মামাতো ভাই স্বজনকে নিয়ে মাঝরাতে শাহবাগ ঘুরতে গেলাম । নতুন ফোয়ারাটার সামনে বসে দুই ভাই গল্প করছি । চারদিকে অনেক মানুষ নেচে-গেয়ে নতুন বছর উদযাপন করছে । মেয়েরা পরিচিতজনদের সাথে মোটরসাইকেলে ঘোরাফেরা করছে । আশেপাশের হৈ-হুল্লোড় ভালই লাগছে দেখতে । পাশে বসা দুজন লোক হঠাৎ দারুণ উচ্ছ্বাসে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলে চিপসের প্যাকেট থেকে চিপস বের করে সাধলো । দুজনেই নিলাম । আমি বেশ খুশিমনেই খেলাম । কিন্তু আমার ভাইটা না খেয়ে ফেলে দিলো,ওর নাকি মানুষদের বিশ্বাস হয় না । আমি আবার পুরো উল্টো । মানুষকে বিশ্বাস করতেই সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে । কেন যেন মনে হয়,আমি যার কোনো ক্ষতি করি নি,সে আমার কোনো ক্ষতি পারবে না । হয়তো ভুল ধারণা,কিন্তু তারপরও নিজের ক্ষেত্রে এই ভাবনাটাই আমার পছন্দ । হঠাৎ সামনে চোখ পড়তেই তাজ্জব হয়ে গেলাম । মোটরসাইকেলে বসা এক মেয়ের ওড়না ধরে সজোরে টান দিয়ে এক ছেলে দ্রুত ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল ! চারদিকে এত পুলিশ আর র্যাব,অথচ এমন একটা কুকর্ম করার দুঃসাহস এরা কোথায় থেকে পায় আমি বুঝি না । তবে এটা বুঝতে পারি এরাই আমাদের সমাজের নষ্ট মানুষ । কেন যেন আশেপাশের মানুষগুলোকেও আমার নোংরা মানসিকতার মনে হলো । নারী এদের কাছে ভোগের বস্তু ছাড়া আর কিছু না,নষ্টামি করার সামান্য সুযোগ পেলেও ওরা হাতছাড়া করে না । ভাবছিলাম ওদের বাড়িতে মা-বোন আছে কি না । আচ্ছা, ওদের কোনো বোনকেও কি কিছু নষ্ট লোক................ না,ভাবতে ইচ্ছে করছে না । কিন্তু এমনটা তো হতেই পারে,এরপর ওরা ব্যাপারটা মেনে নেবে তো ? মনে হয় না । কী আশ্চর্য ! আমরা পুরুষরা এত জঘন্য কেন ?
বাসায় আসতে আসতে মনে পড়ছিলো আমার ভাগ্নি,রাহেলা আর পূর্ণিমার কথা । নারী নির্যাতনের সবচেয়ে কুৎসিত দিকটার সাথে পরিচিত শেষের দুজনকে চিনতেন পারছেন তো ? অতীত যত দুঃসহই হোক না কেন,তাকে তো আর মুছে ফেলা যাবে না । আমার প্রজন্মের অনেকে অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করতে পছন্দ করে না , কিন্তু আমি করি । কারণ অতীত মানুষ চেনায়,মানুষের বিচিত্র বোধের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় । আমার ভাগ্নির কথা বলার আগে চলুন আপনাদের নিয়ে একটু অতীত ঘুরে আসি ।
রাহেলা সাভারের একজন গার্মেন্টস কর্মী । সময়টা ২০০৪ সাল,সদ্য বিবাহিতা এক নারী সে । স্বামী,সংসার নিয়ে ভবিষ্যত সুখী জীবনের স্বপ্নে বিভোর । আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সহকর্মী লিটনসহ আরো কয়েকজনের সাথে কাজ শেষে সে বাড়ি ফিরছিল । ফেরার পথে তাকে জোর করে লিটন ও তার সহযোগীরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মোশাররফ হলের পেছনের জঙ্গলে নিয়ে যায় । সেখানে তারা গণধর্ষণের পর তাকে জবাই করে চলে যায় । ৩ দিন পর তারা এসে দেখে মেয়েটি মরে নি ! পুনরায় তারা তাকে ধর্ষণ করে তার সব চুল কেটে ফেলে । রাহেলা পানি খেতে চাইলে তারা তার সারা শরীরে অ্যাসিড ঢেলে দিয়ে চলে যায় । এর দুইদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মালী গোঙানির শব্দ শুনে এগিয়ে গিয়ে দেখে,মেয়েটি বলছে, ‘আমি এখনো মরি নি,জীবিত আছি।’ তারপর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ৩৩ দিন অসহ্য যন্ত্রণার সাথে লড়ে সে নিষ্ঠুর পৃথিবীকে বিদায় জানায় । মৃত্যুর আগে রাহেলা তার প্রতি যে বর্বর আচরণ করা হয়েছে তার বিচার চেয়ে সব আসামীর নাম প্রকাশ করে । কিন্তু বিচার শুরু হয় ২০০৭ সালে !!! কিন্তু বিচারের প্রথম শুনানিতে কোনো আসামীকেই পুলিশ উপস্থিত করতে পারে নি ! ২০০৮ সালে মামলার রায় হয় যাতে লিটনকে মৃত্যুদন্ড দেন আদালত আর উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে অন্য আসামীদেরকে খালাস দেন ! কথিত আছে,পুলিশ নাকি মামলার নথিপত্র গায়েব করে দিয়ে অন্য আসামীদেরকে মুক্ত করে দিতে সাহায্য করে !!! মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত একমাত্র আসামী লিটন এখনো পলাতক ! পুলিশ তাকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারে নি !!! কী পেল রাহেলার পরিবার ? লিটন হয়তো এর মাঝেই অন্য আরো অনেক মেয়ের স্বাভাবিক জীবন শেষ করে দিয়েছে ।
এবার পূর্ণিমাকে নিয়ে একটু বলি । না,সে মরে নি । ২০০১ নির্বাচনের সময় তার বয়স ছিল ১৫ বছর,স্কুলছাত্রী। সে সিরাজগঞ্জের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের হিন্দু পরিবারের মেয়ে । নির্বাচনে জেতার পর বিএনপির তরুণ কিছু কর্মীর খুব খায়েশ হয় বেঈমান হিন্দু যারা তাদের নেতাদের ভোট দেয় নি তাদের শায়েস্তা করার । কীভাবে করা যায় ভাবতে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তাদের বিলম্ব হয় না । পরিবারের নারীদেরকে তুলে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হয়,তাতে দুইটা লাভ । তাদেরকে ভোগও করা যাবে, পাশাপাশি পরিবারটিকে ভোট না দেয়ার চরম শাস্তিও দেয়া যাবে । এভাবে সারাদেশের ৬১ জন হিন্দু নারী ভয়াবহ গণধর্ষণের শিকার হয় এবং অসংখ্য ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয় । এদেরই একজন পূর্ণিমা । তাকে ধর্ষণ করার জন্য আসে ১১ টা সশস্ত্র নরপিশাচ !!! হ্যাঁ পাঠক,সংখ্যাটা ১১ –ই এবং আপনার মতোই অবাক হয়েছিলেন পূর্ণিমার বাবা । কিন্তু বাধা দিলেই অবধারিত মৃত্যু । অসহায় বাবা যেন চোখের সামনে দেখছিলেন কিছুক্ষণ পরেই তার আদরের কন্যা তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটি অত্যন্ত বর্বর আক্রমণে হারাতে যাচ্ছে । সবাইকে একসাথে ঘরে ঢুকতে দেখে বাবা নিতান্তই নিরুপায় হয়ে অত্যন্ত কাতরস্বরে বললেন, ‘ বাবারা,আমার মেয়েটা খুব ছোট । দোহাই লাগে,তোমরা সবাই একসাথে যেয়ো না । একজন একজন করে যাও ।’ কিন্তু তারা শোনে নি । ফলে যা হয় সিনেমার কাহিনিতে,এখানেও তাই – নিষ্ঠুর গণধর্ষণ । মেয়েটিকে পরে সরকারি হেফাজতে নেয়া হয় । সেই নরপিশাচদের সবাই যাবাজ্জীবন কারাদন্ডের আসামী হয়ে এখন জেলের সাজা ভোগ করছে ।
ভাবুন তো,একজন বাবা কতটা অসহায় হলে এ ধরনের কথা বলতে পারে !! মেয়ের জীবনই তার কাছে সবকিছু । বাবারা খারাপ হয় না,যদিও তারা পুরুষ !
পাঠক,আমি বিভিন্নভাবে ১০ টা মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছিলাম জীবনে কোন ভয়টা সবচেয়ে বেশি কাজ করে । ৯ জন উত্তরে বলেছে – ধর্ষিত হবার ভয় !!! একজন বলেছে – আরশোলার ভয় । রাহেলা আর পূর্ণিমার ধর্ষকেরা শারীরিকভাবে আমার মতোই পুরুষ ! নিজের প্রতি মাঝেমাঝে তাই ঘেন্না হয় ।
আমার ভাগ্নির নাম প্রিয়তা,বয়স প্রায় ৪ বছর । আমি ভাবি,রাহেলা নিশ্চয়ই এমন একটা বাচ্চার মা হতো । সুন্দর আর ভীষণ চঞ্চল । হয়তো সে এতদিনে স্কুলেও যেতো । এই শীতে পিঠা খেতে খেতে অত্যধিক দুষ্টুমির জন্য মা রাহেলা নিশ্চয়ই তাকে বকা দিতো । মেয়ে বড়দের কাছে সদ্য শেখা কবিতার দুটো লাইন অপূর্ব ভঙ্গিমা করে বলতো –
পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসে খুশিতে বিষম খেয়ে
আরো উল্লাস বাড়িয়াছে মায়ের বকুনি খেয়ে
আর পূর্ণিমা ? আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি হায়েনাদের আসার ঠিক আগমুহূর্তে সে বাবার লুঙ্গি আর পাঞ্জাবিটা ভাঁজ করছে আর গুনগুন করে হেমন্ত আর শ্রাবন্তির গান গাইছে –
সিনেমা যখন চোখে জ্বালা ধরায়
গরম কফির মজা জুড়িয়ে যায়
কবিতার বইগুলো ছুঁড়ে ফেলি
মনে হয়ে বাবা যদি বলতো আমায়
আয় খুকু আয়........
যারা ধর্ষিতাকে দেখিয়ে বলে ‘মেয়েটাকে ওরা নষ্ট করেছে’ ,তারা চরম ভুল বলে । ধর্ষণে কোনো মেয়ে নষ্ট হয় না । সম্মানহানি হলেই নারী নষ্ট হয়ে যায় না । ধর্ষক চূড়ান্ত নষ্ট হয়,সে-ই হয় ঘৃণ্য । সে-ই হয় সভ্য সমাজের নিকৃষ্ট আবর্জনা । আর কেউ নয়,কেউ নয় - কোনো মেয়ে তো নয়ই ।
আচ্ছা,কেমন হবে আমার ভাগ্নি প্রিয়তার আগামী পৃথিবী ? ও যে স্কুলে পড়বে সেখানে কোনো পরিমল থাকবেনা তো ? আমার মোটরসাইকেলে চড়ে ওর নিশ্চয়ই গভীর রাতে শাহবাগে নতুন বছরের ফুল কিনতে যেতে ইচ্ছে করবে । ওকে খুশি করার জন্য রাতের নিরালায় বাতাস কেটে কেটে এগিয়ে যাব শাহবাগের দিকে । সেখান থেকে ফেরার পথে কোনো নষ্ট লোক কি ওর ওড়না ধরে............ না,আমি ভাবতে পারছি না । বুক কেঁপে উঠছে ।
পুনশ্চঃ পরম করুণাময় যেকোনো মূল্যে আমাদের সকল মা-বোনদের সম্মান আর পবিত্রতা রক্ষা রাখুন । যদি সেটা সম্ভব না হয়,তবে মায়েরা যেন আর ছেলে জন্ম না দেয় । আর একটা মেয়েও যেন বর্বরতার শিকার না হয় । আমীন ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


