শিলিগুড়ি নামলাম ২ টার সামান্য আগে। দুপুরের খাবার সেরে আবার গাড়ীতে। এবার টাটা সুমু জিপে। শহর পেরিয়ে গাছপালা ঘেরা রাস্তায় ছুটছে জিপ। শুকনা ক্যান্টনমেন্ট পার হবার পরই শুরু হলো পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা। ১৮১ টা বাঁক পেরিয়ে আমরা যখন দার্জিলিং শহরে....তখন সন্ধা। ৩০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে এখানে শ খানেক হোটেল আছে। লাদেন লা রোডে আছে হোটেল গারুডা, হোটেল রাজ প্যালেস, হোটেল অপসারা, হোটেল ইউমা। দত্ত সরণীতে পাবেন হোটেল দিলখোশ, শ্রেষ্ঠ লজ। মল (স্থানীয় ভাষায় মেল বলে) চৌরাস্তায় আছে হোটেল সেভেন সিজ, দি প্লাজা হোটেল, প্যীতি লজ, বেলিভো হোটেল, হোটেল সানফ্লাওয়ার, পাইনরাইজ হোটেল এইসব।
হাত বাড়ালেই এখানে মেঘ ধরা যায়। সেই মেঘে অল্প অল্প ভিজতেও হবে আপনাকে। সমতল থেকে ৬৭০০ ফুট উঁচুতে ভারতীয় এই শহরের নাম দার্জিলিং। দুনিয়ার সেরা চা পেতে চাইলে কিংবা খুব কাছ থেকে দেখতে হলে কান্চনজঙ্ঘা পর্বত, নয়তো ৭৮০০ ফুট উঁচু টাইগারহিল থেকে সূর্যোদয় দেখতে চাইলে - দার্জিলিংয়ের বিকল্প নেই। পাহাড়ের গা কেটে বানানো এই শহরের মানুষগুলো হাঁটতে ভালোবাসে। হোটেল ব্যবসা, গাড়ী চালানো আর চা বাগানে কাজ করেই তাদের চলে যায়। এখানকার প্রধান ভাষা নেপালি হলেও হিন্দী-বাংলা-ইংরেজি তিন ভাষাই চলে এখানে। সারা বছরই শীত। তবে নভেম্বর, ডিসেম্বরে তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ২ / ৩ ডিগ্রিতে। এই শহরের মানুষগুলোও সে রকম ঠান্ডা মেজাজের। এখানকার গাড়ী চালকদের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যেতে ৮০ কিলো রাস্তার ১৮১ টা বাঁক পেরুনোর সময় এরা ৩-৪ বার হর্ন বাজায় মাত্র। বাকী পথে আপনি ভয়ে চোখ বুঁজে ফেললেও এরা চালিয়ে যাচ্ছে নির্বিকার !
দার্জিলিংয়ের প্রথম গন্তব্যটা মল চৌরাস্তা। যাওয়ার পথে দুধারে হাজার পণ্যের সম্ভার। শীতের স্যুয়েটার, কাশ্মীরি শাল, ছাতা, ব্যাগ, জুতা, উপহার সামগ্রী... কত্তো কী ! এছাড়াও এখানে পাবেন চা, রুপা ও কাঠের গহনা, মুখোশ, ঘন্টা এই সব। খাবারের দোকানও আছে বেশ কিছু। যা কিনবেন, দামাদামি করেই কিনতে হবে। মল চৌরাস্তায় রোজ বিকেলে হাজার মানুষের মিলনমেলা হয়। চা-পান-আড্ডা সব মিলিয়ে যেনো ঢাকার টিএসসি। ঘোরাঘুরি সেরে নিন রাত ৮ টার মধ্যে। হোটেলের কার্ডটা সাথে রাখুন। পথ হারালেও ভয় নেই, কেউ না কেউ আপনাকে হোটেলে পৌঁছে দেবে।
দার্জিলিং শহরে মোটামুটি ১৭ টি দর্শণীয় স্থান আছে। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে :
ক) থ্রি পয়েন্টস
৭৮০০ ফুট উঁচুতে টাইগার হিল। খুব ভোরে এখানে পর্যটকদের ভীড় লেগে যায়। আকাশ সারাক্ষণ মেঘলা থাকার কারণে সূর্যোদয় দেখতে পারাটা ভাগ্যের ব্যাপার। টাইগারহিল থেকে ফেরার পথে পড়বে পৃথিবীর অন্যতম উঁচু রেল স্টেশন ঘুম। এর উচ্চতা ৬৯০০ ফুট। তারপর বাতাসিয়া লুপ। ছোট্ট পার্ক থেকে দেখা যাবে পুরো দার্জিলিং শহর। এই ৩ পয়েন্ট দেখার পর রাস্তার পাশের দোকান থেকে পুরি আর সবজী দিয়ে সকালের নাস্তাটা সেরে নিন।
খ) সেভেন পয়েন্টস
চিড়িয়াখানা ও হিমালয়ান মাউন্টেইনেরিং ইনিস্টিটিউট এক সাথে দেখা যাবে। পরবর্তী গন্তব্য চা বাগান। ছবি তোলার জন্য দারুণ জায়গা ! এর একটু উপরেই পাহাড়ের গায়ে তিব্বতি এতিমদের আশ্রম। পাশেই তেনজিং রক। দড়ি বেয়ে ১১০ ফুট পাহাড়ে উঠতে হলে ১৫ টাকার টিকিট করতে হবে। এই সব দেখতে দেখতেই দুপুর।
গ) ফাইভ পয়েন্টস
প্রথমে যাদুঘর দেখা। তারপর জাপানি মন্দির। লাল কুঠি বা কাউন্সিল হাউজ দেখার পর এভা আর্ট গ্যালারি। সবশেষে ধীরধাম মন্দির।
ঘ) স্পেশাল পয়েন্টস
এবার গঙ্গামায়া পার্ক। দার্জিলিং শহর থেকে ৩৫০০ ফুট নিচে। ঝরণা-ঝুলন্ত ব্রিজ-রং করা বিশাল সব পাথর....আরো কত্তো কী আছে ভেতরে ! ১০ টাকার বিনিময়ে নেপালি পোশাক পাওয়া যায়- ছবি তোলার জন্য। সকাল ৮ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত খোলা থাকে এ পার্ক। পার্ক থেকে বেরিয়ে আসুন। সামনেই গুলশান কফি হাউজ। বিকালের নাস্তাটা সেরে নিন এখানে। দোকানের মালিক মোঃ ইব্রাহিম বাট। চমৎকার বাংলায় কথা বলেন এ ভদ্রলোক। ফেরার পথে রক গার্ডেন। এখানে ৪০০ ফুট উপরে রয়েছে চমৎকার ব্রিজ আর ঝরণা। এটা খো থাকে সকাল ৮ টা থেকে বিকেল ৪ টা পর্যন্ত।
যেতে চান ?
হানিফ, এস আর পরিবহন যায় বুড়িমারি বর্ডার পর্যন্ত। শ্যামলী পরিবহন যায় শিলিগুড়ি পর্যন্ত। অবশ্য বর্ডার পেরিয়ে গাড়ী পাল্টাতে হবে আপনাকে। সাথে নিন : গরম স্যুয়েটার / জ্যাকেট। দার্জিলিং ১২ মাসই শীত। দুরবীন, ক্যামেরা, ব্যাটারি, ফিল্ম নিয়ে নিন। তবে ছবি যাই তোলেন না কেনো, সেখানেই ডেভেলপ করে নিতে হবে। অন্যথায় বর্ডারে আপনার ক্যামেরা থেকে ফিল্মটা খুলে রেখে দেবে। ডিজিটাল ক্যামেরার মেমোরি কার্ডটা খুলে রেখে দিন স্বযতেœ। যাবার পথে ক্যামেরা বা মোবাইলের কথা পাসপোর্টে উল্লেখ করুন। তো রেডি হয়ে যান...১.....২.....৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

