
প্রিয় মাহমুদ,
কতদিন তোমার সাথে কথা হয়না। কেমন আছ তুমি? আমার কথা বলছ? আমিতো সেই দিনের মত ভাল আছি যেদিন তোমার সাথে দেখা হয়েছিল। তোমার বাড়ীর খবর জানতে চাইনা ক্যানো এ ব্যাপারে নিশ্চই তোমার কোনো অভিযোগ নেই তাইনা? আসলে কেউ না জানুক এই আমিতো জানি তোমার কোনো ঘর নেই বাড়ী নেই।
আর আমি এখনো সেই রেষ্টুরেন্টের পাশের ছয়তলা বাড়ীটার পাচ তলার একটা রুমে ই থাকি। যেখান থেকে রেষ্টুরেন্টের ডাষ্টবিনে ধনীদের ফেলেদেয়া উপচে পরা খাবার আর সামনে বসা বুড়োদের মতো কুজো হাড্ডিসার সেই মহিলা ভিক্ষুক টাকে মন চাইলেই দেখা যায়। যে মাছিগুলো ঐডাষ্টবিনে ভনভন করে ওগুলোই আবার ছুটে আসে ভাগ বসাতে যখন সাথীর হাতে আমওয়ালার ফেলেদেয়া পচা আমটাকে পরিতৃপ্তির সাথে মথিত হয়।প্রায় প্রতিদিনই এক ফোটা অস্রু আমার বারান্দার গ্রীলের সাথে মিশে ওটাকে জং ধরতে সাহায্য করে।
তুমি অবাক হচ্ছো? ভাবছো সাথীর নাম কিভাবে জেনেছি? বেশিদিন হয়নি নামটা জেনেছি। এইতো পরশুদিন ভার্সিটি থেকে ফিরছি। সাড়া শরীর ঘামে ভিজে চুপচুপ। গ্রামীণ থেকে কেনা লাল পাঞ্জাবীটা গায়ের সাথে একদম লেপ্টে আছে। এতো গরম লাগছে!!! কেয়ামতে নাকি সূর্য এক হাত উচ্চতায় নেমে আসবে? ক্যমন হবে সেদিন? মগজ গুলো টগবগ করে ফুটন্ত পানির মতো করবে তাইনা? আমার ভেতরটা সর্বদাই প্রার্থনা করে...সেই দিন যেনো আমার আপন প্রভূ তার ছায়ায় আমাকে ঠাই দেন।

লোকাল বাসের অভিজ্ঞতা তো তোমার কোনোদিনই হয়নি। কি চাপাচাপি। আর মানুষগুলো সব ভাবে যেনো কাউন্টার বাসে যাচ্ছে। আমি ভাই তৃতীয় শ্রেনীর মানুষ। তাই এভাবেই যাই। তুমি আবার আমার কষ্টের কথা শুনে কষ্ট পেওনা। আসলে কষ্টকে কষ্ট ভাবলেই কষ্ট। দেখ আমার কপাল বেয়ে ঠিকই ঘাম গড়িয়ে পরছে। কিন্তু আমি সুখি। কন্ট্রাক্টর দ্বিতীয়বার ভাড়া চাইলেই এক গাদা গালী শুনতে হয়। বাসে কত মানুষ উঠে, সবার চেহারা কি ওর মনে রাখা সম্ভব? কিন্ত কেউই এভাবে ভাবেনা। আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি হেসে বলি একটু আগে নিয়েছ। আবার দেব ভাই? ও যে তখন কি খুশি হয়!!! আমরা কি সবাই সবাইকে এভাবে খুশি করতে পারিনা? আমাকে তো টাকা খরচ করতে হয়নি। শুধু একটু হেসেছি।
এসব শুনে আবার এক বড় আপু বলেনঃ ইশ!!!! তোমার মত যদি আমার একটা সন্তান থাকত? তখন আমি আমার মায়ের কথা ভাবি। আমার মা!!! আমার মা!!! যতবার কথাটা উচ্চারন করি ততবারই শিহরিত হই। ক্যামন না? অজানা একটা ভালোলাগা আমার হৃদয়ের দরজায়। যেনো ফুলের সমারোহে পারস্যের কোনো বাগানে আমি হেটে যাচ্ছি। চারপাশে ফুলেরা আমায় অভিবাদন যানাচ্ছে বাতাসে হেলে দুলে। আর কাশ্মীরি সৌন্দর্যের অবাক চাহনী নিয়ে মা আমার দাড়িয়ে দূরে। তার গর্বিত ললাটে আত্মতৃপ্তি। আমার অন্তরে বসন্ত মায়ের অন্তরের শীতলতা দেখে।
ঠিক সেই শীতলতা... একই শীতলতা ভিখারীনীর চোখে। তার সন্তান সাথী। নাহ সাথী নিজের নাম নিজে বলতে পারেনা। হাটতেও পারেনা।চার কি সাড়ে চার বছর বয়স হবে মেয়েটার। বড় বড় কালো দুটি কাজল চোখে মায়াবী দৃষ্টিতে নিষ্ঠুর পৃথিবীর অবাক সময় গুলোকে চেয়ে চেয়ে দেখে। ওর বড় সড় শরীরটা কোলে করে মাকে দেখি প্রায়ই গুন গুন করে গান গায়। আমি খুব নিকট থেকে শোনার চেষ্টা করি, সাথী আমার সাথী... তুই যে আমার মোতি...

লোকটা কই যে গেলো তোরে আর আমারে ফালাইয়া। আইজ চাইড্ডা বছর একটা খবর নিলোনা। তুই আইছোছ বইলাই হেয় আমারে ছাইরা যায়। আমার কি দোষ ক? আমিকি তোরে আনছি? ঐযে উপরে একজন আছে। চিনস হেরে? তোর তো চিনার কথা। মাত্র হেই দিন না তুই আইলি হের কাছ থিক্যা? নির্বাক সাথীর দিকে আবার চেয়ে বলে... আমি নাইতো বহুদিন আগে আইছি তাই ভুইল্লা গেছি...হে একজনাই তো তোরে আমার পেডে দিছে। আমার যদি দোষ হইয়া থাকে তাইলে তো হেই দোষে উনিও দোষী। মানুষটারে আইজও আমি ভুলতে পারলাম না।
একি মাহমুদ তুমি কাদছো?
আমি তাকে আরো বলতে শুনেছি... পর্থম যেদিন তোর বাপের সাথে দেখা হয়... আমার মায় আমারে কইছিলো বড় বাড়ির ভালো পোলার লগে তোর বিয়া ঠিক হইছে। আমি শুইনা চাইর রাকাত শোকরানা নামাজ পরছিলাম। দুপুর বেলা হের আসার কথা আছিলো। আইতে আইতে বিকাল অইয়া গেছে। আছর নামাজ পইরা আমি জানালার ধারে বইসা ছিলাম। আমাগো ঘরটা তেমন সুবিধার আসিলোনা। তুই তো ডাহার শহর জন্মাইয়া কতো দালান কঠা দেখতাসছ। আমাগো ঘর দেখলে তুই হাসতি। বুঝলি সাথী... তোর বাপটা কতো ভালো মানুষ তুই জানোস না। শত হইলেও তোর বাপ তো। আমার মায় শিখাইসে কারো বদনাম গাইতে অয়না। তাইলে আল্লায় নারাজি অয়। তাই শত কষ্টেও তোর কাছে তোর বাপের বদনাম গাইনা।
গেরোস্তের লোকজন আইসা পরছে। আব্বায় কইছিলো লোকজন আইলে খেতের থিকা তারে বোলায়া আনতে। ছোড ভাইডারে, মানি তোর মানিক মামারে... ও আল্লা এমন ফ্যাল ফ্যাল কইরা চাইয়া আছোস মনে হয় তারে চিনশ না? তাও ঠিক, চিনবি ক্যামনে। জীবনেও তো দেখস নাই।হেই যে ডাহা আহনের সময় দেহা হইছিলো তারপর আর কোনো খোজ নাই। তারে পাঠাইছিলাম আব্বারে ডাকার লাইগা। আর আমি মানুষটারে পর্দার আড়াল থিকা দেখতাছিলাম। শক্ত পোক্ত শরীর। রাগ রাগ মুখ। কিন্তু আমার কাছে ভালই লাগছে। মায় কইছিলো গুনা হইবো। আমি কইছিলাম ক্যান মা? মায় কইছিলো তার লগে তো তোর এহনো বিয়া হয় নাই।
আমি সইরা আইছিলাম। তার কয়দিন বাদেই বিয়াটা হইয়া গেলো। লোকটা হাসে কম। সব সময় ক্যমন গুম ধইরা বইসা থকে। কত কতা কইতাম। জবাব দিতো একটা অথবা দুইটা। শশুর বাড়ী মানি... তোর দাদা বাড়ীর মানুষজন তেমন একটা খারাপ আসিলোনা। খালি আমার বাপে গরিব, যৌতুক দিতে পারেনাই হেল্লিগা গোস্ম্বা আসিলো। একদিন মানুষটা কইলো ডাহা গেলে নাকি অনেক কাম পাওয়া যায়। আমি কইছিলাম আমারে ছাড়া আফনে থাকবেন ক্যামনে?...... মানুষটা আমার দিকে চায়া আছিলো অনেক্ষন ধইরা।
আবার কোনো একদিন কি উনি এমনে তাকাইবো?
তোরে নিয়া যে আমার কত কষ্ট হইসে। সাহেবগো বাড়ীর মাইয়াডা...ঐ যে পরী নাম। কতো সোন্দর দৌড়াইতো খেলতো। আর তুই খালি হুইয়া হুইয়া চাইয়া থাকতি। কত রাইতে আমি তোরে দৌড়াইয়া আইয়া মা... বইলা ডাকতে হুনছি। কিন্তু চোখ মেইলাই দেহি তুই পাশে ঘুমাইতাছস। সাথী তুই কি আমার কথা বুঝস মা? আমার বুকটা ক্যামন করে খালি তোর মুখে একবার মা ডাক হোনোনের লাইগা।
আমার পেডের ব্যেদনাডা বাড়নে আর কাম করতে পারলাম না। তোরে লইয়া রাস্তায় বইয়া পরলাম। জানি তোর খুব শরম লাগে। কিন্তু কি করমু মা ক? তরে আর আমারে কেডা খাওন দিবো? এইডা তো আর ওমরের দ্যশ না। যে হাসিনা বা খালেদায় রাইতে রাইতে আমাগো দুঃখ দ্যেহনের লইগা আইবো। ও... তুই তো ওমরেরে চিনসনা। চিনবি ক্যামনে। এই পাত্থরের শহরে কি আর মক্তব আছে? আর থাকলেই কি? তুই কি আর পরবার পারতি? আমরা ছোড কালে মক্তবের হুজুরের কাছে হুনছিলাম... ওমর আছিলো অর্ধেক দুন্নাইর রাজা। হের জমানায় কেউ গরীব আছিলোনা। ওমরে গরীব দূর করনের লাইজ্ঞা যাকাত দিতো। হুনছি এমন কইরা একজনেরে যাকাত দিতো যেন পরের বছর হেয় ই গরীবেরে যাকাত দিতো পারে। আর আমাগো দ্যেশে... গরীবেরে পায়ের তলে চডা দিয়া মারনের লাইজ্ঞা যাকাত দেয়। বুঝলি সাথী...
এসব বলেই গাড়ীর চাকায় উড়ে আসা ধুলো বালির আক্রমনে মা পেছনে ঘুরে কাশতে থাকেন। দু এক ফোটা লাল রক্ত বেড়িয়ে আসে। কাশি আর থামে না। নদীর ঢেউয়ের মতো চলতেই থাকে। আর চলতে থাকে সাথীর নির্বাক কথা বলা।
মাহমুদ, জীবনটা আসলে এরকমই হয়। শত অনুভূতির ভিরে হয়তো কেউ আর মনে রাখবেনা। সাথী, সাথীর মা, আমি, আমরা সবাই ক্যামোন ভিন্ন ভিন্ন সুরে জীবনের গান গাই। আমার ফেরার পথে সুর্যটাও ফিরে। সব শেষে রাত্রী নামে।

শুধু বাকী থাকে একটি মা ডাকের আকুতি।
আমার ভেতরে অন্যরকম কিছু অনুভুত হয়।
আজকে অনেক লিখেছি। তুমি নিশ্চই বিরক্ত হয়েছ। থাক, আর লিখবোনা। অন্য কোনো সময়ের ভিরে আবার কথা হবে। স্রষ্টা তোমার মঙ্গল করুন। আমীন।
সনাতন
১৯/০৬/০৯ ইং
রাত-১,২৩
কোনোদিন শুনেননি এমন একটি অডিও ডাউনলোড করতে চাইলে... মাহমুদকে লেখা চিঠি
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুন, ২০০৯ বিকাল ৩:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



