somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী টোমাজ ট্রান্সট্রোমার-এর দশটি কবিতা

০৮ ই অক্টোবর, ২০১১ দুপুর ২:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ: সৌম্য দাশগুপ্ত
সন্ধে-সকাল

চাঁদ-মাস্তুলে পচন ধরেছে, পাল-গুলি গেছে কুঁচকে
গাংচিলখানি মত্ত, নৌকো ভাসিয়ে চলেছে সাগরে
আধপোড়া লাগে ডকের পৃথুল ঘনকের এক টুকরো
ওৎ পেতে থাকা জন্তুর মতো ঝোপে নেমে এল সন্ধে।

দোরগোড়া জুড়ে থেকে থেকে যেন ধাক্কা দিচ্ছে সূর্য
সমুদ্রের ওই রুপোলি পাথর-গেট ভেদ করে ঝলকায়
রোদ্দুর, যেন পৃথিবীর খুব কাছে, সাগরের কুয়াশায়
শ্বাস রোধ হওয়া গ্রীষ্মের যত দেবতারা শুধু হাতড়ায়।



ঝড়

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বুড়োর সঙ্গে দেখা হলো
একটা দৈত্যের মতো ওক গাছের
যেন পাথর হয়ে যাওয়া হরিণ
বিরাট শাখাশৃঙ্গ নিয়ে হেমন্তের সমুদ্রের
ঘনসবুজ দুর্গদেয়াল ঠেলছে

উত্তরের ঝড়। রোয়ানফল পাকার সময় হয়ে এল।
রাতে জেগে সে মন দিয়ে শোনে
ওক গাছের মাথার অনেক ওপরে
নিজের নিজের আস্তাবলের ভিতরে
তারাপুঞ্জের খুরাঘাতের আওয়াজ ।


রেললাইন

রাত দুটো। চন্দ্রালোক। ট্রেন গ্যাছে থেমে
মাঠের ভেতরে। দূরে বিন্দু বিন্দু আলো
শহরের, দিগন্তে তাপহীন কাঁপে।

যেভাবে কখনো কেউ এতদূর পৌঁছে যায় স্বপ্নের গভীরে
কখনো কখনো, আর ঘরে ফিরে এলে
কোনোদিনও মনে করতে পারে না কোথায় গিয়েছিল

কিংবা কখনো কেউ এতদূর পৌঁছে যায় অসুখের তীরে
যে তার দিনগুলি শুধু কম্পমান একঝাঁক স্ফুলিঙ্গের মতো
দুর্বল, শীতল তারা দিগন্তের দিকে।

ট্রেনখানি সম্পূর্ণ নিথর।
রাত দুটো: জোর চাঁদ, দুয়েকটা তারা।



বৃক্ষ এবং আকাশ

বৃষ্টিতে বৃক্ষটি হেঁটে চলে।
আমাদের ছাড়িয়ে সে পিছল ধূসরতায় যায়
ব্যস্ত কোনো কাজে। দেখ, কেমন কুড়োয়
বৃষ্টি থেকে টুকরো টুকরো প্রাণ, ঠিক চেরির বাগানে
ব্ল্যাকবার্ড যেন।

যেই বৃষ্টি থেমে যায়, বৃক্ষটিও থামে।
নিথর দাঁড়িয়ে থাকে অমল রাত্রির বুকে, যেন
অপেক্ষায় থাকে ঠিক আমাদের মতো
সেই মুহূর্তের জন্য, যখন তুষারকুচি
নিজেদের উপচে দেবে
শূন্যের ভিতরে।



অর্ধ-সমাপ্ত স্বর্গ

ভীরুতা নিজের পথ খুঁজে নিয়ে চলে
বিষাদ নিজের পথ খুঁজে নিয়ে চলে
শকুন নিজের পথ খুঁজে উড়ে যায়।

আগ্রহী আলো ঝলমল খুলে যায়
মদিরাপাত্র তুলে নেয় অশরীরী।

বাতাস দেখছে আমাদের ছবিগুলি
তুষারযুগের স্টুডিওর লাল পশু।

সবকিছুরই তো মোড় ফিরে এল তবে
দল বেঁধে তবে রোদ্দুরে চলো যাই।

প্রতিটি মানুষ যেন অর্ধেক খোলা
দরজার মতো, যেন তারা কোনো ঘরে
পথ দেখিয়েই সবাইকে নিয়ে যায়।

পায়ের তলায় শেষহীন প্রান্তর।

গাছেদের ফাঁকে জল চিকচিক করে।

লেক খানা যেন জানালা এ-পৃথিবীর।



খোলা আর বদ্ধ জায়গা

দস্তানা দিয়ে ছোঁয়ার অনুভূতির মতন, পেশার ভিতর দিয়েই
ভুবন ছুঁয়ে দেখে একটা লোক।
দুপুরে খানিকটা জিরিয়ে নেয়ার সময় দস্তানাগুলি তাকের ওপর খুলে রাখে।
সেখানে তারা হঠাৎ বেড়ে উঠতে থাকে, বিশাল বড়ো হয়ে ওঠে
গোটা বাড়িটা অন্ধকার লাগে তখন।

অন্ধকার বাড়িটা চললো এপ্রিলের হাওয়া খেতে।
ঘাসগুলি ফিসফিস করে, ‘মাপ করো, মাপ করো।’

ছোটো ছেলেটি আকাশে উঠে যাওয়া অদৃশ্য সুতোর সঙ্গে সঙ্গে ছুটতে থাকে
সেখানে উড়ছে তার দুরন্ত স্বপ্নঘুড়ি, যেটার সাইজ তার শহরের থেকেও বড়ো।

উত্তরদিকে দেখা যায় ফারগাছের নীল কার্পেটে মোড়া একটা পাহাড়
যার ওপর মেঘেদের ছায়াগুলি
নড়ে না।

নাহ্ , ওই নড়ে উঠলো।


বইয়ের আলমারি

তার মৃত্যুর পর ওটা ফ্ল্যাটের বাইরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। বেশ কয়েকদিন ফাঁকা থাকার পর আমি ওটার তাকে বই রাখা শুরু করলাম, কাপড়ে বাঁধাই করা ভারী বইগুলি দিয়ে। কোনোভাবে এসবের ফাঁকে আমারই অনবধানে ঢুকে পড়েছে খানিকটা কবরের মাটি। অতলের থেকে কিছু একটা উঠে এসেছিল, ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে উঠে সেটা দুর্দম, প্রকাণ্ড এক পারদের কলাম হয়ে দাঁড়ালো। মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার উপায় ছিল না।

মুখ বন্ধ করা ঘনরঙা ভল্যূমগুলি দেখতে ঠিক সেই আলজেরীয় মুখগুলির মতো, যাদের দেখেছিলাম সীমান্তে, ফ্রীডরিখ-স্ট্রাসের ওপর, পূর্ব জার্মানির পুলিশের সীলমোহর পাওয়ার জন্যে লাইন দিয়ে অপেক্ষারত। কাচের ঘরটায় আমার নিজের পাশবইও দীর্ঘক্ষণ পড়ে ছিল। সেদিন বার্লিনে যে সান্ধ্য বাতাস দেখেছিলাম, ঠিক সেই বাতাস যেন এই বইয়ের আলমারিটায়। এর মধ্যে একধরনের প্রাচীন নৈরাশ্য রয়েছে, যেটার স্বাদ অনেকটা প্যাশেনডেল আর ভার্সাইয়ের শান্তিচুক্তির মতো, কিংবা আরো পুরোনো। ওই বিশাল বইগুলির দিকে বারবার ঘুরেফিরে আসি–ওগুলো নিজেরাই যেন একেকটা পাসপোর্ট। শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষকে এত এত সরকারি স্ট্যাম্প লাগাতে হয়েছে যে ভারী হয়ে গেছে বইগুলি। স্বভাবতই, মানুষ তো আর তার মালামাল কখনোই যথেষ্ট পরিমাণে অনুমান করতে পারে না। এই যে সেগুলি চলে যেতে শুরু করেছে, এই যে অবশেষে তুমি …

বয়স্ক ঐতিহাসিকেরা সবাই রয়েছেন সেখানে, তাঁরা উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের পারিবারিক জীবনে উঁকি মারতে পারেন। কিছুই শোনা যাচ্ছে না যদিও, তবু কাচের ওপাশে তাঁদের ঠোঁটগুলি সর্বক্ষণ ফিসফিস করছে (“প্যাশেনডেল[১.]”…)। ব্যাপারটা প্রাচীন একটা অফিসবাড়ির কাহিনী মনে করিয়ে দেয়, (এটা একেবারে ভুতুড়ে গপ্পো), যে-বাড়িতে বহুকালাবধি মৃত সব ভদ্রলোকদের ছবি টাঙিয়ে রাখা থাকতো, আর একদিন অফিসকর্মীরা খেয়াল করলেন যে ফটোফ্রেমের কাচের ভিতরের দিকটা আর্দ্র। যেন মৃতেরা রাত্রিবেলা শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলতে শুরু করেছিল।

বইয়ের আলমারিটা এর থেকে বেশি পোক্ত। এক নম্বর এলাকা থেকে পাশের এলাকায় সিধে তাকিয়ে থাকে! এমন একটা চকচকে ত্বক, যেন অন্ধকার নদীর গায়ের ত্বকের মতন, যার ওপর এই ঘরটা তার নিজের চেহারা দেখবে। আর মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া নিষিদ্ধ।



দুটি শহর

অনেকটা জল, দুদিকে শহর দাঁড়িয়ে–
একটা আঁধার, সেখানে শত্রুদল।
অন্য শহরে জ্বলছে বাতির সারি।
মুগ্ধ হয়েছে আলোয় অন্ধকার।

স্বপ্নের থেকে সাঁতারে বেরিয়ে এলাম
ঘন জলরাশি ঝলমল করে আলোকে
ভেসে আসে যেন স্যাক্সোফোনের সুর
“কবর ওঠাও!” গলা শুনি বন্ধুর


রোমানেস্ক খিলান

বিশাল রোমানেস্ক গীর্জার ভেতরের আধো-অন্ধকারে ভিড় করেছে ট্যুরিস্টরা
খিলানের পর খিলান খুলে যায়, পরিপ্রেক্ষিতহীন।
কয়েকটা মোমের শিখা কেঁপে ওঠে
আমাকে জড়িয়ে ধরে এক দেবদূত, যার মুখ ঠাহর হয় না আমার
তার ফিসফিসানিতে আমার শরীরে তরঙ্গসঞ্চার:
‘মানবজীবন নিয়ে লজ্জিত বোধ কোরো না, গর্ব করো!
তোমার ভেতরে অন্তহীন খুলে যাবে খিলানের পর খিলান।
তুমি কখনোই সম্পূর্ণ হবে না, এমনই হবার কথা।’

জলে ভরে যায় চোখ
আমাদের যখন পথ দেখিয়ে চোখধাঁধানো রৌদ্রোজ্জ্বল বাগানে নিয়ে গিয়ে ফেললো ওরা,
সঙ্গে শ্রীযুক্ত ও শ্রীমতী জোন্স্, হ্যের তানাকা, ও সিনিয়োরা সাবাতিনি;
তাদের প্রত্যেকের ভিতরে খুলে যায় একের পর এক অন্তহীন খিলান ।



রাস্তা পারাপার

ঠাণ্ডা হাওয়া চোখে এসে ধাক্কা দেয়, দুটো কি তিনটে সূর্য
অশ্রুর রামধনুতে নাচ করে, যখন আমি
এই অতিপরিচিত রাস্তা পার হই,
যেখানে তুষারপুঞ্জের থেকে ঝলমল করে গ্রীনল্যান্ডের গ্রীষ্ম।

রাস্তার দুর্দম জীবন আমার চারপাশে ঘুরপাক খায়;
তার মনেও থাকে না কিছু, কোনো চাহিদাও নেই।
ট্রাফিকের অনেক নিচে, মাটির অনেক গভীরে
অজাত অরণ্য অপেক্ষা করে, নিথর, হাজার বছর ধরে।

আমার মনে হয় রাস্তা আমাকে দেখতে পায়।
তার দৃষ্টি এত ক্ষীণ যে খোদ সূর্যকে তার
কৃষ্ণ শূন্যে ছাইরঙা সুতোর গুটলি মনে হয়।
কিন্তু এক সেকেন্ডের জন্য আমি আলোকিত। সে আমাকে দেখতে পায়।
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×