গত বছরের অক্টোবরে বন্যায় থাইল্যান্ডের শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে হার্ডডিস্ক সংকটে পড়ে এর ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো। এ সময় বাংলাদেশের বাজারে এ যন্ত্রাংশটির দাম তিন গুণ বেড়ে যায়। তবে সম্প্রতি থাইল্যান্ডে হার্ডডিস্কের উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় চালু হয়েছে বলে জানা গেছে। ঋণপত্র (এলসি) খুলে আমদানি কার্যক্রমও শুরু করেছে দেশীয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে চলতি মাসের শেষ দিকে বাজারে হার্ডডিস্কের দাম কমতে শুরু করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কম্পিউটারের অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রাংশ হার্ডডিস্ক ড্রাইভ প্রস্তুতে চীনের পরই থাইল্যান্ডের অবস্থান। বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ হার্ডডিস্ক তৈরি হয় এ দেশটিতে। গত বছরের অক্টোবর মাসে থাইল্যান্ডের বন্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করলে দেশটির প্রায় সব শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হার্ডডিস্কের চরম সংকট দেখা দেয়। তবে এ ব্যাপারে আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন বিশ্বের কম্পিউটার বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে বেশ কিছু সংবাদও প্রকাশিত হয়।
বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় পুনরায় চালু হয়েছে থাইল্যান্ডের শিল্প-কারখানা। জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে আবারও কাজ শুরু হয়েছে সেখানকার হার্ডডিস্ক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানে। তবে ভয়াবহ এই দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার পর দেশটির সামগ্রিক উৎপাদন আগের অবস্থানে পেঁৗছতে কিছুটা সময় লাগবে বলে জানিয়েছে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো।
এদিকে হার্ডডিস্কের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে দেশের কম্পিউটারের বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে। গত সপ্তাহে রাজধানীর কম্পিউটারের সর্ববৃহৎ মার্কেট মাল্টিপ্ল্যান কম্পিউটার সিটি সেন্টারের গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। মার্কেটটিতে হিটাচি, সিগেট, স্যামসং ও ওয়েস্টার্ন ডিজিটালের সব ধরনের হার্ডডিস্ক ড্রাইভই পাওয়া যাচ্ছে। ৫০০ জিবি একটি হার্ডডিস্কের দাম আট হাজার ১০০ থেকে আট হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ তিন মাস আগে বাজারে এসব হার্ডডিস্কের দাম ছিল দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে। বিক্রেতারা বলছেন, আমদানিকারকদের কাছ থেকে বেশি দামে হার্ডডিস্ক নিতে হচ্ছে বিধায় বাড়তি দামে বিক্রি করছেন তাঁরা।
মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার সিটি টেকনোলজিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (বিক্রয়) মো. হাবিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, থাইল্যান্ডে বন্যার পর থেকে বাজারে হার্ডডিস্কের দাম বাড়তে শুরু করে। তবে বর্তমানে এই বাড়তি দামের সঙ্গে আরো যোগ হয়েছে ডলারের অতিরিক্ত দাম। সব মিলিয়ে অনেক বেশি দাম পড়ে যাচ্ছে প্রতিটি হার্ডডিস্কের। এতে বিক্রিও অনেকাংশে কমে গেছে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুলাই মাসের শেষ দিকে থাইল্যান্ডে বন্যা শুরু হয়। অক্টোবরে বন্যা প্রকট আকার ধারণ করে। এ সময় রাজধানী ব্যাংককসহ বিভিন্ন প্রদেশ পানিতে তলিয়ে যায়। সেখানকার বড় বড় সাতটি শিল্পাঞ্চল প্রায় ১০ ফুট পানির নিচে ডুবে যায়। সরবরাহ চেইন অকার্যকর হয়ে পড়ায় আঞ্চলিক অটোমোবাইল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যায় দেশটির আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ চার হাজার ৫০০ কোটি ৭০ লাখ ইউএস ডলার। ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় এ দাবি করা হয়।
বন্যায় হার্ডডিস্ক ড্রাইভের মোটর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিডেক ক্ষতির মুখে পড়েছে সবচেয়ে বেশি। বাজারের ৮০ শতাংশ ছিল তাদের দখলে।
প্রতিষ্ঠানটি হিটাচি, সিগেট, তোশিবা, ওয়েস্টার্ন ডিজিটালসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠানকে মোটর সরবরাহ করে। কিন্তু মোটর সরবরাহ বন্ধ থাকায় হার্ডডিস্ক নির্মাতা সিগেট এবং ওয়েস্টার্ন ডিজিটাল তাদের কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। তবে সম্প্রতি আবারও পুরোদমে উৎপাদন কাজ শুরু হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের। জানুয়ারির ২২ তারিখ থেকে ওয়েস্টার্ন ডিজিটাল টেকনোলজিস ইনকরপোরেশন তাদের কর্মকাণ্ড পুনরায় চালু করেছে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। হার্ডডিস্কসহ কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানিকারক দেশীয় প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) মো. মুজাহিদ আল বেরুনী কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের কম্পিউটারের বাজারে প্রাপ্ত হার্ডডিস্কের অধিকাংশই আসে থাইল্যান্ড থেকে। দেশটিতে ভয়াবহ বন্যার পর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হার্ডডিস্ক স্বল্পতা দেখা দেয়।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যান্য উৎস থেকে হার্ডডিস্ক আমদানি করে এর চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করেন এ খাতের আমদানিকারকরা। এতে প্রতি ইউনিট হার্ডডিস্কের আমদানি ব্যয় ৩০ থেকে ৪০ ইউএস ডলার (অর্থাৎ আড়াই থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা) বেড়ে যায়। একই সময়ে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে হার্ডডিস্ক আমদানির ব্যয়ের সঙ্গে যোগ হয় বাড়তি খরচ।
তবে চলতি মাসের শেষ দিকে হার্ডডিস্কের দাম কমার আভাস দিয়ে স্মার্ট টেকনোলজিসের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি থাইল্যান্ডের কারখানাগুলোয় আবারও উৎপাদন কাজ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে উৎপাদন শুরুর আভাস পেয়ে হার্ডডিস্ক আমদানির জন্য প্রক্রিয়া শুরু করেছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কম্পিউটার ও এর এঙ্সেরিজ আমদানির জন্য জানুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় এক কোটি ৮৩ লাখ ইউএস ডলারের (১৬৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা) সমপরিমাণ অর্থের ঋণপত্র খোলা হয়েছে।
সূত্রঃ কালের কন্ঠ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


