somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চিকিৎসার জন্যে দেশী রোগীদের বিদেশ যাওয়ার কারণ এবং তা রোধে কিছু প্রস্তাবনা

২৩ শে জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৪:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গত পাঁচ বছরে বেসরকারী চিকিৎসা ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে। বেশ কয়েকটি হাসপাতাল বেসরকারী খাতে ইতোমধ্যে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে।

কিছুদিন আগেও প্রতি বছর হাজার হাজার রোগী পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, সিঙ্গাপুর ও ব্যাংককে যেত চিকিৎসাসেবা নেয়ার জন্য। বেসরকারী পর্যায়ে দেশে তেমন কোন উন্নতমানের হাসপাতাল ছিলো না বললেই চলে। বিশেষ করে হৃদরোগ আক্রান্ত রোগীরা বাইপাস বা ওপেন হার্ট সার্জারি করার জন্য ভারত বা ব্যাংকক কে বেছে নিত। কিডনি, হিপ ও নি রিপ্লেসমেন্ট, গাইনি ও অবস সহ নানাবিধ সমস্যা নিয়েও বহু রোগী দেশের বাইরে যেত চিকিৎসাসেবা নিতে।

এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, একশ জনের মধ্যে হৃদরোগ সমস্যায় ১৫ জন, লিভার ১০ জন, নিউরোলজি, ক্যান্সার এবং হিপ ও নি রিপ্লেসমেন্ট ৯ জন, কিডনি ৮ জন, চোখ, গাইনি ও অবস্ ৭ জন, নাক-কান-গলা ৫ জন, স্কিন ৪ জন। এছাড়াও অন্যান্য সমস্যার কারণে ১৭ জন রোগী বিদেশ যাচ্ছেন।

অথচ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, হৃদরোগ, নিউরোলজি, ক্যান্সার এবং হিপ ও নি রিপ্লেসমেন্টসহ বাংলাদেশে এখন অনেক জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এই সব চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে রোগী বাড়ীতে ফিরে যাচ্ছে এবং স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারছে। পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- রোগী বিদেশী মানের চিকিৎসা পাচ্ছেন অনেক অল্প খরচে। অথচ এই একই চিকিৎসা নিতে বিদেশ গেলে তাকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৩ থেকে ৪ গুন বেশী টাকা।

পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের সাথে বাংলাদেশের কিছু চিকিৎসা খরচের তুলনামূলক চিত্র :

হাসপাতালের নাম বাইপাস সার্জারি এনজিওগ্রাম
মাউন্ট এলিজাবেথ, সিঙ্গাপুর ২৫,০০০ডলার ১,৬০০ ডলার
বুমরুনগ্রাদ, ব্যাংকক ১০,০০০ ডলার ১,০০০ ডলার
এপোলো, কলকাতা ৫,০০০ ডলার ৩০০ ডলার
এসকর্টস্, দিল্লী ৫,০০০ ডলার ৩৬০ ডলার
বাংলাদেশের হাসপাতাল ৩,০০০ ডলার ২২৫ ডলার

হৃদরোগ ছাড়াও হিপ ও নি রিপ্লেসমেন্টের কথাই ধরা যাক। যেখানে বাংলাদেশে সব মিলিয়ে খরচ হয় হিপ দেড় লাখ এবং নি ২ লাখ টাকা। অথচ ব্যাংককে হিপ বা নি রিপ্লেসমেন্টের খরচই শুধু ৩ লাখ টাকা। এ হিসেব যাওয়া আসার ভাড়া, থাকা এবং খাওয়ার খরচ ছাড়া। তা ছাড়া রোগীর আসা যাওয়ার কষ্ট, আত্নীয়-স্বজনের মধ্যে অনিশ্চয়তা- এতোসব ঝামেলা তো রয়েছেই।

ঢাকার বিভিন্ন বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ১০০ জন রোগী ও তাদের আত্নীয় স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে- কী কী কারণে তারা চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাচ্ছেন। এমন ১০টি কারণ হচ্ছে :

১. দেশীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট হতে না পারা
২. রোগী বা তার আত্নীয় স্বজনের সাথে ডাক্তার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ঠিক মত কাউন্সেলিং না হওয়া
৩. ডাক্তাররা রোগ সম্পর্কে রোগী বা তার আত্নীয়দের সুস্পষ্টভাবে কিছু না বলা
৪. একই রোগ সম্পর্কে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ভিন্ন ভিন্ন মতামত
৫. ডাক্তার / হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অজ্ঞতা বা অবহেলার কারণে চিকিৎসারত অবস্থায় সামান্য অসুখ থেকেও রোগীর শারীরিক অবস্থা জটিল হয়ে পড়া
৬. রোগের চিকিৎসা নয়, রোগীর চিকিৎসা- এই ভাবে ডাক্তারদের না দেখা
৭. ভুল করে ভুল রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে আসলেও রোগীকে সঠিক ডাক্তারের কাছে না পাঠানো বা সঠিক গাইড লাইন না দেয়া
৮. প্রয়োজন না থাকলেও এক গাদা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দেয়া এবং পরবর্তীতে সে সব রিপোর্ট ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ না করা
৯. রোগীর প্রতি ডাক্তারের পর্যাপ্ত মনোযোগ না দেয়া বা তার সমস্যার কথা
বিস্তারিতভাবে না শুনেই প্রেসক্রিপসন লিখতে শুরু করা
১০. দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা তথা বেশীরভাগ হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা,
সন্তোষজনক সার্ভিস না পাওয়া এবং ডাক্তারদের প্রতি আস্থাহীনতা

এ ছাড়াও উল্লেখিত ১০০ জন রোগী ও তাদের আত্নীয় স্বজনদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, কীভাবে তারা বিদেশী ডাক্তার এবং হাসপাতালের খোঁজ পায়। এর মধ্যে :

০ বন্ধু বান্ধব ও আত্নীয় স্বজনদের কাছ থেকে জেনে ৩৯ জন
০ সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি ও অন্য রোগীদের কাছ থেকে শুনে ২৩ জন
০ বিদেশী হাসপাতালের দেশীয় লিয়াঁজো অফিস ও তাদের এজেন্ট এবং স্থানীয় ডাক্তারদের মারফত ২১ জন
০ একান্তই নিজের সিদ্ধান্তে ১৭ জন

রোগীদের কথা থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা গেল- ডাক্তারদের অবহেলা, রোগীদের পর্যাপ্ত সময় না দেয়া, সঠিক ভাবে রোগের ডায়াগনসিস না হওয়া, ভুল চিকিৎসা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ইত্যাকার কারণে রোগীদের মধ্যে দিন দিন দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। রোগীদের বিদেশমুখী হতে সাহায্য করছে। যদিও প্রায় সবাই অভিন্ন ভাবে বলেছেন, দেশের চাইতে বিদেশের চিকিৎসা ব্যয় ৩/৪ গুন বেশী। এটি জেনেও তারা নিরুপায় হয়েই বিদেশে যাচ্ছেন চিকিৎসা করাতে। অর্থনৈতিকভাবে অনেকে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছেন। তবু সান্তনা পাচ্ছেন এই ভেবে যে, সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন তারা।

এ ক্ষেত্রে রোগীদের দোষ না দিয়ে, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের পাশাপাশি বেসরকারী হাসপাতাল উদ্যোক্তাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। ডাক্তারদের প্রতি রোগীর আস্থা আর নির্ভরতা ফিরিয়ে আনতে হবে। রোগীদের সাথে ডাক্তারদের আন্তরিক ব্যবহার, একটু সময় নিয়ে রোগী দেখা, অপ্রয়োজনীয় টেস্ট না করতে দেয়া, সর্বোপরি রোগ সম্পর্কে রোগী বা তার আত্নীয় স্বজনকে সঠিক ধারণা দিতে হবে। রোগীর প্রতি ডাক্তারের দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে সরকারের তরফ থেকে সুস্পষ্ট কিছু নীতিমালা তৈরী করতে হবে। ভুল চিকিৎসা বা রোগীর প্রতি কোনো ধরণের অবহেলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, ডাক্তারদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। যে সকল চিকিৎসা আগে বাংলাদেশে সম্ভব ছিলো না, কিন্তু বর্তমানে হচ্ছে- সে সকল চিকিৎসার ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। বিদেশী হাসপাতালের স্থানীয় লিয়াঁজো অফিসের মাধ্যমে রোগীদের বিদেশে পাঠানো বন্ধ করতে হবে। বিদেশী হাসপাতালগুলো জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিদেশে চিকিৎসা নিতে রোগীদের উদ্বুদ্ধ করে যে সব বিজ্ঞাপণ দেয়- এ ব্যপারেও সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিভিন্ন গণ মাধ্যমেরও বিশাল ভূমিকা রয়েছে।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা, সাহায্য সহযোগীতা, চিকিৎসা খাতে সুস্পষ্ট কিছু নীতিমালা, রোগীর প্রতি ডাক্তারের দায়বদ্ধতা, আন্তরিকতা, মিডিয়ার গঠণমূলক সমালোচনার মাধ্যমেই কেবল মাত্র রোগীদের বিদেশমূখীতা কমানো যাবে। দেশীয় চিকিৎসার প্রতি রোগীদের আস্থা ফিরে আসবে। প্রতি বছর দেশের বাইরে শুধু চিকিৎসা খাতে যে কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে, তা বন্ধ হবে। দেশের টাকা দেশেই থেকে যাবে। পাশাপাশি বেসরকারী স্বাস্থ্যখাতে আরো অনেক উদ্যোক্তাই এগিয়ে আসবেন- এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
১১টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×