somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আস্তিক-নাস্তিক দ্বন্দ্ব এবং আমার নিজের অবস্থান ।।।

০৮ ই আগস্ট, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সেদিন আমার এক বন্ধুর সাথে দেখা হলো, যে কিনা সামুর অনেক পুরনো এবং বর্তমানে খুবই অনিয়মিত ব্লগার। কেমন আছি, কি খবর কথার পর এক সময় সামুর প্রসঙ্গ উঠলো। আমি কথা তুলতেই সে একেবারে আমাকে থামিয়ে দিলো। পরে কথা বলে বুঝলাম সে আস্তিক নাস্তিক আর যুদ্ধাপরাধী বিতর্ক নিয়ে বিরক্ত। আমার মাথায়ও হঠাৎ করে ব্যাপারটা বেজে উঠলো। এই বিতর্কগুলো আমি বরাবরই এড়িয়ে যাই। বাসায় এসে পুরান কাসুন্দি ঘাঁটার মত গত কয়েকদিনের ধর্ম সংক্রান্ত লেখাগুলো পড়ে দেখলাম।
এই ব্যাপারগুলো নিয়ে তর্ক করার কোন ইচ্ছে আমার নেই। আমি আস্তিক বা নাস্তিক কারো পক্ষ নিয়ে লেখছিনা। পুরো লেখাটা পড়ে দেখার আগে কেউ কোন ধারণা করে নেবেননা দয়া করে।

এখন, আমার পর্যবেক্ষণ থেকে উঠে আসা পয়েন্টগুলো হচ্ছেঃ
১। আস্তিক হিসেবে লেখা বেশিরভাগ লোকই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। এদের লেখায় মন্তব্যগুলোও তাই বেশি আসে।
২। এই মন্তব্যগুলোর একটা বড় অংশ থাকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গীর। প্রায় ক্ষেত্রেই এদের দেয়া উত্তরগুলোও থাকে এরকমই।
৩। এখানে আবার একটা চালু বিতর্ক আছে, জাকির নায়েকের পক্ষ এবং বিপক্ষ। কারো মতে জাকির নায়েক ব্যবসা করছেন, কারো মতে উনি ঠিকই করছেন-আর কিছু না হোক মানুষকে খারাপ কিছু করতে বলছেন না।
৪। ইসলাম বিরোধী বেশিরভাগের মূল যুক্তি হচ্ছে, এখানে যুদ্ধকে সমর্থন করা হচ্ছে এবং যে ধর্মে জিজিয়া কর রাখা হয়েছে তারা কখনো মানবতার কথা বলতে পারে না।
৫। বোরখা নিয়ে কিছু তিক্ত ঝামেলাপূর্ণ পোস্ট দেখলাম। এবং সত্যিকার অর্থে এগুলোতে তেমন কোন যুক্তি দাঁড় করানো হয়নি।
৬। মন্তব্যের একটা ধারা আছে যেখানে ধর্ম আর জ্ঞান-দর্শনকে বিপরীত অবস্থানে রাখা হয়েছে। একটাকে বেছে নিলে আরেকটা ছেড়ে দিতে হবে।
৭। নাস্তিক্যবাদ এবং ধর্মবিরোধী পোস্টগুলোর তীব্র এবং উল্লেখযোগ্যভাবে অশালীন সমালোচনা করা হয়েছে কিছু পোস্টে।
৮। কেউ ধর্ম আর বিজ্ঞানকে দুই মেরুতে নিয়ে আসছেন, কেউ এদেরকে আলাদাভাবে না দেখার কথা বলছেন (৬ নম্বরের মতোই হয়ে গেল অবশ্য-শুধু বিজ্ঞান কথাটাকে এখানে গুরুত্ব দেয়া হলো)
৯। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানীদের বর্বরতা এবং জঙ্গীবাদের সাথে ইসলামিক রেফারেন্সের সামঞ্জস্যতা বের করার পক্ষে কিছু পোস্ট আছে।
১০। ধর্ম একটি প্রোডাক্ট এবং রাজনীতির হাতিয়ার-কথাটি এসেছে বেশ কয়েকটি পোস্টে।

এগুলো দেখে আমার কিছু ধারনা তৈরি হয়েছেঃ

১। যেহেতু, তীব্র অশালীন বিতর্কের পরও পোস্টগুলো রয়ে গেছে এবং উল্লেখযোগ্য কোন নোটিশ আসেনি এ সম্পর্কে, সেহেতু আমার মনে হচ্ছে, সামু এটাকে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। এটা আসলে সমস্যা না। সামু চালানোর টাকা সামুকে এই ব্লগ থেকেই তুলতে হবে। সমস্যাটা হলো সামু অশালীন বিতর্ককে বৈধতা দিয়ে দিচ্ছে না। সামুর এ ধরনের দ্বিমুখী নীরবতা হতাশা এবং সন্দেহজনক।
২। গুজরাটে যখন দাঙ্গা হয়, তখন আমি যথেষ্ট ছোট। খালি এতটুকু আমার মনে আছে, এ ঘটনার শুরুটা ছিল খুবই তুচ্ছ। এখন বুঝি, ব্যাপারটাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছিল। ব্লগীয় এই দাঙ্গাগুলো কিন্তু অল্প কয়েকটা পোস্ট থেকে শুরু হয়েছে। ব্যাপারটা চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়ছে। আপনি আদৌ বলতে পারবেন না যে পোস্টগুলো তীব্র নাস্তিক্যবাদ প্রকাশ করছে তার লেখক আদৌ নিতান্তই আনন্দ নেয়ার জন্যে করছেন কি না। একই কথা ধর্মের পক্ষে লেখা আগ্রাসী পোস্টগুলোর জন্যও প্রযোজ্য।
৩। "আয়রন হিল" নামে একটা বই পড়েছিলাম। সেখানে লেখা ছিল এরকম যে একটা মানুষ জন্মের পর থেকে কি করবে, কি খাবে, কোথায় পড়বে, কিভাবে কথা বলবে এমনকি কাকে ভালোবাসবে কিংবা কাকে বিয়ে করবে সেটি নির্ধারিত হয় ওই দেশের ব্যবসায়ী সংস্কৃতি দিয়ে। আস্তিক্য এবং নাস্তিক্য নিয়ে লেখা বড় বড় নিকগুলো যদি একই বা কাছাকাছি মানুষের হয়-সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
৪। ধর্মকে কিছু জায়গায় প্রোডাক্ট বলা হয়েছে। কথাটা আংশিক সত্য। ধর্ম তাদের জন্য প্রোডাক্ট যারা এটাকে ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করছে এবং যারা সে ব্যবসাটাকে গ্রহণ করছে। আমি যদি নিজেকে ধর্মের তীব্র বিরোধী দাবি করি অথবা নিজেকে অসম্ভব ধর্মপিয়াসু প্রমাণ করতে পারি তাহলে আমার যে কোন একটা পক্ষের প্রিয়ভাজন হয়ে যাবার সম্ভাবনা খুবই বেশি। যেটাকে আমি ব্যবসায়িক এবং রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে পারি। আমার ব্লগে যদি লাখখানেক লোক নিয়মিত আসে তারা আমার প্রমোট করা ওয়েবসাইটে ঢুঁ মেরে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। এটা খারাপও না। শুধু এটা যদি করা হয় মানুষের বিশ্বাসকে ম্যানিপুলেট করে তাহলে এটার নিন্দা করা উচিৎ বলে আমি মনে করি।
৫। আবার একটা গল্পের রেফারেন্স। আইজাক আসিমভের একটা গল্প ছিলো, খুব সম্ভবত নাম হল "জোক"। এতে কল্পনা করা হয়েছে, মানুষের হাসি মানুষকে অন্য সব প্রাণী থেকে আলাদা করে। মানুষ কিছু কৌতুকে অযথাই হাসে যেটি কিনা শেষ পর্যন্ত দেখা যায় অন্য কোন এক গ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীর একটি পদ্ধতি যাতে তারা মানুষকে বিশ্লেষণ এবং ম্যানিপুলেট করতে পারে। একজন বিজ্ঞানী ব্যাপারটি ধরতে পারার পর মানুষ হাসতে ভুলে যায় এবং নতুন কোন একটি পদ্ধতি তৈরী হতে থাকে। কোন সমস্যা তৈরী করা হয় এর সমাধান বিক্রি করার জন্য। ২০১২ সালে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া আর ইন্‌কা দিনপঞ্জী নিয়ে বিশাল ব্যবসা হয়ে গেছে। এ ঘটনার আগেও ২০০০ সালের ৫ই মে পৃথিবী ধ্বংস হওয়া নিয়ে ব্যবসা হয়েছে। খেয়াল করে দেখবেন, বাইরের বিভিন্ন ব্লগে এই প্রসঙ্গটি নতুন। রেফারেন্স আর পালটা রেফারেন্সের বহর আমাকে একইসাথে হতাশ এবং অসহিষ্ণু করে তোলে ; সত্যিকার অর্থে এরা তাই চাচ্ছে।

এখন আমি যদি ১-১০ পর্যন্ত পয়েন্ট ধরে পক্ষে কথা বলতে চাই, পারবো। বিপক্ষে চাই, সম্ভব। ভেবেছিলাম তাই করবো। কিন্তু, পক্ষপাতহীনতা মানে সমানভাবে পক্ষপাতদুষ্টতা নয়।

মানুষের হাতে প্রযুক্তি ছাড়াও মোরাল ডেভেলপমেন্টের জন্য অন্য কিছু দরকার। এটা হতে পারে টেলিভিশন, কার্টুন, চলচ্চিত্র, রাজনীতি, বই, কবিতা, ধর্ম বা আরো অন্য কিছু। টেলিভিশন বা কম্পিউটার অথবা ইন্টারনেট অনেকটা দক্ষভাবে মানুষকে সাহায্য করতে পারে। তবে ধর্মবোধ মানুষের জাজমেন্ট তৈরীতে সাহায্য করে। এটা না মানলেও সমস্যা নাই, অপমান না করলেই হলো। যুদ্ধ কিন্তু আমরাও করেছি ১৯৭১-এ, মুক্তির জন্য ; অসহিষ্ণুতা তৈরীর জন্য নয়। মানুষকে ভালোবাসতে ধর্মকে ঘৃণা করার দরকার নেই। জ্ঞান এবং ধর্ম দু'টির কোনটির রাস্তাই কারো জন্য বন্ধ করে রাখা হয়নি। আবার একে ব্যবসা বানানোরও কোন প্রয়োজন আমি দেখিনা। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি দু'টি ভিন্ন জিনিস। তেমনি ধর্ম, ধর্মপ্রচার, ধর্মব্যবসা আর ধর্ম রাজনীতি এগুলো আলাদা।

কালকে দেখলাম, ১২ বছরের একজন ছোট্ট আপুনি সামুতে ছড়া লিখেছে। আমার দেখতে ভালোলাগে।

তারপরও যদি কেউ ধর্ম-অধর্ম নিয়ে আমাকে বিতর্কের মুখোমুখি করেন...
দেখা হবে...
আপনাকে হাসন বা লালনের গান শুনিয়ে দেব...
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ বিকাল ৫:৫৮
১০টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×