সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানে যে নাটক অভিনিত হয়েছে এবং হচ্ছে তাকে পাকিস্তানে ইতিপুর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি (বা পুন:অভিনয়) বলেই মনে হয়। খুব বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে সাম্প্রতীক সময়ে পাকিস্তানে যা ঘটেছে মোটা দাগে তার বর্ণনা এরকম -
১. নেওয়াজ শরীফের নেতৃত্বাধীন জোট স্বাধারণ নির্বাচনে দুই তৃতিয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয়।
২. পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নিতির ব্যাপক অভিযোগ প্রচারিত হতে থাকে।
৩. এক পর্যায়ে পারভেজ মোশাররফ দুর্ণীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষনা করে ক্ষমতায় অধিস্ঠিত হয়।
৪. দুর্নীতির দায়ে সাবেক দুই প্রধান মন্ত্রী বেনজীর ভুট্ট এবং নওয়াজ শরীফকে দেশ থেকে বহিস্কার করা হয়।
৫. ডানপন্থী এবং বৃহত্তম দল মুসলিম লীগকে ভেঙ্গে দুই টুকরা করা হয় এবং এক পক্ষকে ক্ষমতায় বসান হয়।
৬. পারভেজ মোশাররফের পতন নিশ্চিত হবার পর বেনজীর এবং নওয়াজ শরীফ দেশে ফিরে আসেন - তাদের বিরুদ্ধে আনিত সব দুর্ণীতির অভিযোগ বাতিল হয়ে যায়।
৭. পারভেজ মোশাররফের নিরাপদ বিদায় এবং পরাশক্তির স্বার্থ সংরক্ষন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নওয়াজ শরীফ এবং বেনজীর কাউকে বিশ্বস্ত মনে নাহওয়ায় বেনজীরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয় এবং সেই শোক কাজে লাগিয়ে পি.পি.পি. প্রধান হিসেবে জারদারী প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন। একসময় যাকে সেরা দুর্নিতিবাজ হিসেবে ব্যাপক ভাবে প্রচার করা হয়েছিল তিনিই আজ বিশ্ব নন্দিত প্রেসিডেন্ট!!
৮. পাকিস্তানে মার্কীন বাহীনির আগ্রাসনের অনুমোদন এবং কাশ্মীর প্রশ্নে ভারতের পক্ষে কথা বলার মাধ্যমে পরাশক্তির স্বার্থ সংরক্ষনের ব্যাপারে জারদারী তার নিজের বিশ্বস্ততার প্রমান ইতিমধ্যেই হাজির করেছেন। এবং আশা করা যায় ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবেন।
এবার দেখি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাবলী:-
১. বি.এন.পির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট দুই তৃতিয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হয়।
২. সরকারের বিরুদ্ধে দুর্ণীতির অভিযোগ ব্যাপক হারে প্রচারিত হতে থাকে।
৩. দুর্ণীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষনা করে ক্ষমতায় আসে সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকার।
৪. দুর্ণীতির দায়ে সাবেক দুই সরকার প্রধানকেই জেলে নেয়া হয়। চেস্টা করা হয় দেশের বাইরে পাঠানোর। এ'ব্যাপারে শেখ হাসিনা সম্মত থালেও বেঁকে বসেন খালেদা জিয়া। তাকে রাজি করানোর জন্য অসুস্থ দুই ছেলেকে অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে তার সামনে আদালতে আনা হয় - যার নজীর বাংলাদেশেতো নয়ই বিশ্বে কোথাও আছে কি না সন্দেহ। এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা এবং তারেক জিয়াকে বিদেশে পাঠিয়ে এই পর্বের সমাপ্তি টানা হয়। এটা মুলত এই নাটকের এ'দেশী পার্ফরমারদের ব্যার্থতা আর খালেদা জিয়ার একরোখা জেদের ফসল।
৫. ডানপন্থী এবং বৃহত্তম দল বি.এন.পিকে ভাঙ্গার চেস্টা করা হয়। কিন্ত এখানেও সফল হওয়া যায়নি খালেদা জিয়ার জেলে ঢোকার পুর্ব মুহুর্তে নেয়া এক সিদ্ধান্ত - মান্নান ভুইয়াকে বহিস্কার - এবং দেশের জনগনের তথাকথিক সংস্কার পন্থীদের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে। তবে নাটকের পরিচালকরা এই কাজে নির্বাচন কমিশন, সরকার এবং মিডিয়াসহ সকল শক্তিনিয়ে সর্বোচ্চ চেস্টা করেছে।
৬. বর্তমান তত্বাবধায়ক সরকারের দক্ষতার অভাবে দুই দুইটি ক্ষেত্রে ব্যার্থতার কারনে তাদেরকে দৃশ্যপট থেকে নিরাপদে সরিয়ে দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ'জন্যই ১৮ই ডিসেম্বরের নির্বাচনের আয়োজন। এ'খন প্রশ্ন হচ্ছে - আগামীতে কে বা কোন দল এই সরকারের নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরাশক্তির স্বার্থ সংরক্ষনে বিশ্বস্ততার সাথে কাজ করতে পারবে? কে হবে আগামী দিনের জারদারী?
দৃশ্যত মনে হচ্ছে শেখ হাসিনাকেই সেই দ্বায়িত্ব দিয়ে দেশে পাঠান হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হল দেশে যদি সত্যি সত্যি নিরপেক্ষ নির্বাচন হয় আর চারদলীয় জোট পুর্ণ শক্তি নিয়ে তাতে অংশ নেয় তাহলে আওয়ামী লীগের পক্ষে জিতে আসা প্রায় অসম্ভব। তা'ছাড়া শুধু জিতলেইতো হবে না দুই তৃতিয়াংশ সংখ্যাগরিস্ঠতাও লাগবে - এই সরকারের সব অপকর্মের বৈধতা দেয়ার জন্য। সবার অংশগ্রহনের অবাধ নির্বাচনে কি তা সম্ভব? আর শেখ হাসীনা কি পরাশক্তির পক্ষে দেশের সব স্বার্থ বিসর্জন দিতে রাজি/বিশ্বস্ত বলে বিবেচিত হবেন? স্বরণ করা প্রয়োজন তিনি এই দেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তাহলে তাকে দেশে পাঠান হচ্ছে কেন? বেনজীরের ভাগ্য বরণ করার জন্য কি? তার মৃত্যুর শোক কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগের অন্য কোন নেতাকে ক্ষমতাসীন করাই কি নাট্যকারের পরিকল্পনা? এ'জন্যই কি আওয়ামী লীগের নেতারা শেখ হাসিনাকে বিদেশে রেখে নির্বাচন সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত অতি উৎসাহের সাথে নিয়ে নিচ্ছে? তাদের কাছে কি ইতি মধ্যে গ্রীন সিগনাল এসে গেছে? আমু/তোফায়েল/সুরঞ্জিত/মতিয়া/রাজ্জাক/জিল্লুর - সবার সামনেই কি ঝুলছে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রীত্বের মুলো?
এ'সবই এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন - উত্তর একমাত্র সময়ই বলে দেবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

