পুরুষতান্ত্রীক কথাটার মধ্যে এক ধরনের সৈরাচারী মনোভাবের প্রকাশ লক্ষ করা যায়। ইসলামের পারিবারিক স্ট্রাকচার ব্যাখ্যা করার জন্য পুরুষনেতৃত্বাধীন কথাটাই বেশী প্রযোজ্য। হ্যা ইসলামী সমাজ ব্যাবস্থায় পরিবার অবশ্বই পুরুষ নেতৃত্বাধীন।
ইসলাম পরিবারকে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন সামাজিক প্রতিস্ঠান হিসেবে গন্য করে। অন্য ভাবে বলা যায় পরিবার হচ্ছে সমাজ গঠনের প্রধানতম উপাদান বা বিল্ডিং ব্লক। অনেকগুলি পরিবার নিয়ে সমাজ গঠিত হবে - সেই সমাজের প্রতিটি মানুষ কোন না কোন পরিবারের সাথে যুক্ত থাকবে - পরিবার ছাড়া মানুষ একা একা থাকুক এটা ইসলাম কখনই চায় না। পরিবারের কাজ অনেক - তার মধ্যে প্রত্যেকটা মানুষের সামাজিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ব্যাবস্থা এবং ভবিষ্যত প্রজন্মকে সঠিক ভাবে গড়ে তোলা সর্বাধিক গুরুত্বপুর্ণ। একটা প্রতিস্ঠান সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কোন রাস্ট্র যেমন প্রেসিডেন্ট ছাড়া চলতে পারে না বা কোন ব্যাবসা প্রতিস্ঠান যেমন এম.ডি. ছাড়া চলতে পারে না - পরিবারও তেমনি নেতৃত্ব ছাড়া চলতে পারে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে পরিবারের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে? পরিবার মুলত একজন পুরুষ এবং একজন নারীর সম্ময়ে গড়ে ওঠে - যদিও পরবর্তিতে সন্তান-সন্ততির আগমনে পরিবারের কলেবর বৃদ্ধিপায় - তবুও পরিবারের নেতৃত্বের প্রশ্ন যৌক্তিক ভাবেই স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যই সীমাবদ্ধ থাকে। তাহেল কে হবেন পরিবারের নেতা - স্বামী না স্ত্রী? সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে দুটি - ১. স্বামী অথবা ২.স্ত্রী
ইসলাম বলেছে পরিবারের নেতৃত্ব হবে যৌথ নেতৃত্ব, তবে তার মধ্যে স্বামী বা পুরুষের অবস্থান হবে একটু উপরে। মন্ত্রি পরিষদ সাশিত রাস্ট্রে যেমন সকল মন্ত্রীদের যৌথ নেতৃত্ব থাকে কিন্তু প্রধান মন্ত্রীর অবস্থান হয় একটু উপরে। আর স্ত্রী বা নারী হবে তার সহযোগী - রাস্ট্রের উপ-প্রধানমন্ত্রীরমত। এখন নেতৃত্ব প্রতিস্ঠিত রাখার জন্য কিছু ক্ষমতা প্রয়োজন - আপনি কি কোন প্রধানমন্ত্রীর কথা চিন্তা করতে পারেন যার অন্য মন্ত্রীদের উপর কোন ক্ষমতা নাই? না সেটা কখনই সম্ভব নয়। এ'জন্য ইসলাম স্বামীকে পারিবারের অন্য সদস্যদের উপর কিছু ক্ষমতা দিয়েছে। যেমন -
১. স্ত্রী এবং সন্তানদের অভিভাবকত্ব এবং উত্তরাধীকার।
২. অভিভাবক হিসেবে সংশোধনের প্রয়োজনে এবং সীমা লংঘনের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞাসহ সন্তান এবং স্ত্রীকে শাষন করার অধিকার।
৩. বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে একাধিক স্ত্রী গ্রহনের অধিকার।
৪. বিবাহ বিচ্ছেদ বা পরিবার ভেঙ্গেদেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধীকার। ইত্যাদি
দ্বায়িত্বহীন ক্ষমতা সৈরাচারের জন্মদেয়। তাই পুরুষের এই ক্ষমতাগুলিকে ভারসাম্যপুর্ণ করার জন্য ইসলাম তার ঘাড়ে স্ত্রীসহ পরিবারের সকলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানের দ্বায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। আর স্ত্রীকে দিয়েছে সংসার পরিচালনা, মাতৃত্ব এবং ভবিষ্যত প্রজন্মেকে সঠিক ভাবে গড়ে তোলার দ্বায়িত্ব। ইসলামের দৃস্টিতে এই দ্বায়িত্ব এতটাই গুরুত্বপুর্ণ যে নারীকে এর বাইরের সকল দ্বায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। কারণ ইসলাম শুধুমাত্র বর্তমানের উন্নতি নিয়ে চিন্তিত নয়- বরং সামাজের টেকসই উন্নতি এবং স্থীতিশীলতা যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অব্যাহত থাকতে পারে সে জন্যই সমাজের অর্ধেক অংশকে ভবিষ্যত প্রজন্মের পরিগঠনে নিয়জিত করা হয়েছে। এই দ্বায়িত্ব পালন করার পর যদি তার পক্ষে আরো বেশীকিছু করা সম্ভব হয় - তাহলে তার পুর্ণ অধিকার তাকে দেয়া হয়েছে এবং সেই কর্মকান্ড থেকে যদি কোন অর্থ উপার্জিত হয় - তাহলে তার পুর্ণ মালিকানা তারই থাকবে। কোন মন্ত্রী রাস্ট্রের কল্যানে যদি তার নিজ দ্বায়িত্বের অতিরিক্ত কিছু করতে চায় - নিশ্চয়ই করতে পারে - এ'জন্য কি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব অস্বীকার করার প্রয়োজন আছে? নেই। একই ভাবে নারীরা সমাজের সকল সেক্টরে অবদান রাখতে পারবে - সেজন্য পুরুষের নেতৃত্ব অস্বীকার করার প্রয়োজন হবে না।
এই দ্বায়িত্ব এবং ক্ষমতার বন্টনে নারীর ভাগে ক্ষমতার যে কমতিটুকু রয়েগেছে তা ব্যালান্স করার জন্য সন্তানের দৃস্টিতে মায়ের মর্যাদা পিতার চেয়ে উপরে দেয়া হয়েছে - বলা হয়েছে "মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত"। সুতরাং ইসলামের পারিবারিক স্ট্রাকচারে দ্বায়িত্ব, ক্ষমতা এবং মর্যাদার যথাসম্ভব ভারসাম্যপুর্ণ বন্টন করা হয়েছে।
এবার আসুন দেখি এর বাইরে আর কী হতে পারে। স্ত্রী বা নারিকে যদি পরিবারের নেতৃত্ব দেয়া হয় - তাহলে বর্তমানে স্বামীকে দেয়া উল্লেখিত ক্ষমতাগুলি নারীকে দিতে হবে। সেই নেতৃত্বকে ব্যালান্স করার জন্য অর্থনৈতিক এবং সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের দ্বায়িত্বও তাকেই নিতে হবে-কারণ অর্থনৈতিক দ্বায়িত্ব/ক্ষমতা অন্যের হাতে রেখে তার পক্ষে কখনই সঠিকভাবে পারিবারিক নেতৃত্ব প্রতিস্ঠিত রাখা সম্ভব হবে না। তাহলে পুরুষের দ্বায়িত্ব কী হবে? ইসলাম নারীকে যে মাতৃত্বের দ্বায়িত্ব দিয়েছে তা তো পুরুষকে দিয়ে কখনই সম্ভব নয়। তাহলে স্ত্রী বা নারীকেই সকল দ্বায়িত্ব পালন করতে হবে - পুরুষ থাকবে দ্বায়িত্ব হীন। এ'রকম ভারসাম্যহীন অবস্থা প্রায় অকল্পনীয় হলেও কিছু কিছু উপজাতির মধ্যে মাতৃতান্ত্রিক ব্যাবস্থা প্রচলিত আছে। তাদের উপর স্টাডি করে দেখা যেতে পারে সেখানে নারীরা কতটা সুখি বা সেই সমাজ কতটা উন্নত। খুব বেশি উন্নত যে নয় তা সহজেই বোঝাযায় - এবং সে জন্যই বিশ্বের উন্নত কোন সমাজে মাত্রীতান্ত্রীক পারিবারিক ব্যাবস্থা দেখা যায় না
আর এক ধরনের পারিবারিক ব্যাবস্থা পাশ্চাত্যের সমাজে প্রতিস্ঠিত করার চেস্টা করা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে নারী-পুরুষ উভয়ের দ্বায়িত্ব কর্তব্য এবং ক্ষমতা হবে সমান। সেখানে পরিবারকে প্রতিস্ঠান হিসেবে চিন্তা না করে বরং নারী পুরুষের জৈবিক চাহিদা পুরোনের পথ হিসেবেই দেখা হয়েছে। এ'জন্যই তারা বলেছে যেহেতু পরিবার থেকে উভয়ের জৈবিক চাহিদা পুরোন হয় সেহেতু মাতৃত্বেরমত জৈবিক বিষয়কে বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখা যাবে না। অর্থাৎ নারী মাতৃত্বের দ্বায়িত্ব পালনের মাধ্যমে পরিবারের বিশেষ কোন কাজ করছে না - সুতরাং দ্বায়িত্বের সমতা আনার জন্য অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দ্বায়িত্বেও নারিকে সমানভাবে অংশগ্রহন করতে হবে। আসলে পুঁজিবাদী মনোভাবের কারণে অর্থাগমান হয় না এমন কিছুকেই তারা গুরুত্বপুর্ণ কাজ বলে মানতে পারে না। যদিও এই অংশগ্রহনের বিনিময়ে নারীকে পারিবারিক নেতৃত্বেরও সমান অংশ দেয়ার কথা ছিল - কিন্তু সেটা কি বাস্তব সম্মত হতে পারে? এক রাস্ট্রে কি দুজন প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হয়? অথবা এক প্রতিস্ঠানে দুজন সি.ই.ও? না তা সম্ভব নয়। একই ভাবে পারিবার নামক প্রতিস্ঠানেও দুজনের সমান সমান নেতৃত্ব সম্ভব নয়। তাহলে বাস্তবে কী ঘটে - বাস্তবে যেসব নারী ঘরে বাইরে দ্বিগুন দ্বায়িত্ব পালন করেও অর্ধেক দ্বায়িত্ব পালন করা পুরুষের নেতৃত্ব মেনে নিতে পারে সেই পরিবার টিকে থাকে - আর যেখানেই সে তার প্রাপ্য কর্তৃত্বের ব্যাপারে প্রশ্ন তোলে সেখানেই পরিবার ভেঙ্গে যায়। এ'ভাবেই পাশ্চাত্যে পরিবার ব্যাবস্থা প্রায় বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে। আর পরিবার ব্যাবস্থার ধ্বংসের কারনে কুমারী মাতা, পিতৃপরিচয়হীন সন্তান এ'সব জটিল সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। সুতরাং যারা পাশ্চাত্যের অনুকরনে আমাদের সমাজেও সম্পুর্ন অযৌক্তিক সমান সমান ক্ষমতার যৌথ পারিবারিক নেতৃত্ব প্রতিস্ঠার চিন্তা করছেন তাদেরকে এই বিষয়গুলি ভেবে দেখার অনুরোধ করছি। আব্দুল্লাহ উপন্যাসের সেই লাইনটা মনে আছে? - "এক ঘরমে দো পীর? কাভি নেহি" - এটাই নির্মম বাস্তবতা।
বাস্তব উদাহরণ হিসেবে জনপ্রীয় টিভি তারকা শমি কায়সার এবং বিপাশা হায়াতকে দেখতে পারেন। পরিবার এবং মাতৃত্বকে সঠিকভাবে মুল্যায়ন করতে পারায় বিপাশা আজ যেখানে স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে আছেন শমী সেখানে অতি আধুনিকতার পিছনে ছুটতে গিয়ে বরহীন-ঘরহীন হয়ে নি:সংগ জীবন জাপন করছেন। আমরা আমাদের নারীদের জন্য কাকে অনুকরনীয় মডেল হিসেবে দেখতে চাই - বিপাশা হায়াত না শমী কায়সার?
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুন, ২০০৮ দুপুর ১:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


