সকাল আটটা থেকে বিডিআর বাবুরা আসবে। তারা দাড়িপাল্লা আর বাটখারা দিয়ে মেপে মেপে চাল দিবে। আজ শুনেছি জনপ্রতি ৩ কেজির বেশী দিবে না। তাতে আমার সমস্য নেই। আমরা স্বামী-স্ত্রী পাবো মোট ৬ কেজি। আহ কি আনন্দ। ঘরে এক কেজি রেখে বাকী পাঁচ কেজি দিবো বিক্রি করে। ২৫ টাকা দরে কিনে ৩০ টাকা করে ৫ কেজি বেচলেও ২৫ টাকা লাভ। তাহলে একটু টেংরা মাছ কিনে করল্লা দিয়ে পাতলা ঝোল করে খাবো। আহ! কত দিন খাইনা। বউটাও না খেতে পেয়ে শুকিয়ে গেছে।
এভাবে প্রতিদিন লাইনে দাঁড়ালেই মোটামুটি আমাদের দুজনের সংসার ভাল ভাবেই খেয়ে দেয়ে চলে যায়। ফকরুদ্দিন ভাই আর মইন ভাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। উনারা যদি সময় মত সাহসী পদক্ষেপ (অপারেশন ডাল ভাত) না নিতো তাহলে আমাদের মত গরীব গুলোর এই বাড়তি কামাইটাও হতো না আর দুবেলা পেট ভরে খাওয়াটাও হতো না। দোয়া করি এটা যেন বন্ধ না হয়।
আমি খেয়াল করলাম সবার মধ্যে আমার কাপড় চোপড়ই একটু ভাল। এতেই হয়েছে যা বিপত্তি। সবাই টিটকারী মারছে। বলছে বড়লোক আইয়া খাড়াইছে আমাগো লগে, পুরান পাগলে ভাত পায়না নতুন পাগলের আমদানী। কত বোঝানোর চেষ্টা করছি ভাই আমিও তোদের মত। আমারও পেটে ভাত নাই। তাও বোঝে না। পিছন থেকে কে যে একবার গাল দিয়ে বললো, এই হালাত পুতরে লাথথি মার, যতটাকা লাগে আমি দিমু। আমি হাসি মনে মনে, আর বলি, তুই টাকা পাইবি কই, তুই একটা ফকির, নাইলে এইহানে খাঁড়াইছস কিল্লিগা।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যথা হয়ে গেছে। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। দেখলাম আমার বউটা মাটিতে বসে পড়েছে। বসে বসে ঝিমাচ্ছে।
দাড়িপাল্লা আর বাটখারার শব্দ পেয়ে বুঝলাম সকাল আটটা বেজে গেছে। সবাই বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। চারিদিকে একটা শোরগোল পড়ে গেল। হৈ হৈ করে উঠলো সবাই। সবার চোখেতে খুশির ঝিলিক। ভাবটা এমন যেন, ট্রেন এসে পড়েছে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।
বিডিআর বাবুরা অলস ভাবে চাল মাপছেন। একজনকে দিতেই অনেক সময় লাগছে। ওদের পেটেতো ভাত আছে। আমরা না এই চাল নিয়ে গিয়ে রান্না করে খাবো । ওদের তো সরকারী বাবুর্চী রেঁধে খাওয়াচ্ছে। গুনে দেখলাম আমার সামনে আরো ৩১ জন। হোক তাতে সমস্যা কি, চাল আজকে নিয়েই যাবো। মহিলার লাইনে সামনে ক্যাচাল লেগেছে, এক বিডিআর বাবু বলছেন, খানকি মাগী, চাইলের দাম দিবার পারোস না, লাইনে খাড়াসোস ক্যা? তুই যে এক টাকা কম আনছোস এইডা কি আমার বাপে দিয়া যাইবো? জানিনা ওনার বাপ কে? বাবু কার কথা বলছেন। মনে হয় ফকরুদ্দিন ভাই ওনার বাপ লাগে।
মনে মনে বললাম, আসলেই বেটি একটা খানকি মাগী, ফকিরউদ্দিন ভাই যে কত কষ্ট করে দাদাদের কাছ থেকে চাল বেশী দাম দিয়ে কিনে নিয়ে এসে আমাদের দুবেলা খাওয়াচ্ছেন! আসলে আমরা গরীবগুলো যেন কেমন? ঘাড়ে তুললে মাথায় উঠতে চাই।
মোবাইল এলার্মে ঘুম ভেঙ্গে দেখি সকাল সাতটা বাজে। তাড়াতাড়ি নাস্তা খেয়ে দৌড়ে এসে বাস ধরলাম অফিস যেতে হবে। মিরপুর জাতীয় ষ্টেডিয়ামে দেখলাম বিডিআর বাবুদের দোকানের সামনে নারী পুরুষের লম্বা লাইন। আমি লাইনের প্রথম থেকে ৩১ জন পরে আমাকে খুঁজতে চেষ্ট করলাম। বাস ছুটে চলে, আর আমি আবার ঝিমাই, চেষ্টা করি স্বপ্নের পরের পর্বটা দেখতে। আমার স্বপ্নকে পিছনে ফেলে বাস ছুটে চলে অফিসের দিকে। আমার মাথাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।
ছবি সুত্র: দৈনিক পত্রিকা,
ছবি এডিট: লেখক।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই এপ্রিল, ২০০৮ সকাল ১১:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


