আমার ছেলেটা দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল। এইতো সেদিনই ওর জন্ম। খুব দুষ্ট। সিজারিয়ান বেবী। ও যখন আমার পাশে ঘুমিয়ে থাকে তখন তাকিয়ে দেখি ওকে।
আমার ছেলের জন্ম রাজশাহীতে। আমি ছিলাম তখন ঢাকাতে। ওর যেদিন জন্ম হয় সেই সময়ে আমি আমার স্ত্রীর পাশে থাকতে পারিনি। খুব কষ্ট আছে এটা নিয়ে। আমাকে অফিস থেকে ছুটি দেয়া হয়নি। যেদিন ডেট ছিল তার সম্ভবতঃ একদিন আগে তার জন্ম।
আমার স্ত্রী দৈহিক কাঠামো বা অন্যান্য দিক দিয়ে সুস্থ ছিলেন। সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় প্রতি মাসে মাসে ডাক্তারকে দিয়ে চেক করানো হয়েছে। ডাক্তার বলেছিলেন, "কোন সমস্যা নাই নরমাল ডেলিভেরীই হবে।" আমি সব রকম কেইসের জন্যই প্রস্তুত ছিলাম।
অফিসে ছুটির কথা বললাম, জানানো হলো ওখান থেকে ফোন আসলে যেন আমি রওনা দেই, তার আগে নয়। খুব দুঃখ পেলাম। কষ্ট পেলাম। দিনটি ছিল শুক্রবার, সন্ধ্যার একটু আগে রাজশাহী থেকে ফোন পেলাম, আমার স্ত্রীর লেবার পেইন উঠেছে। তাকে এম্বুলেন্স করে হসপিটালে নেয়া হয়েছে। আমি আর দেরী না করে বাসে রওনা দিলাম। তখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা অথবা সাতটা।
কয়েকমিনিট পর পর মোবাইলে খবর নিচ্ছিলাম। ফোনে স্ত্রীর যন্ত্রনার কথা শুনে খুব খারাপ লাগছিল। তবে উনার সাথে আমার কোন কথা হয়নি, কারণ তার কথা বলার মতো অবস্থা ছিল না। ডাক্তার ডিসিশন নেয় আর এক মুহুর্তও দেরী করা যাবে না। পেটের ভিতরে বাচ্চা এবং মায়ের খুব কষ্ট হচ্ছে। নরমাল ডেলীভেরী হচ্ছে না তাই সিজার করতে হবে। (পরে এটা বুঝলাম, কারণ আমার ছেলের মুখে কয়েক জায়গায় হালকা কালো ও নীল দাগ ছিল, পরে সেটা আর ছিল না।) ডাক্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবকের অনুমতি চায়। আমি ওখানে ছিলাম না তাই আমার খালাকে ফোন করে বললাম তাকে বন্ডে সই করার জন্য। বন্ড সই করার পরে আমার স্ত্রীকে ওটিতে নেয়া হলো।
ঠিক রাত সাড়ে দশটায় যখন বাসটি যমুনা সেতুর উপরে টোল দেবার জন্য থামলো তখন আমি খবর পেলাম সৃষ্টিকর্তা আমাকে একটা পুত্রসন্তান দিয়ে ব্লেস করেছেন। আমি ফোনে কথা বলছিলাম আর আমার দুচোখ বেয়ে আনন্দঅশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল নিজের অজান্তে। আমার পাশে বসে ছিলেন একজন বৃদ্ধ, বয়স আনুমানিক ৬৫ হবে। উনি আমার উৎকন্ঠা ও আনন্দ দেখে বললেন, "কাঁদেন বাবা, কাঁদেন। এটা একটা পরম পাওয়া। আপনি বাবা হয়েছেন, আপনাকে অভিনন্দন।"
রাত সোয়া বারোটায় আমি রাজশাহী গিয়ে পৌঁছালাম। শহর জুড়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। ওদিকে আমার খেয়াল ছিল না। রাত পৌনে একটার দিকে হসপিটালে পৌছে আমার সন্তানকে আমি কোলে নিলাম। সে অনুভুতির কথা আমি বলতে পারবো না। আমার স্ত্রীর সাথে দেখা করতে পারলাম না। উনাকে পোষ্ট অপারেটিভ রুমে রাখা হয়েছিল।
ছেলেকে হসপিটালে রেখে খালার বাসায় গেলাম। ভোরে স্ত্রীর সাথে দেখা হলো। তারপর দুপুর বেলা অফিস থেকে ফোন পেলাম, বলা হলো অফিসে (ঢাকায়) ব্যাক করার জন্য। আবারো কষ্ট পেলাম। চলে আসলাম। যাক সে কথা।
আমার সেই কোলে চড়া ছেলেটা এখন অনেক বড় হয়েছে, সবগুলো ছবির বই শেষ করে ফেলেছে, বইয়ে থাকা সব পশুপাখি গুলো বাংলা নামের সাথে ইংরেজী বলে, সব খেলনা গুলো ভেঙ্গে ফেলেছে, টিভি এডের পোকা, টম এন্ড জেরী শুরু হলে সে আর এই দুনিয়াতে থাকে না, সারাদিন পরে রাতে বাবাকে পেয়ে কোলে চড়ে মায়ের বিরুদ্ধে নালিশ করে, হরলিক্সের গ্লাস শেষ করে বলে "মাই এনার্জি", চকলেটের পোকা, সবচেয়ে শান্ত থাকে যখন পটিতে হাগু করতে বসে তখন, ব্লগে প্রোফাইলের ছবি দেখে চিৎকার করে "বাবা" বলে।
একসময় হয়ত এভাবেই আস্তে আস্তে বড় হয়ে যাবে। ও হয়ত ওর সন্তান কোলে নিবে। এসব ভাবলে আমার চোখ ভিজে যায়।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৩:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



