somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

খুজে বের করতে হবে সেই গুপ্তধন

১০ ই মে, ২০০৯ দুপুর ১:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। অবিভক্ত বাংলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল, জাপানীরা আসছে। গুজব নয়, সত্যি সত্যি বার্মা দখল করে নিল জাপানীরা, বোমা ফেলল কোলকাতা বন্দরে। বড় বড় শহরগুলোয় সে-সময় সবাইকে চমকে দিয়ে সাইরেন বেজে উঠত, এই বুঝি বোমা পড়ল। এরকম এক অস্থির ও আতঙ্ককর পরিস্থিতিতে পূর্ব বাংলার নবাব আর জমিদাররা গোপন এক বৈঠকে বসলেন ঢাকায়। সঠিক জানা যায় না প্রথম বৈঠকে তাদের সঙ্গে চট্টগ্রামের নামকরা সব সওদাগররা ছিলেন কিনা, তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৈঠকে যে ছিলেন তার লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে একশো একুশজন অংশগ্রহণ করেন সর্বশেষ বৈঠকে। সেই বৈঠকে সর্বসম্মতিμমে সিদ্ধান্ত হয়, সংশি−ষ্ট সবার যার যত স্বর্ণমুদ্রা ও অলঙ্কার আছে সব এক জায়গায়, অর্থাৎ চট্টগ্রামে জড়ো করা হবে, তারপর একটা বড় জাহাজে তুলে পাঠিয়ে দেয়া হবে সুন্দরবনের গভীরে। গোটা ভারতবর্ষ না পারুক, জাপানীরা যে অন্তত বাংলা দখল করবে, এ-ব্যাপারে তাঁদের মনে কোন সন্দেহ ছিল না। এ-ধরনের একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার পিছনে সেটাই ছিল একমাত্র কারণ। একশো একুশ জনের একটা তালিকা তৈরি করা হয়, প্রত্যেকের নামের পর লেখা হয় কার কি পরিমাণ সোনা জমা করা হলো। পরিমাপের কাজ সের ও মন-এর হিসেবে করা হয়। আসল কথা, সোনার পরিমাণ যাদের কম তাঁরা এই তালিকায় স্থান পাননি বা পাবার চেষ্টাও করেননি। সবচেয়ে কম সোনা জমা পড়ে কুমিল−ার এক জমিদারের, মাত্র এক মন তিন সের। সবচেয়ে বেশি জমা পড়ে ঢাকার নবাববাড়ির এক নবাবপুত্রের নামে ছয় মন বারো সের। সব মিলিয়ে প্রায় তিনশো মন সোনা। শুধু সোনাই নয়, সোনার সঙ্গে হীরা ও অন্যান্য দামী রতড়বও ছিল প্রচুর। হীরা বা অন্যান্য রতেড়বর কোন লিখিত হিসাব অবশ্য পাওয়া যায়নি।
বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত হয়, বাছাই করা বিশ্বস্ত একদল প্রাক্তন সৈনিককে রাখা হবে জাহাজে, তারাই পাহারা দিয়ে সুন্দরবনে নিয়ে যাবে রতড়বালঙ্কার ও তিনশো মন সোনা, তাদের সবার কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ থাকবে। সংখ্যায় তারা হবে পঁচিশজন, সুন্দরবনের গভীর প্রদেশে পৌঁছুনোর পর তাদের কাজ হবে দুর্গম ও নির্জন কোন এলাকায় মাটির তলায় ওই সোনা লুকিয়ে রাখা, এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ওখানেই পাহারায় থাকা। মাস ছয়েক চলার মত প্রয়োজনীয় রসদ ইত্যাদি তাদের সঙ্গেই থাকবে।
নির্দিষ্ট সময়-সীমা নির্ধারণ করা হয় এক মাস, এই সময়ের মধ্যে সবার সোনা চট্টগ্রামে পৌঁছুতে হবে। কিন্তু আরাকানে জাপানীদের উপস্থিতি ও কোলকাতা বন্দরে বোমাবর্ষণের ঘটনা উদ্যোক্তাদের অস্থির করে তোলে, সময়-সীমা কমিয়ে পনেরো দিন করা হয়।
নির্দিষ্ট সময়েই চট্টগ্রামের প্রাচীন এক মন্দিরে পৌঁছে যায় তিনশো মন সোনা। ইতিমধ্যে পঁচিশজন প্রাক্তন সৈনিককে নিয়োগ করা হয়েছে, তারাই পঁচিশটা বড় আকারের কাঠের বাক্সে সেগুলো ভরে জাহাজে তোলার জন্যে। জাহাজ মানে ঝক্কর মার্কা একটা স্টিমার, যথাসময়ে চট্টগ্রাম থেকে রওনা হয়ে যায় সুন্দরবনের উদ্দেশে। এরপরের ইতিহাস খুবই রহস্যময়।
কঙ্গা বা মারঝাটা নদীর মোহনায় শেষবার দেখা গেছে স্টিমার হংসকে। অসমর্থিত খবরে বলা হয়, ওখানে পৌঁছুনোর আগেই স্টিমারে কলেরা ছড়িয়ে পড়ে, ফলে পাহারাদারদের ছ’জন বাদে বাকি সবাই মারা যায়। তারপর হংসকে দেখা যায় নাফ নদীতে, গন্তব্যের সম্পূর্ণ উল্টোদিকে। হংসকে নাকি টো করে নিয়ে যাচ্ছিল একটা জাপানী গানবোট, হংসের ডেকেও জাপানী সৈনিকদের অস্ত্র হাতে পাহারা দিতে দেখা গেছে। ছ’জন বাঙালী পাহারাদারের ভাগ্য সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। ধরে নেয়া চলে তাদেরকে জাপানীরা মেরে ফেলেছিল।
পরবর্তী ইতিহাস আরও অস্পষ্ট। ঘটনার সময় আর কিছু জানা না গেলেও, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ‘ওঅর হিস্টরী’ ডিপার্টমেন্ট থেকে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়। সে-সব তথ্যে উলে−খ করা হয়েছে, যুদ্ধের শেষ দিকে একদল জাপানী সৈনিক একটা জাহাজ নিয়ে বার্মা থেকে স্বদেশের পথে রওনা হয়, তাদের সঙ্গে ভারত থেকে লুঠ করা পাঁচশো মন সোনা ছিল। সিঙ্গাপুর হয়ে, দক্ষিণ চীনসাগর পেরিয়ে, প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে যাচ্ছিল তারা। পথে তাদেরকে বাধা দেয় একটা জার্মান গানবোট। জাপানীদের মেরে ফেলে জার্মান নৌ-বাহিনীর সৈনিকরা, তারপর দখল করে নেয় জাহাজটা। ধারণা করা হয়, ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ‘ওঅর হিস্টরী’-তে যেটাকে ভারতীয় সোনা বলে উলে−খ করা হয়েছে সেটাই আসলে বাংলার নবাব ও জমিদারদের সোনা। জাপানীদের জাহাজে তার সঙ্গে সম্ভবত অন্যান্য এলাকা থেকে লুঠ করা সোনাও ছিল, সেজন্যেই পাঁচশো মন আন্দাজ করা হয়েছে।
বাংলার এই সোনা জার্মানীতে নিয়ে যাওয়া হয়, লুকিয়ে রাখা হয় অন্যান্য দেশ থেকে লুঠ করা বিপুল ধনরাশির সঙ্গে। ধনরাশি বলতে শুধু সোনা নয়, তার সঙ্গে ছিল অমূল্য শিল্পকর্ম, সিকিউরিটি বণ্ড ইত্যাদি। জার্মান ব্যাংকের ইস্যু করা সিকিউরিটি বণ্ড আজও বাতিল করা হয়নি।
‘জার্মানীতে জমা হওয়া সোনাদানা বেশিরভাগই মিত্রপক্ষ নিয়ে যায়। মিত্রপক্ষ বলতে আমি ব্রিটেন, আমেরিকা আর রাশিয়ার কথা বলছি। সর্বমোট ঐশ্বর্যের দুই তৃতীয়াংশ চোরের ওপর বাটপারি হয়ে যায়। বাকি এক ভাগ নাৎসীরা সঙ্গে নিয়ে পালায়। কম করে ধরলেও, ওয়েন, চলতি বাজারে তার মূল্য হবে এই ধরো পাঁচশো মিলিয়ন পাউণ্ড।’

‘মিত্রপক্ষ যে সোনা নিয়ে যায় তার মধ্যে বাংলার সোনা ছিল না। তারমানে আমাদের সোনা থেকে যায় নাৎসীদের হাতে। শুধু আমাদের সোনা নয়, তার সঙ্গে নাৎসীদের হাতে বেশ কিছু সিকিউরিটি বণ্ডও থেকে যায়, অমূল্য কিছু শিল্পকর্ম সহ। কিছু বণ্ড অবশ্যই গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়। কিছু শিল্পকর্ম অস্ট্রিয়ান আলপাইন লেকের তলায় ডুবিয়ে রাখা হয়েছে, এখন পর্যন্ত বলা হচ্ছে ওগুলো আর উদ্ধার করা যাবে না। আমি বুয়েনস আয়ার্সের এক মিলিওনিয়ারকে চিনি, যার সেলার গ্যালারিতে এক জোড়া রাফায়েল আছে, একটা মাইকেল অ্যাঞ্জেলো আছে রিও-তে, নিউ ইয়র্কে আছে একাধিক রুবেনস। সংশি−ষ্ট দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে এগুলোর বর্তমান মালিকদের খুব ভাল সম্পর্ক, কাজেই বেআইনীভাবে এ-সব রাখার দায়ে কখনোই তাদেরকে বিপদে পড়তে হবে না। উনিশশো সত্তর সালে ত্রিশ মিলিয়ন পাউণ্ড মূল্যের সিকিউরিটি বণ্ড ছাড়া হয় লণ্ডন, নিউ ইয়র্ক আর জুরিখের মানি মার্কেটে, কিন্তু মালিকানা প্রমাণ না করা পর্যন্ত ওগুলো ভাঙাতে অস্বীকৃতি জানায় ফেডারেল ব্যাংক অভ জার্মানী। অর্থাৎ এগুলো যে উনিশশো পঁয়তালি−শ সালে রাইখ ব্যাংক- এর ভল্ট থেকে সরানো হয়েছিল, এটা একটা ওপেন সিক্রেট।‘তবে ত্রিশ মিলিয়ন পাউণ্ড সামান্য ভগড়বাংশ মাত্র, বেশিরভাগটাই গোপনে কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে। যুদ্ধ শেষ হলেও, অবৈধ মালিকরা সেগুলো ভাঙাতে সাহস পায়নি। শুধু এই ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করে ইটালি সরকারের রিকভারি অফিস। অফিসের বড়কর্তা প্রফেসর সিভাইরো বলছেন, কম করেও সাতশো শিল্পকর্ম এখনও নিখোঁজ। আরেকজন বিশেষজ্ঞ, শিমন ওয়াজেনথাল, প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন যে অসংখ্য নাৎসী অফিসার, তাদের মধ্যে উচ্চপদস্থ এসএস কর্মকর্তারাও আছেন, গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে থাকা গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে নিয়মিত সিকিউরিটি বণ্ড ভাঙিয়ে দিব্যি বিলাসবহুল জীবন যাপন করছেন।
‘প্রফেসর সিভাইরো আর শিমন ওয়াজেনথাল এ-ধরনের উদ্ধার-কর্মে বৈধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুপরিচিত। সব মিলিয়ে তাঁদের সংখ্যা তিন কি চারজনের বেশি হবে না। কিন্তু আইনের বাইরে থেকে উদ্ধার-কর্মে লেগে আছে এমন বিশেষজ্ঞ লোকের সংখ্যা অনেক।


--:)
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মার্চ, ২০১২ বিকাল ৪:১২
১২টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×