চারপাশে এমন সব ঘটনা ঘটছে যা নিয়ে ভাবতেও ভাল লাগে না, কথা বলাতো দুরে থাক। কিন্তু গতরাতে টিভিতে আমাদের দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের সংবিধান সংশোধন-বিষয়ক পরামর্শ শুনে আর চুপ করে থাকতে পারছি না। খবর মতে, বিশিষ্টজনরা যে সব দাবী করেছেন তার সার কথা হল: সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ তুলে দিতে হবে, রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম বাদ দিতে হবে, ধর্ম নিরপেক্ষতা যোগ করতে হবে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করতে হবে, ৭ই মার্চের ভাষন যোগ করতে হবে ইত্যাদি। প্রস্তাব যেহেতু চাওয়া হয়েছে, দিতে তো দোষ নেই। আমার মতামত জানতে চাওয়া হয়নি কিন্তু আমার কিছু প্রশ্ন এবং আশংকা আছে যা আপনাদের সাথে ভাগাভাগি করতে চাচ্ছি।
প্রথমত, ধর্ম নিয়ে যারা মতামত দিলেন তাদের নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস কী? তারা কি দেশের মানুষের প্রতিনিধি? বেশিরভাগ মানুষ যে ধর্মগুলো বিশ্বাস করেন, বিশিষ্ট নাগরিকেরা কি সে সব ধর্ম বিশ্বাসী মানুষের প্রতিনিধি? যদি হয়ে থাকে তাহলে বলার কিছু নেই। আর যদি তা না হয়ে থাকে তবে তাদের মতামতকে দেশের মানুষের মতামত বলে ভাবতে পারছি না।
দ্বিতীয়ত, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের সংজ্ঞা কী? বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের দলের ওয়ের সাইটের শীর্ষে লিখে রেখেছে "আল্লাহ্ সর্বশক্তিমান"। আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের ইস্তেহারের ২১.৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী কোন আইন প্রণয়ন করা হবে না। সকল ধর্মের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করা হবে (Laws repugnant to Quran and Sunnah shall not be made. Due respect will be shown to the principles and values of all religions.)
লিংক: Click This Link
এই কথাটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিএনপি, জামাত এবং জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্র এবং নির্বাচনী ইস্তেহারেও রয়েছে। তাহলে এই দলগুলো কী ইসলামী দল নয়? আমার মতে এগুলোর সবগুলো দলই ইসলামী দল। বন্ধ করতে হলে সবগুলোই বন্ধ করা হোক। সে সাহস কোন বিশিষ্ট নাগরিকের হবে না তা বলে দেওয়া যায়। ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল রয়েছে এবং তা বন্ধের দাবী শুনিনি। আসলে আমাদের দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা অনেক বিষয়েই আলাদা। তারা গণমানুষের প্রতিনিধিত্ব করাকে সজ্ঞানে এড়িয়ে চলেন।
তৃতীয়ত, যাদেরকে বিশিষ্ট নাগরিক তকমা লাগিয়ে সংবিধান বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য দাওয়াত দেয়া হয়েছে তাদের বেশিরভাগই ঘোষিত ইসলাম বিদ্বেষী, কেউ কেউ কোন ধর্মই মানে না। কোন ধর্ম না মানা বা নাস্তিকতাও একটি ধর্ম; আবার মানবতাবাদও একটি ধর্ম। সুতরাং নাস্তিকতা বা মানবতাবাদের দোহাই দিয়ে যদি সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতা যোগ করা হয়; তবে তা হবে একটি গোষ্ঠীর মতামতের প্রতিফলন। সুতরাং তাদের মতামতের প্রতিফলনের জন্য যদি কোমড় রেঁধে আওয়াজ তোলা যায়, তাহলে ৯০% মুসলিম অধ্যুষিত দেশে মুসলিমদের মতামতের প্রতিফলন ঘটাতে দোষ কোথায়? সেটা না ঘটালেই বরং ভুল হবে। আসলে আমার মতে, আমরা যুক্তিকে খুব ভয় পাই। কারণ, নির্মোহ যুক্তির শক্তিতে আমরা বলীয়ান নই। আমরা দলীয় আনুগত্য, ব্যক্তিগত স্বার্থ, প্রচার লোভী, অন্যের মতামতকে সম্মান করতে অনিচ্ছুক, নিজেকে জ্ঞানী এবং আলাদা বলে প্রচারের হীন চেষ্টায় লিপ্ত। সে কারণেই যুক্তিহীনভাবে আমরা নিজেদের মতামত তুলে ধরি।
চতুর্থত, পুরো সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়াটিতে অসামঞ্জস্যতা বিদ্যমান। আদালতের রায়ে ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রতিস্থাপন করতে বলা হয়েছে। ভাল কথা। সে হিসেবে মোট ১০ বা ১২টি অনুচ্ছেদে পরিবর্তন করার কথা। কিন্তু ইতোমধ্যে পুনর্মুদ্রিত সংবিধানে পরিবর্তন করা হয়েছে অন্তত ৬০টি অনুচ্ছেদে। সেসব পরিবর্তনের মধ্যে নাকি বাকশালের কিছু অনুচ্ছেদও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এতগুলো অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের ভিত্তি কী? পরিবর্তিত সংবিধান অনুসারেই দেশ চলছে বলে সরকার দাবী করছে অথচ সে সংবিধান সংসদে পাশও করা হয়নি। কেন? কেন সংবিধান সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি?
পঞ্চমত, সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন নিয়ে এত তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে কেন? শুধু বিশিষ্টজনরা কেন মতামত দেবেন? সাধারণ মানুষের মতামতও নেওয়া হোক। সংবিধান খসড়া আকারে ওয়েবসাইটে দেওয়া হোক এবং মতামত চাওয়া হোক। শিক্ষানীতি, শিশুনীতি, নারী নীতির জন্য যদি সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া যায় তবে সংবিধান বিষয়েতো মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
আসলে পুরো বিষয়টি নিয়ে সরকারের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তারা তাদের কাঙ্খিত পরিবর্তনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য পায়তারা চালাচ্ছেন। তবে আমি চাই আমার আশংকা অমূলক হোক। কারণ সাধারণ এই আমার আশংকা অমূলক হলে কারো কিছু যাবে আসবে না, কিন্তু আমার আশংকা সত্যি হলে পুরো জাতিকে তার মূল্য দিতে হবে। আন্তরিকভাবে চাইছি তা যেন না হয়। আমার মত অনেকেই বিষয়টি নিয়ে বিরক্ত বলে, বা বলে লাভ হবে না ভেবে চুপ করে আছেন। কিন্তু সংবিধান পরিবর্তনের বিষয়টি আসলে আমাদের সবার সাথে জড়িত। তাই বিষয়টি নিয়ে কথা বলুন, আলোচনা করুন, প্রচার করুন, আওয়াজ তুলুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

