"আজ ফিরতে দেরী হবে বোধ হয়"- দরজার মুখে দাঁড়িয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জানালো বীরু। "প্রজেক্ট মিটিং-এ ফাইনাল ডিসিশন হয়ে যাবে আজ। প্রয়োজন পড়লে কয়েকদিনের জন্য ঢাকার বাইরেও যেতে হতে পারে। এজন্য রিজার্ভ কয়েকটা ড্রেস নিয়ে নিলাম। তো তুমি কিছু বলছনা যে? তোমার আজ অফিসের কোন তাড়া নেই নাকি?" শ্রেয়া ভাবছে। কি বলবে বীরুকে? ঘুম ভেঙে দেখল স্যুটকেস গোছাচ্ছে। ওকে কিছু জানাবার প্রয়োজন মনে করেনি। বীরু অবশ্য এরকমই। নিজের কোন কাজই সে শ্রেয়াকে দিয়ে করানোর আগ্রহ দেখায়না। শ্রেয়ারও কোন অভিযোগ নেই। কিন্তু আজ হঠাৎ অভিমান এসে ভর করলো ওর। বীরুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে শুধু বাই বলে দরজা লাগিয়ে দিল।
দরজার ওপারে বীরুর ভাবলেশহীন চেহারা। সময় নেই হাতে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেল লিফটের দিকে। লিফ্ট বন্ধ। কি যে নিয়ম এই বাসার ! সকাল সাতটার আগে লিফ্ট চালু হয়না। কি আর করা ! সিড়ি ভেঙ্গে নামতে শুরু করলো। প্রায় পার্কিং এ নেমে এসেছে। শ্রেয়ার ফোন কল। বীরু রিসিভ করল না। প্রজেক্ট মিটিঙের আগে যতসম্ভব কুল থাকার চেষ্টা করছে ও। আজ অনেক কিছু নির্ভর করছে এই মিটিং এ। চুক্তিটা কমপক্ষে এক বছর বাড়াতে চায় বীরু। যাক্ দারোয়ান জেগে আছে। গেট খুলতে দেরী হলোনা। গাড়ী বের করে এফ এম রেডিও চালু করে দিল। ইচ্ছে সকালের আপডেটটা জানা। না তেমন কোন আপডেট নেই। ভাবছিল শ্রেয়াকে ফোন করবে কিনা। এমন সময় আবার শ্রেয়ার ফোন।
হ্যালো, সরি.... হ্যা, গাড়ী বের করছিলাম, তাই তোমার ফোনটা ধরতে পারিনি। না, না, ডিফেন্ড করছিনা। ফোন করছিলে কেন বলতো? এনিথিং ইমপরট্যান্ট?
না এমনিতেই, তুমি চলে যাওয়ার পর মনে হলো কিছু না বলেই তোমাকে বিদায় দিলাম তাই...।
ওহ নো শ্রেয়া...। তোমার আজ কি হয়েছে বলোতো? মন খারাপ? বীরু চাচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব কলটা শেষ করতে। অফিসের কাছাকাছি চলে এসেছে। সকালের এই ঢাকা শহরটাকে খুব অপরিচিত মনে হয়। রাস্তায় গাড়ী নেই, শান্ত শান্ত ভাব। হ্যালো শ্রেয়া আমি প্রায় চলে এসেছি। রাখছি এখন। সম্ভবত: অনেকক্ষণ কল রিসিভ করতে পারবনা। দরকার হলে টেক্সট করে রেখো, বাই..। ওপারের কোন প্রতুত্তরের অপেক্ষা না করেই কলটা শেষ করলো বীরু।
শ্রেয়া কি করবে ভাবছে। অফিসে তেমন কোন জরুরী কাজ নেই। দেরী করা যেতে পারে। ভেবেছিল আজ দেরী করে উঠবে। অনেকদিন সকাল বেলা বীরুকে ঘনিষ্ঠভাবে পাওয়া হয়না। আজ প্রচন্ড ইচ্ছে করছিল ওর।কি করবে..... কি করবে ভাবতে ভাবতে মোবাইলের কিপ্যাড নাড়াচাড়া করছে। আজ এমন লাগছে কেন ওর? বীরুর সাথে তো কোন দায়বদ্ধতা নেই। বীরু স্বাধীন- শ্রেয়াও তাই। দুজন দুজনার সব ধরনের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। খুব ভালো বন্ধু ওরা। এক অফিসে ওদের কর্মজীবনের শুরু। বছর খানেক চাকরীর পর বীরু চলে যায় প্রজেক্ট বেজ চাকরীটাতে। শ্রেয়া থেকে যায় আগের জায়গায়। একই সাথে অনেকদিন কাজ করতে যেয়ে দুজনেই দুজনকে বুঝতে পারে বেশ। বীরু স্মার্ট, খুব শার্প। শ্রেয়া আধুনিক, সুন্দরী।
একটু একটু করে দুজনা একসাথে থাকার সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলে। দুজনারই আলাদা জগৎ, স্বতন্ত্রতা তবু কোন এক জায়গায় এক। বীরু বাড়ি ফিরতে দেরী করলে শ্রেয়ার চিন্তা হয়না তা নয়। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শ্রেয়া রান্না করে, বীরু লং-ড্রাইভে বের হয় শ্রেয়াকে নিয়ে। হুটহাট ঘুরতে বের হয় সময় পেলেই..। ভালো আছে শ্রেয়া, ভালো থাকে শ্রেয়া, তবু আজ কেন এমন করে মনে পড়ছে সব ? কেন?
বীরুর কথাটা মাথা থেকে নামাতে পারছেনা। আজ ওর খুব ইমপরট্যান্ট একটা দিন। প্রজেক্ট এক্সটেন্ড হবে কিনা, কন্ট্যাক্ট রিনিউ হব্ব কিনা... ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এত ভাবনার কি আছে? এটাতো প্রতিদিনের ঘটনা। শ্রেয়া কি একটু একটু করে বেশী নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বীরুর উপর।না, এটাতো হবার কথা ছিলনা। কথা ছিল যখন যা ইচ্ছে হবে তখন সে তাই করতে পারবে। ইচ্ছে হলেই শ্রেয়া চলে যেতে পারবে পছন্দের জায়গায়। বীরুর ক্ষেত্রেও তাই। সবই তো ঠিকমত চলছিল। বীরুর কখনই কোন বাড়াবাড়ি আবদার ছিলনা; নেই। রাট নয়টায় অফিস থেকে ফিরে রান্না করটে একটুও দ্বিধা হয়না বীরুর। বরং রান্না করে টেবিল সাজিয়ে শ্রেয়াকে নিয়ে খেতে বসে অনায়াসে। তাহলে শ্রেয়ার কেন এমন হচ্ছে? কল রিসিভ করতে পারবেনা বলেছে বীরু আজ। খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে, মেসেজ পাঠাতে ইচ্ছে করছেনা। কি করা যায়.... কি করা যায়...। অফিস না যাবার সিদ্বান্ত নেই। ভাবলো রান্না করবে অনেক। রাতে দুজনে একসাথে খাবে। ফ্রিজ থেকে মাছ মাংস বের করে বীরুকে মেসেজ পাঠালো যেন মিটিং শেষ হলে ফোন করে, রাতে একসাথে খাবে। দুশ্চিন্তা ছেড়ে রান্না বান্নায় মন দেয় শ্রেয়... অনেকদিন পর রান্না করটে বেশ মজা পাচ্ছে ও।
বীরুর মিটিং এর ফার্স্ট হাফ শেষ হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত সবকিছু ভালোই চলছে। সবাই কমবেশী খুশী কাজের অগ্রগতিতে। কন্ট্যাক্ট এক্সটেন্ড হবে বোধ হয় কিন্তু একটা কমেন্ট একটু অপরিষ্কার মনে হয়েছে। ঢাকার অফিসে কি যেন পরিবর্তন আনতে চাই কমিটি। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কি হয়। বীরু ঘামছে। খুব চেষ্টা করছে স্বাভাবিক থাকতে। ফোনটা বন্ধ রেখেছে ও। একবার ভাবলো অন করে দেখে কোন মেসেজ বা কল এসেছে কিনা। কি ভেবে তা আর করলনা। ঘড়িতে সময় দেখল। এখনও দশ মিনিট সময় আছে। চা খেতে ইচ্ছে করছে। ক্যান্টিনে বসে চা খেতে খেতে ভেবে নিল দ্বিতীয় পর্বটা কিভাবে সামলাবে। যদি প্রজেক্ট এক্সটেন্ড হয় তবে পুরো এক বছরের প্লান বলতে হবে। সব কিছু রেডি আছে তবু কেমন জানি অস্হির লাগছে। সবকিছু শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক হলেই ভালো। আবার ঘড়ি দেখলো। দুই মিনিট এখনও আছে হাতে। হাটা শুরু করলো কনফারেন্স রুমের দিকে।
হ্যালো বীরু... তুমি তো দারুন প্রেজেন্ট করলে, সহাস্যে হাত বাড়ালো বোর্ড মেম্বার রায়হান চৌধুরী। চমৎকার ভাবে এগিয়ে নিয়েছ প্রজেক্টটাকে। জানোতো এই ছিন্নমূল নারীদের পুনর্বাসন নিয়ে আমরা কাজ করছি অনেকদিন হলো। মাঝখানে আমরা আশা প্রায় আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে নাহ্ আমরা বেশ খানিকটা এগিয়েছি। ঢাকা কেন্দ্রিক সফলতা আমাদের নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। বোর্ড চাচ্ছে তোমাকে নতুন করে নিয়োগ দিতে। অনেক দ্বায়িত্ব আসছে তোমার; পারবে তো? সহাস্যে জিজ্ঞেস করলো রায়হান চৌধুরী।
পারবো স্যার, আপনাদের বিশ্বাসের মূল্য দিতে পারার আত্মবিশ্বাস আমার আছে। কিন্তু আপনি যে বললেন নতুন নিয়োগ, নতুন দ্বায়িত্ব- একটু গোলমেলে লাগছে; বুঝিয়ে বলবেন স্যার.. ?
আরে হ্যা সবকিছুই জানতে পারবে, মিটিংটা শেষ করো। দেখবে দ্বায়িত্বের চাপে কাধ ভারি হয়ে গেছে। কোন চিন্তার কারণ নেই। চলো দেখি সবাই এসেছে কিনা।
বীরু রায়হান চৌধুরীর পিছন পিছন হাটতে হাটতে প্রবেশ করলো কনফারেন্স রুমের ভেতর।
....................................।।
মিটিং শেষ। বীরু মুখ গম্ভীর করে বসে আছে অফিসে নিজের রুমটাতে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আজ রাতেই কানেক্টিং ফ্লাইটে যেতে হবে চিটাগাং এ। সমস্যাটা এটা নিয়ে নয়। মোবাইল অন করেই শ্রেয়ার মেসেজটা পেয়েছে। কি করবে বুঝতে পারছেনা। বাসায় যেয়ে ডিনার শেষ করে ফ্লাইটটা ধরা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় কথা বীরু চিটাগাঙ চলে যাচ্ছে এক বছরের জন্য। শ্রেয়ার জন্য কি মনটা খুব খারাপ লাগছে? না, তা নয়.. তবে এই মুহূ্র্তে ওর খুব একাকী লাগছে। শ্রেয়াকে কিভাবে বলবে সে চলে যাচ্ছে... হ্য়ত দুজনার আর একসাথে থাকা নাও হতে পারে। এতদিনের এই যে কতকিছু একসাথে ভাগাভাগি করে কাটিয়ে দেওয়া- সবকিছু কি একমুহূর্তে মিথ্যে হয়ে গেলো? কি রকম সম্পর্ক তাদের ? সবথেকেও কিছু নেই। শুধুই কি নিছক কিছু প্রয়োজনে দুজনে একসাথে ছিলো? সম্পর্ক কি সব সময় প্রয়োজনের উপরই দাড়িয়ে থাকে ? এই যে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিল বীরু, একবারো কি শ্রেয়ার কথা মনে পড়েনি? না মনে পড়তে দেয়নি বীরু? যে সম্পর্কে দায়বদ্ধতা নেই সেখানে কেন এত ভাবাভাবি? বীরু ফ্রেশ রুমে যেয়ে ভালো করে মুখ ধুয়ে এসে ফোন করে শ্রেয়াকে।
হ্যালো বীরু কি ব্যাপার, তুমি কি সারারাত অফিসে কাটিয়ে দেবে নাকি? সারাটা দিন ফোন বন্ধ রাখলে, এক মিনিটের জন্য হলেও তো খবর নিতে পারতে..। যাই হোক বলো তোমার মিটিং কেমন হলো। সাক্সেসফুল? একসাথে এতগুলো কথা বলে থামলো শ্রেয়া।
হ্যা সব ভালোই হয়েছে.. স্যরি তোমার কোন খোঁজ নিতে পারিনি সারাদিন... জানোইতো এই সব মিটিংএ কত প্রেশার থাকে... বীরুর উত্তর।
বাদ দাও ওসব কথা। কখন বের হচ্ছ অফিস থেকে ? আমিতো অনেক রান্না করে ফেলেছি আজ। জানো বিশ্বাসই হচ্ছে না এতগুলো রান্না আমি নিজে করেছি। বিরু একটু তাড়াতাড়ি আসতে পারোনা আজ ?
বীরু ভেবে পায়না কি বলবে। বীরুর কোন কথা না শুনে শ্রেয়ার উদ্বিগ্ন কন্ঠ- কোন সমস্যা বীরু? আমাকে বলা যায়না?
হ্যা তোমাকে তো বলতে হবেই... কিন্তু কিভাবে যে বলি..... শ্রেয়া আমি সত্যিই খুব দুঃখিত... আজ যে আসতে পারছিনা.. কিছুক্ষণ পরেই আমাকে এয়ারপোর্ট যেতে হবে। আজ রাতেই আমাকে চিটাগাঙ পৌছাতে হবে। শ্রেয়া, আমি দুঃক্ষিত ... তুমি এত কিছু করলে অথচ আমি .... কিন্তু কি করব বলো ! নতুন করে আবার শুরু করতে হচ্ছে। এক বছরের জন্য আমাকে ওখানে থাকতে হবে.... তুমি বুঝতে পারছো ... শ্রেয়া তুমি প্লিজ আমাকে ভুল বুঝনা....।
শ্রেয়া চুপচাপ শোনে বীরুর কথা। একসময় লাইনটা কেটে দেয়। তাকিয়ে থাকে টেবিল ভর্তি খাবারের দিকে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে ওর। কাঁদতে পারেনা। এ কেমন সম্পর্ক ছিল ওদের! বীরুর কি একবারও মনে হয়নি কিছু না হোক অন্ততঃ দেখা করে যাওয়ার কথা? না খাক্, এক চিমটি মুখে দিয়ে বলতো অনেক করলে..! শ্রেয়ার বুকের ভেতরটা চাপা অভিমানে, ক্ষোভে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কার উপর অভিমান ওর? অভিমানের কোন কথাই তো এই সম্পর্কে ছিলনা। কথা ছিল যখন যার যা ইচ্ছে হবে তখন তাই সে করতে পারবে। আধুনিক কালের এইসব সম্পর্কটাকে আজ এত তেতো ঠেকছে ওর! এই মুহূর্তে মাকে খুব মনে পড়ছে। মা বেঁচে থাকলে এই অবস্হা দেখলে কি করত কে জানে? আর ভাবতে পারছেনা শ্রেয়া। বেঁচে থাকবার জন্য যদি সম্পর্ক হয় তবে তার মত সম্পর্কের কিমখুব প্রয়োজন? মেলাতে পারেনা। হয়ত অর্থহীন তবু তো এইসব সম্পর্কে কেটে যায় আমাদের জীবন! কিন্তু এ কেমন জীবন শ্রেয়ার?
ধীর পায়ে ডাইনিং থেকে বেড রুমের দিকে হাটে শ্রেয়া। নরম আলোয় সদ্য শেষ হওয়া খাবারগুলো যেন শ্রেয়ার দিকে তাকিয়ে হাসছে। দ্রুত বেড রুমে ঢুকে জোরে দরজাটা বন্ধ করে বিছানায় আছড়ে দেয় শরীরটাক.... ফুপিয়ে ওঠে... আজ ওর কান্না দেখার কেউ নেই... বীরু, তুমি এমনটা না করলে পারতে না? শ্রেয়ার হিসেব মেলেনা....।
বীরুর চিটাগাঙ-গামী এয়ারবাসটা তখন কেবল যাত্রা শুরু করেছে। প্রচণ্ড শব্দের মাঝে সে তাকিয়ে থাকে জানালার অন্ধকারে .... নিচে তখন ঠাঁই দাড়িয়ে লক্ষ কোটি আলোয় পাহারা দেয়া ঢাকা শহর ... বড় অচেনা লাগে তার কাছে । ।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০১০ সকাল ১০:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


