বড় সন্তান হওয়ার সু্বাদে ছোটবেলার বড় একটা সময় কেটেছে আব্বার সান্নিধ্যে।রিক্সায় চড়িয়ে ফরিদপুর জিলা স্কুলের চারপাশটা ঘুরিয়ে নিয়ে বলা সেই কথা, এই স্কুলে পড়তে হবে তোমাকে। স্কুলের বড় বড় মাঠ গুলোর দিকে তাকিয়ে শিশুমনে সেই স্বপ্নের শুরু। জীবনের বড় সমস্যাগুলোর সময়ও তাকে দেখেছি নির্লিপ্ত, আশাবাদী। আস্থার এক দারুন প্রতিমুর্তি। ৮৮ সালের সেই ভয়াবহ বন্যার শুরুর সময় আমি আর আব্বা নানাবাড়ি খুলনায় গিয়েছিলাম , বাকি সবাই ফরিদপুর। দ্রুত পানি বাড়তে থাকায় আববা খুলনা থেকে ফরিদপুর রওনা দিলেন। আমি খুব ছোট ছিলাম তবুও মনে আছে সেই অবিশ্বাস্য যাত্রার কথা। কোথাও রাস্তা তলিয়ে গেছে কোথাও ভেংগে ভেসে গেছে পানিতে, সংগী যাত্রীরা অনেকেই রনে ভংগ দিয়ে ফিরতি পথ ধরেছে কিন্তু আব্বা নির্বিকার ভংগিতে এগিয়ে চলছেন, সংগে আমি। আমাকে বলেছিলেন, লক্ষ্য ঠিক করে রাস্তায় নেমে পড়লে দেখবা ঊপায় একটা বের হয়ে যাবেই। আব্বা কখনো হাল ছাড়তেন না। আমি তার কোন শিক্ষাই মনে রাখিনি। জীবনের আনেক ঘটনাতেই হাল ছেড়ে দিয়েছি , হতাশাগ্রস্ত হয়েছি, পালিয়ে গিয়েছি। নইলে জীবনটা হয়তো একটু অন্যরকম হতে পারত।
আব্বা নিজের সমস্যার কথা লুকিয়ে রাখতেন সন্তানদের কাছে, বুঝতে পারিনি। সুন্দরবন ঘুরতে যাওয়ার আগেরদিন শ্বাসকস্টের কারনে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ফোন করেছিলেন আমাকে, জানিনা কি বলতেন সেই মুহুর্তে, ক্লাশে থাকায় মোবাইল সাইলেন্ট ছিল, কল বুঝতে পারিনি। অনেক পড়ে টের পেয়ে যখন ফোন করে বললাম ছোট ভাইকে পাঠাব নাকি ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য, বললেন দরকার নেই। একাই আসতে পারবেন। আসলে পারতেন না। আমার আব্বার দারুন শরীরের ভিতরের ছোট্ট হার্টটা যে এতখানি ক্ষয়ে গেছে, বুঝিনি কখনও। কেন তখনি তাঁকে ঢাকা নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলাম না সেটা আমাকে পোড়াবে সারাজীবন। তার একদিন পর সুন্দরবন ঢোকার মুখ থেকে ফোনে আব্বার সাথে আমার শেয কথা।প্রানবন্ত সেই শেযকথাগুলো এখনো আমার কান ভরে আছে।
আব্বা প্রায়ই বলতেন আমার ছেলে যেদিন বড় হবে সেদিন আমার ঝামেলা আর কস্টের শেয হবে। তার ছেলে আজ ঠিকই বড় হয়েছে কিন্তু স্রস্টা তাকে নিশ্চিন্ত জীবন যাপনের কোন সুযোগ না দিয়েই নিসঠুর ভাবে নিয়ে গেছে।
আবার কবে দেখা হবে আব্বা?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

