কংকালসার মায়ের শুকিয়ে যাওয়া স্তনের বোঁটা চুষতে চুষতে কখন যে দুগ্ধপোষ্য কংকালসম শিশুটি মারা গেছে তা হয়ত কেউ টের পায়নি। হয়ত সেই মা-ও মারা গেছে তার কিছুক্ষণ পরে। লাশ পরে থেকেছে রাস্তাঘাটে, বনে বাঁদাড়ে। কে করবে সেই লাশের সতকার? শিয়াল আর কুকুরের মধ্যে মৃত মানুষের লাশ কাড়াকাড়ির হাড্ডাহাড্ডি লড়ায়ের খেলা শেষে হয়ত ভাগাভাগি করেই খেতে হয়েছে এই দুটো প্রাণীকে। এমন দৃশ্য কি কল্পনা করা যায়? কেউ হয়ত আজ এই ২০১১ সালে মাঝামাঝি এসে বলবেন "অসম্ভব অসম্ভব"।
কিন্তু ঠিক এমনই ঘটনা ঘটেছিল এই ভারতবর্ষে ১৯৪৩ সালে। ঠিক এর উল্টো চিত্রও ছিল সেই একই সমাজে। এমন দুর্ভিক্ষের পাশাপাশি কিছু লোক ছিল বহাল তবিয়তে। কেউ কেউ খেয়ে দেয়ে ফুলে ফেঁপে ঢোল হয়েছে। ভারতবর্ষ শোষনে থাকা ব্রিটিশ, তাদের কর্মকর্তা আর এদেশের উচ্চ মধ্যবৃত্তরা ভালই ছিল। ১৯৪৩ ইং সালে (১৩৫০ বঙ্গাব্দ) এই অভিভক্ত বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। তাকে পঞ্চাশের মন্বন্তর বলে। মৃত্যুবরণ করে ৩০ লক্ষ প্রাণ কোন কোন হিসেবে ৫০ লক্ষও পাওয়া যায়। ২০০ বছরের ব্রিটিশ নির্যাতন আর পরাধীনতা কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে আমাদের ভারতবর্ষের প্রতিটি নাগরিককে। সে ঘানি আজো আমরা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি।
"ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়,
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি”
যথার্থই লাইন দুটো। কবি খুব অল্প কথায় বুঝিয়েছেন ক্ষুধার জ্বালা।
পঞ্চাশের মন্বন্তরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে ভারতে বৃটিশ রাজের ঔপনিবেশিক শাসনের সূত্রপাত হয়। অর্থাৎ বাংলা থেকেই বৃটিশ রাজের যাত্রা শুরু হয়। তারও অনেক পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির জাপান হঠাৎ করে দখল করে বসে বার্মাকে (মায়ানমার)। জাপানের এই হটকারী দলখদারিত্বে বেশ কিছুটা ভয় পেয়ে যায় ভারতবর্ষের শাসনের (!) মসনদের থাকা ইংল্যান্ড। তারা সেই সময়ে বিশ্বযুদ্ধের মিত্রশক্তি। তখন পুরো দুনিয়ায় চারিদিক থেকে গন্ডোগোল শুরু হয়ে গেছে। খোদ ভারতবর্ষেই তখন "ইংরেজ খেদাও" আন্দোলন তুঙ্গে। ফলশ্রুতিতে ইংরেজ সরকার তখন ভারতবর্ষের ভৌত অবকাঠামোগুলো নষ্ট করে দিতে শুরু করে। তারা পুরো পরিকল্পনা করে তারা এগিয়েছিল। আর এতে নেতৃত্ব দেয় তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল। আজ এতকাল পরে প্রমান হয়েছে এই উইনষ্টন চার্চিল-ই এই দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী। এই দুর্ভিক্ষের সময়কার যাবতীয় নথি সব নষ্ট করে ফেলেছিল ব্রিটিশ। সেই পঞ্চাশের মন্বন্তরের ছবি আঁকতে নিশ্চই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের হাত কেঁপেছিল। কালো রং এর ছোঁয়ায় তিনি এঁকেছিলেন অনেক স্থিরচিত্র।
নীল আর পাট চাষে কৃষকদের বাধ্য করা হতো। আর এর বিরোধিতা করলে বাংলার কৃষকদের উপরে কি খগড় নেমে আসতো সেটা তো ইতিহাসে এখনও একটা ঘা হয়ে আছে। শীতকালীন শস্য পাকার সময় বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। ঝড়ের হাত থেকে যে সব শস্য বেঁচে যায় সেগুলো পরবর্তীতে মড়কের মুখে পড়ে। সেই পরিস্থিতিতে চালের জন্য ভরসা করতে হয় পার্শ্ববর্তী দেশ বার্মার (মায়ানমার) উপরে। জাপান বার্মা আক্রমন করার ফলে বার্মা থেকে সবরকমের চাল আমদানী বন্ধ হয়ে যায় ভারতবর্ষে।
বাংলায় উৎপাদিত সামান্য পরিমানে চাল ঔপনিবেশিক সরকার সৈন্যদের খোরাক হিসেবে মজুত করে রেখেছিল ব্রিটিশ। আতঙ্কে সাধারণ ব্যাবসায়িরাও চাল মজুত করতে শুরু করে। ফলে বাজারে চালের দাম আকাশছোয়াঁ হয়ে পড়ে। অবশ্য, সে সময় বৃটিশ সরকার তাদের গুদাম থেকে খাদ্য বিতরণ করেছিল। তবে, তা করা হয়েছিল ব্যবসায়ী, বৃটিশ ও তাদের কর্মীদের জন্য বিশেষ করে রেলওয়ে, বন্দর শ্রমিক ও সরকারি চাকুরেদের জন্য। কয়েকটি বড় শহরে নির্ধারিত মূল্যের দোকান খোলা হয়। কিন্তু, তাতে গ্রামবাংলার মানুষের কোনো উপকার হয়নি। তাদেরকে বিনা দ্বিধায় 'ক্ষুধা রাক্ষসের' কাছে সোপর্দ করে বৃটিশ রাজ।
আর এর পাশাপাশি ব্রিটিশ, ভারতবর্ষে জাপানি হামলার ভয়ে নৌকো ও গরুর গাড়ি সহ সব রকম মটরগাড়ী বাজেয়াপ্ত বা ধ্বংস করতে শুরু করে তথা খাদ্য সরবরাহের গোটা কাঠামোর ক্ষতিগ্রস্থ করে ৷এই সব পদক্ষেপের ফলে মারাত্মক দুর্ভিক্ষ আরও তরান্বিত হয়। মানুষ খাবারের আশায় দলে দলে শহরে এসে ভিড় জমাতে শুরু করে। রাস্তাঘাটে তখন ভয়াবহ দৃশ্য দেখা যায়। শিশুসহ কংকালসার মায়েদের মৃতদেহ পড়ে থাকত। অন্যদিকে ব্রিটিশ শাসক ও উচ্চ মধ্যবিত্ত বাংলার মানুষেরা দিব্যি খেয়ে দেয়ে বেঁচে ছিল।
সম্প্রতি জার্মানিবাসী বাঙালি মধুশ্রী মুখার্জি প্রায় ৮ বছর ধরে অজানা অনেক নথিপত্র ঘেঁটে একটি বই লিখেছেন, যার নাম ‘চার্চিলস সিক্রেট ওয়ার' বা ‘চার্চিলের গোপন যুদ্ধ'। তাঁর দাবি, চার্চিল নিজে সরাসরি বাংলার মন্বন্তরের জন্য দায়ী ছিলেন। বাংলায় ত্রাণ সাহায্য পাঠানোর হাজার আবেদন সত্ত্বেও জাহাজ সংকটের অযুহাত দেখিয়ে তিনি সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সেই কাজ করতে দেননি, বরং প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া ত্রাণ পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও চার্চিল ও তাঁর মন্ত্রীরা সেই অনুমতি দেননি। ভারত ও ভারতীয়দের প্রতি তাঁর মনে বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছিল, তার বেশ কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে এই বইয়ে। ভারতের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী লিও আমেরি'র ডায়রি থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে মধুশ্রী মুখার্জি লিখেছেন, ‘‘চার্চিল ও হিটলারের মনোভাবের মধ্যে তেমন পার্থক্য দেখতে পাইনি।" তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লাখ লাখ মানুষের মুখের অন্ন কেড়ে নিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন। বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য খাদ্যশস্য পাঠানোর জন্য ভারতের দুই ভাইসরয়, চার্চিলের ভারত বিষয়ক সচিব এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত চার্চিলকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু, চার্চিল তাদের সে আহবানও প্রধানমন্ত্রী চার্চিল সাড়া দেননি। দলিলপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়া থেকে খাদ্যবোঝাই অসংখ্য জাহাজ ভারতের ওপর দিয়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তখন ওই অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ খাদ্য মজুদ চলছিল। চার্চিল সৃষ্ট এ দুর্ভিক্ষ ভারতে ব্রিটিশ রাজের সবচেয়ে কালিমালিপ্ত একটি অধ্যায়। দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের মৃত্যুতে চার্চিল সামান্য দয়া অনুভব করেননি বরং তিনি সে সময় মন্তব্য করেছিলেন, 'ভারতবাসীরা খরগোসের মত বাচ্চা দেয়।'
এ সময় চার্চিল যদি কিছু খাদ্যশস্য ভারতে পাঠাতেন তবে খাদ্যের দাম কমে যেত। ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো বলেছিলেন, খাদ্য আমদানি করা হয়েছে- শুধু এ খবরটি কোনোভাবে ভারতে পৌঁছালেই তার জের ধরে খাদ্যশস্যের দাম কমে আসতো। কিন্তু, তা করা হয়নি। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম বীর নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু সে সময় বার্মা থেকে দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলার জনগণের জন্য চাল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু, সে খবর ভারতের কোনো পত্রিকায় প্রকাশ করতে দেয়নি বৃটিশ সেন্সর কর্তৃপক্ষ। সে সময় কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া ভারতে খাদ্য পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু, তাও হয়নি। কারণ ভারত মহাসাগর দিয়ে যে সব বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতো সেগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে বৃটেনে খাদ্য আমদানির কাজে।
কে এই উইনস্টন চার্চিল?
উইনস্টন চার্চিল (৩০শে নভেম্বর, ১৮৭৪ – ২৪শে জানুয়ারি, ১৯৬৫) ইংরেজ রাজনীতিবিদ ও লেখক। তিনি যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অধিক পরিচিত।
১৯৪০ সালে তোলা সেই অপরাধী উইনস্টন চার্চিলের ছবি
চার্চিলকে যুক্তরাজ্য ও বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ২০০২ সালে বিবিসির এক জরিপে তিনি সর্বকালের সেরা ব্রিটেনবাসী হিসেবে জয়লাভ করেন।
১৯৪৩ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের কালো রং এ আঁকা কিছু ছবি
মূলকথাঃ
এই ৩০ লক্ষ মানুষকে না খেতে দিয়ে হত্যার জন্য শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকেই দায়ী করা যায়। কারণ শুধুমাত্র তার জেদের জন্যই ভারতবর্ষের এত মানুষকে মরতে হয়েছিল। মানুষ হত্যার জন্য প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত।
আজ প্রায় ৭০ বছর পরে এসেও, আমরা এই হত্যাকান্ডের বিচার চাই।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে এপ্রিল, ২০১১ দুপুর ১২:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


