরু করে । রাজপথে জায়গা করে নেয় দ্বিতীয় প্রজন্মের মিনিবাস । এগুলোর ইণ্জিন টাটা , হিন্দুস্তান বা অশোকের হলেও বহির্কাঠামো তৈরি করা হতো স্থানীয়ভাবে ।




দ্বিতীয় প্রজন্মের বাস এবং বাসযাত্রীদের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়:


যাত্রী ছাউনির ১৫০-২০০ গজ সামনে সব বাস থামতে শুরু করে।


বাসে উঠার প্রক্রিয়াটি হয়ে উঠে খুব জটিল ।

(ক)বাস থামার সাথে সাথে বাসের যাত্রীদের নামার সুযোগ না দিয়ে একদল জোর করে বাসে উঠতে শুরু করে।

(খ)বাসে উঠবার সময় বাসের গেটে সাময়িক দাঙ্গা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে থাকে ।ছোট গেট দিয়ে একযোগে২০-২৫ জন প্রবেশের চেষ্টা করার কারণে সৃষ্টি হয় সাময়িক ডেডলকের


পেছনে পুরুষদের সিট খালি থাকা সত্ত্বেও নারীদের সিট দখল করে বসে পড়ার অভ্যাসে দুষ্ট হয়ে পড়ে একদল যাত্রী । পরবর্তীতে নারীরা বাসে উঠলেও এ শ্রেণীটি নির্বিকার থাকার কৌশল গ্রহন করে ।


বাসে উঠে গেটের কাছে ভীড় করে দাঁড়িয়ে পড়ে অধিকাংশ যাত্রী , পেছনে যাবার জন্য কন্ডাক্টরের শত কাকুতি মিনতি জওয়াবে তারা "আমি সামনেই নেমে যাবো" , "এত ইচ্ছা হলে তুই পেছনে যা" .....টাইপের কমন ডায়ালগ আওড়াতে থাকে।


ভাড়া না দিয়েই চুপিচুপি কেটে পড়া সুযোগ নিতে থাকে আরেকটি দল।প্রথমবার ভাড়া চাইলে তারা সাধারণত বলে "পরে নিও" ।একবার
ভাড়া দেবার পর কন্ডাক্টর কারও কাছে আরেকবার ভাড়া চেয়ে ফেললে কন্ডাক্টরকে শাসানো হতে থাকে মৌখিক বা শারিরীক ভাবে


দুই বা তিন টাকার জন্য এসব বাসে কখনো বড় ধরণের সংঘর্ষের কথা ইতিহাসে পাওয়া না গেলেও, একটাকার জন্য তর্ক বারংবার শারিরীক আক্রমণের পর্যায়ে যেতে থাকে।


বাসের গেট ধরে বিপুল সংখ্যক যাত্রীর ঝুলে থাকার ফলশ্রুতিতে যাত্রীর ভারে বাসের কাঠামো স্থায়ীভাবে একদিকে কাত হয়ে পড়ে


ভাড়া বাড়ানোর প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় সিটিং বা গেটলক ।

(ক) সিটিং ট্যাগ লাগিয়ে ভাড়া বাড়িয়ে দেয়ার পর , প্রথম দিনে কঠোরভাবে দাঁড়ানো যাত্রী নেয়া থেকে বাসগুলো বিরত থাকে।

(খ)দৃশ্যপট বদলায় দ্বিতীয় দিন থেকে ।বাসের সিট পূরণ হয়ে যাবার পর হেলপার রা অন্য যাত্রীদের উঠতে দিতে মৃদু আপত্তি করেন , তবে তাদের আপত্তি "এই দুষ্ট , সিটিং দেখোনা ? দাঁড়িয়ে যেতে তোমার কষ্ট হবে না ?" এর চাইতে বেশি কঠোর ঠেকে না। যাত্রীরা অফিস টাইমের দোহাই দিয়ে সিটিংয়ের বেড়াজাল ভেঙ্গে বাসে উঠে পড়েন ।

(গ)তবে ভাড়া সংগ্রহের সময় গোলযোগের সূত্রপাত হয় ।বাসে কেন দাঁড়িয়ে লোক নেয়া হয়েছে এ বিষয়ে যাত্রীরা ড্রাইভার এবং কন্ডাক্টরের কাছে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবী করতে থাকে। যেসব যাত্রীরা জোর করে বাসে দাঁড়িয়ে উঠেছেন তারা এ ঘটনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।বাদানুবাদের এক পর্যায়ে তারা ভাড়া না দেবার কথা ঘোষণা দেন।


রাস্তার যে কোন জায়গা থেকে বাসে উঠার সুযোগ থাকলেও নামার সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত বাস থেকে নামতে হয় ।


তৃতীয় প্রজন্ম:



এ শতাব্দীর প্রারম্ভে ঢাকার রাস্তায় মূলত চীনা এবং সুইডেনে নির্মিত সিএনজি চালিত সুদৃশ্য বাসের আগমন ঘটে । ত্বতীয় প্রজন্মের বাসগুলো চালু হওয়ায় ঢাকার সব রুটে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়।

তৃতীয় প্রজন্মের বাস এবং বাসযাত্রীদের বৈশিষ্ট্যগত বিবর্তন লক্ষণীয়:


যাত্রী ছাউনি কনসেপ্টটির সংস্কার করা হয় , তার বদলে খোলা আকাশের নিচে টিকেট কাউন্টার ধারার সূচনা হয় ।ঢাকার সব রুটে বাস চালু হয়, ফলে যে কোন জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরাসরি যাবার সুযোগ সৃষ্টি হয়।


বাসে উঠবার সময় দাঙ্গা হাঙ্গামা পদ্ধতির বিলোপ ঘটে ।তার পরিবর্তে সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে বাসে উঠতে শুরু করে ।


বাস টিকেট কাউন্টারের ১৫০-২০০ গজ সামনে না থেমে , জায়গামত থামতে শুরু করে । তবে যাত্রীদের লাইন অনেক সময় টিকেট কাউন্টার ছাড়িয়ে ১৫০-২০০ গজ পেছনে চলে যেতে থাকে ।


প্রচুর বাস থাকা সত্ত্বেও জনসংখ্যা আধিক্যে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় দাঁড়িয়ে যাত্রীরা যেতে শুরু করে ।


দাঁড়ানো ভদ্র টাই পরিহিত যাত্রীদের মাঝেও দ্বিতীয় প্রজন্মের স্বভাবের উপস্থিতি প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হতে থাকে । বাসে উঠে পেছনের দিকের দাঁড়ানোর জায়গাগুলো খালি রেখেই সবাই সামনে সুস্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে । বাসের বাইরে দাঁড়ানো ক্লান্ত লাইনের দিকে চেয়েও এরা নির্বিকার ভূমিকা পালন করতে থাকে।


লাইনে দাঁড়ানো যাত্রীরা ,ভেতরে দাঁড়ানো যাত্রীদের পেছন দিকে সরে দাঁড়াবার জন্য অনুরোধ করলেও , বাসে উঠার সুযোগ পেয়েই তারা নিজেরাও গেট জ্যাম করে দাঁড়িয়ে পড়তে থাকে।


টিকেট কেনার সিস্টেম চালু হওয়ায় ভাড়া ফাঁকি দেয়ার ব্যাপারটি নতুন ডাইমেনশনে আবির্ভূত হয় । এ ব্যবস্থায় স্বল্প টাকায় স্বল্প দূরত্বের টিকেট কেটে অধিক দূরত্ব পাড়ি দেয়া হয় ।


চৌর্যবৃত্তি রোধ করতে বিভিন্ন স্থানে টিকেট চেকার নিয়োগ করা হয়।স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরা টিকেট লুকিয়ে ফেলে , "টিকেট হারিয়ে ফেলেছি" , এমন খোঁড়া যুক্তির আশ্রয় নিতে থাকে । বাসে দাঁড়িয়ে কেন যাত্রী নেয়া হয়েছে , এটার ব্যাখ্যা চেয়ে তীব্র বাদানুবাদের মাধ্যমে অনেক অপরাধী যাত্রী পার পাবার চেষ্টা করতে থাকে ।


বাসে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিপুল আনাগোনার ফলে , ভীড়ের মাঝে দামী জুতায় পাড়া দেবার ঘটনা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে বসচা হয়

১০
আলাদা ভাবে নারী এবং পুরুষ আসন বন্টন ব্যবস্থার বিলোপ ঘটে ।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মে, ২০০৮ বিকাল ৫:১৪
৬৫টি মন্তব্য ৬৪টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×