শান্তি লাগছে রায়হানের অনেক দিন পর পুরোনো যায়গায় আসতে পেরে । সামনে কুল কুল ধ্বনিতে বয়ে চলছে তার প্রিয় নদী ফটকি । আহ শান্ত স্নিগ্ধ সেই তার ছোটবেলার নদী । কত স্মৃতি কত ভালবাসা জড়িয়ে আছে এই নদীটার সাথে । এইতো এইখানে দলবেধে মাছ ধরা, ওইখানে চলত ডুঁবসাতারের খেলা । শুধু পরিবর্তন বলতে নেই সেই বৃহৎ হিজল গাছ, সেখানে নাম না জানা অন্য একটা গাছ মাথা উচু করে দাড়িয়েছে । এতে অবশ্য বর্তমানের ছোট বাচ্চাদের সমস্যা হওয়ার কথা না, যেমন তাদের হয়নি কখনো । খেলা শেষে হিজল গাছ থেকে ধুপধাপ করে শান্ত নদীকে অশান্ত করার প্রতিযোগীতায় মত্ত হত তারা । ভুলে যাওয়া অতীত বারবার আজ সামনে আসছে ।
- কেডা মোল্লার পো নাকি ? তা আছ কিরাম বাবাজী ?
মাঝ নদী থেকে হাঁক ছাড়ে এক পৌড় মাঝি ।
রায়হান দ্বিধামিশ্রিত কন্ঠে বলে
- জ্বী চাচা আছি ভালই আপনাদের দোয়ায়, আপনার শরীরের অবস্থা কি ?
- এই বাবা চলে যাচ্ছে দিন । বাড়িতে আইসো তোমার চাচীরে একবার দেখে যেও ।
- আচ্ছা চাচা দেখি, চাচীরে আমার সালাম দিয়েন ।
পৌড় মাঝি স্মিত হাসতে হাসতে তার নৌকা নিয়ে এগিয়ে চলে তার জীবনের মত করে, হয়ত এর শেষ সামনেই অথবা বহুদূরে ।
- কে রে উনি, মজিদ চাচা নাকি ?
কিছুদুরে শায়িত হাসিবকে জিজ্ঞাসা করল রায়হান ।
- হ কাকা, উত্তর পাড়ার মজিদ দাদা, হাটে গেছিল মনে হয় ।
আবার স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে রায়হান । এই মজিদ চাচার গাছ থেকে কত আম চুরি করেছে দলবেধে ওরা । সন্ধ্যা হয়ে গেলে চুরি করতে যেত কিংবা খুব ভোরে কুঁড়াতে যেত আম এই মজিদ চাচার বিশাল আম বাগানে । একবার সে ধরা পড়েছিল মজিদ চাচার হাতেই । চাচা বলল মোল্লা বাড়ির পোলা হয়ে চুরি করতে আইছো আমারে বলতে কত আম লাগে দিতাম । তারপর নিজ হাতে আম পেড়ে দিয়েছিলেন কিন্তু বুঝতে পারেন নাই বা বুঝার চেষ্টা করেন নাই বন্ধুদের সাথে আম চুরি করে খাওয়ার মজাই আলাদা । তারপর থেকে সে কখনো ভুলেও মজিদ চাচার বাগানের দিকে যায়নি ।
- চাচার আম বাগান আছে নাকিরে হাসিব
- না কাকা, শমসের ব্যাপারীর কাছে বেঁচে দিছিল ছেলেরে বিদেশ পাঠানোর জন্যি কিন্তু যাবার পারে নাই ধরা খায়ছে
গ্রামটা কেমন যেন বদলে গেছে,নেই সেই আগের মত তার প্রিয় ছোট্ট গ্রাম, যেখানে মিশে আছে তার পুর্বপুরুষদের ঘাম, নেই সেই ছোটবেলায় দেখা উচ্ছলতা তবুও এটা তার গ্রাম, প্রিয় শৈশবের গ্রাম । আজ তিনদিন হল এসেছে সে তার মায়ের মৃত্যুর কারনে। বাবা অনেক আগেই বিগত হলেও মা একাকী ছিলেন এই নিভৃত পল্লীতে । নিতে চাইলেও যেতে চাইতেন না আধুনিক শহরে একবার অনেক জোরাজুরির পর শহরে এসেই গ্রামে ফেরার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলেন তার নাকি দম বন্ধ হয়ে আসে । তাই ফিরেছিলেন, তার গন্তব্যে বাঁধা দিয়েও আটকাতে পারিনি ও । শুধুই মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠিয়ে নিজের দ্বায়িত্ব শেষ করেছে সে, কিংবা খুব অসুস্থ হয়েপড়লে কাউকে বলে দিয়েছে কাছের কোন হাসপাতালে নিয়ে যেতে বা কৃত্রিম দুঃখ বোধ জানিয়েছে তার সমব্যথি মায়ের জন্য । তবুও সে আসেনি, দেখিয়েছে কৃত্রিম ব্যস্ততা যে মা তার জন্য কত বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছে তার জন্য সে বের করতে পারেনি এক চিলতে সময় । যে ভিটাই পা দিলেই অন্যরকম শান্তিতে ভরে উঠে মন, সেই শান্তিকে সে পদদলিত করে খুঁজে ফিরেছে কৃত্রিম শান্তি, হয়তোবা খুঁজে ফিরবেও ।
মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে দীবাও আসতে চেয়েছিল, অনিচ্ছা থাকা সত্বেও বলতে হয়েছে তাকে, আসতে হবেনা তোমায় । শুধু শুধু যেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পার তুমি আর দিহান । হয়ত স্বস্তির নিঃস্বাস ফেলেছিল দীবা এই ভেবে যে সে অসুস্থতার হাত থেকে বেঁচে গেল কিংবা কৃত্রিম দুঃখ প্রকাশের হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার জন্য । না, সে শহরে সমবেদনা পেয়েছিল অনেক, হোকনা সেটা স্বার্থপরতার খোলসে আটকানো তবুও তো সমবেদনা । তবে অকৃত্রিম ভালবাসা দেখেছিল গ্রামের মানুষের মাঝে, যাদের কাছে এখনো সে সেই ছোট্ট রায়হান কিংবা তার মা তাদের কারো কারো কাছে বড়মা, ভাবী কিংবা মোল্লা বাড়ির বউ ।
মায়ের কবরের আনুষ্ঠনিকতা শেষ হওয়ার পর থেকেই সে এসে বসেছে তার ছোটবেলার প্রিয় নদীর পাড়ে যেখান থেকে কতবার যে তার মা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে তার ইয়ত্তা নেই । আজ তিনদিন হল সে গ্রামে এসেছে, ছুটি শেষ হয়েছে গতদিনই, তবুও কেন জানি যেতে ইচ্ছা করছে না তার । পার করে দিতে ইচ্ছা করছে বাকিটা জীবন এই নদীকেই সামনে রেখেই । জানে সে, সেটা কখনো সম্ভব না । সে পারবে না শহুরে হাতছানিকে উপেক্ষা করতে তবুও এই অসম্ভব চিন্তা করতে ভালই লাগছে তার ।
হঠাৎ করেই যেন পালটে গেল সবকিছু, শুনতে পেল অসংখ্য কলকাকলী । দেখতে পেল একদল দুরন্ত ছুটছে হিজল গাছের দিকে, প্রতিযোগীতা চলছে কে আগে হিজল গাছ থেকে ঝাপিয়ে পড়ে শান্ত নদীকে অশান্ত করবে । তার মাঝে সে দেখতে পাচ্ছে তার ছোটবেলার বন্ধুদের, রায়হান কখনো লাস্ট হয়নি দৌঁড়ে আজো সে হতে চাইনা । জানিয়ে দিতে চায় আমি শেষ হয়ে যায়নি, খুলতে শুরু করে সে তার শার্ট । শার্ট খুলে উঠে দাঁড়াতেই দেখে ফোন এসেছে, দীবার ফোন । রায়হানের প্রচন্ড ইচ্ছা করছে ফোনকে উপেক্ষা করে ছুটে যেতে তার সেই প্রিয় হিজল গাছের দিকে তারপর শুন্যে ঝাপিয়ে পড়ে শীতল পানিতে নিজেকে সমর্পন করতে সেই ছোটবেলার মত যা সে নিয়মিতই করত ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

