"বন্ধু আমার ৯০ বিশ্বকাপ নিয়া আমার বাড়ির সামনে দিয়া রঙ্গো কইরা হাইট্টা যায় -- ফাইট্টা যায়, বুকটা ফাইট্টা যায় ।
ফুটবল স্মৃতির গোড়াপত্তনটা হয়েছিল ৯০ এর আরও বছর দুয়েক পরে । ৯২ এর কথা । আপাদমস্তক ফুটবল পাগল দেশ হিসেবে ইরানকে চিনিয়ে দেবার কারণ নেই , সেই ফুটবলাড়ম্বর পূর্ণ দেশে ফুটবলের জন্য আমার ভালবাসাটাও এল ঝড়ের বেগেই। ছোটাছুটি করতে শেখার পর খেলা যা খেলতাম ঘুরে ফিরে সেই ফুটবলই , কিন্তু দুনিয়ার কে কোথায় এইসব খেলা খেলে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকে, সেসব বুঝতে শুরু করলাম ৯২ এ এসেই ।
আমার বাবা যে হসপিটালে কর্মরত ছিলেন সেটার সদর দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ডানদিকে কোণাকুনি তাকালে একটা পাহাড় দেখা যেত , প্রতি বিকেলে আমরা পিচ্চিরা প্লাস্টিকের বল নিয়ে সেই পাহাড়ের ঢালে যেতাম ফুটবল খেলতে । ৯২ এর কোন একদিন পাহাড়টা পেট বরাবর চিরে ফেলে রাস্তা তৈরি করার জন্য অনেক হসপিটালের কম্পাউন্ডেই মোতায়েন করা হল বেশ কিছু বুলডোজার। বুলডোজারগুলো বেশ কিছুদিন পর যখন চলে গেল , পেছনে ফেলে গেল পাহাড়-চেরা চওড়া পিচঢালা রাস্তা। সে রাস্তা দিয়ে গাড়ি যেত হাতে গোনা দু'চারবার । মানুষজন না থাকলে মাকড়শা যেমন জাল ফেলবে , আমরা ছানা পোনারা রাস্তাটাকে পুরোদস্তুর বৈকালিক স্টেডিয়াম বানিয়ে ফেললাম ।
সময়টা তখন আর্জেন্টিনা-ঝড়ের । ফুটবল নিয়ে ইরানের সর্দি-জ্বর লেগে থাকে যেখানে বারোমাস , সেখানে আর্জেন্টিনা ঝড়ের ভাইরাল থাবা থেকে মুক্ত থাকার সুযোগটাই বা ছিল কোথায় ? খেয়াল করলাম আর্জেন্টিনা নিয়ে দু'চারটা তথ্য দিতে পারলে বন্ধুরা বেশ সমীহের চোখে তাকায় । নানান দেশ নিয়ে এমনিতেই আমার চিন্তার অন্ত ছিল না , এসব চিন্তা চেতনার বীজ ঢুকিয়েছিলেন আমার বাবা । একদিন তাই ম্যাপের নীচ থেকে শেখা আকাশী নীল পতাকা , সাদা খাতার পৃষ্ঠাজুড়ে এঁকে বন্ধুদের মাঝে বিরাট ফুটবলার(!!!) বনে গেলাম ।
এর মাঝে সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু নাসের একদিন মায়ের সাথে শহরে গেল । শহর থেকে যখন ফিরল নীল-সাদা জার্সি গায়ে, পেছনে গোটা গোটা হরফে লেখা ম্যারাডোনা , সাথে জ্বলজ্বলে নম্বর -- ১০ ।
ছোটবেলায় কাউকে দেখে কখনও হিংসা হত এমনটা ঠিক মনে পড়ে না , কে কি কিনল সেসব নিয়েও ভাবতাম না , কিন্তু নাসেরের জার্সিটা দেখে জীবনে যেন প্রথম কোন অপূর্ণতা অনুভব করলাম ।
এর কিছুদিন পর আব্বু আমাকেও ম্যারাডোনার একটা জার্সি এনে দিলেন , কিন্তু সে কথা জানল না বন্ধুদের কেউই। আমাদের পিচ্চিদের ফুটবল সাম্রাজ্যে একক অধিপতি রয়ে গেল নাসেরই ।তাড়াহূড়া করে কিনতে গিয়ে নীল-সাদা না পেয়ে আব্বু কিনেছিলেন লাল-সাদা জার্সি । সে জার্সির গায়ে ম্যারাডোনা বানান ঠিকই ছিল , নম্বরটাও ছিল ঠিকঠিক ১০ , আমার শুধু ছিল না লাল রঙা প্যারাগুইয়ান ম্যারাডোনা হয়ে আকাশী-নীলের নাসেরের সামনে দাঁড়ানোর সাহসটা ছিল না ।
কিছুদিন পরে আমরা নাসেরদের শারভিনাহ ছেড়ে ট্রানসফার হয়ে অন্য শহরে চলে এলাম । প্লাস্টিকের বলের বদলে এবার আমার একটা রাবারের বল হল , সাথে বর্ধনশীল শরীরে ম্যারাডোনার ছোট্ট পোষাকটাও হয়ে গেল খানিক আঁটসাঁট ।তবুও আমার বন্ধুদের কারও জার্সি নেই বলে রোজ বিকেলে টেনেটুনে প্যারাগুয়ের জার্সি পরা আমিই সবার ম্যারাডোনা হয়ে উঠলাম ।
৯৩ সালের কথা । ইরান টেলিভিশনে বলতে গেলে রোজই একটা না একটা ফুটবল খেলা দেখানো হয় , আমার বাবার সাথে আমিও নিয়ম করে খেলা দেখতে বসতাম । বিশ্বকাপ ৯০ এর খবরাখবর তদ্দিনে জানতে শুরু করেছি । ছোটবেলার বন্ধুদের সাথে বিকেলে বিশ্বের ফুটবলের হাল-হকিকত নিয়ে যেসব আলাপ হত , সেটা কোন অংশেই নিখিল বিশ্বের পিচ্চিদের হাস্যকর আলাপের চেয়ে আলাদা হত না । ওদের কাছে শুনে শুনে বদ্ধমূল ধারণা হল আর্জেন্টিনা বাদে পৃথিবীতে ফুটবল খেলতে জানে এমন কোন দেশই নেই । আরও জানলাম চোর-বদমায়েশের দলটির নাম জার্মানী , যারা চুরি করে ঘুষ খাইয়ে রেফারীকে হাত করে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছে । আমার বন্ধুদের মাঝে কিছু জার্মানীর ভক্ত ছিল , হয়ত তারা তাদের বাবা বা বড় ভাইয়ের কথা শুনে জার্মানীর ভক্ত বনে গিয়েছিল , জার্মানীর চৌর্যবৃত্তির কথায় তাদেরকেও কেমন যেন অনুতপ্ত দেখাত । অনুতাপ আমারও ছিল বটে --- আমার বাবা জার্মানীর সাপোর্টার । জেনে শুনে কি করে আব্বু এই চরিত্রহীন দলটিকে সমর্থন করেন , সেকথা ভেবে খারাপ লাগত ।
দেশে ছোট চাচার কাছে ফুটবলের গল্প করে একবার চিঠি লিখলাম । চাচা ম্যারাডোনার ছবিসহ একটা পোস্টকার্ড পাঠালেন , যেখানে ম্যারাডোনা কাঁদছেন , আর বাংলায় বড় বড় হরফে লেখা -- "রেফারীর কালো হাত গুঁড়িয়ে দাও"।
ম্যারাডোনার অশ্রু দেখে আমার মনটা সিক্ত হয়ে গেল , বিশ্বের একমাত্র ফুটবল খেলুড়ে দেশ আর্জেন্টিনার সমর্থক না হওয়া ছাড়া আমার আর কোন উপায়ন্তর রইল না ...........
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০১১ সকাল ৯:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




