সাহিত্যের দায়, কাগজের দায় - একুশ শতক
মোজাফ্ফর হোসেন
২য় কিস্তি
সাহিত্যের দায় ও নন্দনজিজ্ঞাসা
সাহিত্যে দুটো প্রসঙ্গ নিয়ে তর্ক হরহামেশাই লেগে থাকে, তা হল : সাহিত্যে কোনটা আগে- সামাজিক দায়বদ্ধতা নাকি নান্দনিক সৌন্দর্য? একটি ছোটকাগজ মানেই একটি প্রতিবাদী সত্তা; এই প্রতিবাদ কি সমাজে ঘটে যাওয়া অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে, রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের জন্য, নাকি এই প্রতিবাদ নজরুলের বুলবুলির প্রাণের উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার, কিম্বা কিটস এর নাইটিঙ্গেলের মনের আনন্দে গেয়ে ওঠার প্রতিবাদ? এ তর্ক বহুদিনের। আজ অবধি অমীমাংসিত। তাই তো সাহিত্যের নান্দনিক দিকটাকে তুলে ধরবার জন্য যেমন কবিতা কিম্বা পরিচয় এর মতো সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হত অন্যদিকে সময়ের অসুস্থ স্রোতের কথা মাথায় রেখে প্রকাশিত হত সমকাল, কণ্ঠস্বর এর মতো পত্রিকা। এটা ঠিক যে সাহিত্যিকরা পরিপূর্ণভাবেই সামাজিক জীব; সমাজের ভেতর থেকেই তারা সংগ্রহ করেন তাদের লেখনীর materials; সমাজের মানুষগুলোর দুঃখ-দুর্দশা, রাজনৈতিক চিত্র, চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, যৌনতা এগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে প্রতিটি চরিত্র; আর তাই সমাজের প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা সাহিত্যে Ultimately চলে আসে। তবে aesthetic beauty বাদ দিয়ে শুধুমাত্র দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সাহিত্যচর্চা করলে তা গলাবাজি কিংবা শ্লোগানের মতো শোনায়, যা সমসাময়িক পাঠকদের মনকে হয়ত আন্দোলিত করে কিন্তু কালকে জয় করতে পারে না। ৪০-৭০’র দশকের মধ্যে লেখা অনেক সাহিত্যকর্মে এটা লক্ষ করা যায়। লেখকদের কিছু সামাজিক দায়বদ্ধতা অবশ্যই আছে এবং থাকবে। কিন্তু, এটাও স্মরণ রাখা দরকার, একটি সময়ের সকল সাহিত্যিক যদি সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে পড়ে থাকে তবে সমাজের কিছু পরিবর্তন হয়ত দৃশ্যত হবে কিন্তু ঐ সময়ের সাহিত্য মারা পড়বে। আবার কোন কোন সময় সাহিত্যের নান্দনিক সৌন্দর্যের চেয়েও প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে দায়বদ্ধতা। এ সময় ছোটকাগজ তার মেজাজ পরিবর্তন করে; সময়ের সাথে বদলে যাওয়াই তো ছোটকাগজের ধর্ম। রুশ বিপ্লবের সময় লেলিন তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ছোটকাগজের মাধ্যমে সর্ব সাধারনের মাঝে পৌছে দিত; ভারতে নীলবিদ্রোহ, স্বদেশী আন্দোলনেও একই কাজ করা হত। ৫২, ৭১ ও স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনে ছোটকাগজ দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এগিয়ে আসে।
শিল্পকর্ম সৃষ্টি হয় মানুষের সচেতন ও অবচেতন মনের যৌথ প্রচেষ্টার। সচেতন মন প্রত্যক্ষণ বা perceive করে আমাদের ইন্দ্রিয় অনুভূত ভেসে ওঠা সত্যকে কিন্তু অবচেতন মন সত্যের form বা shadow কে ভেদ করে তার essence-কে perceive করে। এজন্য শিল্প-সাহিত্যে উপসি'ত থাকছে জীবনমুখী-জীবনবিমুখিতার দ্বন্দ্ব। স্বপ্ন-বাস্তবতার দ্বন্দ্বের মতো। এজন্য দ্বন্দ্ব চলে : ‘শিল্পের জন্য শিল্প নাকি জীবনের জন্য শিল্প’।
সাহিত্যের দায়কে বিভিন্ন সময়ের লেখক- কবিরা বিভিন্নভাবে প্রকাশ করেছেন। নজরুল লিখেছেন একভাবে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন আরেকভাবে। নজরুলের লেখা আমাদের রক্তে জাগিয়ে তোলে প্রতিবাদের ভাষা। কিন্তু মানিকের লেখায় এসে দেখি সমাজের শোষিত নিষ্পেষিত মানুষদের টনটনে ব্যথার সুর আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্নে নদীর ঢেউয়ের মতন কাঁপিয়ে তোলে। আমরা কষ্ট পাই অথচ ভালোলাগে। অনেকটা কিটস-এর ‘pleasure in pain’ এর মতন। এখন দেখবার বিষয় হল, পদ্মানদীর মাঝি পড়ে আমরা কুবেরদের প্রতি কতটা দায়বদ্ধতা অনুভব করি। কুবেরের দারিদ্রতা আমাদের পীড়া দেয়, মালার অসহায়ত্ব আমাদের কাঁদায়; কিন্তু আমরা যাই কি তাদের কাছে এক দণ্ড আশার বাণী নিয়ে? হোসেন মিয়ার ময়না দ্বীপের স্বপ্ন আমাদের স্পর্শ করে; কিন্তু আমরা হই কি তার স্বপ্নপথের সারথি? কুবেরদের জীবন যেমন ছিল তেমনি থাকে। পদ্মানদীর মাঝি আমাদের ভালো লাগে, এই ভালোলাগা শিল্পের। শিল্পের ভয়ানক রূপই হচ্ছে পোড়ো বাড়িতেও শৈল্পিকতা খুঁজে পাওয়া। শিল্পের এই ভয়ানক রূপটিই আমাদেরকে পরাজয়ে হাসতে শেখায়, ‘জীবনে হয়ত কিছুই হতে পারিনা তবু বেঁচে থাকতে আমাদের ভালো লাগে’।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানুষ খুব একাকী এবং অসহায় বোধ করতে শুরু করে। পরস্পরের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে, ফলে দায়বদ্ধতার জায়গাটা শিল্প ও সাহিত্যে চরম মূর্তি ধারণ করে যে কারণে এই সময়ের পরে আর আমরা রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, কীটস, শেলী, ওয়ার্ডওয়ার্থ, কোলরিজ, ব্লেক, সুধীন্দ্রনাথ এঁদের মতন রোমান্টিক চেতনার- সুন্দর সচেতন কবি খুব কমই পেয়েছি। সাহিত্যের প্রথম পরিচয় শিল্প এবং শিল্পমাত্রই স্বতঃস্ফূর্ত, এখানে আরোপিত বিষয় কাম্য নয়। Walter Pater বলেছেন ‘Art was an end in itself. It purpose was to please, which it did through structure and form.’ Oscar Wild এর কথায়, ‘life itself was subordinate to art’; এর কথায়, ‘life itself was subordinate to art’; তাই দেখা যাচ্ছে, মন এবং শিল্প হচ্ছে পরস্পরের আত্মার আত্মীয়। মানুষের মন চিরকালই সুন্দরের প্রতি দুর্বল, আবেগের কাছে অসহায়। সাহিত্য যেহেতু যতখানিক বাহ্যিক তার থেকে অনেক বেশি মানুষিক। বস'গত পৃথিবী মানুষের মনের জন্য প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। এখানে পরস্পরের সম্পর্ক সমঝোতার। নিতান্ত প্রয়োজনের। কিন্তু শিল্পের সাথে মনের যে সম্পর্ক তা হল সহজাত, যুক্তি-তর্কের ঊর্ধ্বে। তাই একজন শিল্পীর সব থেকে বড় দায়বদ্ধতা তার শিল্পের কাছে, আর শিল্পের দায় হচ্ছে মানুষের যান্ত্রিক জীবনে আবেগের জায়গাটা ধরে রাখার। এ দায় থেকে যুদ্ধ ও হাহাকারের সময়ও সুধীন্দ্রনাথ ও কিটস রোমান্টিক কবিতা লিখেছেন। এজন্যে কেউ কেউ আবার সুধীন্দ্রনাথকে অন্তর্মুখী এবং কিটসকে escapist বলে আখ্যায়িত করেছেন।
শ্রমবিভাজনের সভ্যতায় সকলের দায় হচ্ছে তার নিজের ওপর অর্পিত কাজটি গভীর নিষ্ঠা ও সততার সাথে সম্পন্ন করে সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করা। এক্ষেত্রে, একজন কৃষকের দায়িত্ব হচ্ছে কৃষিকাজে শ্রম দিয়ে উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখা, একজন সরকারী আমলার কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা, একজন শিল্পীর দায়িত্ব হচ্ছে তার শিল্পকর্মের মাধ্যমে সকলের মনকে আনন্দ দেওয়া। কিন্তু কোন কারণে যদি সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়, দুর্নীতি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে; কৃষক ক্ষেত ফেলে রাস্তায় উঠে আসে প্রতিবাদ জানাতে, জেলে-কামার-কুমার যে যার পেশা ফেলে নেমে পড়ে প্রতিবাদে সাহিত্যিকরা হাতে তুলে নেই প্রতিবাদী কলম। ভারসাম্য ফিরে আসলে যে যার কর্মক্ষেত্রে চলে যায় এবং সেটাই স্বাভাবিক।
সাহিত্যের প্রধান উদ্দেশ্য মনের আনন্দ দান; সাহিত্য পাঠের প্রধান উদ্দেশ্যও থাকে তাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে economic era তে সাহিত্য মানুষের মনকে কতখানি আনন্দ দিতে পারে? সভ্যতার আরেকটি নামই হচ্ছে Proletariat-দের শোষণ এবং Bourgeois-দের আগ্রাসনবাদের বিজয়। প্রাচীন অর্থনীতি ব্যবস্থা ছিল সমাজকেন্দ্রিক। কিন্তু একুশ শতকের সমাজ হয়ে উঠেছে অর্থনীতি কেন্দ্রিক। এখানে Economy determines everything'; মানুষের ভালোবাসা- আবেগকেও এখন বাজারের দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ করা হয়। এমন একটি সময় জীবনানন্দ কিংবা কীটসের কবিতায় একটি মানুষ কতটা আনন্দ পেতে পারে? রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যাবার মতন পরিবেশ কি আর থাকছে এই খোলাআকাশ সংস্কৃতির বাজারে? এখন গীতাঞ্জলির দাম ফুটপাতের এক জোড়া চটি স্যান্ডেলের থেকে কম তবুও বই পড়ার কথা জিজ্ঞেস করলে পাঠকরা অভিযোগ করে বলে, ইচ্ছে তো হয় কিন্তু যে দাম! কিন্তু তাই বলে বই বিক্রি থেমে নেই। বই যেহেতু ব্যবসায়ের পণ্য, বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়াই বইয়ের চেহারা সুরত পরিবর্তন করে ভদ্রলোকের টেবিলে সাজিয়ে রাখার জন্য সো-পিচ হিসাবে পরিবেশন করা হয়। এখন টেলিভিশন এবং থিয়েটার মানুষের বিনোদনের জাযগাটা দখল করে নিয়েছে। তাইতো পথের পাঁচালী পড়া হয়ে না উঠলেও ছোটপর্দায় অনেকেই দেখেন। আমি তো বলব, সত্যজিৎ বিভূতিভূষনের পথের পাঁচালীকে গলা টিপে হত্যা করেছেন। ঠিক তেমনিভাবে, মানুষ আর মনোযোগ দিয়ে ডলস হাউস কিংবা রক্তাক্ত প্রান্তর পড়ে না, বিশ টাকা দিয়ে টিকেট কিনে প্রিয়জনকে সঙ্গে করে আয়েশ করে বসে পড়ে। একুশ শতকের সমাজ ব্যবস্থায় সাহিত্যের অবস্থানটা ritual হয়ে উঠেছে। ভাবখানা এমন: থাকতে হয় তাই আছে। এবং খুব কৌশলে সাহিত্যে পুঁজিবাদ ও ক্ষমতার রাজনীতির প্রয়োজনীয় দিকটাকে স্বাস্থ্যবান করে তোলা হচ্ছে।
এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে একুশ শতকে কারা লিখছেন? মুদির দোকানদাররা কি কবিতা লেখেন? কলকারখানার শ্রমিকরা কি গল্প লেখেন? তাদেরকে লিখতে দেওয়া হয় না নাকি লিখতে পারে না তাই লেখে না? এখনও, একটু লক্ষ করলে দেখতে পাবেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকরাই লেখালেখি বেশি করছে? আবার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা কিন্তু লেখালেখির দিকে ঝুঁকছেন না। কেন, লেখক হতে হলে কি বিশ্ববিদ্যালযের ফার্স্ট ক্লাশধারী ছাত্র কিম্বা বি. সি. এস. ক্যাডার হতে হবে? যদি তা নাই হতে হয় তবে বাকিরা কেন লিখছেন না? কারণ হচ্ছে অর্থনীতি! শুধুই কি অর্থনীতি? একটু ভাবা দরকার। বর্তমানে অন্য কোথাও জীবন ধারনের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করে তবেই লেখালেখির জগতে প্রবেশ করছেন একজন লেখক। এদেশে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেয়ার সুযোগ পূর্বেও ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে কিনা সন্দেহ। এবং সেই সুযোগটা আসা উচিৎ কিনা এ নিয়েও বহু বিবাদ আছে। সবাই তো আর হুমায়ূন আহমেদ হয় না, হতেও চায় না। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে শহীদ ইকবাল এবং রহমান রাজু যদি অন্য কোন পেশায় থাকতেন তাহলে কি চিহ্নের মতন আয়েশি পত্রিকার জন্ম হত? বিজ্ঞাপন না থাকলে কালি ও কলম এর কি হাল হত? তাহলে একুশ শতকের সাহিত্য কি একটি বিশেষ শ্রেণীর সাহিত্য? যত দিন যাচ্ছে সাহিত্যের মানের জায়গাটা তত নিম্নগামী হচ্ছে। অন্যান্য ক্ষেত্রে যখন বর্তমান সভ্যতা মানব সাধ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার সাপেক্ষ বস'র চূড়ান্ত উপযোগ ভোগ করছে তখন সাহিত্যের এই অধঃপতন কেন? সমাজের সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত প্রয়াস সাহিত্যে থাকছে না। যে খুব ভালো কবিতা লিখতে পারতো সে লিখছে প্রেসক্রিপশন, যে খুব ভালো গল্প লিখতে পারতো সে খাতা-কলম কিনতে পারছে না। পক্ষান্তরে, এমনটিও হচ্ছে, যে কিছুই লিখতে পারে না, সময় কাটানোর ছলে কিংবা লেখক বন্ধুদেরকে নিজের বাহাদুরি দেখানোর গোপন প্রয়াসে দূর্বোধ্য কিছু শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে কবিতা লিখে ফেলছে। প্রথম আলো কিংবা কালি ও কলমের মত প্রতিষ্ঠিত কাগজের সম্পাদকরা যখন দেখছেন এই লেখক কোন না কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তখন কবিতাটা যত্ন করে ছেপে দিচ্ছেন; এই ভেবে- বাংলা/ইংরেজির শিক্ষক, নিশ্চয় জব্বর কিছু লিখেছেন। পাঠক তো পড়ে একেবারে টাসকি খেয়ে পড়েন; আহা কি লিখলেন কিছুই বুঝলাম না! এ যেন সাক্ষাৎ সুধীন বাবু। এই হচ্ছে আমাদের একুশ শতকের সাহিত্য!
বি দ্র প্রবন্ধিট চিহ্ন আয়োজিত সেমিনারে প্রধান প্রবন্ধ হিসাবে পাঠ করা হয়। প্রধান অতিথী ছিলেন হরিপদ দত্ত, জাকির তালুকদার সহ আরো অনেকে...
মোজাফফর হোসেন (ইংরেজী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)
সাহেব বাজার, রাজশাহী
০১৭১৭-৫১৩০২৩;

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


