আম্মাকে গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দিলাম সময় মত। খুব খারাপ লাগছিল। উনি প্রচন্ড অসুস্থ্য। তারপরেও তাকে যেতে হচ্ছিল কিছু কারণ ছিল। আম্মা যাওয়ার কারণে মনটা খুব খারাপ। উনি গিয়ে ভাল ভাবেই পৌঁছেছেন। তবে বেশ অসুস্থ্য হয়ে পড়েছেন শুনলাম।
আমি এয়ারপোর্টের বাহিরে একা দাঁড়িয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। দেখছিলাম সবাই অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানাচ্ছে তাদের স্বজনকে। এক নববিবাহিত দম্পতিকে দেখলাম। তার স্বামী চলে যাচ্ছে। কণের হাতে মেহেদীর দাগ তখন মোছেনি। মেয়েটি তার স্বামীর জন্য খুব কাঁদছিল। স্বামী বেচারা পারছিলনা তাকে একটু আদর করে দিতে পাছে মনে হয় লজ্জা তাকে গ্রাস করেছিল কারণ তার সাথে গার্জিয়ান ছিল।
বাহিরের প্রচন্ড বৃষ্টির ছাঁট এসে মোটামোটি ভিজিয়ে দিচ্ছিল। আর গ্রীলের বাহিরে যারা দাঁড়িয়ে আছে তারা তো ভিজে একাকার। তবুও ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল যদি তাদের স্বজনকে একটু যদি দেখা যায় কাঁচের ভিতর থেকে। প্রতিবার বাবা মাকে এয়ারপোর্টে এগিয়ে দিতে আসলেই আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না।
গেটের বাহিরে একজন বয়স্কা মহিলা (আনুমানিক ৫০ বছর) বসে বসে কাঁদছেন আর দুই হাত তুলে মোনাজাত করছেন। আমি অনেকক্ষণ তাকে দেখলাম দুর থেকে দাঁড়িয়ে। পরে আস্তে আস্তে তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম, "চাচী কাঁদছেন কেন?" উনি বললেন, তার ছেলে বিদেশ যাচ্ছে প্রথমবারের মত। উনার খুব কষ্ট হচ্ছে। সে যেন ভাল ভাবে গিয়ে পৌঁছায় সেই জন্য তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন। বুঝলাম, একজন ছেলের জন্য তার মায়ের দোয়াই সবচেয়ে বড়।
বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু লোকজন দাঁড়িয়ে ছিল। একজায়গায় দেখলাম কিছু ছেলে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স আনুমানিক ২৫-৩০ হবে। মনে হচ্ছে তারাও কোথাও যাবে। সবার সাথে একটা করে লাগেজ। একজন তাদের ব্রিফ করেছে। তাদের লাগেজে দেখলাম লেখা আছে "ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ ডে ২০০৮"। সম্ভবতঃ তারা কোন অনুষ্ঠানে যোগদিতে যাচ্ছে।
সবাই গাড়ী নিয়ে আসছে। নামছে লাগেজ সহ। ট্রলিতে করে লাগেজ নিয়ে ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম দরজার দিকে মুখ করে। এমন সময় এক বিদেশীনি নামলেন গাড়ী থেকে। দেখলাম গাড়ীটি সোনারগাঁ হোটেলের। তার পরনে স্যান্ডো গেঞ্জির মত একটি গেঞ্জি এবং হাফ প্যান্ট। তার লাগেজটি ট্রলিতে নিয়ে উনি সেটা ঠেলে ঠেলে ভিতরে ঢুকছিলেন। এমন সময় আমার পিছন থেকে একটা মন্তব্য শুনলাম। কেউ একজন বলছে, "এদের দ্যাখলে কোন সেক্সই আসে না, অথচ আমগো দেশের মাইয়ারা কত সেক্সি। জামাডা খুইল্লা হাডতাছে তাও ভালা লাগতাছে না দ্যাখতে।" আমি একটু পিছনে ঘোরার ভান করে তাদের দেখলাম। তিনজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, তারাই এ কথাটা বলছিল।
দেখলাম, কিছু লোক ট্রলি এগিয়ে নিয়ে গিয়ে খুব বিরক্ত করছে আগত যাত্রীদের। দেখলাম এরা একটা সংগবদ্ধ দল। এরা খালি ট্রলি গুলোকে অনেক দুরে ঠেলে রেখে আসছে। আর দুই একটি নিয়ে এরা ঘুরছে। গাড়ী থেকে নামতেই তারা দৌড়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আর যাত্রীদের বাধ্য করছে তার ট্রলিতে মালপত্র রাখার। যারা জানেনা তাদের কাছ থেকে মালপত্র পৌঁছে দেবার পর মোটা টাকা আদায় করছে। এটা এক ধরনের প্রতারণা। পুরোপুরি পরের ধনে পোদ্দারী। সেখানে আনসার ও পুলিশকে দেখলাম। তাদের সামনেই তারা এমন কাজ করছে। অথচ বিমান বন্দরে এমন ট্রলি নিয়ে ব্যাবসা করার কোন নিয়ম নাই।
একজন শিল্পীকে (নাম প্রকাশ করলাম না) দেখলাম তার ট্রলি ঠেলে নিয়ে ওনার লোকজন নিয়ে ভিতরে ঢুকতে গেলেন। সেখানে বেঁধে গেল গন্ডোগোল। নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক যাত্রীকে পাসপোর্ট ও টিকেট দেখিয়ে গেট দিয়ে ঢুকতে হচ্ছে। গেটম্যান তার কাছে সেগুলো চাইলে সে তার সাথে র্দুব্যাবহার করলেন এবং বললেন, তোমাকে দেখাতে হবে কেন? তুমি কে এসেছো? সে বলল, "সরি ম্যাডাম, আমি আপনাকে ঢুকতে দিতে পারছিনা। আপনাকে অবশ্যই পাসপোর্ট টিকেট দেখাতে হবে।" উনি আরো রেগে গেলেন তার এই কথা শুনে। গেটম্যানও নাছোড় বান্দা, সে জোরে করে বলল, "সরি, আমি পারছিনা আপনাকে ঢুকতে দিতে, আপনি কি করবেন করেন।" শেষে অবশ্য সেই শিল্পীকে কাগজপত্র দেখিয়েই ঢুকতে হলো। গেটম্যান শুধু তাকে ঢুকতে এলাউ করেলেন কিন্তু শিল্পীর সাথে আসা লোকজনকে ঢুকতে দিলেন না। আরো লাগলো গন্ডোগোল। শেষে পুলিশ এসে তাদের অন্যদিকে নিয়ে গেল।
সৌদি ফ্লাইট ছেড়ে দিলে আমি চলে আসলাম। কিছুক্ষণের জন্য বেশ কিছু মিশ্র অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলাম। পিছনে রেখে আসলাম আম্মার বিদেশে চলে যাওয়ার জন্য চোখের জল।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুলাই, ২০০৮ দুপুর ১:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


