সাহিত্যের দায়, কাগজের দায় - একুশ শতক
মোজাফ্ফর হোসেন
১ম কিস্তি
একুশ শতকের সাহিত্য
একটি অবক্ষয় সাহিত্য ও শিল্পের মান ও দায়বদ্ধতার জায়গাটিকে কুরে কুরে খাচ্ছে তা হল মূল্যবোধের অবক্ষয়। বর্তমানে, বলতে দ্বিধা নেই, প্রগতিশীল, প্রথাবিরোধী, পুঁজিবাদের প্রতিকূলে, মৌলবাদের বিরুদ্ধে- এই সব শব্দ সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে ব্যবসায়ের মস্ত হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন সাহিত্যিক হয়ে উঠছেন একটা প্রতিষ্ঠান, ফলে সাহিত্য হয়ে উঠছে একটি বিশেষ ধরনের ছাঁচে ফেলে তৈরী করা পণ্য, যেখানে নান্দনিক সৌন্দর্য বলে কিছু থাকছে না। এক্ষেত্রে পাঠকরাও দায়ী, সাহিত্যকে তারা কাঁচাবাজারের ফর্দতে ঠাঁই দিয়েছেন- সাহিত্য এখন প্রয়োজনের।
১২০০-১৩৫০ এই সময়টা ছিল বাংলা সাহিত্যের জন্য বন্ধ্যা একটি সময়। আর বর্তমান সময়টা হচ্ছে ঠিক তার বিপরীত; বেশ আনন্দের বিষয়; পূর্বের যে কোন সময়ের থেকে বর্তমানে বেশি বই প্রকাশিত হয়; ভাবতে বেশ ভালোই লাগে; ছাপাখানার এখন রমরমে ব্যবসা; কোন সন্দেহ নেই তাতে; সাহিত্যকেও এখন সঙ্গীতের মত রিমিক্স বানানো হচ্ছে, অনুবাদ সাহিত্যে ভরে গেছে বাজার; বেশ তো ক্ষতি কি! কিন্তু, বেশ জোরের সাথে বলতে পারি, আমাদের চলতি সাহিত্য যে স্রোতে আজ ভেসে চলেছে তার গন্তব্য ভয়াবহ শূন্যতার দিকে : কেননা সাহিত্য এখন ব্যবসায়ের পণ্য। বর্তমান সময়ের সবথেকে জনপ্রিয় সাহিত্যিকদের জীবন যাত্রার মান ও ব্যস্ততা দেখলে মনে হয়, সাহিত্যিকরাও এখন পুঁজিবাদদের কাতারে সামিল। এখন একজন তারকা সাহিত্যিককে কুশল বিনিময়ে অনায়াসে বলা যাবে, স্যার আপনার ব্যবসা কেমন চলছে? এই বইমেলায় বাজারে কি মাল ছাড়ছেন। একটু লক্ষ করলে দেখতে পাবেন, বর্তমান সময়ে লেখকরা খুব বেশি দিন বেঁচে থাকছেন না। প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে বেশ কিছু ভালো লেখার জন্ম দিয়ে পাঠকদের Expectation বাড়িয়ে দিচ্ছেন ঠিকই কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন পত্রিকার বিশেষ বিশেষ দিনের অর্ডারের লেখা, বিভিন্ন দিবসে বই প্রকাশের জন্য প্রকাশকের সঙ্গে চুক্তি, বিভিন্ন মিডিয়ার জন্য সাক্ষাৎকার তৈরি, এসব সামলাতে গিয়ে আর মানের দিকে নজর দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না; ফলে দেখা যাচ্ছে, একজন লেখকের প্রথম লেখার সাথে তার একশতম লেখার মানগত কোন পার্থক্য নেই। এজন্য হাসান আজিজুল হকের কাছ থেকে ‘শকুন’, ‘গুণিন’ এর মত গল্প আর আমরা পাই না। এ সময়ের ব্যস্ত গল্পকার রফিকুর রশিদ লিখেই চলেছেন: ছোটকাগজে- বড়কাগজেও; কিন্তু নিজেকে নিজে ছাড়াতে পারলেন কই! হাসান আজিজুল হক বলেছিলেন, ‘প্রায় চল্লিশ বছর ধরে লিখছি। এতদিনে লেখার কাজটা বেশ সহজেই পারার কথা ছিল। কিন্তু দিনে দিনে তা আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। আঙুল দিয়ে হিমালয় ঠেলছি। পাথরের পাহাড়ে আঁকিবুকি কাটছি। কিছু হচ্ছে না। খুব ভালো হত না লিখতে পারলে। কিন্তু তবুও লিখতে হয়। তাহলে লেখাটা আসলে কি? এটা কি লেজ যে ভেতর থেকে বার বার গজাবে, না কান ধরে টেনে তোলার মতন কোন কিছু?’ তাহলে লেখালেখিটা এখনকার লেখকদের কাছে কি- নেশা নাকি পেশা? তবে এটা ঠিক বর্তমান সময়ের লেখকরা মনের আনন্দে কিংবা প্রাণের উচ্ছ্বাসে খুব কমই লেখেন। লেখক তাই লিখতে হয়; নিয়ম করে অফিস যাওয়ার মতন। তাই সাহিত্যের প্রতি দায় আর থাকে না। একটা গা ছাড়া ভাব আপনা আপনিই চলে আসে। এজন্যই রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, আসাদ চৌধুরী, আল মাহমুদের এখনকার কবিতা পড়ে মনে হয় আরো ভালো লিখতে পারেন তাঁরা। একটা অতৃপ্তি থেকেই যায়।
লেখালেখি করে যদি সংসার চালানো সম্ভব হয় তাতে কারো আপত্তি থাকবার কথা নয়; কিন্তু লেখালেখিটা যদি টাকা কামানোর মস্ত হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায় তবে আমাদের দেশে যে হারে জনসংখ্যার উৎপাত সেই সাথে চাকরির সমস্যা তাতে করে লিখতে পারুক আর না পারুক সকলে লেখক হতে চাইবে। সাহিত্যের কোন অর্থমূল্য হয় না- হতে পারে না। এ জন্য যদি সকলে লেখালেখি ছেড়ে দেয় দিক। সাহিত্যে ও শিল্পে কোন কমপ্রোমাইজ করা উচিৎ না। যারা ভালোবাসার টানে সাহিত্যকে আত্মার আত্মীয় বানাতে লেখালেখি করবে- তাদেরই লেখক হওয়া উচিৎ। তাহলে ‘কে লেখক আর কে লেখক না’(?) এই প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ হবে না পাঠক সমাজ। কোন বইটি পাঠ্য আর কোনটি অপাঠ্য এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে বই না কিনে বাড়ি ফিরে আসতে হবে না। অতীতে দৃষ্টিক্ষেপ করলে দেখা যায় : বিঞ্চু দে, অমিয় চক্রবর্তী, জীবনানন্দ কবিতাকে ভালোবেসে কবিতা লিখতেন; সুধীন্দ্রনাথের ধ্যানজ্ঞান ছিল কবিতা; নজরুল ছিলেন স্বভাবকবি; শরৎচন্দ্র পথে পথে সাহিত্যের উপকরণ কুড়িয়েছেন; রবীন্দ্রনাথের ছিল দার্শনিক দৃষ্টি ও অনুভবের সীমাহীন শক্তি। প্রকৃত পাঠকরা তাঁদের বই কেনে বেশি। বার বার পড়ে কবি, পুতুলনাচের ইতিকথা, চিলেকোঠার সেপাই, লাল সালু, পদ্মানদীর মাঝি, শেষের কবিতার মত বইগুলো। এদের যৌবন যে চিরদিনের, চিরঅম্লান! আর এখনকার বইগুলো গর্ভ থেকেই দূরারোগ্য এইডস্ রোগে আক্রান্ত যেন মৃত্যুর জন্যই তাদের জন্ম!
তাহলে এখন যে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার তা হল : কে লেখক আর কে লেখক না? চলতি সময়ে যাঁরা লিখছেন কিংবা মিডিয়া যাঁদের নিয়ে মাতামাতি করছে তাঁরা কি লেখক? এঁরা যদি লেখক না হন তাহলে লেখক কারা? অনেক লেখক আছেন যাঁরা সময়ের স্রোতে নিজেদেরকে ভাসিয়ে দেননি। প্রচারবিমুখ এইসব মানুষগুলো সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি। এঁদের কেউ কেউ আবার ছোটকাগজগুলোতে অল্পবিস্তর লেখালেখি করেন; কিন্তু তা ঐ পর্যন্তই। অসীম কুমার দাসের মতন লেখকরা প্রচলিত সাহিত্য বাজার থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে রাখছেন। বিনয় মজুমদার, সুবিমল মিশ্র, অরুণ মিত্র প্রমুখ লেখকদের চিনে নিতে আমাদের সময় লাগছে। কিন্তু মারজুক রাসেল কিংবা খায়রুল আলম সবুজের মতন মিডিয়া ব্যক্তিরা কবিতা লিখলে আমরা ভূমিকম্পের মত টের পেয়ে যাই।
এ সময়ের মৌলিক সাহিত্যে ভাটা পড়েছে। গবেষণা, প্রবন্ধ, ও সমালোচনার দিকেই বেশি ঝুঁকছে সবাই। প্রতি বছর গল্প, কবিতা ও উপন্যাসের যে বইগুলো বেরুচ্ছে তা খুবই সস্তা মানের। তাদের গড় আয়ু ৫-১০ বছর, বড় জোর এক প্রজন্ম পর্যন্ত। ১০০ বছর পরে এই সময়ের নেতৃত্ব দেবার মত মৌলিক সাহিত্য খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে যাবে। লেখকরা বাঙ্গালীর হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় অর্জিত কৃষ্টি কালচারকে তাঁদের লেখার ভেতরে লালন করছে না। একুশ শতকের সাহিত্য হয়ে উঠছে পাশ্চাত্য নির্ভর। অনুবাদ সাহিত্যে ঢেকে যাচ্ছে বাংলা সাহিত্য। বাংলার খেটে খাওয়া মানুষদের নিয়ে ভালো মানের গল্প, উপন্যাস লেখা হচ্ছে না। সাম্রাজ্যবাদের বিজয় যেন সাহিত্যকেও গ্রাস করেছে। এদেশের ঋতু বৈচিত্র্য ও প্রকৃতির সাথে সখ্য করে কবিতা লেখা হচ্ছে না; বর্তমান সময়ের কবিতা সস্তা সাজে সজ্জিত নর্তকীর মতন।
অনেকের ধারণা, মৌলিক সাহিত্য রচনার জন্য খুব বেশি পড়াশুনার দরকার হয় না। পূর্ববর্তী লেখকদের যত কম জানা যাবে মৌলিকতার জায়গাটা তত বেশি প্রগাঢ় হবে। চলতি সময়ের লেখকদের মাঝে এই দৃষ্টিভঙ্গিটা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। একটা লেখকের তাঁর ঐতিহ্য সম্পর্কে যত বেশি জ্ঞান থাকবে সে তত বেশি সমৃদ্ধশালী লেখা উপহার দিতে পারবে। T. S. Eliot তার Tradition and Individual Talent - বলেছেন, ‘ঐতিহ্য হচ্ছে ঐতিহাসিক চেতনার সাথে সম্পর্কিত, আর এটাকে তার জন্য অত্যাবশকীয় মনে করা যেতে পারে যে তার বয়সের পরবর্তী ২৫ বছর পর্যন্ত কবি থাকতে চান, এবং এই চেতনা বোধের বাস্তবতা হচ্ছে যে অতীতের প্রাসঙ্গিকতা শুধুমাত্র অতীতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং তা বর্তমান প্রেক্ষাপটেও চরম যুগপৎ উপযোগী।’ ইতিহাস চেতনা ছাড়া কোন লেখকেরই তার সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও কালের স্রোতধারা সম্পর্কে সচেতন হওয়া সম্ভব নয়। নন্দনতত্ত্বের একটা নীতিসূত্র হল শিল্পের সাথে শিল্পের তুলনা সাপেক্ষ মানের নিশ্চয়তা বিধান করা। বর্তমান সময়ের লেখক-কবিদেরকে অতীতের বিভিন্ন সময়ের শ্রেষ্ঠসাহিত্য কর্মগুলোকে গুরুত্ব সহকারে পড়তে হবে, তাদের ঐতিহ্যকে অনুধাবন করে নিজের সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। অন্যদের ভালো করে রপ্ত করা মৌলিকতার অন্তরায় নয়। 'Nothing is new under the sun’- স্যামুয়েল বেকেটের এই কথাটি সাহিত্যে খাটে না। বিনয় মজুমদার বলেছিলেন, যে তিনি জীবনানন্দের মত লিখতে চান কিন্তু পারেন না। প্রত্যেক লেখকেরই একটা নিজস্ব ঢঙ আছে। এক্ষেত্রে, অন্যদেরকে যত বেশি জানা যাবে নিজের ঢংটা ততবেশি গাঢ় ও গূঢ় হবে। এজন্য ইংরেজি সাহিত্য, ফরাসি সাহিত্য, বাংলা সাহিত্য ঘাঁটাঘাঁটি করেও রবীন্দ্রনাথ আদ্যোপান্ত রবীন্দ্রনাথই থেকে যান।
প্রায়ই পাঠকদের বলতে শোনা যায়, বর্তমান সাহিত্যের ধার কমে গেছে। খুবই সত্যি কথা। কেননা বর্তমান সময়ের সাহিত্যে জীবন হয়ে উঠছে নৈর্ব্যক্তিক। গল্প-উপন্যাসগুলো খুব তাড়াহুড়ো করে লেখা হচ্ছে। জীবনদর্শনের বালাই থাকছে না সেখানে। কোন লেখা শুরু করার আগেই লেখক ভাবতে থাকেন পরবর্তী লেখা নিয়ে। প্রতিটি কাজ হয়ে উঠছে দায়সারা গোছের। কাজের মহিলাদের রান্নার মতন। প্রেমের ছোঁয়া সেখানে থাকছে না। আমার এক বন্ধু আছে যে কিনা কোয়েল পাখির ডিম পাড়ার মতন গল্প পাড়ে। তার ইচ্ছা, আগামী দশ বছরের মধ্যে সে বাংলাদেশের প্রথম সারির গল্পকার হবে। আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম রবীন্দ্রনাথ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক- এঁদের গল্প পড়েছো? সে একবাক্যে বলল, ‘না’। পরে জানতে পারলাম সে লেখক হবার জন্যে কালি ও কলম, প্রথম আলো প্রভৃতি কাগজের সম্পাদক ও প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে ভাব জমিয়ে বেড়াচ্ছে।
অনেকে আবার আজকাল মেগাসিরিয়ালের কথা মাথায় রেখে উপন্যাস লিখছেন। আনিসুল হক, ইমদাদুল হক ও সুমন্ত আসলামের মতন আরো অনেক নব্যপ্রতিভা মিডিয়া জ্বরে ভুগছে। যাঁরা এসব থেকে দূরে দাঁড়িয়ে সাহিত্যের প্রতি কমিটেড থেকে ভালো কিছু লেখার চেষ্টা করছে, তাদেরকে আবার খুব কম মানুষই পড়ছে; যেমন, শহিদুল জহির, ইমতিয়ার শামীম, মামুন হুসাইন, অদিতি ফাল্গুনী, শহাদুজ্জামান, জাকির তালুকদারদের মতন পরিশ্রমী লেখকদের লেখা আজকের প্রজন্মের কয়জন পাঠকইবা পড়ে। কবিতার ক্ষেত্রে আরো হ-য-ব-র-ল অবস্থা। নব্বুই ও শূন্যদশকে এসে কবিদের পরিচিতি নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন এক ফ্যাসাদ। এ সময়ের কবিতা যদি রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব, কিম্বা সুধীন দত্ত দেখতেন তবে খুবই কেলেঙ্কারী ঘটে যেত। আর সেলিম আল দিনের মৃত্যুর সাথে সাথে বোধকরি নাট্যসাহিত্যেরও মৃত্যু ঘটেছে। এখনকার নাটকগুলো দর্শকদের ধরণ ও রুচির কথা মাথায় রেখে লেখা হচ্ছে, পাঠকদের কথা ভেবে নই কাজেই সাহিত্যগুণ বলে কিছু থাকছে না। মোদ্দা কথা, একুশ শতকে বাংলা সাহিত্যের অবস্থা খুবই নাজুক
এই শতকে পাঠকদের মন মেজাজেও আমূল পরিবর্তন এসেছে। আমরা জানি, চাহিদার ভিত্তিতে বাজারের চরিত্র পরিবর্তিত হয়। তাই, এক্ষেত্রে, পাঠকরাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমান সময়ে মানুষ ছুটছে অর্থের পেছনে। আজকের প্রজন্ম খোরাক বলতে শুধু দেহের খোরাককেই বোঝে, খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান। মনের খোরাক বলতে পেট পুরে খাওয়া, ভালো ভালো পোশাক পরা আর এসি রুমে ঘুমানো; ঘুরে ফিরে যাহাই নারিকেল গাছ, তাহাই ডাব গাছ! চিঠি লেখার যুগ গত হয়েছে। এখন চলছে মুঠোফোনের যুগ। আবেগ হয়েছে পান্সে, সস্তাও। মধ্যবিত্ত বাংলাদেশ শেকড়হীন টলকে বেড়াচ্ছে ভোগের বাজারে। ধর্মের লেবাস জড়িয়ে কড়া নাড়ছে ক্ষমতার রাজনীতিতে। DV করে যুবসমাজ স্বপ্ন দেখছে আমেরিকার। এদের হাতে টাকা থাকলে মাথায় অনেক ভূতই চাপে কিন্তু বইপড়ার ভূত খুব কমই চাপে। যে অল্প কিছু পাঠক বই পড়ছেন তাদের মুল উদ্দেশ্য হচ্ছে reading for pleasure; অনেকটা মনের আনন্দে মাঝে মধ্যে বন্ধুদের সাথে সিগারেট ফুঁকার মতন। এজন্য কাজী আনোয়ার হোসেন, রকিব হাসান, হুমায়ূন আহমেদের মতন বিনোদনধর্মী লেখকরা রাতারাতি তারকা বনে যাচ্ছেন। প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়ের কথা মাথায় রেখে এ ধাঁচের লেখকদের পেছনে ছুটছে বেশি। বই এখন হয়ে উঠেছে জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, বাবা দিবস, মা দিবস, বন্ধু দিবস, ভালোবাসা দিবস- প্রভৃতি দিবসের উপহার বিশেষ। এই সব দিবসে লেখকরা চোখ ধাঁধানো কাভারে গতানুগতিক মেজাজের বই ক্রেতাদের উপহার দিচ্ছেন, ক্রেতারা আবার সেই বইগুলো তাদের প্রিয়জনকে উপহার দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে এই তিনটি পক্ষের কেউ পাঠক না।
পাঠক সংকটের অন্যতম একটি কারণ হল ভালো বইয়ের অভাব। এবং ভালো বই আমরা পাচ্ছি না কারণ সাহিত্যিকরা সততার জায়গা থেকে লেখালেখি খুব কমই করছেন। জনপ্রিয়তা ও অর্থের মোহ তাঁদের লেখক সত্তাকে বিষিয়ে তুলেছে। সাহিত্যের প্রতি কারো কোন কমিটমেন্ট নেই। শিল্পের জন্য স্বার্থত্যাগ কথাটিকে তাঁরা একুশ শতকের অভিধান থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে। লেখকরা এখন তাঁদের বিবেকের মৃত্যু ঘটিয়ে ক্ষমতাশীল দলের পোষা তোতাতে পরিণত হচ্ছে। বিপরীত স্রোতে যাঁরা থাকছেন তাঁদের সংখ্যা এবং ক্ষমতা এতই কম যে তাঁরা তাঁদের অস্তিত্ব রক্ষা করতেই হিমশিম খাচ্ছে।
তাই দেখা যাচ্ছে, এই সময়ের সমাজ ব্যবস্থার রন্ধে রন্ধে অবক্ষয় পরিপক্ব আসন গেড়ে নিয়েছে। সাহিত্যের নান্দনিক সৌন্দর্যের থেকে দামী গহনা গাড়ী মানুষের কামনার জায়গাটিকে দখল করে নিয়েছে। এখন সাহিত্যকেই তার দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য এগিয়ে আসতে হবে। সাহিত্যের অন্যতম মাধ্যম হল কাগজ এবং বড়কাগজ যেহেতু বাণিজ্যের কথা চিন্তা করে কখনোই এগিয়ে আসবে না। ছোটকাগজকেই সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। ছোটকাগজ আন্দোলনকে সামাজিক আন্দোলনে দাঁড় করাতে হবে।
ছোটকাগজ প্রসঙ্গ
ছোটকাগজের সংজ্ঞা একেক জনের কাছে একেক রকম। আমার কাছে, ছোট কাগজ হচ্ছে একটি ট্রাজিক হিরো। কেননা, এরিস্টটল তার পোয়েটিকস- এ ট্রাজিক হিরোর যে বৈশিষ্ট্যগুলো দিয়েছেন তার বেশিরভাগই ছোটকাগজের সাথে মিলে যায়। ছোটকাগজের জন্মই হয় অকালমৃত্যুর জন্য, ভাগ্য তার সাথে করে বিরুদ্ধাচরণ। ছোটকাগজ ধারন করে প্রতিষ্ঠিত নিয়মকে নস্যাৎ করবার অকৃত্রিম মেজাজ। মূলত, ছোটকাগজ হচ্ছে কতগুলো বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় তা হল :
১. প্রতিষ্ঠানবিরোধী
২. অরাজনৈতিক
৩. প্রথাবিরোধী
৪. নিরীক্ষাধর্মী
৫. আঙ্গিক সচেতনতা
৬. বিষয়বৈচিত্র্য
৭. প্রচারবিমুখতা
৮. প্রচলিত বাজার ব্যবস'ায় গা ভাসিয়ে না দেওয়া
৯. অনিশ্চয়তা
১০. দুঃসাহসী ১. বিবর্তন ও সম্ভাবনায় বিশ্বাসী
11. দায়মুক্ত
12. স্বতন্ত্র মতপ্রকাশক
13. ক্রিয়ার থেকে প্রতিক্রিয়া গড়ার ক্ষেত্রে ব্যঞ্জনাময়, ইত্যাদি
সন্দেহ, তর্ক, অস্বীকার ছোটকাগজের স্বভাব। ছোটকাগজের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, ‘লিট্ল ম্যাগাজিন বলতে বুঝি যেটা সাহিত্যের নতুন পালাবদলকে ধারণ করে। যে কাগজের ভেতর দিয়ে সাহিত্য নতুন পথের দিকে পা দেয়- এটাকে বলে লিট্ল ম্যাগাজিন।’ অরুণ মিত্র বলেছেন, ‘শরীর দৃশ্যে তারা লিটল বটে, কিন্তু হৃদয় বলে রীতিমত বিগ।’ ছোটকাগজ নামে ছোট শোনালেও, প্রকৃতপক্ষে, ছোটকাগজের গুরুত্বই সর্বাধিক। নামকরণের মাধ্যমে আমরা বস্তুর আয়তন এবং গুণাবলী সম্পর্কে আপাত একটা ধারণা পাই। সেই অর্থে, বলতে গেলে, ‘ছোটকাগজ’ এই নামকরণটা মোটেও সার্থক হয়নি।
ছোটকাগজের concept-টা একদিনে অঙকুরোদগম হয়নি; বেশ সময় নিয়েই বাংলা সাহিত্যে এর আবির্ভাব। ছোটকাগজের মূল্যায়ন পৃষ্ঠা কিংবা পাঠকের সংখ্যা গুণে করা সম্ভব না। ছোটকাগজ লেখক তৈরী করে। আসলে কাউকে পিটিয়ে কিংবা ভুলিয়ে লেখক তৈরি করা যায় না। ছোটকাগজ, এক্ষেত্রে, একটা সংযোজক সেতু হিসাবে কাজ করে। এটা লেখকদের জন্য প্রচলিত নিয়ম ভাঙার কিম্বা এক্সপেরিমেন্টের জায়গাও বটে। বাংলাদেশে, ৮০’র দশকে, নতুন কবিদের জন্য কবিতা লেখা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে কেননা পূর্ববর্তী সময়ের কবিদের অনুকরণের প্রভাবটা এ সময় এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে নতুন কবিরা তাঁদের মতন করে কিছু লিখবার সাহস পাচ্ছিল না; কেননা বড়কাগজের সম্পাদকরা নতুন ধাঁচের লেখার বিপক্ষে ছিলেন। বেশিরভাগ যেটা চায়, বড়কাগজ সেদিকেই ধায়। আর চাহিদার ভিত্তিতে যখন পণ্যের যোগান দেওয়া হয় তখন পণ্যের প্রস্তুতকারকের শৈল্পিক হাতের ছোঁয়া আর সেখানে থাকে না। তাইতো বড়কাগজের জন্য রচিত সাহিত্যকর্ম হয়ে ওঠে যন্ত্রমানবের দ্বারা নির্মিত পণ্যমাত্র। বড়কাগজের লেখক সম্পর্কে দেবেশ রায় বলেন, ‘লেখককে সেখানে শুধু একবারমাত্র মৌলিক হবার সুযোগ দেওয়া হয়। সেই মৌলিকতায় যদি সে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে তাহলে তার ঐ মৌলিকতাতেই শেষদিন পর্যন্ত লিখে যেতে হবে (বিবিধ আখ্যান ও টেকনোলজি)।’ অন্যদিকে ছোটকাগজ কাউকে জোর করে লেখায় না। লেখকরাই এখানে মনের আনন্দে লেখে। অভিজ্ঞতা এবং নন্দনজ্ঞান একই সুরে অনুরণিত হয় এই কোরাসে।
তাই এই সময়, দেশের আনাচে কানাচে, বিশেষ করে ঢাকাতে little-magazine movement and anti-establishment concept-বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ৬০-এর পরবর্তী সময়ে কলকাতায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়, মলয় রায় চৌধুরী, সমীর রায় চৌধুরীর নেতৃত্বে Hungry generation Movement এবং ৮০-এর পরে ঢাকাতে সাজ্জাদ শরিফ, শোয়েব সাদাব ও শান্তনু চৌধুরীর প্রয়াসে ‘সমগ্রবাদী ইসতেহার’ এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ছোটকাগজে যে কোন আমেজের শৈল্পিক চমৎকারিত্ব সম্বলিত সাহিত্য কর্ম এবং যে কোন মেজাজের লেখনীকে গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়। বড়কাগজের মতন ছোটকাগজে লেখকের পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয় না বরং লেখার মান এবং গুরুত্বটাই এখানে বিবেচ্য বিষয়। ছোটকাগজ প্রতিষ্ঠান বিরোধী, প্রচারবিমুখ এবং কোন নির্দিষ্ট ধার্মিক বা রাজনৈতিক ভাবধারায় বিশ্বাসী নয়। ইংরেজি সাহিত্যে ৩০-এর দশকে এবং বাংলা সাহিত্যে ৬০-এর পরে কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রয়েডের প্রভাব বেশ লক্ষ্যণীয়। সেক্সের বিষয়টা এই সময়ের সাহিত্যে বেশ মুক্তভাবে আলোচিত হতে থাকে এবং মানুষের রাজনৈতিক চেতনার আমুল পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। পর পর দুটো বিশ্বযুদ্ধ মানুষের বিশ্বাসের জায়গাটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সংশয়বাদীদের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। অস্তিত্ববাদ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। নারীরা পরিবার থেকে সমাজের দিকে অগ্রসর হয়। পুরুষতন্ত্র, পুঁজিবাদ ও ধর্মতন্ত্র যে ক্ষমতারই ভিন্ন ভিন্ন নাম তা আর বুঝতে বাকী থাকে না প্রগতি চেতনার মানুষদের। এ সময়টাতে বাঙালী আধুনিক হতে শুরু করে। শুরুর দিকে এই পরিবর্তনটা বাংলাদেশের সাধারণ সমাজ সহজভাবে নেয়নি, যে জন্যে এই পরিবেশ যাঁদের লেখায় প্রকোপভাবে ধরা পড়ে তাঁদের লেখা ঐ সময়ের বড়কাগজ ছাপতো না। ফলে, ছোটকাগজই তাদের একমাত্র ধারক হয়ে দাঁড়ায়।
বড়কাগজগুলো তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার স্বার্থে সাধারণ মানুষেরা যে প্রচলিত বিশ্বাস, নৈতিকতা, ধর্মকে লালন করে তার চাটুকারিতা করে যায়। কিন্তু ছোটকাগজ আঙুল উচিয়ে দেখিয়ে দেয় হাজার বছরের লালিত বিশ্বাসের ক্ষতচিহ্নটা কোথায়। ঐতিহ্যের মরচে পড়া অংশে এসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়াই ছোটকাগজের কাজ। এজন্য, ছোটকাগজ প্রথার এবং প্রতিষ্ঠানের বিপক্ষে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। প্রথা হচ্ছে প্রচলিত ধ্যান-ধারণা অর্থাৎ পুরোনোকে আকড়ে থাকা। আর প্রতিষ্ঠান হচ্ছে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক। পুরুষতন্ত্র, ধর্মবাদ, যৌনতা, শ্রেণিবৈষম্য, পরিবার ব্যবস্থা এগুলোকে মদদ দেওয়াই প্রতিষ্ঠানের কাজ। কার্ল মার্কস যথার্থ বলেছিলেন, প্রতিষ্ঠান ধর্মকে মাদক দ্রব্যের মতন ব্যবহার করে সমাজের পরিশ্রমী মানুষগুলোকে ভুলিয়ে সুফল আদায় করে। এবং নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সততা এ-জাতীয় শব্দগুলো প্রতিষ্ঠানের সুবিধামত চরিত্র ধারণ করে। সুবিমল মিশ্রের ভাষায়, ‘প্রতিষ্ঠিত শক্তিই প্রতিষ্ঠান। তার চরিত্র জিজ্ঞাসাকে জাগিয়ে তোলা নয় দাবিয়ে রাখা।’ প্রতিষ্ঠান তাদের স্বার্থে মিডিয়াগুলোকে ব্যবহার করে। আর বর্তমানে মিডিয়াগুলো হয়ে উঠেছে বেশ্যা। অল্প কিছু টাকা দিলেই কোন অপাঠ্য বইয়ের ওপর ‘বেস্ট সেলার বই’ লিখে মাতামাতি শুরু করে দেয়। দাঁতের মাজনের মত বইয়ের বিজ্ঞাপন ছাপা হয় এবং বিজ্ঞাপনের জোরে বাজারে সেগুলোর কাটতিও বেড়ে যায় বহুগুণে। আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীদের চকচকে কিছু দেখলেই চোখ ধাঁধিয়ে ওঠে, পাওয়ার জন্য ব্যকুল হয়ে ওঠে মন। সাধারণ পাঠকরা কিনে বিপদে পড়ে যায় : না পারে পড়তে, না পারে ফেরত দিতে। এই বই আবার একসময় পুরস্কারও পেয়ে যায়। ভণ্ডামির এখানেই শেষ নয়। বর্তমানে বড়কাগজগুলো বিভিন্ন ধরনের সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করে এবং নিজেদের মনোনিত কিছু বিচারকের সহায়তায় নতুন সম্ভাবনাময় লেখকদের বড় কাগজের লেখক বানিয়ে দেন। এভাবেই গলা টিপে হত্যা করেন সেই সম্ভাবনাময় লেখকসত্তাকে। এজন্য রায়হান রাইন লিখেছেন, ‘পুঁজি ও ক্ষমতার ফাঁদকে এড়ানো লেখকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ- এটি লেখকের অস্তিত্বকে সবদিক থেকে গ্রাস করবার জন্য প্রস্তুত থাকে।’ এবং ‘পুঁজি ও ক্ষমতার মোহহীন লেখকদের জন্য যে পূণ্যভূমি তা অবশ্যই ছোটকাগজ(লেখক ও প্রতিষ্ঠান)।’
লিটল ম্যাগাজিন নামের উৎস সঠিক করে বলা মুশকিল। এ নিয়ে বহু মতভেদ আছে। বিশ শতকের গোড়ার দিকে লিটল ম্যাগাজিন ধারণাটি দানা বাঁধতে শুরু করে এবং ৬০-এর দশকে এসে পরিপূর্নতা পায়। প্রথমদিকে খণ্ড খণ্ডভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাতে লিখে ছোটকাগজ প্রকাশ করা হত। জোনাকি পোকার মতন অল্প সময়ের অল্প সময়ের জন্য দ্যুতি দিয়েই নিভে যেত এসব কাগজের জীবন-বাতি; পরক্ষণেই আরেকটির জন্ম হত। এগুলো ছিল তরুণ কিংবা অতি তরুণ প্রাণের উচ্ছ্বাস। এখান থেকেই লেখক হবার প্রেরণা পেত তারা। শিবনারায়ণ রায়, কামাল মোস্তফা সহ অনেকে প্রথম সার্থক লিটল ম্যাগাজিন হিসাবে প্রমথ চৌধুরীর সবুজপত্র (১৯১৪) এর কথা উল্লেখ করেন। সবুজপত্র কখনই লিটল ম্যাগাজিন ছিল না; লিটল ম্যাগাজিন ধারণাটা তখনো দানা বাধেনি। লিটল ম্যাগাজিন anti-establishment concept-এ বিশ্বাসী। সবুজপত্র-এ রবীন্দ্রনাথ সহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত লেখক লিখতেন। কল্লোল গোষ্ঠীর কল্লোল (১৯২৩), নজরুলের ধুমকেতু, কালিকলম (১৯২৬), বুদ্ধদেব বসু ও অজিত কুমারের প্রগতি (১৯২৭), সুধীন্দ্রনাথ দত্তের পরিচয় (১৯৩১), বুদ্ধদেব বসুর কবিতা (১৯৩৫), চতুরঙ্গ (১৯৩৮) এগুলোর কোনটিকেই লিট্ল ম্যাগাজিন বলা যাবে না। এগুলো ছিল সাহিত্যপত্রিকা। লিটল ম্যাগাজিন আর লিটারেচার ম্যাগাজিন এক জিনিস নয়। বলা যেতে পারে, সব লিটল ম্যাগাজিনই লিটারেচার ম্যাগাজিন কিন্তু সব লিটারেচার ম্যাগাজিন লিটল ম্যাগাজিন না। ৬০-এর পরে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের কণ্ঠস্বর (১৯৬৫) ছিল মেজাজে এবং চেতনায় সার্থক ছোটকাগজ। কণ্ঠস্বর তরুণ ও নবীন সাহিত্যকর্মীদের মনে অগতানুগতিক ও আপসহীন এক নতুন অভিক্ষেপ নির্মাণ করতে পেরেছিল। কণ্ঠস্বরের মেনিফেস্টো ছিল : ‘যারা সাহিত্যের সনিষ্ঠ প্রেমিক, যারা শিল্পে উন্মোচিত, সৎ, অকপট, রক্তাক্ত, শব্দতাড়িত, যন্ত্রণাকাতর; যারা অসুন'ষ্ট, বিবরবাসী; যারা তরুণ, প্রতিভাবান, অপ্রতিষ্ঠিত, শ্রদ্ধাশীল, অনুপ্রাণিত; যারা পঙ্গু, অহংকারী, যৌনতাস্পৃষ্ট কণ্ঠস্বর তাদেরই পত্রিকা। মোড়ল, নবীন অধ্যাপক, পেশাদার লেখক, মূর্খ সাংবাদিক, পবিত্র সাহিত্যিক এবং গৃহপালিত সমালোচক এই পত্রিকায় অনাহুত। স্বাক্ষর (১৯৬৩) এবং সামপ্রতিক (১৯৬৪)- এই দুটি পত্রিকাতেও নতুনদের প্রাধান্য দেওয়া হত সর্বাধিক।
৭০-এর দশকে সাহিত্যে রাজনৈতিক প্রভাবটা আরো তীব্র হয়। জনগণের সাথে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রত্যক্ষ সংযোগ ঘটানোর লক্ষে সাহিত্যিকরা বড় কাগজে লেখার দিকে ঝুকে পড়ে ফলে এই সময়ে লিটল ম্যাগের প্রসার কিছুটা কমে যায়। এছাড়াও যুদ্ধত্তর নব্য একটি দেশে মানুষ তাদের মৌলিক চাহিদার পূরণ ঘটাতেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে। যুব সমাজ অস্ত্র ফেলে হাতে ধরে কোদাল। এরই মাঝে নব্য চেতনায় অনেকে হাতে তুলে নেয় কলম।
আশি, নব্বই ও শূণ্য-এর দশকে যে কয়েকটি পত্রিকা ছোট কাগজের আদর্শ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল তা হল :অধুনা, একবিংশ, নিরন্তর, গাণ্ডীব, সংবর্ত, নিসর্গ, সংবেদ, লিরিক, দ্রষ্টব্য, রোদ্দুর, নদী, রিভাইব, অনিন্দ্য, দ্বিতীয় চিন্তা, প্রাকৃত, প্রসূন, চিহ্ন, ধমনি প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য। এদর বেশিরভাগই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ছোটকাগজ থেকে মেগাকাগজে পরিণত হয়েছে। সরকার আশরাফের নিসর্গ এখন প্রতিষ্ঠিত- বড় মাপের লেখকদের লেখা ছাপে। ছোটকাগজের ভোল পাল্টেছে কবে। কিন্তু ‘ছোটকাগজ’ শব্দটা এখনো যত্ন করে ব্যবহার করা হচ্ছে। শহীদ ইকবাল সম্পাদিত চিহ্ন তের সংখ্যা পর্যন্ত ছোটকাগজের আদর্শগত দিকটা আকড়ে ছিল, কিন্তু প্রচলিত স্রোতে চিহ্নও এখন মেগাসাহিত্য পত্রিকা। কিশোরগঞ্জ থেকে আব্দুল মান্নানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়ে আসছে ধমনি। এখানেও তরুণ লেখকদের প্রাধাণ্য দেওয়া হয় সর্বাধিক। ঢাকা থেকে চপল বাশারের সম্পাদনায় দীর্ঘদিন থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে প্রাঙ্গণ। এখানে তরুনদের লেখাকে অধীক গুরুত্ব দেওয়া হয়। মানের জায়গাতে প্রাঙ্গণ বেশ খুঁতখুঁতে স্বভাবের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত শাশ্বতিকীও দুটো সংখ্যার পর থেকে ছোটকাগজের আদর্শ থেকে বের হয়ে এসেছে। এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে ছোটকাগজ স্নান। মেজাজ ও আঙ্গিকে পরিপূর্ণ ছোটকাগজই বটে। প্রতিষ্ঠিত লেখকদের লেখা এখানে ছাপা হয় না। স্নান এর মতন প্রকৃত ছোটকাগজ এ সময়ে নেই বললেই চলে; থাকলেও তা লোকচক্ষুর অন্তরালে; কোন একটি গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নব্বই ও শূন্য দশকে প্রকাশিত হওয়া কয়েকটি ছোটকাগজের মধ্যে হেনরী স্বপনের সম্পাদনায় জীবনানন্দ, তুহিন দাসের আরণ্যক, মালেকুল হকের গন্দম, দারুকের বিপ্রতীক, নিধি রহমান হিল্লোলের উড়-প, রিংকু অনিমিকের অবয়ব, বিল্লাল হোসেন মেহেদীর অথবা সুরমারং, ফজলুর রহমান বাবুলের ঋতি প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য।
ইউরোপে ১৯-শতকের মাঝামাঝি পর্যায়ে লিটল ম্যাগাজিন চর্চা শুরু হয়। সেখানেও নতুন ধাঁচের লেখনীর গুরুত্ব থাকতো সর্বাধিক। তবে ইউরোপের লিটিল ম্যাগাজিন কনসেপ্ট আমাদের সাথে পুরোপুরি মেলে না। ওখানে নতুন লেখকদের থেকে নতুন ধাঁচের লেখনীর গুরুত্ব ছিল বেশি। এ জন্য পোয়েট্রি (১৯১২), লিটল রিভিউ (১৯১৪), ইগোইস্ট (১৯১৪), ব্লাস্ট (১৯১৪)- এসব লিটল ম্যাগাজিনে এজরা পাউন্ড, টি. এস. এলিয়ট,
বড়কাগজ প্রসঙ্গ
বড়কাগজের দিকে লক্ষ করলে দেখতে পাবো, এর প্রকাশক হলো একজন টাকার কুমির। কালো পথে অর্জিত এই টাকা তিনি একটি পত্রিকার কাজে ব্যয় করছেন; কারণ তিনি জানেন একটি গণমাধ্যমের প্রভু হওয়া মানেই রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের পথটা আরো সহজ হওয়া। সমাজে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর একটা ভালো উপায়ও। ফলে, দেখা যাচ্ছে, সমাজ সেবা কিংবা সাহিত্য ও শিল্প সাধনার পথকে মসৃন করা না বরং বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক চিন্তা মাথায় রেখে বড় কাগজের যাত্রা শুরু। মূলত, একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যই হচ্ছে জনগণের ভালোলাগা এবং আবেগের জায়গাটিকে চূড়ান্ত ব্যবহারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করা। এবং আমরা জানি, বড়কাগজের সম্পাদক, সহ-সম্পাদক, সাহিত্য সম্পাদক এই পদগুলো বেতনভুক্ত কর্মচারীদের জন্য। এদের সকলকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয় কিন' নাটাই থাকে প্রকাশকের হাতে। বড়কাগজ তাদের মনোনিত কিছু লেখককে দেশের বুদ্ধিজীবীদের আসনে বসিয়ে দেন। যাদের কাজ হয় বুদ্ধি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা।
বড়কাগজে ব্যবসায়ের কথা চিন্তা করে রুটিন মাফিক সপ্তাহে একদিন করে সাহিত্য পাতা বের করা হয়। ছোটকাগজে সাহিত্যকর্মকেই বড় করে দেখা হয় সাহিত্যিককে নয়; কিন্তু বড়কাগজে ঠিক তার উল্টোটাই ঘটে; এখানে কে লিখছেন সেটাই বড় কথা কি লিখলেন সেটা নয়। এখানে কবিতার থেকে কবির গুণগুণ বেশি শোনা যায়। বড়কাগজের সাহিত্য সম্পাদক সম্পর্কে মঈন চৌধুরী বলেছেন, ‘পাঠক কোনটা পড়বে- এ কথা চিন্তা না করে, পাঠক কোনটা খাবে- এই কথা চিন্তা করতেই ভালোবাসেন এই ভদ্রলোকটি এবং তার এই চক্রান্ত সাহিত্যকেও করে তোলে Power Structure - এর উপাদান। শুদ্ধ সাহিত্যকেও যে খাওয়ানো যায়, এ সত্যকে একটি নতুন তত্ত্বে দাঁড় করাতে সচেষ্ট থাকেন এই সাহিত্য সম্পাদক (ছোটকাগজ/বড়কাগজ বৈপরীত্য ও সৃষ্টির প্রকাশ)”।
বড়কাগজের চরিত্র নিয়ে সুবিমল লিখেছেন, ‘প্রতিষ্ঠানের প্রভাব এমন গভীর ও নেপথ্যচারী যে খুব কম সাহিত্যিকের সম্ভব তার গ্রাস থেকে রেহাই পাওয়া। প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুতিশীল, প্রতিভাসম্পন্ন উঠতি তরুণ কবি-সাহিত্যিকের সামনে এক আপাত-দুর্ভেদ্য, অথচ বহু বর্ণ-সমন্বিত মায়াবী রহস্যের দরজা খুলে দেয়, ঝালরি পর্দা দোলায়, তখন খ্যাতির মোহ, অর্থের লোভ, প্রতিষ্ঠার নিশ্চিতি থেকে নিজেকে নিরাপদে সরিয়ে রাখা সত্যিই দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।’
খুব সহজভাবে দেখতে গেলে, বড়কাগজ অর্থ লগ্নি করে মুনাফার জন্য। এটা ঠিক, ছোটকাগজ লেখক তৈরী করে আর বড়কাগজ তাঁদের নিয়ে বাণিজ্য করে। এবং তাদের সেই পথ আমরা লেখক এবং পাঠকরাই বাতলে দিই। আমাদের লেখকরাই বড়কাগজে লেখা প্রকাশ করবার জন্য মুখিয়ে থাকেন, আর ছোটকাগজ লেখা চাইলে বলেন, নতুন পত্রিকা? প্রতিষ্ঠিত ‘হউক’ তারপর এসো (ভাবখানা এমন: পুরোনো ভিখু ভিখ পায় না নতুন ভিখুর আমদানি!)। আর যদি বা লেখা দেন তবে সেটা কয়েকবছর বছর আগে লেখা এবং অনেক পত্রিকায় প্রকাশিত কোন লেখা। তাঁদের নতুন লেখা সবসময় বড়কাগজ এবং প্রকাশিতব্য কোন বইয়ের জন্য তোলা থাকে। অথচ আমরা জানি, একসময় সাহিত্য পত্রিকাগুলোতে বাংলা সাহিত্যের সব কালজয়ী সৃষ্টিগুলো প্রকাশিত হয়েছে। আবার বড়কাগজ যে লেখক তৈরীর কাজে এগিয়ে আসছে না সেটার কারণ আমরা পাঠকরাই। বড়কাগজ যদি নতুনদের নিয়ে পড়ে থাকে তাহলে রাতারাতি ঐ কাগজটির জনপ্রিয়তা পড়ে যাবে, কোন সন্দেহ নেই তাতে।
ছোটকাগজের সমস্যা ও উত্তরণ
বর্তমানে, পূর্বের তুলনায়, ছোটকাগজের সংখ্যা বেশ কমে গেছে। নেই বললেই চলে। যন্ত্রমানবের বিস্ময়কর বিপ্লবের এই যুগে সেটা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এখন হাতে গুণে যে কয়েকটি ছোটকাগজের জন্ম হয় তার বেশির ভাগই আঁতুড়ে ঘরে মারা পড়ে। যে কয়েকটি টিকে থাকে তার সিংহভাগই ব্যবসায়ের কথা চিন্তা করে মেগাসাহিত্য পত্রিকায় পরিণত হয় এবং লেখক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ছোটকাগজের যে দায়বদ্ধতা এবং প্রথার বিরুদ্ধাচরণ করার যে প্রবণতা তা থেকে বের হয়ে আসে। বর্তমানে ছোটকাগজ কর্মীদের মধ্যে গা ছাড়া ভাব চলে এসেছে। অনেকে শুধুমাত্র যশের প্রয়োজনে লিটল ম্যাগাজিন বের করে। কেউ কেউ করে নিজে লেখক হবার জন্যে। অনেক সময় আবার কয়েকজন বন্ধু মিলে সখের বসে। এগুলোর কোনটিই ছোটকাগজের ভবিষ্যতের জন্য সুখকর কথা নয়। ভালোবাসার পরশ না থাকলে ছোটকাগজ টিকবে কেমন করে? এই সময়ের লেখকরাও বেশি পাঠকের লোভে বড়কাগজের দিকে ঝুকছে।
সবথেকে বড় সমস্যা অর্থনৈতিক সমস্যা। অর্থের অভাবে আজকাল প্রায়ই ছোটকাগজ প্রকাশে অনিয়ম কিংবা একেবারে বন্ধ হতে দেখা যায়। তবে এ সমস্যা আজই প্রথম না। ইতিপূর্বেও ছিল। আজকাল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে লোকসান পুষিয়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে। অনেক ছোটকাগজ আবার প্রয়োজনের তুলনায় বিজ্ঞাপন বেশি নিয়ে ব্যবসায়ের ধান্দা করছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা করতে গিয়ে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান খুলে ফেলা!
বড়কাগজ যেতেতু বৃহত্তর প্রচার মাধ্যম এবং বর্তমানের লেখক চিনবার অন্যতম উপায়ও। উদ্দেশ্য যেহেতু সাহিত্য তাই সাহিত্যের প্রতি দায় থেকেই বড়কাগজের সম্পাদকদের উচিত হবে, লেখকদেরকে তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী প্রশংসা করা। কাগজের সম্পাদক কিংবা মালিকের নিজস্ব রাজনৈতিক চেতনা সাহিত্য পাতায় না তুলে ধরে যদি প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার প্রকৃত স্বরুপটা তুলে ধরা হয় বড়কাগজের নামের যথার্থতা প্রকাশ পাবে। এবং লেখকদেরকেও তাঁদের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে লেখালেখি করতে হবে; তা সে বড়কাগজেই লিখুক আর ছোটকাগজেই লিখুক। স

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


