somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার ফুটবল-স্মৃতি (পর্ব-১)

২০ শে এপ্রিল, ২০১১ সকাল ৭:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার বন্ধুদের চেয়ে একটা জায়গায় আমি পিছিয়ে আছি ,ইহলৌকিক জীবনে সে দূরত্ব ঘুচে যাবার কোন সম্ভাবনাও নেই । ওরা সবাই ৯০ বিশ্বকাপের কথা অল্প হলেও মনে করতে পারে ,আমি পারি না । ৯০ দশকের শেষদিকের স্কুলের বিশ্বকাপোলোচনায় বন্ধুরা যখন দু'চার বাক্য ম্যারাডোনা , রজার মিলা , ক্যানিজিয়া আওড়াতো আমি তখন পাংশুটে মুখে এ ভগ্নহৃদয়ের হাল যেন তখন
"বন্ধু আমার ৯০ বিশ্বকাপ নিয়া আমার বাড়ির সামনে দিয়া রঙ্গো কইরা হাইট্টা যায় -- ফাইট্টা যায়, বুকটা ফাইট্টা যায় ।

ফুটবল স্মৃতির গোড়াপত্তনটা হয়েছিল ৯০ এর আরও বছর দুয়েক পরে । ৯২ এর কথা । আপাদমস্তক ফুটবল পাগল দেশ হিসেবে ইরানকে চিনিয়ে দেবার কারণ নেই , সেই ফুটবলাড়ম্বর পূর্ণ দেশে ফুটবলের জন্য আমার ভালবাসাটাও এল ঝড়ের বেগেই। ছোটাছুটি করতে শেখার পর খেলা যা খেলতাম ঘুরে ফিরে সেই ফুটবলই , কিন্তু দুনিয়ার কে কোথায় এইসব খেলা খেলে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকে, সেসব বুঝতে শুরু করলাম ৯২ এ এসেই ।

আমার বাবা যে হসপিটালে কর্মরত ছিলেন সেটার সদর দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ডানদিকে কোণাকুনি তাকালে একটা পাহাড় দেখা যেত , প্রতি বিকেলে আমরা পিচ্চিরা প্লাস্টিকের বল নিয়ে সেই পাহাড়ের ঢালে যেতাম ফুটবল খেলতে । ৯২ এর কোন একদিন পাহাড়টা পেট বরাবর চিরে ফেলে রাস্তা তৈরি করার জন্য অনেক হসপিটালের কম্পাউন্ডেই মোতায়েন করা হল বেশ কিছু বুলডোজার। বুলডোজারগুলো বেশ কিছুদিন পর যখন চলে গেল , পেছনে ফেলে গেল পাহাড়-চেরা চওড়া পিচঢালা রাস্তা। সে রাস্তা দিয়ে গাড়ি যেত হাতে গোনা দু'চারবার । মানুষজন না থাকলে মাকড়শা যেমন জাল ফেলবে , আমরা ছানা পোনারা রাস্তাটাকে পুরোদস্তুর বৈকালিক স্টেডিয়াম বানিয়ে ফেললাম ।

সময়টা তখন আর্জেন্টিনা-ঝড়ের । ফুটবল নিয়ে ইরানের সর্দি-জ্বর লেগে থাকে যেখানে বারোমাস , সেখানে আর্জেন্টিনা ঝড়ের ভাইরাল থাবা থেকে মুক্ত থাকার সুযোগটাই বা ছিল কোথায় ? খেয়াল করলাম আর্জেন্টিনা নিয়ে দু'চারটা তথ্য দিতে পারলে বন্ধুরা বেশ সমীহের চোখে তাকায় । নানান দেশ নিয়ে এমনিতেই আমার চিন্তার অন্ত ছিল না , এসব চিন্তা চেতনার বীজ ঢুকিয়েছিলেন আমার বাবা । একদিন তাই ম্যাপের নীচ থেকে শেখা আকাশী নীল পতাকা , সাদা খাতার পৃষ্ঠাজুড়ে এঁকে বন্ধুদের মাঝে বিরাট ফুটবলার(!!!) বনে গেলাম ।

এর মাঝে সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু নাসের একদিন মায়ের সাথে শহরে গেল । শহর থেকে যখন ফিরল নীল-সাদা জার্সি গায়ে, পেছনে গোটা গোটা হরফে লেখা ম্যারাডোনা , সাথে জ্বলজ্বলে নম্বর -- ১০ ।

ছোটবেলায় কাউকে দেখে কখনও হিংসা হত এমনটা ঠিক মনে পড়ে না , কে কি কিনল সেসব নিয়েও ভাবতাম না , কিন্তু নাসেরের জার্সিটা দেখে জীবনে যেন প্রথম কোন অপূর্ণতা অনুভব করলাম ।

এর কিছুদিন পর আব্বু আমাকেও ম্যারাডোনার একটা জার্সি এনে দিলেন , কিন্তু সে কথা জানল না বন্ধুদের কেউই। আমাদের পিচ্চিদের ফুটবল সাম্রাজ্যে একক অধিপতি রয়ে গেল নাসেরই ।তাড়াহূড়া করে কিনতে গিয়ে নীল-সাদা না পেয়ে আব্বু কিনেছিলেন লাল-সাদা জার্সি । সে জার্সির গায়ে ম্যারাডোনা বানান ঠিকই ছিল , নম্বরটাও ছিল ঠিকঠিক ১০ , আমার শুধু ছিল না লাল রঙা প্যারাগুইয়ান ম্যারাডোনা হয়ে আকাশী-নীলের নাসেরের সামনে দাঁড়ানোর সাহসটা ছিল না ।

কিছুদিন পরে আমরা নাসেরদের শারভিনাহ ছেড়ে ট্রানসফার হয়ে অন্য শহরে চলে এলাম । প্লাস্টিকের বলের বদলে এবার আমার একটা রাবারের বল হল , সাথে বর্ধনশীল শরীরে ম্যারাডোনার ছোট্ট পোষাকটাও হয়ে গেল খানিক আঁটসাঁট ।তবুও আমার বন্ধুদের কারও জার্সি নেই বলে রোজ বিকেলে টেনেটুনে প্যারাগুয়ের জার্সি পরা আমিই সবার ম্যারাডোনা হয়ে উঠলাম ।

৯৩ সালের কথা । ইরান টেলিভিশনে বলতে গেলে রোজই একটা না একটা ফুটবল খেলা দেখানো হয় , আমার বাবার সাথে আমিও নিয়ম করে খেলা দেখতে বসতাম । বিশ্বকাপ ৯০ এর খবরাখবর তদ্দিনে জানতে শুরু করেছি । ছোটবেলার বন্ধুদের সাথে বিকেলে বিশ্বের ফুটবলের হাল-হকিকত নিয়ে যেসব আলাপ হত , সেটা কোন অংশেই নিখিল বিশ্বের পিচ্চিদের হাস্যকর আলাপের চেয়ে আলাদা হত না । ওদের কাছে শুনে শুনে বদ্ধমূল ধারণা হল আর্জেন্টিনা বাদে পৃথিবীতে ফুটবল খেলতে জানে এমন কোন দেশই নেই । আরও জানলাম চোর-বদমায়েশের দলটির নাম জার্মানী , যারা চুরি করে ঘুষ খাইয়ে রেফারীকে হাত করে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছে । আমার বন্ধুদের মাঝে কিছু জার্মানীর ভক্ত ছিল , হয়ত তারা তাদের বাবা বা বড় ভাইয়ের কথা শুনে জার্মানীর ভক্ত বনে গিয়েছিল , জার্মানীর চৌর্যবৃত্তির কথায় তাদেরকেও কেমন যেন অনুতপ্ত দেখাত । অনুতাপ আমারও ছিল বটে --- আমার বাবা জার্মানীর সাপোর্টার । জেনে শুনে কি করে আব্বু এই চরিত্রহীন দলটিকে সমর্থন করেন , সেকথা ভেবে খারাপ লাগত ।

দেশে ছোট চাচার কাছে ফুটবলের গল্প করে একবার চিঠি লিখলাম । চাচা ম্যারাডোনার ছবিসহ একটা পোস্টকার্ড পাঠালেন , যেখানে ম্যারাডোনা কাঁদছেন , আর বাংলায় বড় বড় হরফে লেখা -- "রেফারীর কালো হাত গুঁড়িয়ে দাও"।

ম্যারাডোনার অশ্রু দেখে আমার মনটা সিক্ত হয়ে গেল , বিশ্বের একমাত্র ফুটবল খেলুড়ে দেশ আর্জেন্টিনার সমর্থক না হওয়া ছাড়া আমার আর কোন উপায়ন্তর রইল না ...........
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০১১ সকাল ৯:০০
৮টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×