ছুটির দিন এলেই মনটা ছটফট করে ওঠে। ঘরে মন বসে না। ইদানীং বন্দুক ছোঁড়া শিখেছি, পাখি-টাখি শিকারের শখ জাগছে। তাই সাপ্তাহিক ছুটির দিন এলেই হাতটা নিশপিশ করে। আমার বন্দুক নেই। যে বন্দুক নিয়ে শিকার শিখেছি সেটা আমার প্রিয় এক ছাত্রের। মফস্বল কলেজে শিক্ষকতা করি।
একেবারে অজ পাড়াগাঁ। ঊনসত্তর-সত্তর সালে মরসুমী ফুলের মত যেসব কলেজ গড়ে উঠেছে, তেমনি একটি কলেজে। ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে বেশ সম্মান-টম্মান পাই। যে সব ছেলে পড়াশুনোয় একটু ভোঁতা, এক-আধটু পার্টি করে, সুন্দর সুন্দর কাপড়-চোপড় পরে- তারা শিক্ষকদের সঙ্গে সাধারণত একটু বেশি খাতির করতে চায়।
তারা কলেজের মেয়েদের পেছনে ঘুর ঘুর করে, তারাই আবার পরীক্ষার আগে পড়ুয়ার মতো এক গাদা বই বগলদাবা করে শিক্ষকদের কাছে পরীক্ষায় খুব দরকারি-অদরকারি প্রশ্নগুলো জেনে নিতে আসে, সারা বছরের দুর্বিনীত ভাবটা ঝেড়ে-পুছে গদগদ হয়ে পড়ে, যখন-তখন সেলাম ঠুকে বসে।
এরা সাধারণত সহজ-সরল হয়, কলেজের যে-কোনো কাজেও তারা সবার আগে থাকে। নাসির সে রকম ছাত্র নয়। ভালো পাস করার ছাত্র। বুদ্ধিসুদ্ধি আছে, কলেজ বার্ষিকীতে গল্প-কবিতা লেখে। ছাত্র হয়েও তাই নাসির আমার বন্ধুর মতো।
সবে দেশ স্বাধীন হয়েছে, বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ফিরেছি কলেজে। নাসির করেছে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ, আমি কলম হাতে শব্দসৈনিক। নাসির বন্দুকটা আমাকে ধার দেয়। এক ছুটির দিনে তাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কলেজ থেকে মাইল ছয়েক দূরে একটি বড় বিল আছে।
বিলের দিকে পা ছড়িয়ে আছে পাহাড়। পাহাড়ে আছে পেয়ারা ও লেবু বাগান, আনারসের ঝাড়।
বর্ষাকালে এসব ফল হয় প্রচুর, শীতের দিনে পাতা ঝরতে ঝরতে এলোমেলো দিশেহারা। বিলও শূন্য খাঁ খাঁ। পাহাড়ও রুখু ও ঝিমিয়ে পড়া গাছপালা নিয়ে অভাবগ্রস্তের মতো হামলাতে থাকে।
বেরিয়ে পড়লাম খুব ভোরে, আঁধার কাটার সময়। নাসির একটা এয়ার-গান নিয়েছে। বের হতে একটু দেরিই হয়ে গেল। তবু ছুটলাম। দেরি হওয়ার জন্য নাসিরও একটু মনমরা। তাকে উৎসাহ দিতে কথা শুরু কলাম। গ্রাম ছেড়ে বিলের কাছে যেতে যেতে সকাল হয়ে গেল।
বিলে পা দিতেই গুলির শব্দ শুনতে পেলাম, দুম ট্যা ট্যা ট্যা। কুয়াশার ঘন জাল ভেদ করে শব্দ বুকে এসে লাগল জ্যান্ত বুলেটের মতো, আরও একটা শব্দ হল। কান আপনাতেই খাড়া হয়ে গেল, বন্দুকের শব্দটা পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে খান খান, টুকরো টুকরোর মত ছড়িয়ে পড়ল, ওই শিশিরের মতো।
বুঝতে পারলাম আমাদের আগেই বিলের পুকুরে শিকারী পৌঁছে গিয়ে শিকারীর কাজ শুরু করে দিয়েছে। বিলের মাঝামাঝি জায়গায় যে দুটি পাড় বাঁধানো বড় বড় পুকুর আছে সেখানেই নানা ধরনের জলজ পাখিদের আড্ডা। খোঁড়ল হাঁস, কাঁচি চোরা, ভুতি হাঁস, সরাল আসে।
পানকৌড়ি, ডাহুক, বক তো আছেই। এক সময় বিলটিই ছিল আস্ত একটি জলাভূমি বা হাওর। নলখাগড়া আর হোগলার বন ছিল। ওগুলো নিজে নিজে জন্মাত, আপনা আপনি মরে যেত, আবার গজিয়ে উঠত ছায়াপথের তারাপুঞ্জের মতো।
এখন পুকুর দুটো আর মাঝখানের হোগলা বনে পাখিরা আসে। শীতেই আসে। বন্দুকের শব্দ শুনে নাসির বলল, স্যার আর আর শিকার করা হল না। তখনই আবার গুলির শব্দ, দুম ট্যা ট্যা ট্যা, দুম। ফাঁকা বিলটা গুলির শব্দে কানায় কানায় ভরে গেল। নিজের বুকটা হতাশায় ছ্যাঁচড়া ছ্যাঁচড়া হয়ে গেল।
গুলির শব্দ যত শুনি ভেতরটা তত দুমড়ে-মুচড়ে ওঠে। মনে মনে নাসিরের ঘাড়ে দোষ চাপাই, নিজেকেও। সবচেয়ে বেশি শিকারীদের, তাদের উপর দোষ নয় গালমন্দ। কেন আরও আগে বের হলাম না, কেন নাসির দেরি করল, কেন শিকারীদের সুসময়ে ঘুম ভাঙ্গল।
শেষে ঠিক করলাম, কাজ নেই আর বিল পাড়ি দিয়ে। তারচেয়ে পাড়াগাঁর ভেতর দিয়ে যাই, যদি দু’-একটা হরিয়াল বা ঘুঘু মেলে। এদিকে রামঘুঘু আছে বলে শুনি। বিলের ধার দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। ধূ ধূ শূন্য বিল।
বিলের গায়ে লাগোয় পাড়া। মাঝে মাঝে পুকুরের উঁচু পাড়। পুকুরের পাশে, গ্রামের আশেপাশে শীতের ধান হয়েছে। বিলেও শুরু হয়েছে। গুণ গুণ করে গভীর নলকূপ থেকে পানি উঠছে। গ্রামের মেয়ে-বৌয়েরা পুকুর ঘাটে, ওখানেও কুয়াশার একটা টুকরো চলে গেছে।
মেয়েদের বাসন-কোসন মাজা, পানি ব্যবহারের একটা ছন্দ আছে। কুয়াশার যেমন ছন্দ আছে, স্তরে স্তরে সে নিজেকে ছড়াতে জানে, কোথাও ঘন আবার পাশেই পাতলা আবরণ বিছিয়ে নিতে জানে।
মেজাজটা যে বিগড়ে আছে। সুন্দর পাড়া। উঁচু একটা টিলার উপর গ্রামের হাইস্কুল।
এই স্কুল থেকে পাস করে ছাত্র-ছাত্রীরা আমাদের কলেজে আসে। পাশের অন্য কলেজটি যায় না। স্কুলের আশেপাশে খুব একটা বাড়িঘর নেই। টিলার বড় বড় বৃষ্টিশিরীষ ও বটগাছগুলো কুয়াশায় চমৎকার ডালপালা মেলে আছে। কুকুরের রোঁয়া ফোলার মতো নতুন করে আরও ঘন কুয়াশা জমেছে।
মাঝে মাঝে পাহাড় থেকে কুয়াশাবাহিনী সকালের দিকে এভাবে লোকজনকে দেখিয়ে দেখিয়ে ছুটে আসে। মাঝে মাঝে এভাবে এসে নয়-দশটা অবধি আসর জমিয়ে রাখে। বোধহয় সেই কুয়াশাই তেড়ে আসছে। নাসির পুকুরটা ঘুরে এগিয়ে চলল। সে হয়তো ভাবছে দু’ একটা কানা বক পেলেও হয়।
কিংবা কণ্ঠীঘুঘু, ডাহুক। ঠিক তখনই ভিটের পাশে নাল জমিতে ডাহুকটা চোখে পড়ল। দেখার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যাব অমন বোকা আমি নই। ডাহুক ভীষণ সতর্ক পাখি। আমি বরং ওকে না দেখার ভান করে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। সে বেঁটে-খাটো লেজটা গর্ব ভরে উঁচু করে ভিটের পাশে খাবার খুঁজছে।
লেজের নিচের লাল রংটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বার বার লেজ তোলা ও নামানো তার স্বভাব, চলতে চলতে বা খাবার খুঁজতে খুঁজতে সব সময়। মাত্র একশো গজখানেক দূরে। ওর সঙ্গে চোখাচোখি হওয়ার পরও সে পালিয়ে গেল না।
তবুও না দেখার ভান করে পুকরের পাড়ের কাছে একটা উঁচু আল নিয়ে বসে পড়লাম। নাসির ওদিকে কোথায় এক দলা কুয়াশার আড়ালে পড়ে গেছে। এতক্ষণ বৃষ্টিশিরীষ বা বটগাছে কোথায় যেন একটা ছিটঘুঘু ডাকছিল। পুকুরে আসা মেয়েদের কল কল শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
ডাহুকটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে সব শব্দ তার পেছনে পড়ে গেল। বন্দুক তুলে তাক করলাম। তখন কেন যে সে ‘কোয়াক কোয়াক’ ডাক পাড়ল বুঝতে পারলাম না। অমনি আমার বন্দুক থেকে ছররার শব্দ হল, দুম ট্যা ট্যা ট্যা। হ্যাঁ, ঘায়েল হয়েছে। একবার লুফিয়েও উঠেছে। ছটফট করছে। উঠে দাঁড়ালাম।
সঙ্গে সঙ্গে জোড়ের পাখিটা ভিটের বেত ও বাসকপাতার ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলো। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত জোড়ের পাখিটা পালিয়ে যায়। তা নয়, বন্দুকের গর্জন শুনে ডাহুকটা এভাবে বেরিয়ে আসবে ভাবতেও পারিনি। সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়লাম, ছররা ভরে ফের নিশানা ঠিক করলাম।
পাখিটা চুপচাপ লেজ নাচিয়ে এগিয়ে এল জখম হয়ে মরতে বসা সঙ্গীর কাছে। এসে ঠোঁট বুলিয়ে সোহাগ নাকি সান্ত্বনা জোগাল? ডাহুক এভাবে ভয়ডর হারিয়ে এগিয়ে আসবে, এরকম করবে আমার ধারণার বাইরে। পাখিবিষয়ক আমার জ্ঞানগম্যি ধুলোয় গড়াগড়ি।
তাই নিশেন ঠিক করেও চুপ করে রইলাম, দ্রুত সবকিছু আর একবার ভেবে নিলাম। এরি মধ্যে কখন যে নাসির পাশে চলে এল বলতে পারব না। টের পেতেই সে ফিস ফিস করে বলল, মারুন, মারুন, স্যার! আমার হাত কেঁপে উঠল, বুকে কেঁপে গেল।
আর আমাদের দেখেও পাখিটার ডরভয় নেই, আমাদের এত তুচ্ছ করল? কিসের জোরে? পাখিটা একবার আমাদের চোখ তুলে তাকাল। তাকাল নয়, যেন শাসিয়ে দিল। তারপর আবার মৃত্যু পথযাত্রী সঙ্গীর দিকে দেখল। ঠোঁট এগিয়ে দিল। সেই করুণ ও ভয়াবহ দৃশ্যের বর্ণনা দিতে পারব না আমি।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এসব ঘটে গেল। নাসির আবার চাপা গলায় বলল, স্যার, দেরি করছেন কেন? মারুন? প্রায় বকুনি দিয়ে থামতে বললাম ওকে। তারপর বন্দুক ফেলে সম্মোহিতের মতো ছুটলাম পাখি দুটোর দিকে।
ওদিকে যেতেই জোড়ের পাখি আহত সঙ্গীর দিকে ফিরে তাকাতে তাকাতে চলে গেল ভিটের নিরাপদ আড়ালে। তার মধ্যে ডাহুকের চঞ্চল স্বভাব নেই, ভয়ডরও সম্ভবত না। পোষা পাখির মতো আস্তে আস্তে ভিটের পাটিবেতের ঝাড়ে ঢুকে পড়ল।
ঝোপের ভেতর থেকে চিৎকার তুলে ডাকতে লাগল লাগাতার ‘কোয়াক কোয়াক কোয়াক’। সেই বুক দুমড়ানো সঙ্গী হারানোর বেদনার একটানা ডাক আর থামে না। কাছে গিয়ে দেখি পাখায় গুলি খাওয়া পাখিটা ধড়ফড় ছটফট করছে। সেই প্রথম পাখির মৃত্যু-যন্ত্রণা আমার বুকে বাজতে শুরু করল।
দাঁড়িয়ে রইলাম। নাসির আগেই ঝুঁকে পড়ে পাখিটা হাতে তুলে নিল। পাখিটা ফ্যাল ফ্যাল করে নাকি বিদ্বেষভরা চোখে রক্ত-লাল কনীনিকায় তাকাল। একটা ন্যাংটো বাচ্চা ছেলে এসে জুটল। গায়ে শাটের উপর গামছা জড়ানো। নাসির ছেলেটাকে বলল, ধর তো, জবেহ করি।
এরি মধ্যে আরও কয়েকটি বাচ্চা ছেলে এসে আমাদের ঘিরে ধরল। আমার চোখ চলে গেছে ভিটের ঝাড় থেকে আসা জোড়ের পাখির কাতর কান্নার দিকে, বাসকপাতার ঝোপের ভেতর থেকে বুক মোচড়ানো হাহাকারের প্রতি।
তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখি ডাহুকটাকে বুকে চেপে ঝোপ-ঝাড়ের ভেতরে এক মেয়ে দাঁড়িয়ে। কী বিষন্ন, কী মলিন মেয়েটির দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে। শিকারীর প্রতি অপরিসীম ঘৃণা এবং বেদনা নিয়ে তাকিয়ে আছে। ওর গায়ের কাপড় আধ ভেজা।
বোধহয় ভোরে উঠে স্নানের অভ্যেস আছে, বন্দুকের শব্দ শুনে অথবা ডাহুকের কান্না শুনে আলুথালু ছুটে এসেছে। ওর চোখের দিকে তাকাতেই অপরাধীর মতো চোখ নামিয়ে নিলাম। নাসির ডাক দিল, স্যার, চলুন। কাজ শেষ।
আমি আস্তে আস্তে সম্মোহিতের মতো মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেলাম। ওদের ভিটের বাসকপাতার ঝোপে সে দাঁড়িয়ে আছে। ফারহানা ফাল্গুনীকে চিনতে পারলাম কাছে যেতেই। সে আমাদের কলেজে বিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছে। মাত্র ক’দিন ধরে কাস করছে, কলেজের কাছে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকে।
তার সুন্দর চোখ-দুটি, মিষ্টি হাসি, শ্যামল সেই লাবণ্য নেই। কলেজের হাসিখুশি চাঞ্চল্য নেই- সেই ফাল্গুনীর কিছুই নেই। আমাকে দেখে সম্মানও জানাল না। অন্য সময় হলে তার শিকের জন্য কী না করত! কাছে গিয়ে মা চাইব কিনা ভাবছি।
সে জন্য বললাম, ডাহুক দু’টো যে তোমার পোষা জানতাম না। ফাল্গুনী আমার সঙ্গে কোনো কথা বলল না, কিছু বলার সুযোগও দিল না। জীবিত ডাহুকটি বুকে আগলে ধরে বেশ রুক্ষ্ণ গলায় নাসিরকে বলল, পাখিটা দাও। ওটা আমার।
পাখি দু’টি নিয়ে সে চলে গেল। নতুন করে নেমে আসা ঘন কুয়াশার মধ্যে আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম। এই ঘটনার পর ফাল্গুনী আর কোনোদিন কলেজে আসেনি। খোঁজ করে জানতে পারলাম সে পার্শ্ববর্তী বোয়ালখালী কলেজে ভর্তি হয়েছে।
সংগ্রহীত
মূল লেখকঃ বিপ্রদাশ বড়ুয়া

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



