ধবধবে জ্যোৎস্নায় পিঠ ঠেকিয়ে কাঠের গুঁড়ির ওপর বসে অবিরাম পাতার বাঁশি বাজিয়ে চলেছে শ্যাম। গাছের সামান্য একটা চিকন পাতা দিয়ে এমন অদ্ভুত সুর তোলে সে, যেন কোথায় নিয়ে যায় সেই সুর। শ্যামের পাতার বাঁশির সুর মৌন রাত্রির বুক চিড়ে ভেসে যাচ্ছে দূরে। দিনে প্রচন্ড গরম আর রাতে শীতের আমেজ। শিশিরও পড়ছে বেশ। পাকা রাস্তায় গাড়ি চলা বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। মাঝে মাঝে দু-একটি ভ্যান যাচ্ছে। সিনেমা হলের রাতের শো ভাঙা দর্শক হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। কেউ কেউ গলা খুলে গাইছে সদ্য দেখা সিনেমার গান। কোন দিকেই ভ্রুক্ষেপ নেই শ্যামের। সে আপন মনে বাজিয়ে চলেছে পাতার বাঁশি।
শ্যামল বিশ্বাস। শ্যাম নামে ডাকে সবাই। সেই কবে বাড়ি থেকে রাগ করে চলে এসেছে। বছর আটেক হবে। আজ পর্যন্ত বাড়ি ফিরে যায়নি। এখন শ্যামের বয়স ছাব্বিশ। এই আট বছরে জীবিকার প্রয়োজনে অনেক কিছুই করেছে দুবার এস. এস. সি ফেল করা শ্যাম। প্রথম বার ইংরেজীতে ফেল করেছিল। দ্বিতীয়বার অংকে। প্রথম বার ফেল করেই অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে তাকে। বলেছে বাড়ির মানুষ, পাড়ার মানুষ। 'অমন চুলে টেরি কেঁটে ঘুরে বেড়ালে ফেল তো করবেই।' 'ভবঘুরের একশেষ।' 'পড়বে কখন, গায়ে যে সখির বাতাস লেগেছে।' 'দাঁত না উঠতেই মটর চিবোতে চায়।' এমন আরও কত হুল ফোঁটানো কথা। আর দ্বিতীয়বার ফেল করার পর সে যেন যমেরও অরুচি। রাস্তার নেড়ি কুকুরটাও তাকে দেখলে পাশ কেঁটে যায়। কথায় কথায় বাড়ির লোকে ফোঁড়ন কাঁটে। বৌদি মুখ ঝামটা দেয়, দাদা ধমক দেয়, বাবা তিন বেলা বাড়ি থেকে বের করে দেন। মা বলেন, তোর মরণ হয় না! বাবা-দাদা কাঠ মিস্ত্রির কাজ করে। সে যতটুকু পারে তাদের সাহায্য করে। তবু তাদের মন ওঠে না। পাশের বাড়ির নারায়ণ গেঞ্জির কলার উঁচু করে কলেজে যায়। যাবার সময় আড় চোখে তাকায়। বাবা-দাদার সহ্য হয় না। রাগ ঝাড়ে তার ওপর। বিকেলে একটু ক্রিকেট খেলতে যায় শ্যাম। কিন্তু ফেল্টু বাবুর এই বিলাসিতা বাড়ির লোকে সইবে কেন! বাড়ি ফিরে ধমক খায়, অরুচিকর গালি শুনতে হয়। আর কত সহ্য হয়! জীবন অতিষ্ঠ। একদিন বৌদি খাবারের খোটাও দিল। সে মুখ ফুঁটে বলতে পারলো না, আমি আমার বাবার রোজগার খাই। আমি নিজেও কমবেশি কাজ করি। সন্ধ্যার মুখে চোখের জল মুছতে মুছতে বেড়িয়ে পড়লো বাড়ি থেকে। প্রথমে ইটের ভাটায় কাজ নিয়েছিল, তারপর মুদি দোকানের বিক্রেতা, সাইকেলের মেকার, নানা ঘাটের জল খেয়ে এখন থিতু হয়েছে স' মিলের কাঠ চেরাইয়ের কাজে। এভাবেই আট বছর। চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে। পাতার বাঁশি থেমে গেল। ঘরে গিয়ে কান্ত শরীর মেলে দিল বিছানায়।
বাঁশপাতা একটা ছোট্ট মফস্বল শহর। খুব বেশি উন্নত নয়। তবে মোটামুটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আছে। প্রধান সড়কের পাশেই স'মিল। প্রায় তিন বছর ধরে এখানে কাজ করছে শ্যাম। স'মিলের মালিক জয়নাল শেখ। শ্যাম ছাড়াও দেবু ও ফিরোজ নামে আরও দুজন কাজ করে এখানে। আরো একটি ছেলে ছিল। কয়েকদিন আগে সে কাজ ছেড়ে দিয়েছে। দেবু তার চেয়ে বয়সে বড়। ফিরোজ তিন-চার বছরের ছোট। শ্যাম কাজ ভাল বোঝে। মালিকের সাথে সম্পর্কও ভাল। শ্যাম কারো সাতে-পাঁচে নেই। সারাদিন কাজ করে রাত হলে পাতার বাঁশি বাজায়। জীবন তাকে অনেক নির্মম শিক্ষা দিয়েছে। তাই বুঝি কাজের অবসরে কিসের ভাবনায় ডুবে থাকে। দেবু অত্যন্ত ধুরন্দর। শ্যামের পিছে লেগে থাকে। মাঝে মাঝে শিখার কথা তুলে খোঁচায়।
শিখার বাড়ি পাকা রাস্তা থেকে খানিকটা ভিতরের দিকে। বাড়িতে রান্না করে বিভিন্ন দোকানে খাবার সরবরাহ করে। আয় রোজগার যা হয় তাতে মোটামুটি চলে। শিখা অন্যসব দোকানে খাবার দিয়ে এসে সব শেষে আসে স'মিলে। খাবার সময় বসে থাকে। গল্প করে। শ্যামের সঙ্গেই তার ভাব বেশি। নানা রসিকতা করে, হাসে। দেবুর গা জ্বলে যায়। ফিরোজ সরল-সোজা ছেলে। সেও রসিকতায় যোগ দেয়। আবার দেবুর ধমক খেয়ে চুপ হয়ে যায়। রাতে মাত্র পাঁচ-ছয়টি দোকানে খাবার দেয় শিখা। কারণ রাতে সবাই বাড়ি ফিরে যায়। আর অফিসগুলো তো বন্ধই হয়ে যায়। স'মিলেও রাতে খাবার দেয় শিখা। শ্যামের কোথাও থাকার জায়গা নেই, খাওয়ার জায়গা নেই। ফিরোজ আর দেবু রাতে বাড়ি ফিরে যায়। শ্যাম রাতে স’মিলেই থাকে। স'মিলের সাথেই ছোট একখানা টিনের ঘর তুলে দিয়েছে মালিক। এজন্য শ্যামের ওপর মালিক বিশেষ আস্থাভাজন।
আজ সাত সকালে দু-ভ্যান গুড়ি চলে এসেছে। গতকালের জমে থাকা কিছু কাজ এখনো শেষ হয়নি। আজ বেশ ধকল যাবে। হোটেল থেকে সকালের নাস্তা খেয়ে এসে বসে আছে শ্যাম। দেবু আর ফিরোজ এখনও আসেনি। মালিকও আসেনি। মালিকের বাড়ি একটু দূরে। তিনি একটু দেরিতেই আসেন।
খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পর দেবু আর ফিরোজ এলো। তাড়াতারি কাজ শুরু করে দিল তিনজনই। প্রচন্ড গরম। কাজ শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘেমে একেবারে জবজবে হয়ে গেল তিনজনই। হাতে-পায়ে কাঠের গুড়োয় একাকার। শ্যামের গায়ের রঙ একটু বেশি কালো হওয়ায় ঘামলে একেবারে চকচক করে। শিখা মাঝে মাঝেই ঠাট্টা করে বলে, গায়ে গর্জনের তেল মেখেছ দেখি, হাতে রামদা নিয়ে দাঁড়ালেই সাক্ষাৎ অসুরের মতো লাগবেনে।
শিখার ঠাট্টায় কিছু মনে করে না শ্যাম। শিখা অমনই। বুদ্ধিমতী তবে মনটা বড় সরল। কথায় কথায় হাসে। শিখার হাসি মাঝে মাঝে তার ভিতরে কম্পন তোলে। কৈশোরে যেমন তুলতো তপতী। তপতী এখন কোথায় সংসার করছে কে জানে! তার ভেতরের কম্পন কেউ শোনে না। দেবু শোনে না, ফিরোজ শোনে না, এমনকি শিখাও শোনে না। সে শুধু নিজের ভিতরেই সেই কম্পন অনুভব করে।
দুপুরে খাবার নিয়ে এলো শিখা।
আজ কি রান্না করছ? বললো দেবু।
শিখা বললো, খুলে দেখলিই তো বুঝবা।
দেবুর মুখ কালো হয়ে গেল, শুনতি দোষ কিসি।
শুনতি কোন দোষ নাই। কিন্তু রোজ রোজ এক কথার উত্তর দিতি আমার ভাল লাগে না। বললো শিখা।
চুপ হয়ে গেল দেবু। শ্যাম নিজে নিজেই হাসে। আড়চোখে শ্যামের দিকে তাকিয়ে রাগে ফুসতে থাকে দেবু। খাওয়া শুরু করে।
গুড়ো মাছের চচ্চরি খুব ভাল অইছে দিদি। বললো ফিরোজ।
ফিরোজের দিকে একবার তাকালো দেবু। সে চোখের ভাষা বোঝে ফিরোজ। আর কোন কথা বলে না সে।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকে সবাই। শিখা দু-হাতে শাড়ীর আঁচলের কোনা পাকায় আর শ্যামের দিকে তাকিয়ে থাকে। শ্যামের খাওয়া দেখে। এত কম খেয়ে এই মানুষটা এমন পরিশ্রমের কাজ করে কেমনে! ভাবে শিখা। শ্যামের সাথে চোখা চোখি হতেই চোখ নামিয়ে নেয় শিখা।
চব্বিশে পা দেওয়া শিখার যৌবন এখন দীপ্ত শিখার মতোই। গায়ের শ্যামলা রঙ, চিকন গড়ন, তেল চকচকে বড় খোঁপা, পরনের মলিন কাপড় দেখে দরিদ্র ঘরের আর পাঁচটি আটপৌরে মেয়ের মতোই মনে হয় শিখাকে। শুধু শিখার মুখখানা আর কথা বলার ধরণই অন্যদের চেয়ে আলাদা মনে হয় তাকে। বাজারে খাবার সরবরাহ করলেও শিখার সম্ভ্রম জ্ঞান প্রখর। কত জন কত কথা বলে, কত কু-প্রস্তাব দেয়। শিখা বুদ্ধিমত্তার সাথে সেসব এড়িয়ে চলে। অথবা সেখানে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দেয়। বড় বাজারের টিনের দোকানের মালিক নলিনীবাবু একদিন তাকে পিছনের ঘরে ডেকে নিয়েছিল, একটু এদিকে আয় তো শিখা।
কেন?
আয় না, বলছি। সব কথা কি আর এখানে বলা যায়!
শিখা সরল মনে পিছনের ঘরে গিয়েছিল। কারণ নলিনীবাবু তার বাবার বয়সী। একবারের জন্যও তার ভিতরে কোন সন্দেহ হয়নি। পিছনের ঘরে নিয়ে নলিনী বাবু বলেছিল, তোর বাড়িতে তো টালির ঘর নারে শিখা?
হ্যাঁ।
বৃষ্টি-বাদলায় বড় কষ্ট হয়, না?
তাতো একটু হয়ই।
তোর কাকিমা অনেকদিন ধরে প্যারালাইসিসের রোগী। শরীরের চাহিদা মেটাতে অক্ষম। আর আমার যা বয়স। শরীরের ক্ষুধা এখনও মরেনি। ভগবানের আর্শীবাদে আমার কোন কিছুর অভাব নেই বুঝলি। তবু আমি একজন অসুখী পুরুষ। আর একটা বিয়েও করতে পারিনা। লোকে মন্দ বলবে। তাই বলছিলাম তুই যদি মাঝে মাঝে আমাকে একটু সুখী করিস। আমি তোর বাড়িতে আট ফুঁটে টিনের ঘর তুলে দেব। মাঝে মাঝে হাত খরচের টাকা, পুঁজোয় কাপড়, আর সাজগোজের ঐ মেয়েদের যা লাগে আর কি। আমি তোকে সব দেব। শুধু তুই আমাকে একটু সুখী কর। কেউ জানবে না।
বলেই শিখার দু-হাত চেপে ধরেছিলেন নলিনীবাবু। রাগে, ক্ষোভে, লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিল শিখা। গরম সীসার উত্তাপ নিয়ে শব্দগুলো কানে ঢুকেছিল। মুখে শুধু বলেছিল, আমি টালির ঘরে দিব্যি আছি নলিনীবাবু। আমার টিনের ঘরের দরকার নেই। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল নলিনীবাবুর দোকান থেকে। আর ভুলেও কখনো নলিনীবাবুর দোকানে পা দেয়নি।
আর একবার আমিন কসমেটিকস এর মালিক আমিন একদিন তার হাত ধরে বলেছিল, তোর হাতখানা বড় খালিখালি লাগেরে শিখা। দে চুড়ি পড়িয়ে দিই।
সেই হাতের চাপ আর চোখের ইঙ্গিত বুঝেছিল শিখা। আমিন ফার্মেসীতেও খাবার দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে শিখা। এমন আরও টুকরো টুকরো ঘটনা ঘটে মাঝে মাঝেই।
শিখার মা-বাবা কেউ নেই। ছোট ভাই কাস সিক্সে পড়ে। স্কুল থেকে ফিরে শিখাকে কাজে সাহায্য করে। রাতে টর্সলাইট হাতে শিখার সঙ্গে আসে। দুজনের সংসার কোনমতে খেয়ে পড়ে চলছে। মাস তিনেক আগে শিখার মা মারা গেছে। সেদিন ছিল বৃষ্টির রাত। শিখা লোক দিয়ে খবর পাঠিয়েছিল শ্যামকে। শ্যাম ছুটে গিয়েছিল। নিজেই লোকজন ডেকে নিজ দায়িত্বে শিখার মায়ের সৎকার করেছিল। সেই বিপদের দিনে শিখার পাশে দাঁড়িয়েছিল। সেই থেকে শ্যামের প্রতি শিখার কেমন মায়া জন্মে গেছে।
খাওয়া শেষ হলে খাবারের বাটিগুলো গোছাতে গোছাতে শিখা বললো, তোমাদের মালিক কই? কিছু টাকার দরকার।
শ্যাম বললো, মালিক তো বিকালের আগে আর আসপেন না। কাল নিও।
শিখা বললো, কাল মনে করে রাখে দিও।
আচ্ছা। বললো শ্যাম।
চলে গেলে শিখা। দেবু আস্তে বললো, মাগির বিষ যদি আমি না নামাইছি তো আমি বাপের জন্মই না।
শ্যাম বললো, মেয়ে মানুষকে গালি দেও ক্যান।
দেবু গলার জোর বাড়িয়ে বললো, তুমার এতো পোড়ে কিসি। দরদ উতলায়ে পড়ে মনে অয়।
শ্যাম বললো, উল্টা-পাল্টা কতা কবা না কয়ে দিলাম। ভাল অবেন না।
দেবু এগিয়ে গিয়ে শ্যামের ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে বললো, কি অবেনে! এই কি অবেনে! তুই আমার কি করবি? ভিন দ্যাশের তে আসে তুই আমার সাতে পাল্লা দিস!
গায়ে হাত দিয়ে কতা কও ক্যান? বললো শ্যাম।
এই তুই কোন লাট সাহেবের বাচ্চা রে! তোর গায় হাত দিলি কি অবেনে!
দ্বিতীয় বার শ্যামের গায়ে ধাক্কা দিতেই শ্যামও দেবুকে বেশ জোরে ধাক্কা দেয়। পিছনের গাছের গুড়িতে বাঁধা পেয়ে মাটিতে পড়ে যায় দেবু।
দেবু ফুঁসতে ফুঁসতে উঠে গিয়ে লম্বা একফালি কাঁঠ নিয়ে তেঁড়ে আসে শ্যামের দিকে। ফিরোজ দেবুকে জাপটে ধরে আটকায়। দেবু ছুটোছুটি করে কিন্তু শক্তিতে ফিরোজের সঙ্গে পেরে ওঠে না। অনর্গল অশ্লীল গালি দিচ্ছে সে শ্যামকে। অল্প দূরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দু-চার জন মানুষ উপভোগ করছে এই দৃশ্য। কিন্তু কেউই এগিয়ে এলো না। নিশ্চুপ শ্যাম হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে দেবুর দিকে। খানিকণ পর শান্ত হয় দেবু। শান্ত হলেও শ্যামকে পরে দেখে নেবে বলে হুমকি দিয়েছে। আবার কাজ শুরু করলো তিনজনই। শ্যাম আর ফিরোজ কাঠ চেড়াই করছে। আর দেবু তাদের সাহায্য করছে। এতক্ষণ কাঠ চেরাই করতে আসা লোকজন ছিল না। বোধ হয় খেতে গিয়েছিল। এখন এসে তাড়া দিচ্ছে। 'ভাই আমারটা হলো?' 'দাদা এর পর কিন্তু আমারটা দিতে হবে।' শ্যাম চুপ করে থাকে। একের পর এক তারা কাঠ চেরাই করে যাচ্ছে। কিন্তু কাজে আর মন নেই শ্যামের। বাড়ির কথা মনে পড়ছে। ইদানিং কষ্ট পেলেই বাড়ির কথা মনে পড়ে তার। মা কেমন আছে? বাবা? বেঁচে আছে তো! বাড়ি থেকে আসার পর কেউ কি তার খোঁজ করেছিল? খোঁজ করলেও এতো দূরে আর কেউ খুঁজতে আসেনি। বাড়ির সবাই হয়তো ভেবেছিল যে, সে একা একাই বাড়ি ফিরবে। আরো কত কথা মনে হয়! বলাই, আজাদ, রফিক, নারায়ণ। নারায়ণ কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তাকে এড়িয়ে চলতো। কষ্ট হতো খুব। ওদের সঙ্গে আড্ডা মেরে কত বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পেড়িয়ে গেছে! সেই বটগাছ, স্কুলের মাঠ......
উঃ মাগো..... ককিয়ে উঠলো শ্যাম। রক্তে ভেসে যাচ্ছে হাত। বাম হাত দিয়ে ডান হাত চেপে ধরে বসে পড়লো শ্যাম। ধারালো করাতে ডান হাতের তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলের মাঝখানে অনেকটা গভীর হয়ে কেঁটে গেছে। কাঁটা জায়গা রক্ত আর কাঠের গুড়ো মিলেমিশে একাকার। ফিরোজ এসে শ্যামকে ধরলো। একটু দূরে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেবু। কাঠ চেরাই করতে আসা কয়েকজন ইস্, আহা করতে লাগলো। ফিরোজ শ্যামের কাঁটা হাত চেপে ধরে এক ভ্যানঅলাকে বললো, ভাই ভ্যানখানা আগান তো।
ফিরোজ শ্যামকে ধরে উঠানোর চেষ্টা করতেই দেবুও এসে ধরলো। দুজনে ধরে ভ্যানে তুললো শ্যামকে। ব্যাথায় চোখ বুজে আছে শ্যাম। মুমূর্তেই ভিড় জমে গেল। কাঠ চেরাই করতে আসা একজন ভিড়ের মধ্যে বলে উঠলো, মশাই আমার কপালটাই খারাপ। দুদিন বাদে ছেলের বিয়ে। কাল থেকে মিস্ত্রি ঘরের কাজ শুরু করবে। পাঁজি দেখে দিন ঠিক করেছি। এরা একটু সাবধানে কাজ করতে পারে না....
পাশ থেকে একজন বললো, ধুর মিয়া, মানুষটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। আপনি আছেন আপনার ঘর নিয়ে।
ভ্যান চলে গেল বাজারের দিকে। সঙ্গে গেল ফিরোজ।
সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। গাছের গুড়ির ওপর বসে আছে শ্যাম। আজ দুপুরের পর আর কাজ হয়নি। সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরে গেছে ফিরোজ আর দেবু। ফিরোজ অবশ্য থাকতে চেয়েছিল শ্যামই নিষেধ করেছে। হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত শুয়ে ছিল শ্যাম। হাতে পাঁচটা সেলাই দিতে হয়েছে। ব্যাথায় হাতটা টনটন করছে। কতদিন অকেজো হয়ে বসে থাকতে হয় কে জানে! শিখা এখনও রাতের খাবার নিয়ে আসেনি। অবশ্য খেতেও ইচ্ছে করছে না। গা বেশ গরম। জ্বর জ্বর লাগছে। বোধ হয় রাতে ভাল মতোই জ্বর আসবে।
অনেক রকম এলোমেলো ভাবনা ভর করছে শ্যামের মাথায়। আর এখানে কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। দেবুর সাথে মাঝে মাঝে খটমট লেগেই থাকে। দেবু যে গোঁয়ার কোনদিন না জানি কোন বড় অঘটন ঘটিয়ে বসে। তার চেয়ে এখান থেকে চলে যাওয়াই ভাল।
কালই মালিককে বলে পাওনা টাকা বুঝে নিয়ে এখান থেকে চলে যাবে দুচোখ যেদিকে যায়। বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না। যদিও মায়ের জন্য মনটা মাঝে মাঝে কেমন করে। মায়ের কথা মনে পড়লেই কাঁন্না পায়। মা'র এখন বয়স হয়েছে। হয়তো মাথার চুলও পেকে গেছে।
ভাবনায় ছেদ পড়ে সামনে একজন মানুষের অস্তিত্ব টের পেয়ে। খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিখা।
আসো। বললো শিখা।
শ্যাম বললো, আমার ক্ষিদে নেই। ঘরে রাখে যাও। মন চাইলে পরে খাবানে।
কাছে এসে শ্যামের বা হাতের কব্জি ধরে বললো, ওঠো।
এই ছোট্ট শব্দটা এমন দৃঢ়ভাবে শ্যামের কানে লাগলো যে, শ্যাম উঠতে বাধ্য হলো। ঘরে এসে ছোট্ট পাটি পেতে দিল শিখা। হাত ধুয়ে ভাত মেখে শ্যামের মুখের কাছে তুলে ধরলো। শ্যামের চোখ হাতের ভাত ঘুরে শিখার মুখে।
হাত দিয়ে তো খাবার পারবা না, নাও। বললো শিখা।
শ্যাম মুখে ভাত তুলে নেয়। আর চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে জল।
শিখা বললো, কাঁদতেছ ক্যান? হাত কাটছে আবার সারবেনে।
শ্যাম বললো, মাও আমারে এভাবে খাওয়ায়ে দিত। আমি অনেক বড় হয়েও মায়ের হাতে ভাত খাইছি।
চুপ করে থাকে শিখা। তার চোখেও জল আসে। বা হাতের চেটোতে জল মুছে শিখা বললো, কতদিন বাড়ি যাওনা। তোমার মাকে তো একবার দেখে আসপার পারো।
একটু থেমে আবার বললো শিখা, কাটা হাত নিয়ে তো আর কাজ করবার পারবা না। কয় দিনের জন্যে বাড়ি থেকে ঘুরে আসো।
শ্যাম চোখের জল মুছে বললো, আমি আর এ জায়গা কাম করবো না। কালই চলে যাব।
কই যাবা? বললো শিখা।
ক্যাম বললো, দুই চোখ যেদিকে যায়।
আর কোনদিনই আসপা না? বললো শিখা।
শ্যাম ঘাড় নেড়ে বললো, না।
কোন কথা বললো না শিখা। খাওয়া শেষ হলে খাবারের বাটিগুলো গুছিয়ে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালো সে।
চলে যাও ক্যান, একটু বস। আর তোমার সাথে দেহা হবেন না। বললো শ্যাম।
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না শিখা। এতক্ষণ আটকে রাখা চোখের জলের বাঁধ ভেঙে পড়লো। কিন্তু ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো সে। শ্যাম উঠে গিয়ে সামনে দাঁড়ালো, তুমি কাঁদো ক্যান?
তুমি কি কিছু বোঝ না শ্যাম! তবে কেন আমার জন্য মানুষের সাথে ঝগড়া কর? এই প্রথম শ্যামের নাম ধরে ডাকলো শিখা।
শ্যাম নিঃশব্দে শিখার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। শিখা বললো, তুমি পারো না শ্যাম, তুমি পার না মানুষের মুখ বন্ধ করে দিতে?
আমার তো কিছুই নেই শিখা। ঘর নেই, বাড়ি নেই, মা-বাবা থেকেও নেই। আমি কিভাবে মানুষের মুখ বন্ধ করবো! তাছাড়া আমি শূদ্রের ছেলে। বললো শ্যাম।
শিখা বললো, গাঙের পারে অশ্বথ গাছের নিচে চারটে খুঁটি দেহ নাই শ্যাম। মরার পর আমরা ঐ এক খুঁটির ভিতরই ছাই অবো।
তোমার আত্নীয়-স্বজনরা আছে। বললো শ্যাম।
শিখা বললো, যেদিন আমার মা মরে গেল সেদিন কই ছিল আমার আত্নীয়রা? সেদিন এই শূদ্রের ছেলেই আমার পাশে ছিল। কতদিন অনাহারে দিন কাটছে কেউ তো সে সময় খোঁজ নেয় নাই।
শ্যামের কাছে একথার কোন উত্তর নেই। দুজনেই নীরব। শ্যাম বা হাতের আঙুল দিয়ে শিখার চোখের জল মুছে দিল। পাশের আম গাছ থেকে ডানা ঝাপটে হয়তো একটা বাদুর উড়ে গেল। বাতাসে দরজার পাল্লাটা বাড়ি খেলো বার দুই। উত্তরের আকাশে জমাট বাঁধ মেঘ। মেঘের গর্জন। হয়তো আজ বৃষ্টি নামবে।
অক্টোবর, ২০০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



