somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি কাগজিলেবু এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর --হুমায়ূন আহমেদ

২৮ শে আগস্ট, ২০১১ সকাল ৯:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কিছু দিন আগেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের সার্ধশতবর্ষ (এই শব্দটি জানা ছিল না, এবার জানলাম) উৎসব হয়ে গেল। আমরা রবীন্দ্রনাথকে চিপে ছোবড়া বানিয়ে দিলাম। কবি-সাহিত্যিকরা কলম হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাদের রবীন্দ্র-জ্ঞান উগরে দিতে লাগলেন_ গৌতম বুদ্ধ এবং রবীন্দ্র-দর্শন, রবীন্দ্রকাব্যের ম্যাজিক রিয়েলিটি, এইসব। আমি নিজেও তিন দৈনিক পত্রিকায় তিন লেখা উগরালাম। টিভি চ্যানেলগুলো রবীন্দ্রনাথের কঠিন কঠিন কবিতাকে নাটক বানিয়ে প্রচার করে ফেলল। নাটকের নায়কদের পরনে বুকখোলা পাঞ্জাবি এবং নাচের ছেলেরা যেমন ধুতি পরে সেরকম ধুতি। পায়ের লোম দেখানোর জন্যই হয়তো ধুতি অনেক উপরে পরা। কবি-সাহিত্যিক যাদের মুখে লম্বা দাড়ি আছে এবং মাথায় বাবরি চুল আছে তারা রবীন্দ্রনাথ সেজে নাটকে যোগ দিলেন। নাটকের দৃশ্যে তাদের গুরুতর চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় কাব্যরচনায় মগ্ন হতে দেখা গেল। চ্যানেল আই দিনব্যাপী লেবুচেপা উৎসবের ব্যবস্থা করল। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা আসছেন। গলায় লাল গামছার মতো কিছু পরে গদ গদ গলায় রবীন্দ্রবন্দনা করছেন। মেলাও বসে গেছে। কাচের চুড়ি, মাটির হাঁড়িখুরি বিক্রি হচ্ছে। সাপের খেলা এবং বাঁদরের খেলাটা শুধু বাদ পড়েছে।

রন্ধনশিল্পী কেকা ফেরদৌসী করছেন ঠাকুরবাড়ির রান্না নিয়ে একটি উৎসব। আমি অবাক হয়ে দেখি কেউ একজন (নিশ্চয়ই রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী) পাঁচফোড়ন দিয়ে মিক্সড ভেজিটেবল (রবীন্দ্রনাথের পছন্দ) রাঁধতে রাঁধতে রান্নার একপর্যায়ে কড়াইয়ের ভেজিটেবলের দিকে তাকিয়ে গান শুরু করলেন_

সখি যাতনা কাহারে বলে

সখি ভাবনা কাহারে বলে

তোমরা যে বল ভালোবাসা ভালোবাসা

সখি ভালোবাসা কারে কয়?

গান শুনে মনে হচ্ছিল প্রশ্ন করা হচ্ছে পাঁচফোড়ন মাখা সবজিকে।

আমাদের পরম সৌভাগ্য রবীন্দ্রনাথকে এই অনুষ্ঠানটি দেখতে হয়নি।

কালবৈশাখী ঝড় শুরুর আগে প্রকৃতিতে যেমন সাড়া পড়ে যায় রবীন্দ্র সার্ধশতবার্ষিকী নিয়ে বাংলার সবদিকে সাড়া পড়ে গেল। যে বাউল শিল্পী সারা জীবন ভাটিয়ালী গান করেছেন তিনিও বরফ-পানিতে ক্রমাগত গোসল করে প্রথমে গলা বসিয়েছেন, নাকি সর্দি বাঁধিয়ে রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেট বের করে ফেলেছেন। সাধারণ গলায় গান করেননি, কারণ তাতে কবিগুরুর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয় না।

রবীন্দ্র ফ্যাশন শো হলো।

চ্যানেলগুলোতে রবীন্দ্র টকশোর মেলা বসে গেল।

শিল্পীরা রংতুলি নিয়ে ক্যানভাসে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাদের তুলি থেকে নানান রংয়ে এবং নানান চেহারার রবীন্দ্রনাথ নাজেল হওয়া শুরু করলেন। সার্ধশতবর্ষটা যে এমনভাবে হবে তা মনে হয় ছাত্রলীগ আগে বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারলে অবশ্যই তারা মহল্লায় মহল্লায় রবীন্দ্র কাঙালিভোজের ব্যবস্থা করে টু-পাইস ঘরে নিয়ে আসতে পারত। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী তাদের জন্য এক হাজার কোটি টাকা আলাদা করেছেন। ছাত্রলীগের দায়িত্ব এই টাকা দিয়ে তারা বাংলাদেশের নিরক্ষর মানুষদের সাক্ষর মানুষ করে ফেলবে। প্রধানমন্ত্রী এই টাকাটা ছাত্রলীগকে সত্যিকার শিক্ষিত করে তোলার জন্য খরচ করলে একটা কাজের কাজ হতো। গ্রামে প্রচলিত বিশ্বাস হলো, করোর ওপর যদি মন্দ কিছু ভর করে তাহলে তাকে সোনা-রুপা ডুবানো পানিতে গোসল দিতে হয়। দেশের স্বার্থে ছাত্রলীগের সদস্যদের কি সোনা-রুপার পানিতে গোসল করানো যায় না। মনে ক্ষোভ থেকে রবীন্দ্রনাথ থেকে ছাত্রলীগে চলে এসেছিলাম, আবার রবীন্দ্রনাথে ফিরে যাই। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তার শবদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শ্মশানযাত্রীরা হঠাৎই মৃত রবীন্দ্রনাথের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার চুল-দাড়ি টেনে খুলে ফেলতে লাগল। রবীন্দ্রনাথের স্মারক সংগ্রহ। কেওড়াতলা শ্মশানে রবীন্দ্রনাথ যখন পেঁৗছলেন তখন তার দাড়ি-গোঁফ, চুল সবই তুলে নেওয়া হয়েছে। তাকে দেখাচ্ছিল বীভৎস প্রেতের মতো।

পাঠক কল্পনা করুন, রবীন্দ্রনাথ দেড়শ' বছর বেঁচেছেন। সার্ধশতবর্ষে তার মৃত্যু হলো। বাংলাদেশে আমরা তখন রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহের জন্য কী করব? চামড়াসুদ্ধ খুলে ফেলব না? রবীন্দ্রনাথ তখন গায়ের চামড়া দিয়ে বুঝতেন বাংলাদেশের রবীন্দ্রভক্তি কোন পর্যায়ের। পাদটীকা : এই রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীতে ভারতের বিখ্যাত কার্টুনিস্ট চান্ড একটি কার্টুন এঁকেছিলেন। সেখানে বিশাল অনুষ্ঠান। দর্শকের সারিতে জ্ঞানী-গুণীরা বসে আছেন। মঞ্চে মাইক হাতে খালি গায়ে নেংটিপরা এক বক্তা। তিনি গলার রগ ফুলিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন_ 'আমি তখন শান্তিনিকেতনের মাঠে গরু চড়াতাম। একদিন কবিগুরু ডেকে বললেন...।'
View this link
১৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×