somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সিডর.......... হৃদয় ভেঙ্গে যাওয়া কিছু ঘটনা...........

১৫ ই অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ১১:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রলোন্কারি ঘুর্নিঝড় সিডরের কিছু পর পরই অফিসের ষ্টাফদের সাহায্যে ছোটোখাটো একটা ফান্ড দাড় করিয়ে ছুট দিয়েছিলাম সাউথখালি, তাফালবাড়ির উদ্দেশে। আমি, নজরুল স্যার আর শফিক ভাই। পুরো সাউথখালি আর তাফালবাড়ি জুড়ে য়ে ধংসলিলা দেখলাম তা এক কথায় অবর্ণনীয়, অবিশ্বাস্য। সে অভিজ্ঞতার কথা বলা যাবে অন্য কোনদিন। আজ সেই ঝড়ের সময়ের ঘটে যাওয়া কিছু অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা বলব যা সেখানকার মানুষের মুখে মুখে ফেরে আজও।

ঝড়ের দিন এলাকায় সন্ধ্যার অগে থেকেই মাইকিং করা হয়েছিল জলোছ্বাস হতে পারে - সবাই যেন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে চলে যায়। কিন্ত কেউই এতো বড় বিপদের কথা আচ করতে পারেনি। রাত আটটার দিকে আগুনমুখো নদীর বাধ ভেংগে দ্রত পানি ঢুকতে থাকায় অতংকিত হয়ে পড়ে গ্রামের মানুয,ছুটতে থাকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর দিকে।তাফালবাড়ী এলাকার এক মহিলার ছিল দুই মেয়ে।বড়ো মেয়ে স্কুলে পড়ে -বয়স ৮/৯ বছর,ছোটটা ২/৩ বছরের ।তাদের ঘরে পানি ঢুকতে শুরু করার পর তারা ঘর ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রের উদ্দেশে বেড়িয়ে পড়ে ।মা তার ছোট মেয়েকে কোলে নিয়েছে,বড়টা পেছন পেছন। রাস্তার উপর তখন পানির তীব্র স্রোত । পানির উচ্চতাও বাড়ছে দ্রুত। রাস্তার দুইপাশে বাবলা গাছ লাগানো সারি দিয়ে । বিদ্যুতের ঝলকে সেই গাছ একটার পর একটা ধরে ধরে এগোছে মা, একইভাবে পেছনে মেয়ে। চারিদিকে প্রচন্ড ঝড়। রাস্তার মাঝমাঝি আসার পর একটা গাছ ভেংগে এসে মেয়েটার পেছেনের হাত দিয়ে ধরা গাছটার উপর পড়ল। আটকে গেলো তার হাত। তার চিৎকারে ঘুরে দাড়ালো মা।দুজন মিলে বহু চেষ্টা করেও হাতটা ছাড়াতে পারল না। এদিকে স্রোতের সংগে পানিও বেড়ে চলছে দ্রুত গতিতে। মা তখন দিশাহারা। ছোট্র বালিকা আকুল হয়ে কাদছে, মা আমাকে বাচাও আমাকে বাচাও। মা বুঝলো আরো কিছুক্কন থাকলে কোলের ছোট মেয়েটাকেও আর বাচানো যাবেনা। মা আস্তে আস্তে চলতে শুরু করলো। পেছনে তখন বড় মেয়ে চীত্কার করছে, মা আমার হাতটা কাইটা আমাকে নিয়ে যাও .. আমাকে রাইখা যাইও না। পরদিন পানি নেমে গেলে ছোট্র মেয়েটার লাশ পাওয়া যায় গাছের ফাকে হাত আটকানো অবস্থায়।

সাউথখালি গ্রামে ঝড়ে উড়ে যাওয়া এক ঘরের পাকা মেঝেতে বসে থাকা এক লোককে কিছু সাহায্য করেছিলাম আমরা। পেশায় সে কাঠ মিস্ত্রি। ঘরের ধ্বংস স্তুপ দেখলে বোঝা যায় বেশ ডিজাইন করে সে তার ঘর বানিয়ে ছিলো। সেই রাতের কথা বলতে গিয়ে সে আর তার স্ত্রী চোখ মুছছিলো বারবার।সে রাতে দ্রুত পানি বাড়তে থাকায় ঘর ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।লোকটার ৩ ছেলে।বউ এর কোলে ৬/৭ মাসের ছোটো বাচ্চাকে দিয়ে আর নিজে ৩/৪ বছরের ছেলেটাকে কোলে নিয়ে সে বড় ছেলেকে বলল তার পাশাপাশি হাটতে। তীব্র স্রোতের পানিতে কিছুক্খন হাটার পর বড় ছেলে জানালো সে আর হাটতে পারছেনা, পানি ইতোমধ্যে তার বুক সমান এসে গেছে।অগত্যা লোকটা তার বড় ছেলেকে বলল কাধ ধরে ঝুলে পড়তে। বাবা তার দুই ছেলেকে নিয়ে তীব্র স্রোতের পানি ভেংগে হাটতে লাগলো। পানি বাড়ছে ধীরে ধীরে সেই সংগে বাড়ছে স্রোত। কিছুদুর যাওয়ার পর হাপিয়ে গেলো বাবা। দাড়িয়ে পড়ল। অবশ হয়ে গেছে শরীর।আশ্রয় কেন্দ্র তখনও অনেক দুরে। এদিকে তার মনে হচ্ছিলো এখুনি মারা যাবে সে।তাই সে বড় ছেলেকে কাধ ছেড়ে দিয়ে একটু নেমে দাড়াতে বলল। ছেলে বলল, আমি যে ভেসে যাব বাবা। লোকটা ভেংগে যাওয়া মানুষের মতো বলল, আমিতো আর পারছিনা বাবা। ছোট্র বালক বাবার বিপদ বুঝতে পেরে ছেড়ে দিলো বাবার কাধ , আর মুহুর্তের মধ্যে স্রোতের টানে হারিয়ে গেলো চিরোতরে।ঘটনাটা বলতে বলতে লোকটা দুরে বিস্তির্ন ধান খেতের দিকে হাত উঠিয়ে দেখাল সেখানেই কোথাও রয়েছে প্রিয় পুত্রের লাশ, তখন পর্যন্ত খুজে পায়নি সে। প্রিয় পুত্রকে নিজ হাতে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া বাবার চোখে অদ্ভুত এক আঁধারের ছায়া।

প্রিয়জন হারানোর এরকম বহু ঘটনা শুনেছি আমরা। শুনাছি কিছু অলৌকিক ভাবে বেচে যাওয়ার ঘটনাও।সাউথখালীতে একটা মহিলা তার ২ বছর বয়সী বাচ্চাকে দেখাচ্ছিলো । ভেসে যাওয়ার পর দুরের গ্রামে পাওয়া গেছে তাকে সর্ম্পুন সুস্থ অবস্থায়। আবার তাফালবাড়ীর এক লোক স্রোত ভেংগে অশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটছিলেন। পাশ দিয়ে মানুযের মত কিছু একটা ছুটে য়েতে দেখে অটকান। ৮/৯ বছরের এক ছেলে হাবুডুবু খেতে খেতে ভেসে যাচ্ছিলো, তিনি তাকে ধরে দাড় করিয়ে দেন। ছেলেটা বারবার তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছিলো। তিনি হুমকি দিয়ে বললেন ' ব্যটা আমার পাশাপাশি হাট. তোকে আমি ধরব. কিন্ত তুই আমাকে ধরার চেয্টা করলে বাড়ি দিয়ে মাথা ভেংগে ফেলব' । ভয়ে কথা শুনেছিলো ছেলেটা এবং বেচে গিয়েছিলো ।

বিদেশী সাহায্যে সাউথখালী, তাফালবাড়ীর অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, অনেকে ভাংগা ঘরের বদলে পেয়েছেন শক্তপক্ত নতুন ঘর। কিন্ত যাদের প্রিয়জন হারিয়ে গেছে চিরতরে তাদের ক্ষতি পুরন করার খমতা কোন ত্রাণ কমিটির নেই। প্রিয়জনদের চোখের সামনে হারিয়ে যেতে দেখা মানুষগুলোর যে বেদনার্ত মুখগুলো আমি দেখেছি তা কখনো ভুলবনা।


(ঈষৎ সংক্ষপিত এই লেখাটা ইতোপুর্বে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ১১:৫৭
৬টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×